মাওয়ের চীন: যে বিপ্লব চীনকে বদলে দিল, পরে পথ হারাল

· Prothom Alo

১৯৭৬ সালের ৯ সেপ্টেম্বর মাও সে–তুং মারা গেলেন। তাঁর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে শুধু একজন বিপ্লবী নেতার জীবনাবসান ঘটেনি, শেষ হয়েছিল চীনের ইতিহাসের একটি অধ্যায়ও। প্রায় তিন দশক ধরে মাও যে বিপ্লবী রাষ্ট্র গড়ে তুলেছিলেন, সেটি একদিকে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ রাষ্ট্রকে ঐক্যবদ্ধ ও আমূল পরিবর্তিত করেছে, অন্যদিকে তাঁকে ঠেলে দিয়েছে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ, রাজনৈতিক নিপীড়ন, সামাজিক বিভাজন ও সাংস্কৃতিক বিপর্যয়ের দিকে।

মাওয়ের চীনকে কীভাবে দেখা হবে, এ প্রশ্নের উত্তর সহজ নয়। তিনি কি আধুনিক চীনের নির্মাতা, নাকি এমন এক বিপ্লবের নায়ক, যাঁর রাজনৈতিক দর্শন শেষ পর্যন্ত তাঁরই গড়ে তোলা রাষ্ট্রকে বিপর্যস্ত করেছিল?

Visit newsbetting.bond for more information.

মার্কিন রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞানী অ্যান্ড্রু জি ওয়াল্ডারের ২০১৫ সালে প্রকাশিত বই ‘চায়না আন্ডার মাও: আ রেভোল্যুশন ডিরেইলড’ এই প্রশ্নের একটি গুরুত্বপূর্ণ উত্তর খোঁজে। হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে প্রকাশিত ৪০০ পৃষ্ঠার বেশি এ বইয়ে ১৯৪৯ সালে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির ক্ষমতায় আসা থেকে ১৯৭৬ সালে মাওয়ের মৃত্যু পর্যন্ত সময়ের ইতিহাস বিশ্লেষণ করা হয়েছে। ওয়াল্ডারের মূল বক্তব্য হলো, চীনা বিপ্লবের যে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো মাওয়ের বড় সাফল্যের ভিত্তি তৈরি করেছিল, পরবর্তী সময়ে সেগুলোই তাঁর বড় ব্যর্থতার পথ তৈরি করে।

মাও সে-তুং

বিপ্লবের শুরু

১৯৪৯ সালে চীনা কমিউনিস্ট পার্টি ক্ষমতায় আসে। দীর্ঘ গৃহযুদ্ধ ও সশস্ত্র সংগ্রামের পর মাওয়ের নেতৃত্বে কমিউনিস্টরা চীনকে একটি নতুন রাজনৈতিক কাঠামোর অধীন নিয়ে আসে। ওয়াল্ডারের কাছে এটি ছিল বিপ্লবের সমাপ্তি নয়; বরং বিপ্লবের দ্বিতীয় অধ্যায়ের শুরু।

মাওয়ের সামনে তখন বিশাল এক দেশ। যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতি, দারিদ্র্য, কৃষিনির্ভর সমাজ, দুর্বল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান; সবকিছু নতুন করে সাজাতে হবে। তাঁর নেতৃত্বে ভূমিসংস্কার, শিল্পের জাতীয়করণ, শহর ও গ্রামের সামাজিক কাঠামোর পরিবর্তন এবং রাষ্ট্রীয় পরিকল্পিত অর্থনীতি প্রতিষ্ঠার কাজ শুরু হয়।

ওয়াল্ডারের মতে, এ সময়ে দুটি প্রতিষ্ঠান বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। একটি ছিল কমিউনিস্ট পার্টির কঠোর নিয়ন্ত্রণমূলক কাঠামো। অন্যটি ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের আদলে গড়ে তোলা সমাজতান্ত্রিক পরিকল্পিত অর্থনীতি। এসব ব্যবস্থা রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করেছিল এবং দ্রুত পরিবর্তন আনার সক্ষমতা তৈরি করেছিল। একই সঙ্গে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হয়েছিল।

এ কাঠামোর সুবিধা ও সীমাবদ্ধতা, দুটিই পরে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। দ্রুত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা সম্ভব হলেও ভুল সিদ্ধান্ত সংশোধনের পথ ক্রমে সংকুচিত হতে থাকে।

