সাহাবি খোবাইবের শাহাদত থেকে শিক্ষা

· Prothom Alo

সাহাবিরা সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য যে আত্মত্যাগের নজির স্থাপন করেছেন, তা মানবজাতির ইতিহাসে বিরল। এমন মহান আত্মত্যাগের অন্যতম উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হলেন খোবাইব ইবনে আদি (রা.)।

Visit iwanktv.club for more information.

তাঁর শাহাদাতের ঘটনা ইমানের দৃঢ়তা, নবীজির প্রতি সীমাহীন ভালোবাসা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগের অনন্য উদাহরণ।

বদরের বীর সৈনিক

তিনি ছিলেন মদিনার আনসার সাহাবিদের একজন। ইসলাম গ্রহণের পর তিনি নিজেকে সম্পূর্ণভাবে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের পথে উৎসর্গ করেন।

বদর যুদ্ধে সাহসিকতার সঙ্গে অংশগ্রহণ করেন এবং মুশরিকদের বিরুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ওই যুদ্ধে কোরাইশের কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি তাঁর হাতে নিহত হয়। 

ফলে মক্কার নেতাদের অন্তরে তাঁর প্রতি প্রবল প্রতিশোধস্পৃহা জন্ম নেয়। কিন্তু খোবাইব (রা.) কখনো শত্রুর প্রতিশোধের ভয়ে পিছিয়ে যাননি। তাঁর কাছে ইমানের মর্যাদা ছিল জীবনের চেয়েও মূল্যবান।

রাজি প্রান্তরে নির্মম বিশ্বাসঘাতকতা

হিজরির চতুর্থ বছরে, আদল ও কারা গোত্রের কয়েকজন ব্যক্তি ইসলাম সম্পর্কে জানার আগ্রহ প্রকাশ করে নবীজির কাছে কিছু সাহাবি পাঠানোর আবেদন জানায়। তাঁদের কথায় আস্থা রেখে নবীজি কয়েকজন সাহাবিকে দাওয়াতি মিশনে পাঠান।

কিন্তু এটি ছিল একটি গভীর ষড়যন্ত্র। ‘রাজি’ নামক স্থানে পৌঁছার পর বিশ্বাসঘাতকেরা হঠাৎ সাহাবিদের ওপর হামলা চালান। কয়েকজন সাহাবি সেখানেই শাহাদতবরণ করেন। 

খোবাইব (রা.) এবং আরও কয়েকজনকে জীবিত বন্দী করা হয়। পরে তাঁদের মক্কার বাজারে বিক্রি করে দেওয়া হয়, যাতে বদরের নিহত ব্যক্তিদের স্বজনেরা প্রতিশোধ নিতে পারেন।

যে নারী তাঁকে পাহারা দিতেন, তিনি একদিন দেখলেন খোবাইবের হাতে তাজা আঙুরের থোকা। অথচ তখন মক্কায় আঙুরের মৌসুম ছিল না এবং বন্দী অবস্থায় তাঁর কাছে এমন ফল পৌঁছানোরও কোনো সুযোগ ছিল না।
সাহাবি খুজায়মার একটি সাক্ষ্যের মূল্য

বন্দিজীবনেও অবিচল ইমান

বন্দী অবস্থায়ও খোবাইবের ইমানে কোনো ভাটা পড়েনি। তিনি নিয়মিত ইবাদত-বন্দেগিতে মশগুল থাকতেন। তাঁর চরিত্র, ধৈর্য ও আল্লাহর প্রতি নির্ভরতা বন্দীকারীদেরও মুগ্ধ করেছিল।

হাদিসের বর্ণনায় এসেছে, যে নারী তাঁকে পাহারা দিতেন, তিনি একদিন দেখলেন খোবাইবের হাতে তাজা আঙুরের থোকা। অথচ তখন মক্কায় আঙুরের মৌসুম ছিল না এবং বন্দী অবস্থায় তাঁর কাছে এমন ফল পৌঁছানোরও কোনো সুযোগ ছিল না। এতে তিনি বুঝতে পারেন, আল্লাহ-তাআলা তাঁর এই নেক বান্দাকে বিশেষ অনুগ্রহে রিজিক দান করছেন।

মৃত্যুর আগে দুই রাকাত নামাজ

অবশেষে সেই দিন উপস্থিত হলো, যেদিন মুশরিকরা তাঁকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে নিয়ে গেল। মৃত্যুদণ্ডের আগে খোবাইব (রা.) তাঁদের কাছে দুই রাকাত নামাজ আদায়ের অনুমতি চান। তাঁরা অনুমতি দিলে তিনি একাগ্রতার সঙ্গে নামাজ আদায় করেন।

নামাজ শেষে তিনি বলেন, ‘তোমরা যদি মনে না করতে যে আমি মৃত্যুভয়ে নামাজ দীর্ঘ করছি, তাহলে আমি আরও দীর্ঘ করতাম।’

