রোবট যেখানে পিৎজা হাতে, হৃদয় সেখানে চিঠি লেখে
· Prothom Alo

যান্ত্রিকতার এই দ্রুতগামী যুগে আমরা যখন ক্রমশ অ্যালগরিদমের কাছে নিজেদের অনুভূতি সঁপে দিচ্ছি, তখন একটুকরা কাগজ আর কলমের কাছে ফিরে যাওয়ার সুযোগটাই যেন বিরল হয়ে উঠেছে। এমনই এক সুযোগ তৈরি হয়েছে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) বটতলায়। বিশ্ব পর্যটন দিবস-২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত ফুড ফেস্টিভ্যালে ভিন্নমাত্রা যোগ করেছে ‘চিঠি বক্স’। খাবার ও পর্যটনকেন্দ্রিক আয়োজনের মধ্যে রাখা এই ডাকবাক্সে শিক্ষার্থী ও দর্শনার্থীরা নিজেদের ভাবনা, অনুভূতি ও স্বপ্ন লিখে জমা দিচ্ছেন।
ফুড ফেস্টিভ্যালে সাধারণত খাবারই প্রধান আকর্ষণ। সেখানে চিঠি বক্স শিক্ষার্থীদের মতপ্রকাশের এক ভিন্ন মাধ্যম হয়ে উঠেছে। মোবাইলে মুহূর্তে বার্তা পাঠানোর এই সময়ে হাতে লেখা চিঠির অভিজ্ঞতা অনেকের কাছেই নতুন। পর্যটন উৎসবের সঙ্গে অনুভূতি ভাগাভাগির এই উদ্যোগ আয়োজন শুধু খাবারের উৎসবের গণ্ডিতে আটকে রাখেনি, দিয়েছে এক ভিন্নমাত্রা।
Visit betsport.cv for more information.
বাক্সের পাশের টেবিলে রাখা আছে রঙিন কাগজ। আগ্রহীরা কাগজ তুলে নিয়ে নিজের ভাবনা লিখছেন, তারপর ভাঁজ করে বাক্সে ফেলছেন। বাক্সের গায়ে সাঁটা পোস্টারে লেখা, নিজের চিন্তা, অনুভূতি ও স্বপ্ন এখানে রেখে যাও; ছোট চিরকুটও বয়ে আনতে পারে বড় হাসি। বাক্সের পাশে বসা দায়িত্বরত শিক্ষার্থীরা দর্শনার্থীদের প্রক্রিয়াটি বুঝিয়ে দিচ্ছেন। পথচলতি অনেকেই এমন আয়োজন দেখে থমকে দাঁড়াচ্ছেন।
উৎসবের সূচনা হয় গত রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৭) সকাল ১০টায় ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদ থেকে বের হওয়া বর্ণাঢ্য র্যালির মাধ্যমে। র্যালিতে শিক্ষার্থীরা সাজসজ্জায় তুলে ধরেন বাঙালির সংস্কৃতি ও গ্রামীণ জীবনের ঐতিহ্য। কেউ সেজেছেন বর-বউ, কেউ কিষান-কিষানি, কেউবা বাউল আবার কেউ জমিদার-জমিদারপত্নী। ছিলেন আদিবাসী জনগোষ্ঠী ও গ্রামীণ নারীর সাজে অংশগ্রহণকারীরাও। পাশাপাশি শেফ, এয়ার হোস্টেস, ওয়েটার ও ট্যুরিস্ট পুলিশের বেশে উঠে আসে পর্যটন খাতের নানা পেশা। ঐতিহ্য আর আধুনিক পর্যটনের এই মিলিত রূপ নিয়েই র্যালিটি বটতলায় এসে শেষ হয়।
নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের আয়োজিত এই ফুড ফেস্টিভ্যালের উদ্বোধন করেন উপাচার্য অধ্যাপক এ কে এম মতিনুর রহমান। বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. মাসুদ রানা জানান, তিন দিনব্যাপী এই আয়োজন চলবে।
উৎসবের বাকি অংশ মূলত প্রযুক্তি, খাবার ও সংস্কৃতিকেন্দ্রিক। এবারের প্রতিপাদ্য ‘ডিজিটাল এজেন্ডা অ্যান্ড আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ফর ট্যুরিজম’। সেই প্রতিপাদ্যের আবহে বটতলায় রাখা হয়েছে রোবটের আদলে তৈরি একটি কাটআউট, যার এক হাতে বার্গার অন্য হাতে পিৎজা। পর্যটনের ভবিষ্যৎ যে ক্রমেই প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে উঠছে, আতিথেয়তার সেবায় যন্ত্রের উপস্থিতি যে আর দূরের কল্পনা নয়, এই কাটআউট যেন সেই ইঙ্গিতই দেয়। আছে পালকির আদলে বানানো ছবি তোলার ফ্রেমও। প্রযুক্তিনির্ভর ও গ্রামীণ নান্দনিক এই সাজসজ্জার পাশে চিঠি বক্স উৎসবে যুক্ত করেছে ভিন্নমাত্রা।
খাবারের স্টলগুলোও সাজানো হয়েছে নান্দনিক নামে। এর মধ্যে অন্যতম ভ্রমণকুঞ্জ, পাঁচফোড়ন, পকেট বাইটস, লিটল পার্লিস, তাউফা ক্রিয়েশন ও সিশেল। ব্যানারে লেখা ‘দাম থাকবে নাগালে, স্বাদ থাকবে মনে’। স্টলগুলোতে দেশীয় ও বিদেশি খাবারের পাশাপাশি পর্যটনসংশ্লিষ্ট সামগ্রী, গাইডসহ নানা উপকরণ প্রদর্শন করা হয়। পাঁচফোড়ন স্টলের সামনে রাখা ‘আপনার মন্তব্য’ বোর্ডে দর্শনার্থীরা রঙিন চিরকুটে খাবার নিয়ে মতামত জানাচ্ছেন।
স্টলে স্টলে যখন খাবারের ঘ্রাণ, ছবির ফ্রেমে ভিড়, আর রোবটের কাটআউটের হাতে পিৎজা, তখন বটতলার এক কোণে হলুদ ডাকবাক্সটি নীরবে অপেক্ষা করছে পরের চিরকুটের জন্য। যেখানে থাকবে প্রিয়জনের জন্য কিছু বার্তা,কিছু অনুভূতি। প্রযুক্তি, স্বাদ আর সংস্কৃতির এই মিলনমেলায় কাগজে লেখা কয়েক লাইন যেন উৎসবের সবচেয়ে নিদারুণ স্পর্শ হয়ে রয়েছে।
*লেখক: নূর ছানজিদাহ স্মৃতি, শিক্ষার্থী, কমিউনিকেশন অ্যান্ড মাল্টিমিডিয়া জার্নালিজম, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