সাফল্যের ভেতরেই সংকট

১৯৫০-এর দশকের মাঝামাঝি চীন দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছিল। শিল্পায়ন হচ্ছিল, কৃষি ও গ্রামীণ সমাজে বড় ধরনের পরিবর্তন আসছিল, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোও শক্তিশালী হচ্ছিল। কিন্তু মাও মনে করতেন, সোভিয়েত মডেলের আমলাতান্ত্রিক সমাজতন্ত্র চীনের জন্য যথেষ্ট নয়। একই সঙ্গে স্টালিন-পরবর্তী সোভিয়েত ইউনিয়নের নতুন নেতৃত্বের প্রতি মাওয়ের অনাস্থা ও আদর্শগত বিরোধিতা (যা ‘সিনো-সোভিয়েত বিরোধ’ নামে পরিচিত) তীব্র হতে থাকে। মস্কো সমাজতন্ত্রের মূল পথ থেকে বিচ্যুত হচ্ছে, এই আশঙ্কা থেকে মাও চীনের জন্য আরও উগ্র ও নিজস্ব সমাজতান্ত্রিক পথ খোঁজার দিকে ঝুঁকে পড়েন।

১৯৫৬ সালে মাও ‘শত ফুল ফুটুক’ নীতির মাধ্যমে বুদ্ধিজীবী ও সমাজের বিভিন্ন অংশকে মতামত প্রকাশে উৎসাহিত করেন। কিন্তু সমালোচনা যখন প্রত্যাশার চেয়ে বেশি তীব্র হয়ে উঠল, তখন পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। শুরু হয় ডানপন্থাবিরোধী অভিযান। ওয়াল্ডারের বিশ্লেষণে এই পর্ব মাওয়ের রাজনৈতিক চিন্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক। সমালোচনা ও উদারতার পথ থেকে সরে তিনি আবার শ্রেণিসংগ্রামকেই রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে গ্রহণ করেন।

এরপরই আসে আরও উচ্চাভিলাষী কর্মসূচি—গ্রেট লিপ ফরোয়ার্ড।

চীনের প্রথম প্রধানমন্ত্রী চৌ এনলাই (বাঁয়ে), চীনা কমিউনিস্ট পার্টির চেয়ারম্যান মাও সে-তুং এবং চীনের তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী লিন পিয়াও। লিন পিয়াওয়ের হাতে ‘লিটল রেড বুক’। ১৯৬৭ সালের অক্টোবরে বেইজিংয়ের তিয়েনআনমেন স্কয়ারে

একলাফে এগিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন

১৯৫৮ সালে শুরু হয় ‘গ্রেট লিপ ফরোয়ার্ড’। লক্ষ্য ছিল খুব অল্প সময়ে কৃষিনির্ভর চীনকে শিল্পোন্নত দেশে পরিণত করা। কৃষিতে গড়ে তোলা হয় বিশাল জনগোষ্ঠীভিত্তিক কমিউন। একই সঙ্গে উৎপাদন বাড়াতে নির্ধারণ করা হয় নানা অবাস্তব লক্ষ্যমাত্রা।

স্থানীয় কর্মকর্তাদের ওপর উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা পূরণের চাপ ছিল প্রচণ্ড। বাস্তব উৎপাদনের চেয়ে রাজনৈতিক আনুগত্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে থাকে। কোথাও কোথাও উৎপাদনের অতিরঞ্জিত হিসাব ওপরের দিকে পাঠানো হয়। সেই হিসাবের ভিত্তিতে রাষ্ট্র খাদ্য সংগ্রহ করে। অথচ বাস্তবে গ্রামাঞ্চলে খাদ্যের ঘাটতি তৈরি হচ্ছিল। ওয়াল্ডার এখানে চীনের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর একটি বড় সীমাবদ্ধতা দেখিয়েছেন—‘হুকৌ’ বা কঠোর গৃহস্থালি নিবন্ধন ব্যবস্থার মাধ্যমে গ্রামের মানুষকে জমিতে আটকে রাখা হয়েছিল এবং শহরের শিল্পশ্রমিক ও কর্মকর্তাদের খাবার জোগাতে গ্রামের খাদ্য জোর করে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেওয়া হতো। ফলে দুর্ভিক্ষের ভয়াবহ আঘাতটি সবচেয়ে বেশি পড়েছিল গ্রামীণ সাধারণ মানুষের ওপর। এর পরিণতি ছিল ভয়াবহ।

