আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবসের ভাবনা
· Prothom Alo

মানুষের মৌলিক অধিকারগুলোর অন্যতম শিক্ষা। নিরক্ষরতা নিঃসন্দেহে যেকোনো জাতি বা গোষ্ঠীর জন্য অভিশাপ স্বরূপ। জানা যায় সারা বিশ্বের প্রায় এক–চতুর্থাংশ মানুষ আজ নিরক্ষর। আর এই নিরক্ষর জনগোষ্ঠীর অর্ধেকের বেশি মানুষের বাস দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে। শিক্ষার আলো থেকে পিছিয়ে থাকা এই বৃহৎ জনগোষ্ঠীর সাক্ষরতার গুরুত্ব অনুধাবন করে জাতিসংঘের ঘোষণা অনুযায়ী প্রতিবছর ৮ সেপ্টেম্বর বিশ্বব্যাপী আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস উদ্যাপিত হয়ে আসছে।
জানা যায় প্রথম ইউনেসকোর উদ্যোগে ১৯৬৫ সালের ৮ থেকে ১৯ সেপ্টেম্বর তেহরানে শিক্ষাসংক্রান্ত বিশ্ব সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। বিশ্বের ৮৮টি দেশের শিক্ষামন্ত্রী ও শিক্ষাবিশেষজ্ঞগণের অংশগ্রহণকারী এ সম্মেলনের মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল বিশ্বের সব মানুষকে সাক্ষর করার উপায় খুঁজে বের করা। উক্ত সম্মেলনে বিশ্বের সব দেশে প্রতিবছর ৮ সেপ্টেম্বরকে আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস হিসেবে উদ্যাপনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। ১৯৬৬ সালে ইউনেসকো দিবসটি প্রথম উদ্যাপন করে। ১৯৬৭ সালের ৮ সেপ্টেম্বর সীমিত পরিসরে আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস উদ্যাপিত হয়। এর পর থেকে নিয়মিতভাবে আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস উদ্যাপিত হয়ে আসছে। তবে স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭২ সালে প্রথম সাক্ষরতা দিবস উদ্যাপিত হয়। দিবসটি উদ্যাপনের মূল লক্ষ্য হলো বিশ্বের জনগণকে শিক্ষা সম্পর্কে সচেতন ও উদ্দীপ্ত করে তাদেরকে মানবসম্পদে রূপান্তরিত করা। এ ছাড়া পশ্চাৎপদ নিরক্ষর জনগোষ্ঠীর মধ্যে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও সরকারি–বেসরকারি পর্যায়ে বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্য দিয়ে দিবসটি উদ্যাপিত হয়। এ বছর আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবসের প্রতিপাদ্য হলো—‘মানুষ, পৃথিবী ও সমৃদ্ধির জন্য সাক্ষরতা’।
Visit esporist.com for more information.
সাক্ষরতা প্রত্যয়টির উদ্ভব ঘটেছে স্বাক্ষর শব্দ থেকে। স্বাক্ষর এর শাব্দিক অর্থ দস্তখত বা সই করা। ব্যবহারিক অর্থে স্ব-অক্ষরের সঙ্গে পরিচয় রয়েছে যাঁর, তিনিই সাক্ষর। সুতরাং সাক্ষর বলতে অক্ষরযুক্ত তথা পড়া, লেখা ও হিসাব করায় দক্ষতাসম্পন্ন ব্যক্তিকে বোঝায়। আর অক্ষর জ্ঞান রয়েছে, এমন নাগরিকের সংখ্যা হলো সাক্ষরতা। তবে দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে এর পরিধি। এখন শুধু স্বাক্ষর জ্ঞান থাকলেই সাক্ষরতা বলা যায় না। বাংলাদেশের ভৌগোলিক পরিসরে সাক্ষরতা শব্দের প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায় ১৯০১ সালে জনশুমারির অফিশিয়াল ডকুমেন্টে। শুরুতে স্ব–অক্ষরের সঙ্গে অর্থাৎ নিজের নাম লিখতে যে কয়টি বর্ণমালা প্রয়োজন, তা জানলেই তাকে সাক্ষর বলা হতো। চল্লিশের দশকের দিকে পড়ালেখার দক্ষতাকে সাক্ষরতা বলে অভিহিত করা হতো। ষাটের দশকে এসে পড়া ও লেখার দক্ষতার সঙ্গে সঙ্গে সহজ হিসাব–নিকাশের যোগ্যতাসম্পন্ন মানুষই সাক্ষর মানুষ হিসেবে পরিগণিত হতো। আশির দশকে লেখাপড়া ও হিসাব-নিকাশের পাশাপাশি সচেতনতা ও দৃশ্যমান বস্তুসামগ্রী পঠনের ক্ষমতা সাক্ষরতার মানদণ্ড হিসেবে স্বীকৃত হয়। অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতা থেকে মুক্তির অন্যতম উপায় হলো সাক্ষরতা অর্জন করা। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এই সাক্ষরতার সংজ্ঞায় ভিন্নতা থাকলেও ১৯৬৭ সালে ইউনেসকো সর্বজনীন একটি সংজ্ঞা নির্ধারণ করে। তখন শুধু কেউ নাম লিখতে পারলেই তাকে সাক্ষর বলা হতো। দেশে সাক্ষরতা নিয়ে কাজ করে এমন প্রতিষ্ঠানগুলোর মতে, সাক্ষরতা বলতে বোঝানো হয় পরিচিত বিষয় ও প্রেক্ষাপটের সঙ্গে সম্পর্কিত বিষয়বস্তু পড়তে ও লিখতে পারার দক্ষতা অর্জন এবং সমাজে কার্যকর ভূমিকা পালনে দৈনন্দিন জীবনে এ দক্ষতাগুলো ব্যবহার করতে পারার ক্ষমতা। বর্তমানে সাক্ষরতা হলো সরাসরি ব্যক্তির জীবনমান পরিবর্তনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। অর্থাৎ সাক্ষরতার সঙ্গে যোগাযোগ দক্ষতা, ক্ষমতায়নের দক্ষতা, জীবন নির্বাহী দক্ষতা, প্রতিরক্ষার দক্ষতা এবং সাংগঠনিক দক্ষতাও সংযোজিত হয়েছে।
নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
ইউনেসকোর তথ্যানুযায়ী, বর্তমান বিশ্বে প্রায় ৭৩ কোটি ৯০ লাখ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ নিরক্ষর। বাংলাদেশ তৃতীয় বিশ্বের একটি উন্নয়নশীল দেশ। প্রায় ১৭ কোটি জনসংখ্যা–অধ্যুষিত এ দেশে নিরক্ষর মানুষের সংখ্যা ৩ কোটি ২৫ লাখ। বিশ্ব নিরক্ষরতা র্যাঙ্কিংয়ে বাংলাদেশের অবস্থান ১৬৪তম। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, দেশের প্রাপ্তবয়স্ক (১৫ বছর বা তার বেশি) জনগোষ্ঠীর সাক্ষরতার হার প্রায় ৭৫ দশমিক ৬ শতাংশ। অর্থাৎ বাংলাদেশে প্রতি পাঁচজন বয়স্ক মানুষের মধ্যে একজনের কিছু বেশি (প্রায় ১ দশমিক ২ জন) মানুষ নিরক্ষর। উন্নত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠনের জন্য তাদের সাক্ষরজ্ঞান ও কর্মমুখী প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করা অত্যন্ত জরুরি। উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা আইন-২০১৪ অনুযায়ী ১০ থেকে ১৪ বছর বয়সী বিদ্যালয়বহির্ভূত শিশুদের উপানুষ্ঠানিক প্রাথমিক শিক্ষা এবং ১৫ বছর ও তদূর্ধ্ব বয়সী নিরক্ষর নারী-পুরুষকে সাক্ষরতা, জীবিকায়ন দক্ষতা ও জীবনব্যাপী শিক্ষা দেওয়ার কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। নিচে বাংলাদেশের সাক্ষরতার পরিসংখ্যান তুলে ধরা হলো—
সারণি-১: বাংলাদেশের সাক্ষরতার পরিসংখ্যান (১৯৭১-২০২৫)
ক্রমিক নং সাল সাক্ষরতার হার সাল সাক্ষরতার হার
০১। ১৯৭১ ১৬.৮০ ভাগ ২০১৮ ৭২.৯০ ভাগ
০২। ১৯৭৪ ২৫.৯০ ভাগ ২০১৯ ৭৪.৬৮ ভাগ
০৩। ১৯৯০ ৩৫.০০ ভাগ ২০২০ ৭৪.৯১ ভাগ
০৪। ১৯৯১ ৩৫.৩০ ভাগ ২০২১ ৭৬.৩৬ ভাগ
০৫। ১৯৯৫ ৪৭.০০ ভাগ ২০২০ ৭৪.৯১ ভাগ
০৬। ২০০০ ৬৪.০০ ভাগ ২০২১ ৭৬.৩৬ ভাগ
০৭। ২০০২ ৬৫.০০ ভাগ ২০২২ ৭৪.৬৬ ভাগ
০৮। ২০০৩ ৬৫.০০ ভাগ ২০২৩ -
০৯। ২০১০ ৫৯.৮২ ভাগ ২০২৪ ৭৬ ভাগ
১০। ২০১৭ ৭২.৩০ ভাগ ২০২৫ ৭৭.৯ ভাগ
সূত্র: প্রাধমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়, ২০১৮ ও আদমশুমারি-২০১১
