১০ ব্যাংকেই খেলাপি ঋণের ৭২ শতাংশ

· Prothom Alo

বাংলাদেশ এখন খেলাপি ঋণে বিশ্বের ১ নম্বর দেশ। আর মোট খেলাপি ঋণের ৭২ শতাংশই দেশের মাত্র ১০টি ব্যাংকে কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়েছে। এতে ব্যাংকিং খাতের ঝুঁকি যেমন বেড়েছে, তেমনি আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার সক্ষমতাও কমে গেছে।

Visit newsbetsport.bond for more information.

বিশেষ করে একীভূত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের অন্তর্ভুক্ত চারটি ব্যাংক মারাত্মক সংকটে রয়েছে। অন্য ব্যাংকগুলো খেলাপি ঋণ আদায়ের চেষ্টা চালালেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হচ্ছে না।

ব্যাংকারদের ভাষ্য, যাঁদের নামে বড় অঙ্কের ঋণ রয়েছে, তাঁদের বড় অংশই ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের নেতা–কর্মী ও সমর্থক ব্যবসায়ী। তাঁদের কেউ কারাগারে, আবার কেউ বিদেশে পলাতক। যে কারণে দুই বছর ধরে খেলাপি ঋণ বেড়েই চলেছে।

ব্যাংক কর্মকর্তারা জানান, দীর্ঘদিন রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে আড়ালে থাকা অনিয়ম ও জালিয়াতি করে দেওয়া এবং বেনামি ঋণের প্রকৃত চিত্র এখন প্রকাশ্যে আসছে। ব্যাংকগুলোর স্বাধীন সম্পদ পর্যালোচনার ফলে এত দিন গোপন থাকা অনেক তথ্য সামনে এসেছে। একই সঙ্গে ঋণনীতিমালা আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করায় খেলাপি ঋণের প্রকৃত হিসাবও দৃশ্যমান হয়েছে। এ অবস্থায় ঋণ পুনঃ তফসিল ও এককালীন পরিশোধে ছাড় দিয়ে খেলাপি ঋণ কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। পাশাপাশি সরকার ঝুঁকিগ্রস্ত সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি গঠন করে খেলাপিদের সম্পদ বিক্রির মাধ্যমে অর্থ উদ্ধারের পরিকল্পনা করছে।

খেলাপি ঋণ কতটা বেড়েছে

বাংলাদেশ ব্যাংকের জুনভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী, দেশের ব্যাংক খাতের মোট ঋণের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এখন খেলাপি। ফলে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে সর্বোচ্চ খেলাপি ঋণের দেশ।

হালনাগাদ হিসাব অনুযায়ী, ব্যাংক খাতে বিতরণ করা মোট ঋণের পরিমাণ বেড়ে গত জুনে ১৮ লাখ ৫০ হাজার ৫৯৪ কোটি টাকায় উঠেছে। এর মধ্যে খেলাপি ঋণ ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ; অর্থাৎ প্রতি ১০০ টাকার ঋণের মধ্যে প্রায় ৩৩ টাকা অনাদায়ি ও খেলাপি। শুধু মার্চ থেকে জুন—তিন মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১৭ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা।

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন জোট সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা। তাদের ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার বছর ২০২৪ সালের জুনে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২ লাখ ১১ হাজার ৩৯১ কোটি টাকায়।

অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর আর্থিক খাতের গোপন তথ্য ও প্রকৃত চিত্র প্রকাশ পেতে শুরু করে। দেশি-বিদেশি নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান ব্যাংক খাতের প্রকৃত অবস্থা তুলে আনে। ফলে তারল্যসংকটও প্রকট হয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে বিশেষ ছাড় দিয়ে ঋণ পুনঃ তফসিল ও সুদ মওকুফের মাধ্যমে এককালীন ঋণ পরিশোধের সুযোগ দেওয়া হয়। বর্তমান বিএনপি সরকার সুবিধা আরও বাড়িয়েছে; কিন্তু খেলাপি ঋণ কমছে না।

১০ ব্যাংকে কেন্দ্রীভূত ৭২% খেলাপি ঋণ

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ব্যাংক খাতে গত জুনে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে শীর্ষ ১০ ব্যাংকে ছিল ৪ লাখ ৩৯ হাজার ৫২৬ কোটি টাকা, যা মোট খেলাপি ঋণের ৭২ শতাংশ।

