চালু হয়নি ট্রমা সেন্টার, ‘গোল্ডেন আওয়ারে’ চিকিৎসা পাচ্ছেন না সড়ক দুর্ঘটনার রোগীরা
· Prothom Alo

ট্রমা সেন্টারটি নির্মাণের এক যুগ পরও চালু হয়নি। দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিরা তাৎক্ষণিক চিকিৎসা পাচ্ছেন না।
Visit umafrika.club for more information.
ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের পাশে হবিগঞ্জের বাহুবল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সীমানায় দাঁড়িয়ে আছে তিনতলা একটি ভবন। বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে, এটি একটি সচল হাসপাতাল। কিন্তু ভেতরে ঢুকলেই ভিন্ন চিত্র। বেশির ভাগ কোনো কক্ষ খালি পড়ে আছে, কোনোটিতে পুরোনো সরঞ্জাম স্তূপ করে রাখা। ভবনের নিচতলার একটি অংশে চলছে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের প্যাথলজি পরীক্ষার কার্যক্রম। এমনই চিত্র সড়ক দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিদের দ্রুত চিকিৎসা দেওয়ার লক্ষ্যে নির্মিত বাহুবল ট্রমা সেন্টারের।
নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার এক যুগের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও ট্রমা সেন্টারটি এখনো পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হয়নি। ফলে দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত রোগীদের আগের মতোই উন্নত চিকিৎসার জন্য হবিগঞ্জ, সিলেট কিংবা ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে পাঠাতে হচ্ছে।
বাহুবলে ট্রমা সেন্টার নির্মাণের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিদের দ্রুত প্রাথমিক ও জরুরি চিকিৎসা দেওয়া। এ ছাড়া মাথা, বুক, মেরুদণ্ড ও হাড়ের গুরুতর আঘাত পাওয়া রোগীদের দ্রুত চিকিৎসা দিয়ে প্রয়োজন হলে পরবর্তী পর্যায়ের হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করা। কিন্তু কেন্দ্রটি চালু না থাকায় দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত রোগীদের অনেক সময় দূরের হাসপাতালে পাঠাতে হয়।
২০২৬ সালের জুলাইয়ের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এক প্রতিবেদনে দেশের ২৪টি ট্রমা সেন্টারের সঙ্গে বাহুবলের কেন্দ্রটিকেও পূর্ণাঙ্গভাবে অচল থাকা কেন্দ্রগুলোর তালিকায় উল্লেখ করা হয়েছে। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, এসব প্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় জনবল ও সরঞ্জামের ঘাটতি রয়েছে।
বাহুবল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের একজন চিকিৎসক নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত ব্যক্তির ক্ষেত্রে দুর্ঘটনার পর দ্রুত চিকিৎসা পাওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জরুরি চিকিৎসাব্যবস্থায় দুর্ঘটনার পর প্রথম এক ঘণ্টাকে ‘গোল্ডেন আওয়ার’ হিসেবে গুরুত্ব দেওয়া হয়। এ সময়ে জীবন রক্ষাকারী চিকিৎসা দ্রুত শুরু করা গেলে গুরুতর আহত রোগীর বেঁচে থাকার সম্ভাবনা বাড়ে।
* ট্রমা সেন্টারটি নির্মাণে ব্যয় হয় প্রায় ৩ কোটি ১৮ লাখ টাকা। * উদ্দেশ্য ছিল সড়ক দুর্ঘটনায় আহতদের দ্রুত চিকিৎসা দেওয়া। * ভবনটি স্বাস্থ্য বিভাগে হস্তান্তর করা হয় ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে। * চিকিৎসকসহ জনবল ও সরঞ্জাম না থাকায় কার্যক্রম শুরু হয়নি।
কেটে গেছে এক যুগ
গণপূর্ত প্রকৌশল বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিদের দ্রুত চিকিৎসাসেবা দেওয়ার উদ্দেশ্যে ২০১০ সালে ফিজিক্যাল ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্টের আওতায় বাহুবলে ট্রমা সেন্টার নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের পাশে তিনতলা ভবনটির নির্মাণকাজ শেষ হয় ২০১৩ সালে। এতে ব্যয় হয় প্রায় ৩ কোটি ১৮ লাখ টাকা। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বর্তমান ফ্যাসিলিটি রেজিস্ট্রিতে প্রতিষ্ঠানটি ‘বাহুবল ২০ শয্যাবিশিষ্ট ট্রমা সেন্টার’ নামে তালিকাভুক্ত।
নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার পর ২০১৪ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি গণপূর্ত বিভাগ ভবনটি স্বাস্থ্য বিভাগের কাছে হস্তান্তরের উদ্যোগ নেয়। কিন্তু ভবনে বিদ্যুৎ, পানি ও গ্যাস-সংযোগসহ বিভিন্ন কাজ অসম্পূর্ণ থাকায় স্বাস্থ্য বিভাগ সেটি গ্রহণ করেনি। এরপর দুই বিভাগের মধ্যে চিঠি চালাচালিতেই কয়েক বছর পার হয়ে যায়। পরে অবকাঠামোগত কিছু কাজ শেষ করে ভবনটি স্বাস্থ্য বিভাগের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
২০২৩ সালের জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২২ সালের শেষ দিকে প্রায় ২৫ লাখ টাকা ব্যয়ে কিছু অবকাঠামোগত কাজ সম্পন্ন করার পর ২০২৩ সালের ২ ফেব্রুয়ারি ভবনটি আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করা হয়। ওই বছরের জুনে ভবনটির উদ্বোধনও করা হয়েছিল। কিন্তু প্রয়োজনীয় চিকিৎসক, নার্স, টেকনিশিয়ানসহ জনবল ও চিকিৎসা সরঞ্জাম না থাকায় পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব হয়নি।
ভবনে চলছে অন্য কার্যক্রম
গতকাল বুধবার সকালে বাহুবল ট্রমা সেন্টারে গিয়ে দেখা যায়, তিনতলা ভবনটির বেশির ভাগ কক্ষ ফাঁকা। কোথাও নিয়মিত রোগী ভর্তি বা চিকিৎসা কার্যক্রমের চিত্র নেই। নিচতলার একটি অংশে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের প্যাথলজি পরীক্ষার কার্যক্রম চলছে। দ্বিতীয় তলায় রাখা হয়েছে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কিছু পুরোনো সরঞ্জাম ও মালামাল। অন্যান্য কক্ষও বেশির ভাগ সময় ব্যবহার হচ্ছে না।
দীর্ঘদিন ভবনটি মূল উদ্দেশ্যে ব্যবহার না হওয়ায় এর অবকাঠামো ও বিভিন্ন সরঞ্জামের যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ২০২৬ সালের এপ্রিলে মাসে ওই ট্রমা সেন্টার ভবনে চুরির ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ভবনটিতে অন্য বিভাগের কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি কিছু মালামাল ও যন্ত্রপাতি চুরির অভিযোগের কথাও উঠে এসেছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, মহাসড়কের পাশে এত গুরুত্বপূর্ণ একটি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান বছরের পর বছর পূর্ণাঙ্গভাবে চালু না থাকায় সরকারি বিনিয়োগের সুফল থেকে মানুষ বঞ্চিত হচ্ছে। বাহুবল উপজেলার লামাতাসি গ্রামের আজমান আহমেদ বলেন, বাহুবল ও আশপাশের এলাকায় সড়ক দুর্ঘটনা হলে গুরুতর আহত রোগীকে দ্রুত চিকিৎসা দেওয়ার জন্য বাইরে পাঠাতে হয়। ট্রমা সেন্টারটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হলে মানুষের অনেক উপকার হতো।
স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ট্রমা সেন্টার চালুর জন্য শুধু ভবন থাকলেই হবে না; চিকিৎসক, নার্স, টেকনিশিয়ানসহ প্রয়োজনীয় জনবল, জরুরি চিকিৎসা সরঞ্জাম এবং সার্বক্ষণিক সেবা দেওয়ার প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। ২০২৬ সালের এপ্রিলের প্রতিবেদনে হবিগঞ্জের সিভিল সার্জনও প্রয়োজনীয় জনবল ও যন্ত্রপাতির ঘাটতির কথা জানিয়েছেন।
ট্রমা সেন্টারটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালুর জন্য প্রয়োজনীয় জনবল ও চিকিৎসা সরঞ্জামের চাহিদা জানিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে চিঠি দেওয়া হয়েছে বলে জানান বাহুবল উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা এম সোলায়মান খান। ট্রমা সেন্টারটি চালু করতে প্রয়োজনীয় জনবল ও চিকিৎসা সরঞ্জাম দরকার উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এ জন্য আমরা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কাছে চাহিদা জানিয়েছি। জনবল ও সরঞ্জামের অনুমোদন পাওয়া গেলে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা সম্পন্ন হলে কেন্দ্রটির পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম চালু করা সম্ভব হবে।’