আশিক সাহেবের আশির দশকের বিড়ম্বনা

· Prothom Alo

সকালে ঘুম থেকেই চোখ চড়কগাছ আশিক সাহেবের। ঘড়ির কাঁটা বলছে, নয়টা বেজে গেছে। ব্রাশটা মুখে গুঁজে কোনোমতে শার্ট পরে, ব্যাগ নিয়ে ছুটলেন তিনি। বাসা থেকে বেরিয়েই মেজাজ গেল বিগড়ে। জুতার ভেতর নুড়িপাথর আটকে গেছে। জুতা খুলে সেটি বের করে প্রাণপণে দৌড়ে বাস স্টপেজে পৌঁছানো গেল বটে; কিন্তু লাভ হলো না। বাস তার পাঁচ মিনিট আগেই চলে গেছে।

Visit sportbet.reviews for more information.

এরপর লক্কড়ঝক্কড় মার্কা আরেকটা বাসে কোনোমতে ঝুলতে ঝুলতে মতিঝিল পৌঁছানো হলো তাঁর। বাস থেকে নামার পর নিজের দিকে তাকিয়ে মনে হলো, ফেসবুকে পোস্ট দিতে আশির দশকের ছবি বানানোর দরকার নেই, আজকের ছবিটাই চাইলে ‘দুর্যোগের পরের ঢাকা’ নামে পোস্ট করা যায়।

অফিসের লিফটে ঢুকতেই ধীরেসুস্থে পকেটে হাত ঢুকিয়ে দাঁড়ালেন আশিক সাহেব। বয়স পঁয়তাল্লিশ ছুঁই ছুঁই। কুড়ি বছর ধরে মতিঝিলের এক পুরোনো ব্যাংকে চাকরি করছেন।

আশিক সাহেবের আশির দশকটা কেটেছিল মালিবাগের মেসঘরে কেরোসিনের স্টোভে নিজে রান্না করে খেয়ে আর গণিতের প্রাইভেট পড়িয়ে। অথচ গতকাল ফেসবুকে যে ছবিটা তিনি ছেড়েছেন, দেখলে মনে হবে ওই আমলে তিনি কোনো রাজবংশের ছেলে ছিলেন।

গায়ে হাতাকাটা সোয়েটার, গলায় মাফলার, চোখে একধরনের রহস্যময় দৃষ্টি; আর ব্যাকগ্রাউন্ডে রেট্রো স্টাইলের ক্যাফে। ছবিটা দেখে আশিক সাহেব নিজেই কিছুক্ষণ সেটির দিকে তাকিয়ে ছিলেন। তারপর মনে মনে বলেছিলেন, ‘মানুষ আমাকে এত দিন চিনলই না!’

আসলে গত রাতে এই ইমেজ বানাতে গিয়ে আর লাইক-কমেন্ট চেক করতে করতেই ঘুমাতে অনেক রাত হয়ে যায়। একটা ছবিতে কে লাভ দিল, কে ‘ওয়াও’ দিল, কে কমেন্টে লিখল ‘হিরো’, এসব হিসাব করতে করতে রাত প্রায় তিনটা। ফলস্বরূপ আজকে তার লেট হয়েছে।

অফিসের লিফটে ওঠার পর লিফটের মকবুল আশিক সাহেবকে দেখে একগাল হেসে বলে উঠল, ‘স্যার, কালকের ছবিটা কিন্তু একদম ফাটাফাটি হইছে! আপনার জোয়ান বয়সের ছবিটা দেইক্কা তো আমার বউ কইল, আপনি নাকি ওই যুগে বাংলা সিনেমার হিরো হইতে পারতেন!’

নেংটি ইঁদুরের দৌরাত্ম্যবিয়ে না করার ১০ উপকারিতা...১টা ফাউ

আশিক সাহেব মৃদু হেসে বললেন, ‘আরে না না, এসব তো এআইয়ের কারসাজি।’

মকবুল বলল, ‘এআই যদি এই কাম করতে পারে, তাইলে আমারে একটু কম বয়সী বানাইয়া দিয়েন তো স্যার। আমার বউ কয়, বিয়ের সময় আমি নাকি ভালো আছিলাম, এখন নাকি বাজারের ব্যাগের মতো হইয়া গেছি!’