১৯৫৯ থেকে ১৯৬১ সালের মধ্যে চীনে ব্যাপক দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। গ্রেট লিপ ফরোয়ার্ডের অর্থনৈতিক বিপর্যয় ও গ্রামীণ দুর্ভিক্ষ মাওয়ের শাসনের সবচেয়ে ভয়াবহ ব্যর্থতাগুলোর একটি হয়ে ওঠে। কেন্দ্রীভূত সিদ্ধান্ত গ্রহণ, অবাস্তব উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা এবং বাস্তব পরিস্থিতির তথ্য ওপরের স্তরে পৌঁছাতে না পারা, সব মিলিয়ে বিপর্যয় আরও গভীর হয়।

মাও কি সরে গিয়েছিলেন

গ্রেট লিপ ফরোয়ার্ডের বিপর্যয়ের পর অর্থনৈতিক নীতি পুনর্বিন্যাসে মাও কিছুটা পেছনে সরে যান। লিউ শাওছি, দেং শিয়াওপিংসহ দলের অন্য নেতারা অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে বাস্তবভিত্তিক নীতি গ্রহণের চেষ্টা করেন। তবে এর অর্থ এই নয় যে মাও রাজনীতি বা রাষ্ট্র পরিচালনা থেকে সরে গিয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে তিনি আবার সক্রিয়ভাবে রাজনৈতিক গতিপথ নির্ধারণে হস্তক্ষেপ করেন।

মাও মনে করতে থাকেন, বিপ্লবী চেতনা দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। রাষ্ট্রীয় কাঠামো ক্রমে এমন একটি আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থা তৈরি করছে, যেখানে বিপ্লবের আদর্শের বদলে বিশেষজ্ঞ, কর্মকর্তা ও বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত গোষ্ঠী শক্তিশালী হচ্ছে। তাঁর চোখে এটি ছিল সমাজতন্ত্রের ভেতর থেকেই ‘পুঁজিবাদী পুনঃস্থাপনের’ আশঙ্কা।

ওয়াল্ডারের ব্যাখ্যায়, এখান থেকেই মাওয়ের পরবর্তী রাজনৈতিক পদক্ষেপের যুক্তি তৈরি হয়। তিনি সমস্যাকে অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা হিসেবে দেখার পরিবর্তে আবার শ্রেণিসংগ্রামের সমস্যা হিসেবে দেখতে শুরু করেন।

চীনের লুশান পর্বত এলাকায় ১৯৬১ সালে ছুটি কাটাতে গিয়ে মাও সে-তুং

সাংস্কৃতিক বিপ্লব: রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিপ্লব

১৯৬৬ সালে শুরু হয় সাংস্কৃতিক বিপ্লব। মাওয়ের আহ্বানে তরুণদের বড় অংশ, বিশেষ করে শিক্ষার্থীরা, ‘রেড গার্ড’ বা লাল রক্ষীবাহিনীতে সংগঠিত হয়। লক্ষ্য ছিল সমাজের ‘পুঁজিবাদী পথের অনুসারী’ ও বিপ্লববিরোধীদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম।

কিন্তু খুব দ্রুত এই আন্দোলন রাষ্ট্রের প্রচলিত কাঠামোকেই আঘাত করতে শুরু করে।

বিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হয়ে যায়। শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, কর্মকর্তা, পার্টির নেতা, অসংখ্য মানুষ নিপীড়নের শিকার হন। প্রকাশ্য অপমান, গ্রেপ্তার, নির্যাতন, কারাবন্দিত্ব এবং হত্যার ঘটনাও ঘটে। বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে।

ওয়াল্ডারের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ হলো, সাংস্কৃতিক বিপ্লবকে শুধু নিচ থেকে উঠে আসা স্বতঃস্ফূর্ত গণ–আন্দোলন হিসেবে দেখলে পুরো ঘটনাটি বোঝা যায় না। মাও ও তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগীরা রেড গার্ডদের রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করেন। পরে যখন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তখন সেনাবাহিনীকে হস্তক্ষেপ করতে হয়।

এ কারণে রাষ্ট্রীয় কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে শেষ পর্যন্ত সেই রাষ্ট্রীয় ও সামরিক শক্তির ওপরই আবার নির্ভর করতে হয়।

ডাকটিকিটে মাও সে-তুং

সবচেয়ে ভয়াবহ বছরগুলো

সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সহিংসতায় মৃত ব্যক্তির সঠিক সংখ্যা নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। ওয়াল্ডারের গবেষণায় প্রায় ১১ থেকে ১৬ লাখ মানুষের মৃত্যুর হিসাব পাওয়া যায়। এর বড় অংশ ঘটে ১৯৬৮ সালে, যখন সামরিক নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন অঞ্চলে ‘শ্রেণিশত্রু’ শনাক্ত ও দমন করার অভিযান চালানো হয়।

