শিয়ান: এক দিনে হাজার বছর

· Prothom Alo

এই শহরে অতীতকে জাদুঘর নয়, দেখা যায় নানাভাবে। এ শহর নিজেই গল্পকথক। বলে চলে এক রাজার গল্প। এক সাম্রাজ্যের গল্প। এক সভ্যতার গল্প। আর সারা বিশ্ব সেটাই শোনে সবিস্ময়ে।

রাত গভীর। রাজপ্রাসাদের চারপাশে নিস্তব্ধতা। দূরে কোথাও প্রহরীর পায়ের শব্দ। বিশাল কক্ষের জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আছেন চীনের প্রথম সম্রাট কিন শি হুয়াং। পাশে তাঁর রানি। সম্রাটের কাঁধে আলতোভাবে হাত ছুঁয়ে রানি জানতে চাইলেন—
—ঘুম আসছে না, সম্রাট?
—ভাবছি, আমি চলে গেলে আমার সাম্রাজ্যের কী হবে।
—সাম্রাজ্য কি কখনো চিরকাল থাকে?
—সাম্রাজ্য হয়তো থাকবে না। কিন্তু আমি থাকব।
—কীভাবে!
—আমার সেনাবাহিনী থাকবে আমার সাথে।
—মৃত্যুর পর!
—হ্যাঁ। আমার সৈন্য থাকবে। হাজার হাজার সৈন্য। ঘোড়া থাকবে, রথ থাকবে, অস্ত্র থাকবে। ওরা মৃত্যুর পরও আমাকে পাহারা দেবে।
—আর যদি কেউ ওদের অস্তিত্ব জানতে পারে?
—তাহলে ওরা জানবে একদিন এক সম্রাট ছিল, যে মৃত্যুকেও সাম্রাজ্যের শেষ বলে মানেনি।

Visit mchezo.co.za for more information.

ইতিহাসে এমন কোনো কথোপকথনের উল্লেখ নেই। তবু কয়েক হাজার বছর পর শিয়ানের মাটির নিচে দাঁড়িয়ে থাকা টেরাকোটা আর্মির দিকে তাকিয়ে মনে হলো, সম্রাটের এই কথোপকথন হয়তো সময়ের ভেতর কোথাও জমে আছে। ওই রাতে সম্রাট হয়তো জানতেন না একদিন তাঁর সাম্রাজ্য থাকবে না, প্রাসাদ থাকবে না; কিন্তু তাঁর মাটির সৈন্যরা পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে মানুষকে টেনে আনবে তাঁর হারিয়ে যাওয়া রাজধানী চাংআনে। ওই একই টানে আমারও আগমন চীনের শিয়ানে।

এভাবে আজও আছে কিন শি হুয়াং আর্মিরাটেরাকোটা আর্মি এক অপার বিস্ময়

এই শহরে অতীতকে শুধু জাদুঘরের কাচের ভেতর দেখতে হয় না; হাঁটতে হাঁটতে, খেতে খেতে, ঘণ্টাধ্বনি শুনতে শুনতে তাকে অনুভব করা যায়। বহু রাজবংশের রাজধানী ছিল এই শহর। বিশেষ করে হান ও তাং আমলে চাংআন ছিল চীনা সভ্যতার রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র এবং সিল্ক রোডের পূর্ব প্রান্তের এক গুরুত্বপূর্ণ নগর।

বিশাল হলঘরে প্রবেশমাত্রই চোখে পড়ে মাটিরঙা এক বিস্তৃত সমুদ্র। একটু পর বোঝা যায় ওগুলো সৈন্য। সারি সারি সৈন্য। হাজার হাজার। কারও হাতে অস্ত্র, কেউ অশ্বারোহী, কোথাও রথের অবশিষ্টাংশ। ওরা যেন সামনে তাকিয়ে আছে যুদ্ধের নির্দেশের অপেক্ষায়। কারও মুখে কঠোরতা, কারও মুখে অদ্ভুত স্থিরতা। আশ্চর্যের বিষয়, এত সৈন্যের মধ্যে প্রায় প্রত্যেকের মুখের গড়ন আলাদা।

এত বছর ধরে থেকে গেছে মাটির নিচেটেরাকোটা আর্মির একাংশ

খ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয় শতকে কিন শি হুয়াং চীনের বিচ্ছিন্ন রাজ্যগুলোকে একত্র করে প্রথম ঐক্যবদ্ধ সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর মৃত্যুর পরও যেন সাম্রাজ্যের নিরাপত্তা অক্ষুণ্ন থাকে, এই বিশ্বাস থেকেই তাঁর সম্ভাব্য সমাধিস্থলকে ঘিরে তৈরি হয়েছিল বিশাল এক ভূগর্ভস্থ জগৎ। টেরাকোটা আর্মি ছিল ওই জগতের সামরিক বাহিনী।

অথচ এই বাহিনী যে একদিন আবার পৃথিবীর আলো দেখবে, তা হয়তো কেউ ভাবেনি। ভূগর্ভস্থ এত বড় একটি সেনাবাহিনী কয়েক শতাব্দী নয়, দুই হাজার বছর ধরে চাপা পড়ে ছিল। ১৯৭৪ সালে স্থানীয় কৃষকেরা কূপ খনন করতে গিয়ে মাটির নিচে একটি টেরাকোটা মাথা খুঁজে পান। সেই একটি মাথা ভাঙিয়ে দিল সৈন্যদের হাজার বছরের ঘুম। সৈন্যগুলোর দিকে তাকিয়ে মনে হলো রানি যদি আজ এখানে আসতেন, তিনি হয়তো একটু হেসেই সম্রাটকে বলতেন, ‘দেখেছ? তোমার স্বপ্ন সত্যি হয়েছে। তোমার সৈন্যরা সত্যিই রয়ে গেছে।’

রাজা, রাজ্যপাট নেই বটে, তবু আছে তার প্রহরীরা

আজ সম্রাট নেই। সাম্রাজ্য নেই। সেই পৃথিবীও নেই। শুধু সময়ের পাহারায় দাঁড়িয়ে আছে সম্রাটের মাটির সেনাবাহিনী। সম্রাট হয়তো মৃত্যুর পরে তাঁর সাম্রাজ্যকে সঙ্গে নিতে পারেননি। কিন্তু তাঁর মাটির সৈন্যরা তাঁকে বাঁচিয়ে রেখেছে। তাঁর তৈরি সৈন্যদের সামনে দাঁড়িয়ে আমরা এখনো তাঁকে নিয়ে গল্প করি। এটাই তো অমরত্ব!

কোলাহলে মুখর প্রাঙ্গণে টেরাকোটা আর্মির নীরবতা পেছনে ফেলে শহরে ফিরতেই দেখি শিয়ানের অন্য রূপ। চারপাশ ব্যস্ত। গাড়ি ছুটছে, মানুষ হাঁটছে, দোকানপাটে আলো জ্বলছে। এই আধুনিক কোলাহলের ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে কয়েক শতাব্দী পুরোনো স্থাপনা; বেল টাওয়ার।

মিং রাজবংশের সময় ১৩৮৪ সালে নির্মিত বেল টাওয়ার

মিং রাজবংশের সময় ১৩৮৪ সালে নির্মিত বেল টাওয়ার প্রথমে অন্য জায়গায় ছিল। পরে ১৫৮২ সালে বর্তমান অবস্থানে সরিয়ে আনা হয়। একসময় এটি শহরের দৈনন্দিন জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল। ভোরে বেল টাওয়ারের ঘণ্টা শুনে হতো দিনের শুরু, আর সন্ধ্যায় ড্রাম টাওয়ারের ঢাক ঘোষণা করত দিনের সমাপ্তি। এখন ওই দায়িত্ব ঘড়ি আর মুঠোফোনের। এই স্থাপনা এখন সময় জানায় না, বরং সময়কে মনে করিয়ে দেয়।

এই স্থাপনা শুরুতে অন্য জায়গায় ছিল

চারপাশে বেশ ভিড়। অনেকেই চীনা ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরে ছবি তুলছে। লম্বা পোশাক, সাজানো চুল, হাতে পাখা। যেন মিং বা তাং রাজবংশের কোনো চরিত্র। একদিকে প্রাচীন স্থাপত্য, অন্যদিকে ঐতিহ্যবাহী পোশাক আর ক্যামেরার ওপাশে দাঁড়িয়ে বর্তমানের একজন পথিক। একই ফ্রেমে তিনটি যুগ!

বিকেলের শেষ আলোয় উঠে পড়লাম শিয়ানের প্রাচীন নগরপ্রাচীরে। বর্তমান প্রাচীরটি মিং রাজবংশের আমলে নির্মিত হলেও এর ভেতরে রয়েছে আরও পুরোনো তাং আমলের স্মৃতি। প্রায় ১৩ দশমিক ৭ কিলোমিটার দীর্ঘ এই বিশাল প্রাচীর একসময় শহরকে রক্ষা করত। এই দেয়াল দেখেছে রাজবংশের উত্থান-পতন। একসময় যার কাজ ছিল শহরকে শত্রুর হাত থেকে রক্ষা করা, আজ সেই একই প্রাচীরের ওপর মানুষ হাঁটে, সাইকেল চালায়, ছবি তোলে, সূর্যাস্ত দেখে।

ইতিহাসের সাক্ষী শিয়ানের এই প্রাচীন নগরপ্রাচীরসিটি ওয়ালের ইটের গায়ে জমে আছে অসংখ্য গল্প

