শিক্ষার্থীদের আনন্দময় একটি দিন

· Prothom Alo

উবারে ৯০০ টাকায় গাড়ি ভাড়া করে দুই বন্ধু মাহমুদুল হাসান ও হৃদয় মল্লিক সকাল সাতটায় মিরপুর-১১ নম্বর থেকে রওনা দিয়েছিল। গন্তব্য সাভারের আশুলিয়ার ফ্যান্টাসি কিংডম। জিপিএ-৫ সংবর্ধনায় অংশ নিতেই তাদের এই যাত্রা।

Visit albergomalica.it for more information.

সকাল ১০টার দিকে ফ্যান্টাসি কিংডমের প্রবেশপথের পাশে তৈরি করা বুথের সামনে লাইনে দাঁড়িয়ে ক্রেস্ট, কুপনসহ প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সংগ্রহ করছিল তারা। তখনই কথা হলো তাদের সঙ্গে।

এবার বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এই দুই বন্ধু এসএসসিতে জিপিএ-৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছে। তাদের পাশেই ছিল ৯ বন্ধুর আরেক দল। বুথের সামনে তারা সবাই মিলে সেলফি তুলছিল। তাদের মধ্যে নাইমুল ইসলাম ও ইবনে মুবাশ্বির জানাল, উত্তরা থেকে এসেছে বাসে করে। এত দিন সবাই নওয়াব হাবিবুল্লাহ স্কুল অ্যান্ড কলেজ পড়লেও এসএসসি পাস করার পর কলেজ আলাদা হয়ে গেছে। জিপিএ-৫ সংবর্ধনা উপলক্ষে আবার সবাই একত্র হওয়ায় আনন্দের মাত্রা তাদের বেড়েছে অনেক।

আশুলিয়ায় ফ্যান্টাসি কিংডম আজ বুধবার সকাল থেকেই উৎসবমুখর হয়ে উঠেছিল নাইমুল, হৃদয় মল্লিকদের মতো হাজার হাজার কৃতী শিক্ষার্থীর সমাগমে। তারা এই বিনোদনকেন্দ্রে ছোটাছুটি করে, রাইডে ওঠে, বন্ধুদের সঙ্গে সেলফি তুলে আর জমিয়ে আড্ডা দিয়ে কাটিয়েছে এক অনাবিল আনন্দের দিন।

প্রথম আলোর আয়োজনে ও শিক্ষার ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম শিখোর পৃষ্ঠপোষকতায় ‘স্বপ্ন দেখ জীবন গড়ো’ স্লোগান নিয়ে এবার এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পাওয়া কৃতী শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা শুরু হয়েছে গত ১৩ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম থেকে। উৎসবে অংশ নিতে এবার সারা দেশে এরই মধ্যে ৮৩ হাজার শিক্ষার্থী অনলাইনে নাম নিবন্ধন করেছে।

ফ্যান্টাসি কিংডমে ঢাকা ও পার্শ্ববর্তী এলাকার শিক্ষার্থীদের দুই দিনের সংবর্ধনা শুরু হয়েছিল মঙ্গলবার থেকে। আজ বুধবার ছিল শেষ দিন। এই দুই দিনের সংবর্ধনায় অংশ নিতে নাম নিবন্ধন করে প্রায় ২০ হাজার শিক্ষার্থী।

সকাল ৯টায় শিক্ষার্থীরা ফ্যান্টাসি কিংডমের সামনের বুথ থেকে নিবন্ধনপত্র দেখিয়ে ক্রেস্ট, উপহার, ভেতরে প্রবেশের রিস্টব্যান্ড, রাইড ও খাবারের কুপন সংগ্রহ করে। ভেতরে তাদের জন্য বিভিন্ন স্টলে ছিল কুইজ, সুডোকু, রুবিক্সকিউব মেলানো, বোতল ফ্লিক, লুডোতে প্রথম চালে ছক্কা ফেলা, পাজল মেলানো, কাগজের কাপে পিরামিড সাজানোর মতো অনেক মজার মজার প্রতিযোগিতা। বিজয়ীদের জন্য ছিল বই, কিশোর আলো, বিজ্ঞানচিন্তা, প্রথম আলোর লোগোযুক্ত চাবির রিংয়ের মতো তাৎক্ষণিক পুরস্কার।