ওয়াল্ডারের বিশ্লেষণে ১৯৬৮ থেকে ১৯৭১ সালের সময়টিতে চীন কার্যত একধরনের সামরিক শাসনের অধীনে চলে যায়, যার নেতৃত্বে ছিলেন মাওয়ের নির্ধারিত উত্তরসূরি ও সেনাপ্রধান লিন বিয়াও। পরে লিন বিয়াওর পতন ও সন্দেহজনক মৃত্যু মাওয়ের ক্ষমতার ভিত্তি ও নৈতিক ভাবমূর্তিকে আরও বড় ধাক্কা দেয়।

অর্থাৎ সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সহিংসতা শুধু রেড গার্ডদের উচ্ছৃঙ্খলতার ফল ছিল না। পরবর্তী পর্যায়ে রাষ্ট্র ও সামরিক কাঠামোও সেই দমনযজ্ঞের অংশ হয়ে ওঠে।

এখানে মাওয়ের রাজনৈতিক প্রকল্পের একটি বড় বৈপরীত্য দেখা যায়। আমলাতান্ত্রিক ক্ষমতা ভাঙার জন্য যে আন্দোলনকে উৎসাহ দেওয়া হয়েছিল, পরিস্থিতি সামলাতে শেষ পর্যন্ত সেই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ওপরই নির্ভর করতে হয়।

দুর্ভিক্ষের মুখে চীনের মূল ভূখণ্ড ছেড়ে হংকংয়ে চলে যান দেশটির অনেক বাসিন্দা। খাবারের জন্য অপেক্ষা করছেন তাঁরা। ১৯৬২ সালের মে মাসে

মাওয়ের ব্যক্তিপূজা

মাওয়ের শাসনের আরেকটি বৈশিষ্ট্য ছিল তাঁকে ঘিরে গড়ে ওঠা ব্যক্তিপূজা। তাঁর ছবি, বাণী, এমনকি তাঁর লেখা ‘লিটল রেড বুক’ও রাজনৈতিক আনুগত্যের প্রতীকে পরিণত হয়।

একজন নেতার কথা যখন রাজনৈতিক সত্যের চূড়ান্ত মানদণ্ড হয়ে ওঠে, তখন তাঁর সিদ্ধান্তের সমালোচনা করাও কঠিন হয়ে পড়ে। গ্রেট লিপ ফরোয়ার্ডের সময় উৎপাদনের অবাস্তব লক্ষ্যমাত্রা থেকে শুরু করে সাংস্কৃতিক বিপ্লবের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, অনেক ক্ষেত্রেই নিচের স্তরের কর্মকর্তারা ওপরের নেতৃত্বের প্রত্যাশা ও বাস্তবতার ফারাক তুলে ধরতে পারেননি।

মাওয়ের ব্যক্তিগত কর্তৃত্ব ও দলীয় কাঠামো মিলিয়ে এমন এক রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি হয়েছিল, যেখানে ভুল নীতি সংশোধনের সুযোগ ক্রমে কমে যায়।

ওয়াল্ডারের বইয়ের গুরুত্বপূর্ণ দিক এখানেই। তিনি মাওয়ের ব্যক্তিত্বকে একমাত্র ব্যাখ্যা হিসেবে দাঁড় করান না। একই সঙ্গে মাওয়ের কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক ভূমিকাকেও আড়াল করেন না। তাঁর বিশ্লেষণে নেতা, দলীয় কাঠামো ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান, এই তিনের সম্পর্ক বুঝলেই মাওযুগের সাফল্য ও বিপর্যয়ের প্রকৃতি স্পষ্ট হয়।

তাহলে মাওয়ের সাফল্য কী?

মাওয়ের সমালোচনা করতে গিয়ে তাঁর সময়ের অর্জনগুলো অস্বীকার করলে ইতিহাস অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

১৯৪৯ সালের আগে চীন দীর্ঘ যুদ্ধ, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও বিদেশি আগ্রাসনের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছে। কমিউনিস্টদের বিজয়ের পর দেশটি একটি শক্তিশালী কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রের অধীনে আসে। ভূমিসংস্কার, শিল্পায়ন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার বিস্তার এবং গ্রাম-শহরের সামাজিক কাঠামোর পরিবর্তন চীনা সমাজকে গভীরভাবে বদলে দেয়।

রাষ্ট্রের সক্ষমতা বৃদ্ধি, শিল্পায়নের ভিত্তি তৈরি এবং সামাজিক কাঠামোর ব্যাপক পরিবর্তন ছিল মাও–যুগের গুরুত্বপূর্ণ অর্জন। কিন্তু একই সঙ্গে এর মূল্য ছিল ব্যাপক মানবিক ও রাজনৈতিক ক্ষতি।

এই দ্বৈততাই মাওকে ইতিহাসের অন্যতম জটিল রাজনৈতিক চরিত্রে পরিণত করেছে।

শেষ পর্যন্ত কী রইল?

