চলতি অর্থবছরে সরকারি বন্ডের ঋণ পরিশোধ করতে হবে ৫৭ হাজার কোটি টাকা
· Prothom Alo

ঋণ পরিশোধের ঝুঁকি কমাতে মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই বন্ড পুনঃক্রয় কার্যক্রম চালুর পরামর্শ।
আগামী ৫ বছরে যে ১২০টি বন্ডের মেয়াদ শেষ হবে, ওই জায়গায় ১০-১৫টি বড় বন্ড চালুর সুপারিশ।
Visit een-wit.pl for more information.
সরকারি বন্ডের বড় অঙ্কের ঋণ পরিশোধের সময় ঘনিয়ে আসছে। চলতি অর্থবছরে প্রায় ৫০০ কোটি ডলার বা ৫৭ হাজার ৩০০ কোটি টাকার বন্ডের মেয়াদ শেষ হবে।
সরকারি ঋণ ব্যবস্থাপনায় এই ঝুঁকি কমাতে মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই কিছু বন্ড কেনার পরামর্শ দিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংক। ছোট পরিসরে পরীক্ষামূলকভাবে বন্ড পুনঃক্রয়ের কার্যক্রম চালুর পর তা নিয়মিত করার সুপারিশ করেছে সংস্থা দুটি।
আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের মূল পরামর্শ হলো—একসঙ্গে মেয়াদ শেষ হওয়া বন্ডের চাপ কমানো এবং ২৩৭টি ছোট-বড় বন্ডের খণ্ডিত বাজারকে ক্রমান্বয়ে কমসংখ্যক বড় বন্ডে রূপান্তর। এতে সরকারের ঋণ পরিশোধের ঝুঁকি কমবে এবং বন্ড বাজার আরও সক্রিয় হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
গত মাসে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুরোধে তৈরি ‘দায় ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম: স্থানীয় মুদ্রার বন্ড বাজারের উন্নয়ন’ শীর্ষক কারিগরি সহায়তা প্রতিবেদন তৈরি করেছে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের একটি মিশন। মিশনে নেতৃত্ব দেন আইএমএফের অরিন্দম রায় এবং বিশ্বব্যাংকের জসোল্ট বাঙ্গো।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একই সময়ে অনেক বন্ডের মেয়াদ শেষ হওয়ার কারণে সরকারের পুনঃ অর্থায়নঝুঁকি বাড়ছে। অর্থাৎ, পুরোনো ঋণ শোধ করতে গিয়ে সরকারকে আবার নতুন ঋণ নিতে হচ্ছে। এতে চাপ আরও বেড়ে যাচ্ছে।
জাহিদ হোসেন, সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ, বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের এসব পরামর্শকে সরকার কীভাবে নিচ্ছে। সরকার রাজি না হলে তো পরামর্শ কাগজেই পড়ে থাকবেবিশ্বব্যাংক ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘দেখতে হবে, আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের এসব পরামর্শকে সরকার কীভাবে নিচ্ছে। সরকার রাজি না হলে তো পরামর্শ কাগজেই পড়ে থাকবে। কত টাকার বন্ডের পুনঃক্রয় লাগবে, আর এ জন্য সংস্থা দুটি কোনো অর্থায়ন করবে কি না, তা-ও আলোচনাযোগ্য। কারণ, পুনঃক্রয় করতেও টাকা লাগবে।’
৫০০ কোটি ডলারের চাপ
সরকারি বন্ডের প্রায় ১২ শতাংশের মেয়াদ চলতি অর্থবছরে শেষ হবে। এসব বন্ডের মোট মূল্য প্রায় ৫০০ কোটি ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় ৫৭ হাজার ৩০০ কোটি টাকা।
আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের আশঙ্কা, পরিশোধের চাপ বৃদ্ধি পাওয়ায় সরকারকে নতুন করে বিপুল ঋণ নিতে হতে পারে। এতে সরকারি ঋণের পুনঃ অর্থায়নঝুঁকি আরও বাড়বে।