এই উৎসব পাওয়ার্ড বাই বিকাশ। সহযোগিতায় রয়েছে কনকর্ড গ্রুপ, ফ্রেশ, সেভয় আইসক্রিম, কনকা–গ্রী, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক পিএলসি, কোয়ালিটি গ্রুপ, প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটি, জিংক বি, অতীশ দীপঙ্কর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, ইউসিএসআই ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ শাখা ক্যাম্পাস, আম্বার আইটি লিমিটেড, এটিএন বাংলা ও প্রথম আলো বন্ধুসভা। প্রাথমিক চিকিৎসাসহয়তা দিয়েছে আনোয়ার খান মডার্ন মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল।

মঞ্চমাতানো আয়োজন

কৃতী শিক্ষার্থী সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে প্রধান পৃষ্ঠপোষক ‘শিখো’র একাডেমিক পরিচালক এনামুল ইসলাম ও মেন্টররা। সাভারের ফ্যান্টাসি কিংডম। ৩০ সেপ্টেম্বর

ছোটাছুটি, ঘোরাঘুরি, দুপুরের খাবারের পর মঞ্চে শুরু হয় উৎসবের মূল আকর্ষণ অনুপ্রেরণাদায়ী কথোপকথন ও সাংস্কৃতিক পর্ব। প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক সুমনা শারমীনের সঞ্চালনায় এই পর্ব শুরু হয় জাতীয় সংগীত পরিবেশনা দিয়ে। পারশা ও রাফার গাওয়া সংবর্ধনার ভাবনা সংগীত (থিম সং) ‌‘বিজয় নিশান’ ডিজিটাল পর্দায় প্রদর্শন করা হয়। সঞ্চালক শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবনে প্রথমবার বড় কৃতিত্ব অর্জনের জন্য অভিনন্দন জানান। তিনি এই কৃতিত্বের জন্য মা–বাবা ও শিক্ষকের ভূমিকা কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করে তাদের জন্য হর্ষধ্বনি দেওয়ার আহ্বান জানালে শিক্ষার্থীরা কণ্ঠছেড়ে চিৎকার দিয়ে ফ্যান্টাসি কিংডমের পরিবেশ মুখর করে তোলে।

কৃতী শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতের পথচলায় এই সাফল্য ধরে রাখার পাশাপাশি পরিবার, দেশ, জাতির জন্য কাজ করতে অনুপ্রেরণা দিয়ে বক্তব্য দেন বিভিন্ন ক্ষেত্রের বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বরা। ভূপর্যটক এলিজা বিনতে এলাহী মঞ্চে এসে শিক্ষার্থীদের তাঁর পর্যটন অভিজ্ঞতার গল্প শোনান। তিনি বিশ্বের ৬৬টি দেশে এবং বাংলাদেশের ৬৪টি জেলায় ভ্রমণ করেছেন। শিক্ষার্থীদের তিনি বলেন, ভ্রমণে আনন্দ আছে তবে এটি শিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যমও। তিনি শিক্ষার্থীদের নিজ নিজ জেলার ঐতিহ্যবাহী স্থানগুলো ঘুরে দেখা এবং পর্যায়ক্রমে সারা দেশ ভ্রমণের উৎসাহ দেন। এর মাধ্যমে তারা দেশকে ভালোভাবে জানতে পারবে। তিনি তাদের মানবিক মানুষ হয়ে ওঠার পরামর্শ দেন।

ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির (ইউআইইউ) মার্স রোভার টিমের কো-টিম লিডার শেখ সাকিব হোসেন বলেন, তিনি রোবট নিয়ে কাজ করছেন। তাঁদের রোবোটিক দল ২০২২ সালের এশীয় রোবোটিক প্রতিযোগিতায় তৃতীয় স্থান অধিকার করেছিল। তিনি নবীন শিক্ষার্থীদের বলেন, নিজেদের যোগ্য নাগারিক ও ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।

