টেকসই উদ্ভাবনেই সিরামিকশিল্পের ভবিষ্যৎ
· Prothom Alo

দেশের সিরামিকশিল্প বর্তমানে নানামুখী চ্যালেঞ্জ ও রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই খাতের সম্ভাবনা, আকিজ সিরামিকসের নানা উদ্ভাবন, পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে প্রথম আলোর সঙ্গে কথা বলেছেন প্রতিষ্ঠানটির মহাব্যবস্থাপক (বিক্রয় ও বিপণন) মোহাম্মদ আশরাফুল হক। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন শামসুল হক মো. মিরাজ।
আবাসন ও নির্মাণশিল্পের বর্তমান পরিস্থিতিতে সিরামিক খাতের সামগ্রিক বাজার ও চ্যালেঞ্জগুলো কী?
Visit solvita.blog for more information.
মোহাম্মদ আশরাফুল হক: দেশের সিরামিকশিল্প একটি গুরুত্বপূর্ণ রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। নগরায়ণ ও আবাসন চাহিদা বড় সম্ভাবনা তৈরি করলেও বিনিয়োগের ধীরগতি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার প্রভাব বাজারে পড়ছে। প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুতের সরবরাহ, জ্বালানি ব্যয় ও আমদানিনির্ভর কাঁচামাল। সিরামিক উৎপাদনে গ্যাসের চাপ ওঠানামা করলে পণ্যের মান ও ব্যয়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। এই বাস্তবতায় সম্পদের কার্যকর ব্যবহার ও টেকসই উন্নয়ন এখন আর ঐচ্ছিক বিষয় নয়। তাই আকিজ সিরামিকস উৎপাদনে জ্বালানিসাশ্রয়ী প্রযুক্তি, বর্জ্য-তাপ পুনর্ব্যবহার, সৌরবিদ্যুৎ এবং পানি পুনর্ব্যবহারের মতো উদ্যোগে গুরুত্ব দিচ্ছে। ভবিষ্যতে শুধু দাম নয়; বরং মান, নকশা, প্রযুক্তি ও গ্রাহক অভিজ্ঞতার সমন্বয়েই এই ব্র্যান্ড এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে।
ক্রেতাদের পরিবর্তিত রুচির সঙ্গে তাল মেলাতে পণ্যের বৈচিত্র্যে কী ধরনের উদ্ভাবন আনছেন?
মোহাম্মদ আশরাফুল হক: এখন ক্রেতা শুধু টাইলস কিনছেন না, তিনি নিজের ব্যক্তিত্বের সঙ্গে মানানসই স্পেস তৈরি করতে চাইছেন। তাই আমাদের উদ্ভাবনের কেন্দ্রে রয়েছে নকশা, সারফেস, আকার, প্রয়োগ ও স্মার্ট উপকরণের ব্যবহার। আমরা বিভিন্ন আকারের ওয়াল ও ফ্লোর টাইলসের পাশাপাশি ম্যাট, পলিশড ও টেক্সচার্ড সারফেস নিয়ে কাজ করছি। স্থাপনায় এখন মার্বেল, কাঠের আদলে নতুন নকশায় টাইলস তৈরি হচ্ছে। তবে উদ্ভাবন মানে শুধু দেখতে নতুন হওয়া নয়; উৎপাদনে জ্বালানি ও উপকরণের ব্যবহার কমিয়ে কীভাবে দীর্ঘ মেয়াদে আরও টেকসই পণ্য তৈরি করা যায়, সেটিও উদ্ভাবনের অংশ। আমাদের লক্ষ্য আন্তর্জাতিক প্রবণতার সঙ্গে দেশের আবহাওয়া, পরিবেশ ও জীবনযাত্রার সমন্বয় ঘটানো।
একসময় ব্যাপক আমদানিনির্ভরতা ছিল। দেশেই আন্তর্জাতিক মানের পণ্য উৎপাদনে আকিজের সফলতা কীভাবে এল?
