বাঁধ সংস্কারে আনার কথা বাইরের মাটি, তবে কাটা হচ্ছে ফসলি জমি

· Prothom Alo

প্রকল্প এলাকার বাইরে থেকে মাটি এনে বাঁধ সংস্কার করার কথা। এ জন্য বরাদ্দও রাখা হয়েছে ২ কোটি ৩৮ লাখ ৮৩ হাজার টাকা। কিন্তু অন্য এলাকা থেকে না এনে খালের দুই পাড়ের আবাদি জমি কেটে বাঁধ সংস্কারের কাজ করা হচ্ছে। এতে নষ্ট হচ্ছে ফসলি জমি।

Visit h-doctor.club for more information.

দিনাজপুরের পার্বতীপুর উপজেলায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) ‘টিওয়ানএসএইটডি’ সেচখালের বাঁধ পুনর্বাসন ও শক্তিশালীকরণ প্রকল্পে এমন অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। খোদ পাউবো সরেজমিনে এই অনিয়মের সত্যতা পাওয়ার কথা উল্লেখ করে ঠিকাদারকে দুই দফায় চিঠিও দিয়েছে। তবে ঠিকাদার বলছেন, তিনি কোনো চিঠি পাননি। অনিয়মের বিষয়েও কিছু জানেন না।

পাউবোর পার্বতীপুর পানি উন্নয়ন উপবিভাগ সূত্র জানায়, ‘তিস্তা সেচ প্রকল্পের কমান্ড এলাকার পুনর্বাসন ও সম্প্রসারণ’ শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় ১২ দশমিক ২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ খালটির দুই পাড় পুনর্বাসন ও শক্তিশালী করা হচ্ছে। এর মধ্যে ৪৪০ মিটার আরসিসি ঢালাই, ১০ কিলোমিটার সিসি লাইনিং এবং অবশিষ্টাংশ শুধু মাটি দিয়ে শক্তিশালী করা হবে।

খালের পাশ থেকে মাটি নিয়ে বাঁধ সংস্কারের জন্য গাছ-গাছালি সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে

কাজটির ব্যয় ধরা হয়েছে ১৩ কোটি ৯৫ লাখ টাকা। কাজটি পেয়েছেন মিজানুর আলম নামের একজন ঠিকাদার। কার্যাদেশ অনুযায়ী, ২০২২ সালের ১ ডিসেম্বর কাজ শুরু করে ২০২৪ সালের ৩০ ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ করার কথা। দুই দফায় বাড়িয়ে কাজের শেষ সময় নির্ধারণ করা হয়েছে চলতি বছরের ৩০ ডিসেম্বর। এ পর্যন্ত ৫৫ দশমিক ৫০ শতাংশ কাজ শেষ দেখিয়ে ঠিকাদার ৭ কোটি ৭২ লাখ টাকা বিলও নিয়েছেন।

কার্যাদেশের শর্ত অনুযায়ী, ঠিকাদারকে প্রকল্প এলাকার বাইরে থেকে প্রায় ৫৯ হাজার ৭০৮ ঘনমিটার মাটি এনে বাঁধ পুনর্নির্মাণ করার কথা। এ জন্যই প্রায় ২ কোটি ৩৮ লাখ ৮৩ হাজার টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

দিনাজপুরের চিরিরবন্দর উপজেলার দেবীগঞ্জ এলাকায় তিস্তা ব্যারাজ থেকে বের হয়ে ‘এসএইটডি’ নামের খালটি পার্বতীপুর উপজেলার আদমকাটা পর্যন্ত চলে গেছে। খালের মালিপাড়া এলাকা থেকে বের হওয়া টিওয়ানএসএইটডি খালটির সংস্কারকাজ করা হচ্ছে। যেটি পার্বতীপুর উপজেলার মাঝাপাড়া, চাকলা, খড়খড়িয়া নদী হয়ে সৈয়দপুর শহরের পাশ দিয়ে পুনরায় পার্বতীপুরের রামপুরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এলাকায় শেষ হয়েছে।

সম্প্রতি দুই দিন খাল ঘুরে দেখা যায়, খালের দুই পাড়ে খননযন্ত্র দিয়ে মাটি কাটা হচ্ছে। কোথাও খালের পাশের আবাদি জমি থেকে প্রায় ১০-১২ ফুট পর্যন্ত গভীর করে মাটি কেটে বাঁধে দেওয়া হচ্ছে। বাইরে থেকে মাটি আনার কোনো দৃশ্য চোখে পড়েনি। কয়েকটি স্থানে খালপাড়ের ঘরবাড়ি সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। কেটে ফেলা হয়েছে বাঁশ, কলাসহ অন্যান্য গাছপালা। কোথাও পাড়ের মাটি পড়ে পানির প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