কথা শেষ হতে না হতেই লিফটটা হুট করে একটা ঝাঁকুনি দিয়ে চারতলার কাছে আটকে গেল।

লোডশেডিং! কারেন্ট চলে গেছে।

ভ্যাপসা গরমে লিফটের ভেতরে তাদের অবস্থা একেবারে কাহিল। আশিক সাহেবের নাকের ডগা দিয়ে ঘাম গড়িয়ে পড়তে শুরু করল। ঠিক তখনই তাঁর পকেটে রাখা লেটেস্ট মডেলের ফোনটা টুং করে বেজে উঠল। স্ক্রিনে ভেসে উঠল ফেসবুকের নোটিফিকেশন, ‘তার ছবিতে নতুন ১০টা লাভ রিঅ্যাক্ট পড়েছে।’

আশিক সাহেবের মুখে সঙ্গে সঙ্গে হাসি ফুটে উঠল। মকবুল অবাক হয়ে বলল, ‘স্যার, গরমে তো আমি মইরা যাইতেছি, আপনি হাসতেছেন ক্যান?’

আশিক সাহেব কথাটা খেয়াল করলেন না; কারণ, তিনি ফোনে মজে গেছেন।

মিনিট সাতেক পর জেনারেটরের বদৌলতে তিনি লিফট থেকে বের হলেন। আশিক সাহেব ডেস্কে বসতেই তাঁর বস হাজির! এসেই হেসে হেসে বললেন, ‘কী আশিক সাহেব, আশির দশক থেকে এত জলদি চলে এসেছেন নাকি? আমি তো ভেবেছি, আপনি আশির দশকেই আটকে গেছেন।’

এ কথা শুনেই আশিক সাহেব আমতা–আমতা করতে লাগলেন।

দুপুরে ক্যানটিনে খাওয়ার সময় আশিক সাহেবের সঙ্গে যোগ দিলেন মফিজ সাহেব। খাবারের প্লেট হাতে নিয়ে বসেই তিনি আশিক সাহেবের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আশিক ভাই, আশির দশকে কি আপনি এসব খাবারই খেতেন?’

আশিক সাহেব বললেন, ‘কেন?’

মফিজ সাহেব বললেন, ‘তখন তো দারুণ ফিট ছিলেন। এখন অবশ্য ভুঁড়িটা বেশ বেড়েছে।’

আশিক সাহেব চুপ করে রইলেন। তারপর ধীরে ধীরে বললেন, ‘ছবিটা এআই বানাইছে।’

মফিজ সাহেব বললেন, ‘তা বুঝছি; কিন্তু ভুঁড়িটা তো এআই বানায় নাই!’

আশিক সাহেব অস্বস্তিকর একটা হাসি দিলেন।

সারা দিনের নানা ঝামেলা ও কাজ শেষে আশিক সাহেব বাসায় ফিরলেন মনে মনে একটু স্বস্তি পাবেন ভেবে; কিন্তু হায় বিধি বাম! তা কি আর হয়!

ওয়েস্টিন, হাঁস ও খাসি: ১১ হাজার কোটি টাকা আসলে কত টাকাবিদুৎ-বিড়ম্বনায় তাঁহারা যা লিখতেন

বাসায় ফিরে স্ত্রী রত্নার মুখ দেখেই আঁচ করেছিলেন, ঝড় বইবে। হলোও তাই। সবকিছুতেই যেন কেমন ঘেটছেট ভাব। আশিক সাহেব সাবধানে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কী হয়েছে?’

রত্না কোনো উত্তর দিলেন না।

তিনি আবার বললেন, ‘শরীর খারাপ?’

এবারও নীরবতা।

আশিক সাহেব ভাবলেন, নিশ্চয়ই বাজারের কিছু কিনতে ভুলে গেছেন; কিন্তু কিছুক্ষণ পর রহস্য জানা গেল। আজ বিকেলে পাশের বাসার সাদিয়া ভাবি এসেছিলেন। তিনিই রত্নার কাছে আশিক সাহেবের সেই আশির দশকের এআই কর্তৃক প্রস্তুতকৃত ছবির ভূয়সী প্রশংসা করেছেন।

‘ভাবি, আপনার স্বামীকে কিন্তু এই বয়সেও বেশ ভালো লাগে। আর আশির দশকের ছবিটা তো একদম সিনেমার নায়ক!’

ব্যস! এতেই আশিক সাহেবের ঘরেই আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত শুরু হয়েছে।

সবকিছু মিলিয়ে মেজাজ হারিয়ে আশিক সাহেব বলে উঠলেন, ‘ধ্যাৎ! এক এআইতে এত সমস্যা, ফোনই রাখব না!’

এই বলে ফোনটা সোজা আছাড় মেরে ফেলে দিলেন। ফোনটা মেঝেতে পড়ে দু-তিনবার কেঁপে উঠল।

স্ক্রিনে তখনো ভেসে আছে নতুন একটা নোটিফিকেশন ‘Sadia Akter Reacted to your Photo’।

Read full story at source