সর্বোচ্চ ৯৮ হাজার ৯১৪ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ রয়েছে বেসরকারি খাতের ইসলামী ব্যাংকে, যা তাদের মোট ঋণের ৫২ দশমিক ১৫ শতাংশ। ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের বড় অংশই সাইফুল আলম বা এস আলমের নামে, যিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত। ২০১৭ সালে এস আলম গ্রুপে এ ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর থেকে ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন পর্যন্ত গ্রুপটির নেওয়া ঋণের বড় অংশই এখন খেলাপি।

দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৭৫ হাজার ৭২৮ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ রাষ্ট্রমালিকানাধীন জনতা ব্যাংকে, যা তাদের দেওয়া মোট ঋণের ৭৫ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ। ব্যাংকটির শীর্ষ খেলাপি হচ্ছে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের বেক্সিমকো গ্রুপ। এ ছাড়া এস আলম গ্রুপ ও এননটেক্সও বড় খেলাপি।

খেলাপি ঋণের হারের দিক থেকে সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় রয়েছে একীভূত ব্যাংকগুলো। এর মধ্যে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের ৯৭ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ, ইউনিয়ন ব্যাংকের ৯৬ দশমিক ৭৮ শতাংশ, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের ৭৮ দশমিক ১৫ শতাংশ ও এক্সিম ব্যাংকের ৭০ দশমিক ৮১ শতাংশ ঋণ এখন খেলাপি। এসব ব্যাংকের বড় খেলাপিদের মধ্যে রয়েছে এস আলম, বেক্সিমকো, নাসা, সিকদারসহ কয়েকটি গ্রুপ।

ন্যাশনাল ব্যাংকের ৬৫ দশমিক ৭৪ শতাংশ, আইএফআইসি ব্যাংকের ৬৩ দশমিক ৩৮ শতাংশ ও এবি ব্যাংকের ৫৬ দশমিক ৪ শতাংশ ঋণ খেলাপি। এসব ব্যাংকের বড় খেলাপিদের মধ্যে রয়েছে বেক্সিমকো, উত্তরা গ্রুপ, নাসা গ্রুপ, বেঙ্গল গ্রুপ, মাইশা গ্রুপ, বিল্ডট্রেড গ্রুপ, সিকদার গ্রুপ, আশিয়ান সিটি, মাহিন গ্রুপ, আমান গ্রুপ, এরশাদ ব্রাদার্স ও মোতাজ্জেরুল ইসলাম মিঠুর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান।

এ ছাড়া রাষ্ট্রমালিকানাধীন অগ্রণী ব্যাংকের ৪৩ দশমিক ৯৮ শতাংশ ঋণ এখন খেলাপি। ব্যাংকটির শীর্ষ খেলাপিদের মধ্যে রয়েছে জজ ভূঁইয়া গ্রুপ, জাকিয়া গ্রুপ, মুহিব স্টিল অ্যান্ড শিপ রিসাইক্লিং, মুন গ্রুপসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান।

কঠোর পদক্ষেপের বিকল্প নেই

খেলাপি ঋণ প্রসঙ্গে ট্রাস্ট ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও ব্র্যাক ব্যাংকের ভাইস চেয়ারম্যান ফারুক মইনউদ্দীন প্রথম আলোকে বলেন, দেশে ৫০ হাজার টাকার ঋণের জন্য কৃষকদের জেলে যেতে দেখা গেছে। অথচ বড় ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা খুব কমই নেওয়া হয়েছে। তাঁর মতে, ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া ছাড়া খেলাপি ঋণ কমানো সম্ভব নয়।

এককালীন পরিশোধের সুযোগ দেওয়া হলেও বড় খেলাপিদের অনেকে তা কাজে লাগাবেন না। কারণ, তাঁদের অর্থের বড় অংশ পাচার হয়ে গেছে অথবা অন্যত্র ব্যয় হয়েছে। সেই অর্থ ফিরিয়ে এনে ব্যাংকের দায় পরিশোধে ব্যবহার করতে হবে।

অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) সাবেক চেয়ারম্যান ও মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের সাবেক এমডি আনিস এ খান বলেন, ঋণনীতিমালা শিথিল করে প্রকৃত অর্থে খেলাপি ঋণ কমানো যায় না। তাঁর মতে, সরকারকে দ্রুত একটি ঝুঁকিগ্রস্ত সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি গঠন করতে হবে। যেসব খেলাপি সাড়া দেবে না, তাদের ঋণ ওই কোম্পানির কাছে হস্তান্তর করে সম্পদ বিক্রির মাধ্যমে কিছু অর্থ উদ্ধার করা সম্ভব হবে। এতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রমও পুনরুজ্জীবিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে, যা দেশের অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক হবে।

Read full story at source