আখিনুজ্জামান, নির্বাহী প্রকৌশলী, পানি উন্নয়ন বোর্ডএকটি অনিয়মের অভিযোগ ছিল যে পাশের জমি থেকে মাটি নিয়ে বাঁধে দেওয়া হচ্ছিল। সরেজমিনে আমরা বিষয়টির সত্যতা পেয়েছি এবং তাৎক্ষণিক মৌখিকভাবে কাজটি বন্ধ রাখতে বলা হয়েছে।

মালিপাড়ার বাসিন্দা জহুরুল ইসলাম বলেন, ‘কাজ শুরুর কয়েক দিন পর জানতে পারি, বাইরে থেকে মাটি আনার কথা। পরে দেখি, কোনো মাটি আনা হয়নি, বরং খালের পাশ থেকেই মাটি কাটা হচ্ছে। আমরা কাজ বন্ধ রাখতে বলেছিলাম। তখন ঠিকাদারের লোকজন বাইরে থেকে মাটি আনার আশ্বাস দিয়েছিল। কিন্তু সেটি আর হয়নি।’

একই এলাকার রায়হান আলী বলেন, ‘৩০ বছরের বেশি বয়স হবে খালটার। এত দিন পর সংস্কারকাজ হচ্ছে। কিন্তু আমাদের জমির মাটি কেটে পাড়ে দেওয়া হয়েছে। অনেকেরই ধানগাছ নষ্ট হয়েছে।’

এদিকে মাটি নিয়ে অভিযোগের পাশাপাশি সাইটে নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী পাওয়ার কথা জানিয়েছে পাউবো। গত ৩১ আগস্ট উপবিভাগীয় প্রকৌশলী জি এম রাইসুল ইসলাম ঠিকাদারকে সংস্কারকাজের অনিয়ম নিয়ে চিঠি দেন। এতে সিসি লাইনিং নির্মাণকাজের নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী সাইট থেকে সরিয়ে কার্যাদেশ অনুযায়ী নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করতে বলা হয়। চিঠিতে আরও বলা হয়, পরিদর্শনকালে দেখা গেছে খালসংলগ্ন অধিগ্রহণ করা জমি থেকে মাটি তুলে বাঁধে দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া সিসি লাইনিং ও আরসিসি ড্রেন অংশে দরপত্র অনুযায়ী মাটি দেওয়া হয়নি। চিঠিতে কার্যাদেশ অনুযায়ী মাটি শক্ত করার কথাও বলা হয়েছে।

পাউবোর এক কর্মকর্তা বলেন, মূল ঠিকাদারের কাছ থেকে স্থানীয় খাদেমুল ইসলামসহ কয়েকজন ঠিকাদার সাবলিজ নিয়ে কাজটি করছেন। সরকার পতনের পর দীর্ঘদিন কাজ বন্ধ ছিল। প্রায় দুই মাস পর আবার শুরু হলেও এখন বন্ধ।

এ বিষয়ে জানতে খাদেমুল ইসলামকে ফোন করা হয়। তবে পরিচয় দিতেই তিনি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। পরে খুদে বার্তা পাঠানোর কয়েকদিন পর তিনি ভয়েস মেসেজ পাঠান। এতে খাদেমুল এই প্রতিবেদকের সঙ্গে সাক্ষাতে কথা বলার আগ্রহ ব্যক্ত করেন।

পরে মূল ঠিকাদার মো. মিজানুর আলমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। তিনি বলেন, ‘কাজটি আমার নামে বের হয়েছে। তবে স্থানীয় কয়েকজন সাবলিজ নিয়ে বাস্তবায়ন করছে। কাজের অনিয়ম বা কোনো সমস্যার কথা আমি জানি না। কোনো চিঠিও আমার হাতে আসেনি। যারা আমার কাছে কাজটি নিয়েছে, তাদের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কথা বলে পরে জানাব।’

এ বিষয়ে সৈয়দপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আখিনুজ্জামান বলেন, ‘একটি অনিয়মের অভিযোগ ছিল যে পাশের জমি থেকে মাটি নিয়ে বাঁধে দেওয়া হচ্ছিল। সরেজমিনে আমরা বিষয়টির সত্যতা পেয়েছি এবং তাৎক্ষণিক মৌখিকভাবে কাজটি বন্ধ রাখতে বলা হয়েছে। পরে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে চিঠিও দেওয়া হয়েছে। পরে যদি আবার কোনো অভিযোগ পাই, খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

Read full story at source