১৯৭৬ সালে মাও মারা যাওয়ার সময় চীন ছিল গভীরভাবে বিভক্ত ও রাজনৈতিকভাবে ক্লান্ত। তাঁর মৃত্যুর এক মাসেরও কম সময়ের মধ্যে, ৬ অক্টোবর ‘গ্যাং অব ফোর’ গ্রেপ্তার হয়। এর মধ্য দিয়ে সাংস্কৃতিক বিপ্লবের অবসান ঘটে।

পরে দেং শিয়াওপিংয়ের নেতৃত্বে চীন ভিন্ন অর্থনৈতিক পথে হাঁটতে শুরু করে। ১৯৮১ সালে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির ঐতিহাসিক মূল্যায়নে সাংস্কৃতিক বিপ্লবকে গুরুতর ভুল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। একই সঙ্গে মাওয়ের ঐতিহাসিক অবদানকে অস্বীকার করা হয়নি। তাঁর অবদান ও ভুল, দুটিকেই একসঙ্গে মূল্যায়নের চেষ্টা করা হয়।

তবে মাওকে শুধু ব্যর্থতার প্রতীক বানিয়েও ইতিহাস শেষ করা যায় না। তিনি যে চীনকে ক্ষমতায় এসে পেয়েছিলেন, তাঁর মৃত্যুর সময় সেই চীন আর আগের চীন ছিল না। রাষ্ট্র শক্তিশালী হয়েছিল, সমাজ বদলেছিল, শিল্পায়নের ভিত্তি তৈরি হয়েছিল। কিন্তু সেই পরিবর্তনের মূল্যও ছিল বিপুল।

এ কারণেই অ্যান্ড্রু ওয়াল্ডারের বইয়ের নাম ‘আ রেভোল্যুশন ডিরেইলড’ তাৎপর্যপূর্ণ। ‘বিপ্লব ব্যর্থ হয়েছিল’, বইটির বক্তব্য এত সরল নয়; বরং যে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো বিপ্লবের সাফল্যের ভিত্তি গড়ে দিয়েছিল, পরবর্তী সময়ে সেগুলোর সীমাবদ্ধতা, মাওয়ের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত এবং ক্ষমতার অতিরিক্ত কেন্দ্রীকরণ মিলেই বিপ্লবকে পথচ্যুত করে।

মাওয়ের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হয়তো এখানেই।

মাও এমন একটি রাষ্ট্র তৈরি করেছিলেন, যার মাধ্যমে বিপুল পরিবর্তন ঘটানো সম্ভব হয়েছিল। কিন্তু সেই রাষ্ট্রে তাঁর নিজের ভুলকে কার্যকরভাবে প্রশ্ন করার মতো শক্তিশালী রাজনৈতিক প্রক্রিয়া গড়ে ওঠেনি। ফলে ভুল সিদ্ধান্ত সংশোধনের বদলে একের পর এক বড় রাজনৈতিক অভিযান ডেকে এনেছে আরও বড় সংকট।

একজন বিপ্লবী নেতা যখন রাষ্ট্রের চেয়েও বড় হয়ে ওঠেন, তখন তাঁর সাফল্য রাষ্ট্রের সাফল্য হয়ে যায়। কিন্তু তাঁর ভুলও তখন রাষ্ট্রের ভুল হয়ে দাঁড়ায়।

মাওয়ের চীনের ইতিহাস তাই শুধু একজন নেতার উত্থান-পতনের গল্প নয়। এটি ক্ষমতা, বিপ্লব, প্রতিষ্ঠান ও নেতৃত্বের সম্পর্কের এক গভীর রাজনৈতিক পাঠ।

আর সেই পাঠের সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নটি হয়তো এটাই, একটি বিপ্লব যখন নিজের ভুল স্বীকার করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে, তখন সে আর কাকে বদলায়, সমাজকে, নাকি শেষ পর্যন্ত নিজেকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে?

সূত্র: ‘চায়না আন্ডার মাও: আ রেভোল্যুশন ডিরেইলড’। অ্যান্ড্রু জি ওয়াল্ডার, মার্কিন সমাজবিজ্ঞানী।

Read full story at source