এই ঘটনায় একজন মুমিনের প্রকৃত পরিচয় ফুটে ওঠে। মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও তাঁর হৃদয় আল্লাহর স্মরণে নিবিষ্ট ছিল। মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে দুই রাকাত নামাজ আদায়ের সুন্নাহর সূচনা এই ঘটনাকে কেন্দ্র করেই।

৪ ধনী সাহাবি যেভাবে বদলে দেন মদিনার অর্থনীতিখোবাইব ইবনে আদি (রা.)আল্লাহর শপথ, আমি এটাও চাই না যে আমি আমার পরিবারের মাঝে নিরাপদে থাকি আর রাসুলের পায়ে একটি কাঁটাও ফুটুক।

রাসুলের প্রতি অতুলনীয় ভালোবাসা

মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে কোরাইশ নেতারা তাঁকে মানসিকভাবে দুর্বল করার চেষ্টা করল। তারা বলল, ‘তুমি কী চাও, তোমার পরিবর্তে মুহাম্মদ আমাদের হাতে থাকবে আর তুমি নিরাপদে তোমার পরিবারের কাছে ফিরে যাবে?’

খোবাইব (রা.) দৃঢ় কণ্ঠে উত্তর দিলেন, ‘আল্লাহর শপথ, আমি এটাও চাই না যে আমি আমার পরিবারের মাঝে নিরাপদে থাকি আর রাসুলের পায়ে একটি কাঁটাও ফুটুক।’

এটি ছিল নবীপ্রেমের এমন উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত, যার তুলনা ইতিহাসে খুব কমই পাওয়া যায়। নিজের জীবনের বিনিময়ে রাসুলের সামান্য কষ্টও তিনি সহ্য করতে প্রস্তুত ছিলেন না। প্রকৃত ইমান কেমন হয়, এই একটি উত্তরই তার জীবন্ত দৃষ্টান্ত।

শাহাদতের আগে হৃদয়স্পর্শী দোয়া

শাহাদতের পূর্বমুহূর্তে খোবাইব (রা.) আল্লাহর কাছে দোয়া করেন। তিনি আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনা করেন এবং নিজের সালাম যেন নবীজির কাছে পৌঁছে যায়, সেই প্রার্থনা করেন। 

আল্লাহ-তাআলা তাঁর সালাম নবীজির কাছে পৌঁছে দেন। এরপর তিনি ধৈর্য ও আত্মসম্মানের সঙ্গে শাহাদত বরণ করেন। শত্রুরা তাঁর দেহকে হত্যা করতে পেরেছিল, কিন্তু তাঁর ইমানকে বিন্দুমাত্র নত করতে পারেনি।

আমাদের জন্য শিক্ষা

খোবাইব ইবনে আদির শাহাদতের ঘটনা সব যুগের মুসলমানের জন্য অসংখ্য শিক্ষার উৎস। আমাদের জন্য শিক্ষণীয় কয়েকটি বিষয় হলো—

১. ইমানের দৃঢ়তা : সত্যিকারের মুমিন বিপদের সময়ও বিশ্বাস হারান না। মৃত্যুর মুখেও খোবাইব (রা.) আল্লাহর ওপর আস্থা রেখেছিলেন।

২. নবীপ্রেম ইমানের অপরিহার্য অংশ : নবীজির প্রতি তাঁর ভালোবাসা আমাদের শেখায়, নবীপ্রেম শুধু আবেগ নয়, এটি আনুগত্য ও আত্মত্যাগের নাম।

৩. ইবাদতের গুরুত্ব : জীবনের শেষ মুহূর্তেও তিনি নামাজকে প্রাধান্য দিয়েছেন। এটি প্রমাণ করে, মুমিনের জীবনে ইবাদতের গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি।

৪. বিপদে ধৈর্য : বন্দিত্ব, অপমান কিংবা মৃত্যুর হুমকি কোনো কিছুই তাঁর ধৈর্যচ্যুতি ঘটাতে পারেনি। ধৈর্য মুমিনের উত্তম গুণ।

৫. দাওয়াতের পথে আত্মত্যাগ : ইসলামের দাওয়াত কখনো ত্যাগ ও কোরবানির মাধ্যমেও প্রতিষ্ঠিত হয়। খোবাইব (রা.) সেই শিক্ষাই দিয়ে গেছেন।

৬. পরকালকে প্রাধান্য দেওয়া : দুনিয়ার সাময়িক জীবন রক্ষার জন্য তিনি ইমান বিসর্জন দেননি। বরং চিরস্থায়ী সফলতার জন্য শাহাদাতকে বেছে নিয়েছিলেন।

(তথ্যসূত্র: সহিহ বুখারি, হাদিস: ৪০৮৬)

  • ফয়জুল্লাহ রিয়াদ: মুহাদ্দিস, জামিয়া আরাবিয়া দারুস সুন্নাহ রাজাবাড়ী, ঢাকা

বিশ্বস্ত সাহাবি সেনাপতি আবু উবাইদা

Read full story at source