এ পরিস্থিতি এড়াতে মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই বন্ডের একটি অংশ বাজার থেকে কিনে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ। সংস্থা দুটি বলছে, একই সঙ্গে পুরোনো বন্ডের পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি নতুন বন্ড দেওয়ার ব্যবস্থাও চালু করা যেতে পারে। এর ফলে ঋণের পুরো চাপ একটি নির্দিষ্ট সময়ে না এসে বছরজুড়ে ছড়িয়ে পড়বে। এতে কমে আসবে সরকারের ওপর হঠাৎ বড় অঙ্কের অর্থ পরিশোধের চাপ।
বন্ড পুনঃক্রয় করা হয় প্রতিযোগিতামূলক উল্টো নিলামের মাধ্যমে। সাধারণ নিলামে সরকার বিনিয়োগকারীদের কাছে বন্ড বিক্রি করে। আর উল্টো নিলামে বিনিয়োগকারীরা সরকারকে তাঁদের হাতে থাকা বন্ড বিক্রির প্রস্তাব দেবেন। সরকার গ্রহণযোগ্য দামে প্রয়োজনীয় বন্ড কিনে নেবে।
২৩৭ বন্ডের খণ্ডিত বাজার
২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সরকারের ২৩৭টি বন্ড চালু ছিল। প্রতিটি বন্ডের গড় আকার ছিল প্রায় ১ হাজার ৯৪০ কোটি টাকা। অথচ বড় বেঞ্চমার্ক বন্ডের লক্ষ্যমাত্রা ৯ হাজার কোটি টাকা।
আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের মতে, অধিক বন্ডের কারণে সরকারি বন্ডের বাজার খণ্ডিত হয়েছে। এসবের প্রভাব পড়েছে বন্ডের দ্বিতীয় পর্যায়ের বাজারেও (সেকেন্ডারি মার্কেট)। ২০২৪ অর্থবছরে সরকারি বন্ডের সরাসরি লেনদেন হয়েছিল ১ লাখ ৭০ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। যদিও ২০২২ অর্থবছরে এর পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৫ হাজার ৩০০ কোটি টাকা।
আগামী ৫ বছরে যে ১২০টি সরকারি বন্ডের মেয়াদ শেষ হবে, ওই জায়গায় ১০-১৫টি বিভিন্ন মেয়াদি বড় বন্ড চালুর পরামর্শ দিয়েছে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক। এতে ছোট বন্ডের সংখ্যা কমবে, বড় বন্ডে লেনদেন বাড়বে এবং বাজারে তারল্যও বাড়তে পারে।
সরকারি বন্ডের বড় অংশ ব্যাংকগুলোর হাতে। তাই কোন বন্ড পুনঃক্রয় করা হবে, তা নির্ধারণের সময় ব্যাংকগুলোর হাতে থাকা বন্ডের ধরন বিবেচনায় নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
অনেক ব্যাংক সরকারি বন্ড মেয়াদ পর্যন্ত ধরে রাখার হিসাবে রাখে। এসব বন্ড বাজারে বিক্রি করলে ব্যাংককে হিসাবের খাতায় লোকসান দেখাতে হতে পারে। ফলে সব ব্যাংক পুনঃক্রয় কার্যক্রমে অংশ নিতে আগ্রহী না-ও হতে পারে। এ কারণে কার্যক্রম শুরুর আগে বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে আলোচনা করার পরামর্শ দিয়েছে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংককেও শুরুতে বন্ড পুনঃক্রয় কার্যক্রমে অংশ না নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে প্রতিবেদনে।
নগদ টাকার সুরক্ষা কম
বন্ড পুনঃক্রয়ের পথে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাধাগুলোর একটি হলো সরকারের নগদ অর্থ ব্যবস্থাপনা। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকারের হাতে পর্যাপ্ত নগদ সুরক্ষা মজুত নেই। মেয়াদ শেষ হওয়ার কয়েক সপ্তাহ আগে বড় বন্ডের অর্থ জোগাড় করতে গেলে সরকারের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে। আবার বাজারে সরকারকে বড় অঙ্কের অর্থ সংগ্রহ করতে হবে—এমন ধারণা তৈরি হলে স্বল্পমেয়াদি ঋণের সুদও বেড়ে যেতে পারে।
এ কারণে মেয়াদ শেষ হওয়ার অনেক আগেই অর্থ সংগ্রহের প্রস্তুতি নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক।