রবীন্দ্রনাথের ‘নষ্টনীড়’ নিয়ে জাবি বন্ধুসভার পাঠচক্র
· Prothom Alo

মানুষের মনের জটিল অলিগলি, সম্পর্কের সূক্ষ্ম টানাপোড়েন এবং চার দেয়ালের মধ্যে নারীর নীরব আর্তনাদের এক অনন্য সাহিত্যিক রূপকার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তাঁর কালজয়ী সৃষ্টি ‘নষ্টনীড়’ কেবল একটি পারিবারিক ভাঙনের গল্প নয়; বরং দাম্পত্যের অবহেলা, একাকিত্ব এবং ভালোবাসার অতৃপ্ত আকুলতার এক নিবিড় মনস্তাত্ত্বিক আখ্যান।
Visit afrikasportnews.co.za for more information.
রবীন্দ্রসাহিত্যের এই গভীর দিকগুলো নতুন প্রজন্মের পাঠকদের সামনে উন্মোচনের উদ্দেশ্যে ‘নষ্টনীড়’ নিয়ে পাঠচক্রের আসর করে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধুসভা। ১০ সেপ্টেম্বর বিকেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের (টিএসসি) ১০ নম্বর কক্ষে এই আসর বসে। গ্রন্থ আশ্রমের সহযোগিতায় অনুষ্ঠিত এই পর্বে মূল আলোচক ছিলেন সহসাংগঠনিক সম্পাদক অরুপা রহমান।
শুরুতে গল্পের পটভূমি, চরিত্রবিন্যাস ও প্রেক্ষাপট বিশদভাবে তুলে ধরা হয়। এতে উঠে আসে গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র চারুলতার নিঃসঙ্গ অন্তঃপুরের চিত্র। স্বামী ভূপতির সার্বক্ষণিক সংবাদপত্র ও রাজনীতি নিয়ে ব্যস্ততার কারণে চারুলতার জীবনে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছিল, দেবর অমলের আগমনে সেখানে কীভাবে সাহিত্য ও সৃষ্টির নতুন প্রাণের সঞ্চার ঘটে, তা নিয়ে প্রাণবন্ত আলোচনা হয়।
১৩০৮ বঙ্গাব্দে রচিত ‘নষ্টনীড়’ মূলত প্রাচুর্যের মধ্যেও এক গৃহবন্দী নারীর তীব্র একাকিত্ব, আত্মআবিষ্কার ও মনোজগতের জাগরণের গল্প। গল্পের শিরোনামেই লুকিয়ে রয়েছে একটি সাজানো সংসারের নীরব ভাঙনের ইঙ্গিত; যেখানে পারস্পরিক সম্পর্কের টান থাকলেও শেষ পর্যন্ত তা স্পষ্ট প্রকাশের ভাষা হারিয়ে ফেলে। পরে প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায় ১৯৬৪ সালে এই সাহিত্যকর্ম অবলম্বনে নির্মাণ করেন কালজয়ী চলচ্চিত্র ‘চারুলতা’; যা বিশ্বদরবারে বাংলা সাহিত্যের মনস্তাত্ত্বিক গভীরতাকে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দেয়।
পাঠচক্রে চারুলতা, অমল ও ভূপতির সম্পর্কের ত্রিকোণ মনস্তত্ত্ব এবং সমকালীন সমাজব্যবস্থায় নারীর অবস্থানের নানা দিক নিয়ে আলোকপাত করেন আলোচক অরুপা রহমান। তিনি বলেন, ‘চারুলতা কেবল সংসারের একজন উপেক্ষিত গৃহবধূ নন; তিনি সেই সময়ের সেসব নারীর প্রতীকী রূপ, যাঁরা অন্তরের বিপুল সম্ভাবনা ও ভালোবাসার স্বীকৃতি না পেয়ে নিঃশব্দে একাকিত্ব বয়ে বেড়িয়েছেন। অমলের প্রতি চারুর টান নিছক মোহ নয়, বরং এক সৃজনশীল আত্মার সঙ্গে আরেক আত্মার মেলবন্ধন, যা তৎকালীন সামাজিক কাঠামোতে এক গভীর সংকটের জন্ম দেয়।’
মুক্ত আলোচনা পর্বে উপস্থিত বন্ধুরা চারুলতার শেষ উচ্চারণ, ‘থাক্, আর কাজ নেই’—এর অন্তর্নিহিত গভীর বেদনা, ভূপতির চরম অসহায়ত্ব এবং সম্পর্কের ভাঙা কাচের মতো নিঃশব্দ পতনের দিকগুলো নিয়ে নিজস্ব অনুভূতি ভাগ করে নেন।
পাঠচক্রে উপস্থিত ছিলেন সভাপতি সৈয়দ সালমান হাসান, সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার হোসেন, দপ্তর সম্পাদক অরিত্র গুহ, সাংস্কৃতিক সম্পাদক তাসনিম সুলতানা ও ছোয়াসহ অনেকে।
রচনার এক শতাব্দীরও বেশি সময় পার হয়ে গেলেও ‘নষ্টনীড়’ যে মানবমনের শাশ্বত সংকটের কারণে আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক, উন্মুক্ত মতবিনিময় ও আড্ডার মধ্য দিয়ে শেষ হওয়া জাবি বন্ধুসভার এ পাঠচক্র তারই সাক্ষ্য বহন করে।
দপ্তর সম্পাদক, জাবি বন্ধুসভা