হরমুজ সংকটেও কেন ধসে পড়েনি তেলের বাজার
· Prothom Alo

ইরান যুদ্ধ দীর্ঘ হচ্ছে, বাড়ছে জ্বালানির দাম। তবে যুদ্ধের শুরুতে যে ধরনের তেলসংকটের আশঙ্কা করা হয়েছিল, এখনো তা দেখা যায়নি। বিকল্প সরবরাহপথ, মজুত তেল ও জ্বালানি ব্যবহারে বড় ধরনের কাটছাঁট—এ তিন কারণে বৈশ্বিক তেলের বাজার এখনো সচল। তবে এ ব্যবস্থা কত দিন টিকবে, তা নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ।
ইরান যুদ্ধ ছয় মাসের বেশি সময় ধরে চললেও বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি। হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প পথে তেল পরিবহন, বিভিন্ন দেশের মজুত থেকে তেল সরবরাহ আর সর্বোপরি বৈশ্বিক চাহিদা কমে যাওয়ায় বাজারে বড় ধরনের সরবরাহ–ঘাটতি তৈরি হয়নি।
Visit arroznegro.club for more information.
তবে এ ভারসাম্য বেশ নড়বড়ে। যুদ্ধ দীর্ঘ হলে মজুত কমে যেতে পারে, বিকল্প সরবরাহপথের সক্ষমতা চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছাতে পারে। সেই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তায় তেল পরিবহনের বর্তমান ব্যবস্থা টেকসই না–ও হতে পারে। তখন তেলের দাম আবার দ্রুত বাড়তে পারে।
যুদ্ধ শুরুর পর যুক্তরাষ্ট্রে পরিবারগুলোর বার্ষিক জ্বালানি খরচ গড়পড়তা প্রায় ৮০০ ডলার বেড়েছে। তবে তেলের দাম এখনো সর্বকালের সর্বোচ্চ পর্যায়ে ওঠেনি।
তিন কারণে তেলের বাজার এখনো সচল
জেপি মরগ্যানের প্রধান পণ্যবাজার বিশ্লেষক নাতাশা কানেভার সাম্প্রতিক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মূলত তিনটি কারণে তেলের বাজার বড় ধরনের সরবরাহ–ধাক্কা সামলে নিতে পেরেছে।
প্রথমত, হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে তেল পরিবহনের বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। সৌদি আরব পাইপলাইনের মাধ্যমে প্রতিদিন কয়েক মিলিয়ন ব্যারেল তেল ইরানের নাগালের বাইরে থাকা বন্দরে পাঠাচ্ছে। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র ও উপসাগরীয় দেশগুলো মিলে সামরিক পাহারায় হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহনের ব্যবস্থা করেছে।
তবে ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুতিদের সাম্প্রতিক বিজয়ে এ বিকল্প পথগুলোর নিরাপত্তা নিয়েও নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র, ভেনেজুয়েলা, ব্রাজিল, গায়ানা ও কানাডা—এ দেশগুলো সম্মিলিতভাবে দৈনিক প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল উৎপাদন বৃদ্ধি করেছে।
কানেভার ভাষায়, তেলের ব্যারেলগুলো শেষমেশ কোনো না কোনো পথ খুঁজে নেয়।
দ্বিতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্র ও চীন ছাড়া অধিকাংশ দেশ মজুত থেকে যে তেল ব্যবহার করেছে, তা প্রত্যাশার তুলনায় কম। ফলে প্রয়োজনের সময় বাজারে সরবরাহ করার মতো উল্লেখযোগ্য মজুত এখনো আছে।
তৃতীয়ত, যুদ্ধের সময়ে বৈশ্বিক তেলের চাহিদা প্রতিদিন প্রায় ৫০ লাখ ব্যারেল কমেছে। ভ্রমণ কমে যাওয়া, গণপরিবহন ব্যবহার ও বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যবহার বৃদ্ধির কারণে যেমন তেলের চাহিদা কমেছে, তেমনি অনেক প্রতিষ্ঠানের বাড়ি থেকে কাজের ধারায় ফিরে যাওয়ার কারণেও তা কমেছে। পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্য, রাশিয়া ও চীনের তেল পরিশোধনাগারের সক্ষমতায় ঘাটতি থাকায় অপরিশোধিত তেলের চাহিদা কমেছে।
