সবাই নিষেধ করলেও বিপাশা বেছে নিয়েছিলেন প্রাপ্তবয়স্কদের ‘জিসম’

· Prothom Alo

‘এই সিনেমা করলে ক্যারিয়ার শেষ হয়ে যাবে।’ বলিউডে তখন বিপাশা বসুকে এমন সতর্কবার্তাই শুনতে হয়েছিল। অভিনয়জীবনের মাত্র তিন বছর। ‘রাজ’ ও ‘আজনবী’র মতো সিনেমায় সাফল্য পেয়ে এরই মধ্যে পরিচিত মুখ হয়ে উঠেছেন তিনি। এমন সময়ে প্রস্তাব এল ‘জিসম’-এর। গল্পে ছিল প্রেম, বিশ্বাসঘাতকতা এবং এক নারীর ধূসর চরিত্র। প্রচলিত হিন্দি সিনেমার নায়িকার ছকে এমন প্রাপ্তবয়স্কের জন্য নির্মিত চরিত্র তখনো বেশ অস্বস্তিকর।

Visit mwafrika.life for more information.

কিন্তু সবাই যখন পিছিয়ে যেতে বলছিলেন, বিপাশা তখন উল্টো সিদ্ধান্ত নিলেন। সম্প্রতি ‘এল’ ম্যাগাজিনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সেই সময়ের কথা মনে করে অভিনেত্রী বলেছেন, তাঁকে বলা হয়েছিল, সামান্য যৌন আবেদন বা ‘ইরোটিকা’ থাকা কোনো সিনেমায় অভিনয় করলে তাঁর ক্যারিয়ার শেষ হয়ে যাবে। বিপাশার উত্তর ছিল সরল, তিনি প্রাপ্তবয়স্ক, আর ‘জিসম’ও প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য তৈরি একটি প্রেমের গল্প। চরিত্রটির নানা স্তর তাঁর ভালো লেগেছিল, তাই ঝুঁকি নিতে পিছপা হননি।

যে চরিত্রে নায়িকা ‘ভালো মেয়ে’ নন

২০০৩ সালে মুক্তি পাওয়া ‘জিসম’ পরিচালনা করেছিলেন অমিত সাক্সেনা, চিত্রনাট্য লিখেছিলেন মহেশ ভাট। বিপাশার সঙ্গে সিনেমাটিতে জুটি বেঁধেছিলেন জন আব্রাহাম। গল্পের কেন্দ্র সোনিয়া; আবেগ, আকর্ষণ ও উচ্চাকাঙ্ক্ষার জটিলতায় আটকে থাকা একজন নারী। প্রচলিত অর্থে তিনি আদর্শ নায়িকা নন। তাঁর মধ্যে আছে প্রলোভন, হিসাবি বুদ্ধি, দুর্বলতা ও অন্ধকার দিক। সেই সময় হিন্দি সিনেমার নায়িকাদের অধিকাংশ চরিত্রই ছিল তুলনামূলকভাবে নিরাপদ; নায়কের প্রেমিকা, স্ত্রী কিংবা নৈতিকতার প্রতীক।

বিপাশার সোনিয়া সেই কাঠামোয় ফাটল ধরিয়েছিল। চরিত্রটি একই সঙ্গে আকর্ষণীয় ও বিপজ্জনক। দর্শক তাঁকে শুধু নায়িকা হিসেবে দেখেননি; গল্পের চালিকা শক্তি হিসেবেও দেখেছেন। বিপাশা পরে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘জিসম’ করার সময় তিনি প্রচলিত ‘হিন্দি সিনেমার নায়িকা’ তাই তাঁর ম্যানেজার পর্যন্ত মনে করেছিলেন, এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া পাগলামি। ভয়কে পাত্তা না দেওয়ার ফল বিপাশার সেই ঝুঁকির ফল শেষ পর্যন্ত তাঁর পক্ষেই যায়। ‘জিসম’ বাণিজ্যিক সাফল্য পায়। শুধু ব্যবসায়িক সাফল্য নয়, সিনেমাটির নান্দনিকতা ও বিপাশার পর্দার উপস্থিতিও আলোচনায় আসে। অভিনেত্রীর নিজের ভাষ্য অনুযায়ী, সিনেমাটি মুক্তির পর তাঁর চরিত্রের চেহারা ও সাজসজ্জা জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে প্রভাব ফেলেছিল। চুলে টং ব্যবহার, ব্রোঞ্জ মেকআপ, গাঢ় কাজল, সাদা পোশাক এবং সমুদ্রসৈকতের দৃশ্য; সব মিলিয়ে ‘জিসম’-এর ভিজ্যুয়াল স্টাইল তখনকার তরুণীদের মধ্যে ট্রেন্ড তৈরি করে।

‘জিসম’ সিনেমার দৃশ্য। আইএমডিবি

‘নেগেটিভ’ চরিত্রে নারী কেন নয়?

