পাতার ভাঁজে মহাবিশ্ব জয়!

· Prothom Alo

এ মুহূর্তে হাতের কাছে কোনো কাগজ দেখছ? দেখে থাকলে একটি পাতা হাতে নাও। কিন্তু এটা দিয়ে কীভাবে মহাবিশ্ব জয় করা যায়? একবার কাগজটিকে মাঝবরাবর ভাঁজ করে দেখা যাক। দেখো তো, কাগজটির পুরুত্ব বাড়ল কি না? হ্যাঁ, এভাবেই আমরা মহাবিশ্ব জয় করে ফেলব!

Visit turconews.click for more information.

শুনতে অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছে? তাহলে আগে চাঁদ দিয়েই শুরু করা যাক।

চাঁদ পৃথিবী থেকে গড়ে ৩ লাখ ৮৪ হাজার কিলোমিটার দূরে। আর একটি সাধারণ কাগজের পুরুত্ব যদি ০.১ মিলিমিটার ধরা হয়, তাহলে একবার মাঝ বরাবর ভাঁজ করার পর এর পুরুত্ব হবে ০.২ মিলিমিটার।

তাহলে অনুমান করো তো, কতবার ভাঁজ করলে এর পুরুত্ব চাঁদের দূরত্ব অতিক্রম করবে? তুমি নিশ্চয়ই লক্ষ-কোটি বা তার কাছাকাছি কোনো সংখ্যা ভাবছ!

আসলে উত্তরটি হবে ৪২। হ্যাঁ, মাত্র ৪২!

কীভাবে এমনটা হলো, তা বুঝতে হলে কাগজটিকে আরেকবার ভাঁজ করো। এবার কিন্তু পুরুত্ব ০.৩ মিলিমিটার নয়, বরং ০.৪ মিলিমিটার হয়েছে। অর্থাৎ প্রতিবার ভাঁজে পুরুত্ব আগেরবারের দ্বিগুণ হচ্ছে।

শুরুতে কাগজটির পুরুত্ব ০.১ মিলিমিটার হলে n বার ভাঁজের পর পুরুত্ব হবে—

০.১ × ২ⁿ মিলিমিটার। এটাই সূচকীয় বৃদ্ধি বা exponential growth।

১০ বার ভাঁজ করলে পুরুত্ব হবে প্রায় ১০.২৪ সেন্টিমিটার। এতক্ষণে সংখ্যাটা খুব একটা ভয়ংকর মনে হচ্ছে না। কিন্তু এরপরই ম্যাজিকটা আরও স্পষ্ট হতে শুরু করে। ২০ বার ভাঁজ করলে পুরুত্ব হবে প্রায় ১০৪.৯ মিটার—একটি ফুটবল মাঠের দৈর্ঘ্যের কাছাকাছি।

৩০ বার ভাঁজ করলে তা প্রায় ১০৭ কিলোমিটার হয়ে যাবে। আর ৪০ বার ভাঁজ করলে পুরুত্ব হবে প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার কিলোমিটার। তখনো চাঁদ বেশ দূরে—আরও প্রায় ২ লাখ ৭৪ হাজার কিলোমিটার। কিন্তু আর মাত্র দুটি ভাঁজ!

৪২ বার ভাঁজ করলে কাগজটির তাত্ত্বিক পুরুত্ব হবে প্রায় ৪ লাখ ৪০ হাজার কিলোমিটার। অর্থাৎ পৃথিবী থেকে চাঁদের গড় দূরত্বকেও অতিক্রম করে যাবে। হ্যাঁ, তুমি চাঁদ থেকে মাত্র ৪২ ভাঁজ দূরে বসে আছ!

এবার চাঁদকে ছাড়িয়ে যাওয়া যাক। কী মনে হয়, গ্যালাক্সি পর্যন্ত যেতে যেতে ভাঁজের সংখ্যা কি লক্ষ-কোটিতে চলে যাবে?

হিসাব করা যাক।

সূর্য পৃথিবী থেকে প্রায় ১৫ কোটি কিলোমিটার দূরে। ৫০ বার ভাঁজ করলে আমাদের তাত্ত্বিক পুরুত্ব হবে প্রায় ১১ কোটি ২৬ লাখ কিলোমিটার। অর্থাৎ সূর্য তখনো কিছুটা দূরে।

কিন্তু আর একটি ভাঁজেই পুরুত্ব দ্বিগুণ হয়ে প্রায় ২২ কোটি ৫২ লাখ কিলোমিটার হবে।

অর্থাৎ ৫১তম ভাঁজেই আমরা সূর্যের দূরত্ব অতিক্রম করে ফেলব।

এবার কোথায় যাওয়া যায়? চলো, সূর্যের সবচেয়ে কাছের প্রতিবেশী নক্ষত্র প্রক্সিমা সেন্টুরির দিকে যাই। এটি পৃথিবী থেকে প্রায় ৪.২৪ আলোকবর্ষ বা প্রায় ৪০ লাখ কোটি কিলোমিটার দূরে।

