চকরিয়া সুন্দরবনে প্রাণ ফেরার আশা

· Prothom Alo

হারিয়ে যাওয়া চকরিয়া সুন্দরবন ফেরানোর আশা জাগাচ্ছে বাইনগাছ। পরীক্ষামূলকভাবে রোপণ করা ম্যানগ্রোভ প্রজাতির এই গাছের টিকে থাকার হার সন্তোষজনক। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, জোয়ার-ভাটার প্রবাহ ফিরিয়ে আনাসহ চারটি বিষয় নিশ্চিত করা গেলে বনটির প্রাণবৈচিত্র্য ফিরিয়ে আনা সম্ভব।

চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার যাওয়ার পথে চকরিয়া উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে এই বনের অবস্থান। উপমহাদেশের প্রাচীন ম্যানগ্রোভ বা শ্বাসমূলীয় বনগুলোর একটি ছিল চকরিয়া সুন্দরবন। মাতামুহুরী নদীর কোল ঘেঁষে সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্যের বনটি সংঘবদ্ধ দখল ও তৎকালীন সরকারের ভুল নীতিতে প্রায় বিলীন হয়ে গেছে। এখন সেখানে টিকে আছে মাত্র একটি গাছ। বনটি নিয়ে গত বছরের ২৪ জুলাই ‘যে বনে একটিমাত্র গাছ’ শিরোনামে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করে প্রথম আলো।

Visit palladian.co.za for more information.

একই মাস থেকে পরীক্ষামূলকভাবে বনের অংশ বদরখালী চ্যানেলে ২৫ একর জমিতে ৮০ হাজার বাইনগাছ রোপণ করেছে বেসরকারি সংস্থা কোডেক (কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট সেন্টার)। সংস্থাটি বলছে, বাইনগাছের টিকে থাকার হার সন্তোষজনক। এরপর চলতি বছরের জুন মাসে বনের রামপুরা মৌজায় ২৫ একর জমিতে ৪০ হাজার বাইনগাছ রোপণ করা হয়েছে। এটি সফল হলে বনের হারিয়ে যাওয়া বাস্তুতন্ত্র ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

এর মধ্যে চলতি মাসের ১০ তারিখে বন বিভাগ বনায়নের জন্য নির্ধারিত স্থান চিহ্নিত (ম্যাপিং) করে দিয়েছে। বন বিভাগের পক্ষ থেকে এসব গাছ রক্ষায় নিয়মিত পাহারার ব্যবস্থা করার আশ্বাসও দেওয়া হয়েছে।

মো. আলমগীর কবির, সাধারণ সম্পাদক, বাপাদরকার বনের জবরদখল উচ্ছেদে সমন্বিত উদ্যোগ। পাশাপাশি বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটা কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করে ধাপে ধাপে বনের প্রাণ-প্রকৃতি ফিরিয়ে আনতে হবে।

কোডেকের প্রকল্প কর্মকর্তা শীতল কুমার নাথ প্রথম আলোকে বলেন, বদরখালী চ্যানেলে লাগানো ম্যানগ্রোভ প্রজাতির মধ্যে সবচেয়ে ভালো ফল দেখিয়েছে বাইনগাছ। এ বছর যে বাইনগাছগুলো লাগানো হয়েছে, সেটার ফলাফল দেখার অপেক্ষা করছেন। কারণ, এখানে সফল হলে বনের প্রাণবৈচিত্র্য ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে।

ম্যানগ্রোভ প্রজাতির টিকে থাকা ও বৃদ্ধির জন্য জোয়ার–ভাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে শীতল কুমার নাথ বলেন, চকরিয়া সুন্দরবনে চিংড়িঘেরের অনেক বাঁধ আছে। এর কারণে জোয়ার–ভাটার প্রবাহ এখানে আসে না। এটা কীভাবে ফিরিয়ে আনা যায়, সেটা ভাবতে হবে।

কোডেক ছাড়াও ম্যানগ্রোভ প্রজাতির চারা রোপণ করছে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা আরণ্যক ফাউন্ডেশন। গত ১০ আগস্ট চকরিয়া সুন্দরবন পরিদর্শন করেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, চকরিয়া সুন্দরবন বিভিন্ন সংস্থাকে ইজারা দেওয়ার পরও আমাদের বন বিভাগের নামে চার হাজার একর বনভূমি রেকর্ডভুক্ত আছে। কিন্তু মৎস্য, কৃষি ও ভূমি মন্ত্রণালয়ের ইজারা দেওয়া জমির সীমানা চিহ্নিত না করার ফলে ইজারাগ্রহীতারা বন বিভাগের জমিও দখল করে নিয়েছেন।

বনের জমি স্থানীয় নানা ব্যক্তি রাজনৈতিক পরিচয়ে দখল করে আছেন জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের প্রথম লক্ষ্য আগে বন বিভাগের নামে থাকা বনভূমি উদ্ধার করা। এ বিষয়ে বন বিভাগকে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এরপর ধীরে ধীরে অন্যান্য ইজারা বাতিল ও চকরিয়া সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য ফিরিয়ে আনার পরিকল্পনা নেওয়া হবে।’

সদিচ্ছায় ফিরতে পারে চকরিয়া সুন্দরবন

জীববৈচিত্র্য ফেরাতে চার বাধা

২০১৪ সালে চকরিয়া সুন্দরবনের পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা নিয়ে ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব ইকোলজিতে প্রকাশিত এক গবেষণায় বাইনগাছের সম্ভাবনার বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছিল। ‘গ্রোথ পারফরম্যান্স অব ম্যানগ্রোভ স্পিশিজ ইন চকরিয়া সুন্দরবন’ শিরোনামের ওই গবেষণায় যুক্ত ছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ফরেস্ট্রি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সের অধ্যাপক খালেদ মিসবাহুজ্জামান।

গবেষণায় তিন মাস ধরে ২৪০টি ম্যানগ্রোভ চারার বেঁচে থাকা, উচ্চতা ও গোড়ার ব্যাস পরিমাপ করা হয়। অধ্যাপক খালেদ মিসবাহুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, গবেষণায় দেখা গেছে, চকরিয়া সুন্দরবনে বাইনগাছের দুটি প্রজাতির বৃদ্ধি ছিল আশাব্যঞ্জক। সাদা বাইন ও মরিচা বাইনের বেঁচে থাকার হার ছিল অন্যান্য প্রজাতির চেয়ে বেশি। এ দুই প্রজাতির মধ্যে মরিচা বাইনের বৃদ্ধি ছিল বেশি।

দীর্ঘমেয়াদি ও বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা নিলে ফিরতে পারে চকরিয়া সুন্দরবন

অধ্যাপক মিসবাহুজ্জামানের মতে, চকরিয়া সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য ফিরিয়ে আনতে হলে চারটি বাধা অতিক্রম করতে হবে। ম্যানগ্রোভ গাছকে ইজারাগ্রহীতারা তাঁদের ব্যবসার জন্য হুমকি হিসেবে দেখেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, ইজারাদারেরা কখনো চাইবেন না এ বন ফিরে আসুক।

সুন্দরবনে থাকা বাঁধকে দ্বিতীয় হুমকি জানিয়ে অধ্যাপক মিসবাহুজ্জামান বলেন, ম্যানগ্রোভে পুনর্জাগরণের জন্য দরকার জোয়ার–ভাটার প্রবাহ। এখানে অসংখ্য পোল্ডার ও চিংড়িঘেরের বাঁধ। ম্যানগ্রোভের জন্য বনের মধ্যে জোয়ার–ভাটার প্রবাহ নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয় চ্যালেঞ্জ হবে মাটির গুণাগুণ ফিরিয়ে আনা। গত চার দশকের লবণ ও চিংড়ি চাষ এ বনের মাটি (ফরেস্ট ফ্লোর) গুণাগুণ নষ্ট করেছে। মাটিতে লবণাক্ততার মাত্রা অনুযায়ী ঠিক করতে হবে কোথায় ম্যানগ্রোভের অগ্রবর্তী প্রজাতি, কোথায় মধ্যবর্তী প্রজাতি এবং কোথায় চূড়ান্ত প্রজাতির গাছ লাগাতে হবে। চকরিয়া সুন্দরবনে পানির প্রবাহের গতিপথ পরিবর্তনকে চতুর্থ বাধা হিসেবে মনে করেন এই অধ্যাপক। তাঁর ভাষ্য, বনের প্রাণবৈচিত্র্য ফেরাতে দরকার রাজনৈতিক সদিচ্ছা।

ইউএনইপি জানাচ্ছে, ম্যানগ্রোভ আয়তনে বিশ্বের ক্রান্তীয় বনের ১ শতাংশের কম হলেও উপকূলের ১০০ কিলোমিটারের মধ্যে বসবাসকারী প্রায় ২৪০ কোটি মানুষের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ। ঝড়, জলোচ্ছ্বাস, ভাঙন ও বন্যা থেকে উপকূল রক্ষা, পানি পরিশোধন, বিপুল কার্বন ধারণ এবং মৎস্যসম্পদ রক্ষায় ম্যানগ্রোভের ভূমিকা রয়েছে। দেড় হাজারের বেশি প্রজাতির বন্য প্রাণী এসব বনকে আবাসস্থল হিসেবে ব্যবহার করে।

ঘুরে দাঁড়াচ্ছে বিশ্বের নানা ম্যানগ্রোভ বন

জাতিসংঘের পরিবেশবিষয়ক সংস্থা ইউএনইপি গত ২৪ জুলাই প্রকাশিত এক নিবন্ধে বলেছে, উপকূলীয় উন্নয়ন, অতিরিক্ত আহরণ, চিংড়ি চাষ ও জলবায়ু পরিবর্তনের চাপে কয়েক দশক ধরে হারিয়ে যেতে থাকা ম্যানগ্রোভ আবার ফিরে আসছে। ১৯৮০ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ভূ–উপগ্রহের চিত্র বিশ্লেষণ করে সংস্থাটি বলছে, কেনিয়া, কোস্টারিকা, বেনিন ও ভিয়েতনামে স্থানীয় জনগোষ্ঠী, বিজ্ঞানভিত্তিক সংরক্ষণ, পুনরুদ্ধার ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে ম্যানগ্রোভ বন ফিরিয়ে আনা ও সংরক্ষণে সফলতা পেয়েছে।

