উদ্বেগের মুহূর্তে মেনে চলুন ৩–৩–৩ নিয়ম
· Prothom Alo

উদ্বেগ জীবনের স্বাভাবিক অংশ। কিন্তু অতিরিক্ত উদ্বেগ যখন দৈনন্দিন জীবনকে ব্যাহত করে, তখন নিজেকে সামলানোর সহজ কিছু কৌশল কাজে আসতে পারে। তেমনই একটি হলো ৩-৩-৩ নিয়ম।
উদ্বেগ আমাদের স্বাভাবিক মানসিক প্রতিক্রিয়া। বিপদ সম্পর্কে সতর্ক হতে এবং কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে এটি আমাদের প্রস্তুত করে। তবে উদ্বেগ যখন অতিরিক্ত, অযৌক্তিক ও দীর্ঘস্থায়ী হয়ে ওঠে এবং স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় বাধা সৃষ্টি করে, তখন তা উদ্বেগজনিত ব্যাধিতে রূপ নিতে পারে।
Visit een-wit.pl for more information.
উদ্বেগের পেছনে সাধারণত একটি নয়, বরং একাধিক কারণ কাজ করে। তাই নিজের উদ্বেগের সম্ভাব্য কারণগুলো সম্পর্কে সচেতন হওয়া জরুরি।
উদ্বেগ কেন হয়?
জৈবিক কারণ
• মস্তিষ্কের বিভিন্ন নিউরোট্রান্সমিটারের ভারসাম্যে পরিবর্তন।
• পরিবারে উদ্বেগজনিত সমস্যার ইতিহাস থাকলে ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে।
• হরমোনের পরিবর্তন বা কিছু শারীরিক সমস্যা, যেমন থাইরয়েডের সমস্যা, মেনোপজ বা গর্ভাবস্থা।
মানসিক ও আচরণগত কারণ
• অতিরিক্ত চিন্তা করার অভ্যাস।
• অতীতের ট্রমা বা নেতিবাচক অভিজ্ঞতা।
• সবকিছু নিখুঁতভাবে করার প্রবণতা বা পারফেকশনিজম।
পরিবেশগত কারণ
• কাজের চাপ, আর্থিক সংকট বা সম্পর্কের টানাপোড়েনের মতো দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ।
• শৈশবে অনিরাপত্তা, অতিরিক্ত সমালোচনা বা প্রতিকূল অভিজ্ঞতা।
• অতিরিক্ত সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার, তথ্যের আধিক্য, পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব ও অতিরিক্ত ক্যাফেইন গ্রহণ।
• কিছু ওষুধ বা মাদকদ্রব্যের প্রভাব।
উদ্বেগ শরীরে কী প্রভাব ফেলে?
উদ্বেগ কেবল মন নয়, শরীরেও প্রভাব ফেলেউদ্বেগ শুধু মনেই প্রভাব ফেলে না, শরীরেও এর নানা প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। যেমন—
• হৃৎস্পন্দন বেড়ে যাওয়া বা বুক ধড়ফড় করা।
• শ্বাস নিতে অস্বস্তি হওয়া।
• মাথাব্যথা ও পেশিতে টান বা শক্তভাব।
• পেটের সমস্যা দেখা দেওয়া।
• ঘুমের সমস্যা বা অনিদ্রা।
• দুর্বলতা ও ক্লান্তি।
• খাওয়ার অভ্যাসে পরিবর্তন।
• মনোযোগ ও একাগ্রতা কমে যাওয়া।
• আত্মবিশ্বাস কমে যাওয়া এবং নিজেকে অযোগ্য মনে হওয়ার প্রবণতা।
দীর্ঘস্থায়ী উদ্বেগ মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে এবং বিষণ্নতার মতো সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। উদ্বেগের শারীরিক উপসর্গ যদি দীর্ঘদিন থাকে বা দৈনন্দিন জীবন ব্যাহত করে, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
কী এই ৩-৩-৩ নিয়ম?