বিপাশার মতে, সিনেমাটির পর নারীর ‘গ্রে’ বা নেতিবাচক চরিত্রে অভিনয় করা নিয়ে দর্শকের ধারণায় পরিবর্তন আসে। একজন নারী চরিত্র ভালো বা খারাপ, এই সরল বিভাজনের বাইরে গিয়েও তাকে আকর্ষণীয় করে তোলা সম্ভব, সেটিই দেখিয়েছিল সোনিয়া। বলিউডে এর আগে নারীর ধূসর চরিত্র একেবারে ছিল না, এমন নয়। কিন্তু ‘জিসম’ যে সময়ে মুক্তি পায়, তখন মূলধারার সিনেমায় একজন প্রতিষ্ঠিত নায়িকার এমন চরিত্র গ্রহণ করা ছিল অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। বিপাশা সেই ঝুঁকি নিয়েছিলেন নিজের জনপ্রিয়তা হারানোর আশঙ্কা থাকা সত্ত্বেও।

‘জিসম’ সিনেমার দৃশ্য। আইএমডিবি

এ কারণেই অভিনেত্রী মনে করেন, তাঁর ক্যারিয়ারে ‘জিসম’ শুধু আরেকটি সিনেমা নয়; এটি একটি বাঁকবদল। বিপাশার নিজের ইমেজও বদলে গেল ‘জিসম’-এর আগে বিপাশাকে দর্শক মূলত প্রচলিত নায়িকার কাঠামোয় দেখছিলেন। কিন্তু সিনেমাটির পর তাঁর পর্দার পরিচয় বদলে যায়। সাহসী, আত্মবিশ্বাসী এবং নিজের সিদ্ধান্তে অনড় অভিনেত্রী হিসেবে আলাদা জায়গা তৈরি করেন তিনি। এই পরিবর্তন শুধু পোশাক বা সাজসজ্জার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। নারী চরিত্রের যৌনতা ও আকাঙ্ক্ষাকে গল্পের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখানোর ক্ষেত্রেও সিনেমাটি আলোচনার জন্ম দেয়। তবে ‘জিসম’-এর প্রভাবকে শুধু ‘বোল্ড সিনেমা’ হিসেবে দেখলে বিষয়টির বড় অংশ বাদ পড়ে যায়। এর আসল গুরুত্ব ছিল—একজন প্রতিষ্ঠিত নারী তারকা নিজের ক্যারিয়ার নিয়ে প্রচলিত নিরাপদ সিদ্ধান্ত না নিয়ে এমন চরিত্র বেছে নিয়েছিলেন, যার জন্য তাঁকে আগে থেকেই সতর্ক করা হয়েছিল।

যশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ দৃশ্য, সমালোচনার মুখে নায়িকা

‘জিসম’ কি সত্যিই পথপ্রদর্শক?

আজকের দৃষ্টিতে ‘জিসম’-এর মতো গল্প কিংবা সাহসী নারী চরিত্র খুব অস্বাভাবিক মনে নাও হতে পারে। কিন্তু ২০০৩ সালের বলিউডের প্রেক্ষাপট ছিল আলাদা। মূলধারার নায়িকাদের নিয়ে সামাজিক প্রত্যাশা ছিল অনেক বেশি রক্ষণশীল। তাঁদের পর্দার ব্যক্তিত্ব এবং বাস্তব জীবনের ভাবমূর্তির মধ্যেও দর্শকেরা খুব সহজে সীমারেখা টেনে দিতেন। সেই সময়ে বিপাশার সিদ্ধান্ত তাই গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বুঝেছিলেন, একটি চরিত্র গ্রহণের অর্থ নিজের ইমেজ বিসর্জন দেওয়া নয়; বরং কখনো কখনো ইমেজ ভাঙাই নতুন পরিচয় তৈরি করতে পারে। এ কারণেই আজও ‘জিসম’ নিয়ে কথা উঠলে শুধু জন আব্রাহামের সঙ্গে বিপাশার জুটির কথা আসে না; আসে সোনিয়া চরিত্রটির কথাও।

দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস অবলম্বনে

Read full story at source