১৯৭১ সালে দেশে সাক্ষরতার হার ছিল ১৬ দশমিক ৮ শতাংশ। ৩ বছর পর অর্থাৎ ১৯৭৪ সালে এই হার দাঁড়ায় ২৫ দশমিক ৯ শতাংশে। ১৯৯১ সালে সাক্ষরতার হার ছিল ৩৫ দশমিক ৩ শতাংশ এবং ২০০১ সালে সাক্ষরতার হার বেড়ে দাঁড়ায় ৪৭ দশমিক ৯ শতাংশ। আর ২০১০ সালে দেশে সাক্ষরতার হার ৫৯ দশমিক ৮২ শতাংশ আর বর্তমানে দাবি করা হচ্ছে ৭৭ দশমিক ৯০ শতাংশ। সরকারি–বেসরকারি প্রচেষ্টার ফলে এই হার হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়, তারপরও গ্রহণযোগ্য মাপকাঠি দিয়ে দেখা উচিত এবং সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন, যাতে দেশে একজন মানুষও নিরক্ষর না থাকে।
অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতা থেকে মুক্তির অন্যতম উপায় হলো সাক্ষরতা অর্জন করা। দেশে সাক্ষরতা বৃদ্ধির প্রথম উদ্যোগ গৃহীত হয় ১৯১৮ সালে নৈশবিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। এরপর ১৯৩৪ সালে খান বাহাদুর আহসানউল্লাহ, নবাব আবদুল লতিফ প্রমুখের প্রচেষ্টায় বয়স্ক শিক্ষা কেন্দ্র গড়ে ওঠে। ষাটের দশকে ভি-এইড কার্যক্রমের আওতায় সফলভাবে পরিচালিত হয় বয়স্ক শিক্ষা কার্যক্রম। এতে অসংখ্য দরিদ্র মানুষ অন্তর্ভুক্ত হয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এই সাক্ষরতার সংজ্ঞায় ভিন্নতা থাকলেও ১৯৬৭ সালে ইউনেসকো সর্বজনীন একটি সংজ্ঞা নির্ধারণ করে। তখন শুধু কেউ নাম লিখতে পারলেই তাকে সাক্ষর বলা হতো। এরই ধারাবাহিকতায় ২০০৪ সালে ব্যুরো অব নন-ফরমাল এডুকেশন প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৯১ সালে দেশে প্রাথমিক শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করা হয়। পরবর্তী সময়ে প্রায় প্রতি দশকেই এই সংজ্ঞায় পরিবর্তন এসেছে এবং ১৯৯৩ সালের একটি সংজ্ঞায় ব্যক্তিকে সাক্ষর হওয়ার জন্য তিনটি শর্ত পূরণ করতে হয়। শর্ত তিনটি হচ্ছে—
১. ব্যক্তি নিজ ভাষায় সহজ ও ছোট বাক্য পড়তে পারবে।
২. ব্যক্তি নিজ ভাষায় সহজ ও ছোট বাক্য লিখতে পারবে এবং
৩. ব্যক্তি দৈনন্দিন জীবনের সাধারণ হিসাব-নিকাশ করতে পারবে।
বর্তমানে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে বিনা মূল্যে বই সরবরাহ করা হচ্ছে আর মেয়েদের শিক্ষাবৃত্তি তো আছেই। বাংলাদেশ সংবিধানের ১৭ অনুচ্ছেদে ৬ থেকে ১০ বছরের ছেলে-মেয়েদের জন্য বিনা মূল্যে মৌলিক শিক্ষা প্রদানের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এগুলো সাক্ষরতা বৃদ্ধি তথা প্রাক্-প্রাথমিক শিক্ষা প্রসারের ক্ষেত্রে ধনাত্মক ফ্যাক্টর। কিন্তু এটিও তো ঠিক যে পঞ্চম শ্রেণি পাস করার পরও অনেক শিক্ষার্থী দেখে দেখে বাংলা পড়তে পারে না, ইংরেজি তো দূরের কথা। এটিকে কোন ধরনের সাক্ষরতা বলব? সাক্ষরতার হার নির্ধারণে আমরা যে পদ্ধতি ব্যবহার করে আসছি, সেটি সাক্ষরতার প্রকৃত চিত্র তুলে ধরে না। ১৯৮৫ সালে লেসোথোতে ব্যক্তি প্রদত্ত মূল্যায়ন, যা বাংলাদেশেও প্রচলিত পদ্ধতি ব্যবহার করে সাক্ষরতার হার দেখানো হয়েছিল ৬০ শতাংশ, অথচ সাক্ষরতার পরিবর্তিত সংজ্ঞা অনুযায়ী ব্যক্তিকে নির্দিষ্ট করার মাধ্যমে মূল্যায়ন ও যাচাই করা হলে সাক্ষরতার হার ৪৬ শতাংশে নেমে এসেছিল। এটি দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ মেসেজ। কারণ, দাবি করা হচ্ছে দেশে সাক্ষরতার হার ৭৭ দশমিক ৯ শতাংশে পৌঁছে গেছে। এটির ভিত্তি কী? এখানে কী কী শর্ত ধরা হয়েছে, বিষয়টি সবার কাছে পরিষ্কার থাকা প্রয়োজন।