উদ্বেগের তীব্র মুহূর্তে মনকে বর্তমান সময়ে ফিরিয়ে আনার জন্য ৩-৩-৩ নিয়ম একটি সহজ গ্রাউন্ডিং কৌশল। এতে আশপাশের পরিবেশ ও নিজের শরীরের দিকে মনোযোগ দেওয়া হয়।
নিয়মটি খুব সহজ—
১. তিনটি জিনিস দেখুন
আপনার আশপাশে থাকা তিনটি জিনিস খেয়াল করুন। যেমন—একটি ঘড়ি, একটি চেয়ার বা একটি ছবির ফ্রেম।
২. তিনটি শব্দ শুনুন
আশপাশের তিনটি আলাদা শব্দের দিকে মনোযোগ দিন। যেমন—ফ্রিজের গুঞ্জন, পাখির ডাক কিংবা পাতার খসখস শব্দ।
৩. শরীরের তিনটি অংশ নড়াচড়া করুন
শরীরের তিনটি অংশ ধীরে ও স্বাভাবিকভাবে নড়াচড়া করুন। যেমন—কাঁধ ঘোরানো, কবজি ঘোরানো কিংবা পায়ের আঙুল নাড়ানো।
এই তিনটি ধাপের মাধ্যমে মনকে উদ্বেগ তৈরি করা চিন্তার জগৎ থেকে সরিয়ে বর্তমান মুহূর্তের দৃশ্য, শব্দ ও শরীরের অনুভূতির দিকে আনা হয়।
যেভাবে অনুশীলন করবেন
তিনটি জিনিস দেখুন
চারপাশে তাকিয়ে তিনটি বস্তু বেছে নিন। সেগুলোর রং, আকার বা অবস্থান লক্ষ করুন। উদ্দেশ্য হলো মনকে নিজের চিন্তার ভেতর থেকে বের করে বাইরের পরিবেশে ফিরিয়ে আনা।
তিনটি শব্দ শুনুন
চোখ বন্ধ করার প্রয়োজন নেই। বরং আশপাশের শব্দগুলো মন দিয়ে শুনুন। দূরের কোনো গাড়ির শব্দ, ঘড়ির টিকটিক, ফ্যানের আওয়াজ—যেকোনো তিনটি আলাদা শব্দ শনাক্ত করুন।
শরীরের তিনটি অংশ নাড়ান
কাঁধ ধীরে ঘোরাতে পারেন, কবজি নাড়াতে পারেন কিংবা পায়ের আঙুল নাড়াতে পারেন। নড়াচড়ার সময় শরীরের অনুভূতির দিকে মনোযোগ দিন।
কেন কাজে লাগতে পারে?
উদ্বেগের সময় অন্য কোন শঙ্কায় নিজেকে জড়িয়ে ফেল উচিৎ নয়উদ্বেগের সময় আমাদের মন অনেক সময় ভবিষ্যৎ নিয়ে আশঙ্কা কিংবা অতীতের কোনো ঘটনা নিয়ে অনুশোচনার মধ্যে আটকে যায়। ৩-৩-৩ নিয়ম সেই চিন্তার প্রবাহ থেকে মনোযোগ সরিয়ে বর্তমান মুহূর্তের দিকে ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করতে পারে।
এ কারণে তীব্র উদ্বেগ, অস্থিরতা বা চাপের মুহূর্তে এটি একটি সহজ স্ব-সহায়ক কৌশল হিসেবে ব্যবহার করা যায়। জনসমক্ষে কথা বলা, সামাজিক পরিস্থিতিতে অস্বস্তি বা কোনো চাপপূর্ণ পরিস্থিতিতেও কেউ এটি প্রয়োগ করে দেখতে পারেন।
নিয়মিত অনুশীলনের মাধ্যমে নিজের অনুভূতি ও আশপাশের পরিবেশ সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো সম্ভব। তবে এটিকে উদ্বেগজনিত ব্যাধির চিকিৎসার বিকল্প হিসেবে দেখা উচিত নয়।
অন্য কৌশলের সঙ্গেও করতে পারেন
৩-৩-৩ নিয়মের পাশাপাশি আরও কিছু রিল্যাক্সেশন বা গ্রাউন্ডিং কৌশল অনুশীলন করা যেতে পারে। যেমন—
• গভীর ও ধীর শ্বাসপ্রশ্বাস।
• প্রগ্রেসিভ মাসল রিল্যাক্সেশন।
• মাইন্ডফুলনেস মেডিটেশন।
• নিয়মিত ঘুম ও শারীরিক পরিশ্রম।
• ক্যাফেইন গ্রহণ কমানো।
• প্রয়োজন হলে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—উদ্বেগকে উপেক্ষা না করে এর কারণ ও তীব্রতা বোঝার চেষ্টা করা। সহজ কিছু কৌশল তাৎক্ষণিকভাবে নিজেকে সামলাতে সাহায্য করতে পারে, কিন্তু দীর্ঘদিনের বা তীব্র উদ্বেগের ক্ষেত্রে পেশাদার সহায়তা নেওয়াই নিরাপদ।
লেখক: খাদ্য ও পথ্য আকুপ্রেশার বিশেষজ্ঞ; প্রধান নির্বাহী, প্রাকৃতিক নিরাময় কেন্দ্র
ছবি: পেকেজলসডটকম