যুদ্ধের কারণে প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ ব্যারেল তেল সরবরাহ কমেছে ঠিকই, তকে এর বিপরীতে চাহিদা কমেছে প্রায় ৫০ লাখ ব্যারেল। বিকল্প সরবরাহ ও মজুতের ব্যবহার মিলিয়ে বাজারে একধরনের নতুন ভারসাম্য তৈরি হয়েছে।
নতুন বাস্তবতা কত দিন থাকবে
জেপি মরগানের হিসাবে, যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে তেলের দাম শেষ পর্যন্ত ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৮৭ ডলারে স্থিতিশীল হতে পারে। যুদ্ধ শেষ হলে দাম নেমে আসতে পারে ৬৪ ডলারে।
তবে র্যাপিডান এনার্জি গ্রুপের প্রেসিডেন্ট বব ম্যাকনালি আরও সতর্ক। তাঁর পূর্বাভাস, যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হবে এবং হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি স্বাভাবিক হবে না। সে ক্ষেত্রে আগামী বছর ব্রেন্টের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৮৯ ডলার হতে পারে।
ম্যাকনালির মতে, হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি স্বাভাবিক হবে—তেমন সম্ভাবনা নেই। তাঁর ভাষায়, দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের কারণে বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তেল সরবরাহ অঞ্চল ঝুঁকির মধ্যে থাকলে তেল ও গ্যাসের দামের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা আরও তীব্র হবে।
মজুত কমে গেলে বড় ঝুঁকি
বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো তেলের মজুত। যুক্তরাষ্ট্র ও চীন যুদ্ধের ধাক্কা সামলাতে নিজেদের মজুত থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ তেল ব্যবহার করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ওকলাহোমার কুশিংয়ে যে তেলের মজুত আছে, গত জুলাই মাসে তা ন্যূনতম পর্যায়ে নেমে গিয়েছিল, পরিচালনাগত দিক থেকে। ওই পর্যায়ের নিচে নামলে পাইপলাইনের মাধ্যমে শোধনাগারে তেল পাঠানো কঠিন হয়ে পড়ে। সম্প্রতি মজুত কিছুটা বেড়েছে। ফলে আবার তা ঝুঁকিপূর্ণ সীমার ওপরে উঠেছে।
চীনের তেল আমদানিও সম্প্রতি কিছুটা বেড়েছে। তবে যুদ্ধের আগের তুলনায় দেশটির দৈনিক আমদানি এখনো কয়েক মিলিয়ন ব্যারেল কম। চীনের সরকারি মজুতের প্রকৃত পরিমাণ জানা না গেলেও ধারণা করা হয়, দেশটির হাতে প্রায় ১০০ কোটি ব্যারেল তেল মজুত রয়েছে।
ক্যাপিটাল ইকোনমিকসের পণ্যবাজার অর্থনীতিবিদ হামাদ হুসাইনের মতে, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে একপর্যায়ে এসব মজুতও শেষ হয়ে যাবে। তখন তেলের সরবরাহ ও চাহিদার মধ্যে বড় ধরনের ভারসাম্যহীনতা তৈরি হতে পারে। এ কারণে দাম দ্রুত বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।
পিকারিং এনার্জি পার্টনার্সের প্রতিষ্ঠাতা ড্যান পিকারিং মনে করেন, মজুত কমলেই যে সঙ্গে সঙ্গে তেলের দাম লাফিয়ে বাড়বে, বিষয়টি তেমন নয়। তবে বাজারে অস্থিরতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাবে। তাঁর ধারণা, বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে এ ঝুঁকি চলতি বছর নয়, বরং আগামী বছরের শেষ দিকে বেশি স্পষ্ট হতে পারে।