একটি জাতি গঠনের প্রধান মাধ্যম শিক্ষা আর শিক্ষার প্রথম সোপান সাক্ষরতা। তাই সবার জন্য শিক্ষা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ সাংবিধানিকভাবে দায়বদ্ধ। ১৯৪৮ সালের ১০ ডিসেম্বর ঘোষিত জাতিসংঘের মানবাধিকার ঘোষণার ধারা ২৬-এ সাক্ষরতা যে মৌলিক অধিকার সে কথা স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে। এই ঘোষণায় বলা হয়, শিক্ষা প্রতিটি মানুষের অধিকার। এই শিক্ষা মৌলিক স্তর পর্যন্ত হবে সম্পূর্ণ বিনা মূল্যে। এ ছাড়া কারিগরি ও পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধির সুযোগও বিস্তৃত হতে হবে। জাতিসংঘের এই ঘোষণার পর সদস্যভুক্ত প্রায় প্রতিটি দেশ সাংবিধানিকভাবে সাক্ষরতাকে প্রতিটি নাগরিকের অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। পরবর্তী সময় এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৯০ সালে থাইল্যান্ডের জমতিয়েনে ‘সবার জন্য শিক্ষা’ শীর্ষক বিশ্ব সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত সম্মেলনে বাংলাদেশ প্রতিনিধিত্ব করে। ১৬৪টি দেশের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে বাংলাদেশ ২০০০ সালের মধ্যে ‘সবার জন্য শিক্ষা’ নিশ্চিতের অঙ্গীকার করে। কিন্তু ১০ বছরের ব্যবধানেও বাংলাদেশে সে সম্মেলনের ঘোষণা বাস্তবায়িত হয়নি। পরে ২০০০ সালে সেনেগালের রাজধানী ডাকারে ‘জমতিয়েন ঘোষণা’র পুনর্মূল্যায়ন করা হয়। ডাকার সম্মেলনে অ্যাকশন প্ল্যান তৈরি করে ছয়টি লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে ২০১৫ সাল পর্যন্ত সময় নির্ধারণ করা হয়। বাংলাদেশ ঘোষণা দেয়, ২০০০ সালের সাক্ষরতার দ্বিগুণ লক্ষ্য অর্জন করবে ২০১৫ সালে। বাংলাদেশের সংবিধানেও এ বিষয়ে অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়েছে।
ইতিমধ্যে দেশে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় নামে একটি স্বতন্ত্র মন্ত্রণালয় স্থাপিত হয়েছে। পাশাপাশি প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক ও গণশিক্ষা কার্যক্রম চালু করা হয়েছে। ইদানীং সরকার নারী শিক্ষার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। বিনা বেতনে মেয়েদের ১০ শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। নারী শিক্ষা সম্প্রসারণের লক্ষ্যে ১৯৯৪ সাল থেকে ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণির ছাত্রীদের উপবৃত্তি প্রদান শুরু করা হয় এবং ২০০১ সালে একনেক এইচএসসি পর্যন্ত নারী শিক্ষাকে অবৈতনিক করে ৬০০ কোটি টাকার প্রকল্প অনুমোদন করে। এ কর্মসূচির আওতায় ১৯৯৯ শিক্ষাবর্ষে প্রায় ৩৯ লাখ এবং ২০০০ শিক্ষাবর্ষে প্রায় ৪০ লাখ ছাত্রীকে উপবৃত্তি প্রদান করা হয়। এ ছাড়া ২০০২ সালের জানুয়ারি থেকে উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে সব ছাত্রীর জন্য বেতন মওকুফ ও উপবৃত্তি প্রদান কার্যক্রম বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। নারী শিক্ষার তাৎপর্যপূর্ণ অগ্রগতির ফলে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরে ছাত্রীর সংখ্যা ৫২ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। এ ছাড়া প্রতি অর্থবছরেই সরকার দেশের বাজেটে শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ দিয়ে আসছে। যেমন বর্তমান সরকার ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতে মোট ১ লাখ ১০ হাজার ৬৫৭ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছিল, যা ছিল মোট বাজেটের ১৪ শতাংশ এবং জিডিপির ১ দশমিক ৭৭ শতাংশ।
প্রিয় শিক্ষকের অশ্রুসজল ও বর্ণিল বিদায়অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতা থেকে মুক্তির অন্যতম উপায় হলো সাক্ষরতা অর্জন করা। দেশে সরকারি পর্যায়ে বিভাগীয়, জেলা ও ২টি উপজেলাসহ মোট ৭১টি গণগ্রন্থাগার পরিচালিত হচ্ছে। বেসরকারি পর্যায়ে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র ৯০ লাখ ছাত্র-ছাত্রীকে বই পড়াচ্ছে। প্রায় চার হাজার স্কুলে যেখানে কোনো লাইব্রেরি ছিল না, লাইব্রেরি স্থাপন করেছে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র। এ ছাড়া আরও দুই হাজার বিদ্যালয়ে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র লাইব্রেরি স্থাপন করেছে। ব্র্যাক শিক্ষা কর্মসূচি প্রায় ৩ হাজার গণকেন্দ্র ও ৫ হাজার কিশোর-কিশোরী ক্লাবের মাধ্যমে লাইব্রেরি কার্যক্রম পরিচালনা করে প্রায় ১৪ লাখ পাঠক-পাঠিকা তৈরি করেছে দেশব্যাপী। এসব কেন্দ্রে বছরব্যাপী বিভিন্ন ধরনের কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়। জ্ঞান ও তথ্য জনগণের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য ব্রিটিশ কাউন্সিল সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যৌথভাবে পরিচালনা করছে, লাইব্রেরিজ আনলিমিটেড কর্মসূচি। আলোর পাশে যা থাকে, তা-ও আলোকিত হয়। এই হিসেবে এসব উদ্যোগ ও গ্রন্থাগার কার্যক্রমও দেশে সাক্ষরতার হার বৃদ্ধিতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সহায়তা করছে। সাক্ষরতা ও উন্নয়ন একই সূত্রে গাঁথা। নিরক্ষরতা উন্নয়নের অন্তরায়। টেকসই সমাজ গঠনের জন্য যে জ্ঞান ও দক্ষতা প্রয়োজন, তা সাক্ষরতার মাধ্যমেই অর্জন করা সম্ভব।
সাক্ষরতা একটি দেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষার সঙ্গে সাক্ষরতার আর সাক্ষরতার সঙ্গে উন্নয়নের সম্পর্ক ওতপ্রোতভাবে জড়িত। যে দেশ বা জাতির শিক্ষার হার যত বেশি, সে দেশ তত উন্নত। সাক্ষর জাতি উন্নত জাতি। এ কথা সত্য যে দেশের এই ব্যাপক জনগোষ্ঠীকে স্বাক্ষরজ্ঞান সম্পন্ন করার মতো দুরূহ কাজটি সরকারের একার পক্ষে করা সম্ভব নয়। এ জন্য সরকারের পাশাপাশি বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও সাধারণ জনগণের সক্রিয় সহযোগিতা ও অংশগ্রহণ একান্ত প্রয়োজন। সংশ্লিষ্ট সবার সঠিক দায়িত্ব পালন, সচেতন ও অর্থবহ অংশগ্রহণের মাধ্যমে সমাজের সব স্তরে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিয়ে দেশকে যদি নিরক্ষরতার অভিশাপ থেকে মুক্ত করা যায়, তবেই আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবসটি পালন আমাদের জন্য সার্থক ও তাৎপর্যপূর্ণ হবে।
লেখক: অধ্যাপক (সমাজবিজ্ঞান) ও অতিরিক্ত পরিচালক, উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট, খুলনা-৯২০৩।