সূর্য পশ্চিমে ঢলে পড়ছে। পুরোনো ইটের গায়ে দিনের শেষ আলো। সোনালি আভায় প্রাচীরের ইটগুলো আরও পুরোনো দেখায়। এই ইটের গায়ে নিশ্চয়ই অনেক গল্প জমে আছে। সম্রাট, সৈন্য, ব্যবসায়ী, পথিক, যুদ্ধ আর শান্তির গল্প। প্রাচীরের ওপর থেকে পুরোনো ও নতুন শিয়ান পাশাপাশি দেখা যায়। নিচে আধুনিক রাস্তা, গাড়ির স্রোত, উঁচু ভবন; আর আমি দাঁড়িয়ে কয়েক শতাব্দী পুরোনো ইটের ওপর।

রাত নামতেই চলে গেলাম মুসলিম কোয়ার্টারে। সরু রাস্তা। দুই পাশে অসংখ্য খাবারের দোকান। মানুষের ভিড়। দোকানের আলো। গ্রিলের ধোঁয়া। আর বাতাসে ভেসে বেড়ানো জিরা, মরিচ আর মাংসের গন্ধ। কোথাও কাঠিতে গেঁথে আগুনের ওপর সেঁকা হচ্ছে মাংস। কোথাও চওড়া ‘বিয়াং-বিয়াং’ নুডলস তৈরি হচ্ছে, কোথাও গোল রুটির ভেতর মাংসের পুর। দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে খাবারের গন্ধ নিতে নিতে মনে হয় সিল্ক রোড শুধু রেশম আর মসলা বহন করেনি; বহন করেছে মানুষের স্বাদ, ভাষা আর সংস্কৃতিও।

শিয়ানের মুসলিমদের ইতিহাস বেশ পুরনো

শিয়ানের মুসলিম সম্প্রদায়ের ইতিহাস সিল্ক রোডের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। তাং যুগ থেকেই মধ্য এশিয়া, পারস্য ও পশ্চিম এশিয়া থেকে ব্যবসায়ী ও ভ্রমণকারীরা চাংআনে আসতেন। তাঁদের অনেকেই এখানে বসতি গড়েন। সেই দীর্ঘ সাংস্কৃতিক বিনিময়ের জীবন্ত উত্তরাধিকার আজকের মুসলিম কোয়ার্টার। সভ্যতা কখনো একা তৈরি হয় না। মানুষ আসে। মানুষ মেশে। সংস্কৃতি বদলায়। এরপর তৈরি হয় একটি শহর। এখানে ইতিহাস হাঁটে, কথা বলে, রান্না করে, খাবারের গন্ধ ছড়ায়। এখানে ইতিহাসকে পড়তে হয় না, খেতে হয়।

খাওয়া শেষে রাস্তায় বেরিয়ে দেখি, রাত আরও গভীর। কিন্তু শিয়ান ঘুমায়নি। বরং অন্য এক জীবন শুরু হয়েছে। দূরে ঝলমলে বেল টাওয়ার। চারপাশে রাতের শহর। আর কোথাও অচেনা সুরে গান। কয়েক হাজার বছরের পুরোনো এই শহর যেন নিজের বর্তমানটাকে আমার সামনে মেলে ধরেছে। ইতিহাস মৃত কোনো বিষয় নয়। সে বেঁচে থাকে। কখনো মাটির সৈন্যের চোখে। কখনো প্রাচীন ইটের গায়ে। কখনো বেল টাওয়ারের ছায়ায়। কখনো মসলার গন্ধে ভরা কোনো সরু গলিতে। আবার কখনো অচেনা সুরের কোনো গানে।

ঘুমায় না শিয়ান

হোস্টেলে ফেরার পথে আবার সম্রাটের কথা মনে পড়ল। তাঁর ইচ্ছা পূরণ হয়েছে। তবে তাঁর কল্পনার মতো করে নয়। তাঁর সৈন্যরা এখন আর কোনো সম্রাটকে পাহারা দেয় না। এরা দুই হাজার দুইশ বছর ধরে পাহারা দেয় একটি গল্পকে। একটি সাম্রাজ্যের গল্প। একটি সভ্যতার গল্প। আর আমাদের মতো পথিকদের মনে জমে থাকা বিস্ময়ের গল্প।
আর শিয়ান? শিয়ান যেন এক অতন্দ্র প্রহরী; যে এক হাতে ধরে রেখেছে অতীত, অন্য হাতে বর্তমান। আজ আমি আসলে একটি শহর দেখিনি। আমি হেঁটেছি কয়েক হাজার বছরের ভেতর দিয়ে। এক দিনে; মাত্র এক দিনে।

ছবি: লেখক

Read full story at source