ইউএনইপি জানাচ্ছে, ম্যানগ্রোভ আয়তনে বিশ্বের ক্রান্তীয় বনের ১ শতাংশের কম হলেও উপকূলের ১০০ কিলোমিটারের মধ্যে বসবাসকারী প্রায় ২৪০ কোটি মানুষের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ। ঝড়, জলোচ্ছ্বাস, ভাঙন ও বন্যা থেকে উপকূল রক্ষা, পানি পরিশোধন, বিপুল কার্বন ধারণ এবং মৎস্যসম্পদ রক্ষায় ম্যানগ্রোভের ভূমিকা রয়েছে। দেড় হাজারের বেশি প্রজাতির বন্য প্রাণী এসব বনকে আবাসস্থল হিসেবে ব্যবহার করে।

ভিয়েতনাম ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফল ন্যাচারাল স্টাডিজ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল স্টাডি বিভাগের অধ্যাপক ফাং নুয়েন হংয়ের এক গবেষণায় বলা হয়, ১৯৫৫ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত চলা যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের বোমাবর্ষণে ভিয়েতনামের ৪০ হাজার হেক্টর আয়তনের কান জিও ম্যানগ্রোভ সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায়।

ওই গবেষণায় উঠে এসেছে, ১৯৭৫ সালে যুদ্ধ শেষে ম্যানগ্রোভ বনটির জীববৈচিত্র্য ফেরাতে নানা পদক্ষেপ নেয় ভিয়েতনাম সরকার। মাটির গুণাগুণ পরীক্ষা করে নির্দিষ্ট প্রজাতির ম্যানগ্রোভ চারা রোপণের মধ্য দিয়ে ১৯৯৬ সালের মধ্যে ৩৫ হাজার একরের মতো ম্যানগ্রোভ বন পুনরুদ্ধারে সফল হয় ভিয়েতনাম সরকার।

বাপা সাধারণ সম্পাদক মো. আলমগীর কবির সরকার ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে সারা দেশে প্রাণ-প্রকৃতির ভারসাম্য পুনঃপ্রতিষ্ঠায় অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করছে। এর মধ্যে চকরিয়া সুন্দরবনের ঐতিহ্য ও জীববৈচিত্র্য ফেরাতে পারলে সেটা একটা অনন্য অর্জন হবে। এ জন্য দরকার বনের জবরদখল উচ্ছেদে সমন্বিত উদ্যোগ। পাশাপাশি বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটা কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করে ধাপে ধাপে বনের প্রাণ-প্রকৃতি ফিরিয়ে আনতে হবে।

বিশেষজ্ঞদের নিয়ে কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নের তাগিদ

১৯৫৪ সালে প্রকাশিত ‘কক্সবাজার ওয়ার্কিং প্ল্যান ফর দ্য পিরিয়ড ফ্রম ১৯৫০ টু ১৯৬৯-৭০’ শীর্ষক এক সরকারি নথিতে বলা হয়েছে, চকরিয়া সুন্দরবনকে ১৯০৩ সালে সংরক্ষিত বন হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এটি উপমহাদেশের অন্যতম প্রাচীন ম্যানগ্রোভ বন।

কৃষিজমি সম্প্রসারণ, জ্বালানি কাঠ সংগ্রহ, মাছ ধরা ইত্যাদির জন্য বনটি নানাভাবে মানব হস্তক্ষেপের শিকার হয়। গত শতকের পঞ্চাশের দশকে চকরিয়া সুন্দরবন প্রায় ২১ হাজার ১০২ একর এলাকাজুড়ে ছিল। পরবর্তী সময়ে ১৮ হাজার ৫০৮ একর জমিকে সংরক্ষিত বন এবং বাকি অংশকে রক্ষিত বন হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এরপর সরকারি সিদ্ধান্তে চার হাজার একর বন বিভাগের অধীনে রেখে বাকি অংশ চিংড়ি চাষের জন্য বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংস্থাকে ইজারা দেওয়া হয়।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সাধারণ সম্পাদক মো. আলমগীর কবির প্রথম আলোকে বলেন, সরকার ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে সারা দেশে প্রাণ-প্রকৃতির ভারসাম্য পুনঃপ্রতিষ্ঠায় অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করছে। এর মধ্যে চকরিয়া সুন্দরবনের ঐতিহ্য ও জীববৈচিত্র্য ফেরাতে পারলে সেটা একটা অনন্য অর্জন হবে। এ জন্য দরকার বনের জবরদখল উচ্ছেদে সমন্বিত উদ্যোগ। পাশাপাশি বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটা কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করে ধাপে ধাপে বনের প্রাণ-প্রকৃতি ফিরিয়ে আনতে হবে।

Read full story at source