কতগুলো ভাঁজ লাগবে মোট ৬৯টি। অর্থাৎ সূর্যের দূরত্ব অতিক্রম করার পর আরও মাত্র ১৮টি ভাঁজেই প্রক্সিমা সেন্টুরির দূরত্বও পেরিয়ে যাওয়া সম্ভব—অন্তত আমাদের এই কাল্পনিক হিসাবে। এরপর আরও বড় লাফ।

মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির ব্যাস প্রায় ১ লাখ আলোকবর্ষ। আমাদের কাগজের তাত্ত্বিক পুরুত্ব ৮৩ বার ভাঁজে প্রায় ১ লাখ ২ হাজার আলোকবর্ষ হয়ে যাবে। আর পৃথিবী থেকে প্রায় ২৫ লাখ আলোকবর্ষ দূরের অ্যান্ড্রোমিডা গ্যালাক্সির দূরত্ব অতিক্রম করতে লাগবে মোট ৮৮টি ভাঁজ।

এবার আমাদের যাত্রা মহাবিশ্বের বিশালতম স্কেলে।

দৃশ্যমান মহাবিশ্বের ব্যাস প্রায় ৯৩ বিলিয়ন বা ৯ হাজার ৩০০ কোটি আলোকবর্ষ। সেখানে পৌঁছাতে কতবার ভাঁজ লাগবে?

মাত্র ১০৩ বার। ১০৩ বার ভাঁজ করলে ০.১ মিলিমিটার পুরু কাগজের তাত্ত্বিক পুরুত্ব হবে প্রায় ১০৭ বিলিয়ন আলোকবর্ষ—দৃশ্যমান মহাবিশ্বের আনুমানিক ব্যাসের বেশি!

কিন্তু এতই যদি সহজ হয়, তাহলে নাসা বা মহাকাশ গবেষকেরা এত টাকা খরচ করছেন কেন? আমরা কি সত্যিই একটা কাগজ ১০৩ বার ভাঁজ করে মহাবিশ্ব পার হয়ে যেতে পারি?

অবশ্যই না।

কারণ, এতক্ষণ আমরা শুধু একটি গাণিতিক কল্পনা করেছি। ধরে নিয়েছি, প্রতিবার কাগজটিকে নিখুঁতভাবে অর্ধেক ভাঁজ করা সম্ভব এবং প্রতিবার তার পুরুত্ব ঠিক দ্বিগুণ হচ্ছে। বাস্তবে খুব অল্প কয়েকটি ভাঁজের পরই বিষয়টি অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে।

প্রতিবার ভাঁজের সঙ্গে কাগজের স্তরের সংখ্যা দ্বিগুণ হয়। ফলে ভাঁজ করা অংশ ক্রমেই মোটা ও শক্ত হতে থাকে। নতুন করে ভাঁজ করতে আরও বেশি জায়গা এবং আরও বেশি কাগজ দরকার হয়। তাই সাধারণ একটি কাগজকে হাতে নিয়ে কয়েকবারের বেশি ভাঁজ করাই বেশ কঠিন।

তবে অসম্ভব বলে ছেড়ে দিলে গণিতবিদদের চলে না!

Britney Gallivan নামের ক্যালিফোর্নিয়ার এক স্কুলছাত্রী এ সমস্যাটি নিয়ে কাজ করে দেখিয়েছিল, কাগজের দৈর্ঘ্য ও পুরুত্বের সঙ্গে কতবার ভাঁজ করা সম্ভব, তার একটি গাণিতিক সম্পর্ক আছে।

২০০২ সালে সে প্রায় ১ হাজার ২১৯ মিটার লম্বা একটি অত্যন্ত পাতলা কাগজকে একই দিকে ১২ বার ভাঁজ করে গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস গড়ে।

তাই আমাদের ৪২, ৫১ কিংবা ১০৩ ভাঁজের হিসাব বাস্তবে কাগজ ভাঁজ করার কোনো পদ্ধতি নয়। এটি আসলে একটি অসাধারণ উদাহরণ—সূচকীয় বৃদ্ধি কত দ্রুত বিশাল হয়ে উঠতে পারে, সেটি বোঝার।

মাত্র একটি অতিরিক্ত ভাঁজ মানেই আগের পুরো পুরুত্বটুকু আবার যোগ হয়ে যাওয়া। তাই শুরুতে বৃদ্ধি খুব ধীর মনে হলেও কিছুক্ষণ পর সংখ্যাগুলো আমাদের কল্পনাকেও ছাড়িয়ে যায়।

এক টুকরা কাগজ দিয়ে সত্যিই হয়তো চাঁদ বা মহাবিশ্বে যাওয়া যাবে না। কিন্তু গণিতের সাহায্যে?

সেখানে মাত্র কয়েককটি ভাঁজেই আমাদের কল্পনা চাঁদ, নক্ষত্র, গ্যালাক্সি পেরিয়ে মহাবিশ্বের শেষ প্রান্ত পর্যন্ত ঘুরে আসতে পারে।

সহযোগিতায়:বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াড কমিটি 

Read full story at source