কারণ হিসেবে ড্যান বলেন, হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে তেল পরিবহনের জন্য বিকল্প পাইপলাইন রাতারাতি তৈরি করা সম্ভব নয়। একইভাবে ভেনেজুয়েলার মতো দেশগুলোর বাড়তি উৎপাদন দিয়েও দীর্ঘ মেয়াদে ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব হবে না।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতাও প্রশ্নের মুখে
বর্তমান তেলবাজারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তা। রয়্যাল ব্যাংক অব কানাডার বৈশ্বিক পণ্যবাজার বিভাগের প্রধান হেলিমা ক্রফটের মতে, বাজারের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া নয়, বরং মার্কিন সামরিক শক্তিই এখন তেল সরবরাহ সচল রাখতে বড় ভূমিকা রাখছে।
হেলিম আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতাও সীমাহীন নয়। দীর্ঘদিন ধরে তেলবাহী জাহাজ পাহারা দেওয়া ব্যয়বহুল; কঠিন কাজও বটে।
ক্রফটের মতে, ইরান যুদ্ধ যেমন পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ নয়, তেমনি সেখানে স্বাভাবিক শান্তির পরিবেশও নেই। বড় ধরনের উত্তেজনার পর কিছু সময়ের জন্য স্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। তবে আবারও বড় ধরনের হামলার ঝুঁকি আছে।
২০১৯ সালে সৌদি আরবের তেল স্থাপনায় ড্রোন হামলা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। ওই হামলার পর বিশ্ববাজারে তেলের দাম দ্রুত বেড়ে গিয়েছিল।
যুদ্ধের ‘নতুন বাস্তবতা’
বড় এক ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত সম্ভবত ‘চিরস্থায়ী যুদ্ধের’ রূপ নিতে পারে। তাঁর মতে, এমন পরিস্থিতিতে বাজারে অস্বস্তি থাকবে। তবে একপর্যায়ে সবাই বিষয়টিকে নতুন বাস্তবতা হিসেবে মেনে নিতে শুরু করবে।
মার্কিন সরকারি সংস্থাগুলোও দীর্ঘস্থায়ী সরবরাহ সংকটের প্রস্তুতি নিচ্ছে। গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (ইআইএ) বলেছে, বছরের বাকি সময়জুড়ে হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল রপ্তানি সীমিত থাকবে।
এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল এনার্জি আরও সতর্ক পূর্বাভাস দিয়েছে। তাদের মতে, আগামী বছরের শেষ নাগাদও মধ্যপ্রাচ্যের তেল উৎপাদন যুদ্ধপূর্ব পর্যায়ে ফিরবে না।
এসঅ্যান্ডপি গ্লোবালের অপরিশোধিত তেলবিষয়ক গবেষণা বিভাগের প্রধান জিম বারখার্ডের ভাষায়, তেলের বাজার আর আগের স্থিতিশীল অবস্থায় ফিরছে না; বরং অমীমাংসিত সংঘাত ও স্থায়ী নৌপথের ঝুঁকি কেন্দ্র করে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিচ্ছে।
অর্থাৎ এখন পর্যন্ত তেলের বাজার যুদ্ধের ধাক্কা সামলে নিয়েছে। তবে এই স্থিতিশীলতার অনেকটাই বিকল্প পথ, মজুত ও সামরিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। যুদ্ধ যত দীর্ঘ হবে, এ তিন ক্ষেত্রে চাপও তত বাড়বে। শেষ পর্যন্ত মজুত ফুরিয়ে গেলে বা হরমুজ ঘিরে নতুন করে বড় ধরনের হামলা হলে তেলের বাজারে আবার বড় ধাক্কা আসতে পারে।