শিখোর একাডেমিক পরিচালক এনামুল কবির ও মেন্টররা শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতের জন্য কঠিন পরিশ্রম ও লক্ষ্য অটুট রাখার পরামর্শ দেন। শিক্ষার্থীদের নিয়ে ‌‌‘শিখব, জিতব’ স্লোগান দেন তাঁরা।

প্রথম আলোর ব্যবস্থাপনা সম্পাদক কথাশিল্পী আনিসুল হক শিক্ষার্থীদের পাঠ্যপুস্তকের পাশাপাশি বেশি বেশি অন্য বই পড়ার পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, জানার জন্য পড়ার কোনো বিকল্প নেই। প্রথম আলো, কিশোর আলো, বিজ্ঞানচিন্তা পড়তে শিক্ষার্থীদের উৎসাহিত করেন। তিনি শিক্ষার্থীদের মাদক, মিথ্যা ও মুখস্থকে ‘না’ বলার শপথ পড়ান।

অনুষ্ঠানের একটি পর্ব সঞ্চালনা করেন প্রথম আলোর মহাব্যবস্থাপক ও হেড অব মার্কেটিং অ্যান্ড ইভেন্টস আজওয়াজ খান। এ পর্বে শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন হেড অব ফ্যান্টাসি কিংডম কাজী রাফি, মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের ব্যবস্থাপক মো.ওয়ালিউল হক, প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটির স্কুল অব বিজনেসের ডিন অধ্যাপক আবুল কালাম, ইউসিএসআই ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের ভাইস প্রেসিডেন্ট (একাডেমিক) অধ্যাপক এইচ এম জহুরুল হক ও আম্বার লিমিটেডের সহকারী মহাব্যবস্থাপক সুব্রত সরকার শুভ্র।

অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন অতীশ দীপঙ্কর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউশনাল কোয়ালিটি অ্যাসুরেন্স সেলের অতিরিক্ত পরিচালক জাবের আহমদ।

দিনের প্রথম ভাগে অনুষ্ঠিত কুইজ প্রতিযোগিতায় বিজয়ী শিক্ষার্থীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন অতিথিরা।

বন্ধুদের সঙ্গে, সংবর্ধনা নিতে

গানে গানে সুরেলা বিকেল

সংবর্ধনা উৎসবে গানে গানে শিক্ষার্থীদের মাতিয়ে রাখেন সংগীতশিল্পী তানভীর ইভান, জেফার রহমান ও ব্যান্ড ডিফরেন্ট টাচের শিল্পীরা। আর শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলাপচারিতায় অংশ নিতে মঞ্চে ছিলেন অভিনেত্রী সাফা কবির ও উপস্থাপক রাফসান শাবাব।

তানভীর ইভান গেয়েছেন দুটি গান ‘আকাশ’ ও ‘শূন্য’। জেফার রহমান পরিবেশন করেন ‘ঝুমকা’ ও ‘লিচুর বাগানে’।

সাফা কবির শিক্ষার্থীদের কৃতিত্বের জন্য অভিনন্দন জানান। পরে শিল্পীরা সবাই মিলে ‘লিচুর বাগানে’ গানের সঙ্গে নৃত্য পরিবেশন করেন।

শেষে ছিল জনপ্রিয় ব্যান্ড ডিফরেন্ট টাচের ব্যান্ড সংগীত। তারা তাদের জনপ্রিয় গান, ‘মন কি যে চায় বলো’, ‘বন্ধু আবার কবে দেখা হবে’, ‘শ্রাবণের মেঘগুলো জড়ো হলো আকাশে’র মতো গানগুলো গেয়ে শিক্ষার্থীদের মাতিয়ে তোলেন। আড্ডা ও উল্লাসে ভরা এক আনন্দময় দিনের স্মৃতি নিয়ে ফিরে যায় নবীন কৃতী শিক্ষার্থীরা।

Read full story at source