মোহাম্মদ আশরাফুল হক: আমাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পণ্যটি দেশে তৈরি হলেও তার মানদণ্ড হতে হবে আন্তর্জাতিক। ২০১২ সাল থেকে আকিজ সিরামিকস স্বয়ংক্রিয় আধুনিক প্রযুক্তি, মান নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণায় ধারাবাহিকভাবে বিনিয়োগ করে আসছে। কাঁচামাল নির্বাচন থেকে শুরু করে ফিনিশিং পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করা হয়। ফলে যেসব নকশা ও প্রযুক্তির জন্য একসময় ক্রেতারা আমদানীকৃত টাইলসের ওপর নির্ভর করতেন, তা এখন দেশেই তৈরি হচ্ছে। এর স্বীকৃতি হিসেবে আমরা ২০১৯ সাল থেকে টানা ‘বেস্ট ব্র্যান্ড অ্যাওয়ার্ড’ এবং সম্প্রতি ‘সুপারব্র্যান্ডস’ স্বীকৃতি পেয়েছি। আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা এখন শুধু পণ্যের মানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এটি পরিবেশগতভাবে কতটা দায়িত্বশীল, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। তাই আমাদের প্রযুক্তিতে বিনিয়োগের বড় অংশই জ্বালানি সাশ্রয় ও বর্জ্য হ্রাসের সঙ্গে যুক্ত।
বর্তমান পরিস্থিতিতে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ ও খাতের টেকসই প্রবৃদ্ধিতে নীতিনির্ধারকদের কাছে প্রত্যাশা কী?
মোহাম্মদ আশরাফুল হক: সিরামিক একটি জ্বালানি ও মূলধননির্ভর শিল্প। এখানে শুধু গ্যাস পাওয়া নয়, স্থিতিশীল চাপ নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। তবে শিল্প হিসেবে জ্বালানির দক্ষ ব্যবহার নিশ্চিত করাও আমাদের দায়িত্ব। আকিজ সিরামিকস জ্বালানিসাশ্রয়ী প্রযুক্তি ব্যবহার করে দৈনিক প্রায় ছয় লাখ ঘনফুট গ্যাস সাশ্রয় করছে এবং কার্বন নিঃসরণ ১৩ শতাংশ কমিয়েছে। সৌরবিদ্যুতের পাশাপাশি বর্জ্য পানি ও কঠিন বর্জ্য আবার ব্যবহার করা হচ্ছে। নীতিনির্ধারকদের কাছে আমাদের প্রত্যাশা—দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নীতি, নবায়নযোগ্য শক্তিতে উৎসাহ এবং পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি আমদানিতে নীতিগত সহায়তা। পাশাপাশি কাঁচামালের যৌক্তিক শুল্ককাঠামো ও সহজ আমদানিপ্রক্রিয়া প্রয়োজন। সবচেয়ে জরুরি হলো নীতির ধারাবাহিকতা। কারণ, এ খাতে বিনিয়োগ ১০ থেকে ২০ বছরের পরিকল্পনা করেই নেওয়া হয়।
নতুন বাড়ি নির্মাণ বা ঘর পুনঃসজ্জার ক্ষেত্রে ক্রেতাদের জন্য আকিজের সুবিধা ও অন্দরসজ্জা নিয়ে আপনার পরামর্শ কী?
মোহাম্মদ আশরাফুল হক: আকিজ সিরামিকসের অন্যতম সুবিধা হলো ক্রেতারা ঘরের মেঝে, দেয়াল থেকে শুরু করে রান্নাঘর, বাথরুম, সিঁড়ি, পার্কিং বা বাণিজ্যিক স্পেসের জন্য একই ব্র্যান্ডে উপযুক্ত সমাধান পান। অন্দরসজ্জার ক্ষেত্রে আমার পরামর্শ হলো—সবার আগে ব্যবহার, তারপর সৌন্দর্য। বাথরুমে শুধু সৌন্দর্যের চেয়ে পিচ্ছিল না হওয়ার বিষয়টি দেখা উচিত। ছোট জায়গায় সঠিক রং ও বড় আকারের টাইলস ব্যবহার করলে জায়গাটি বড় দেখায়। পুরো বাড়িতে অতিরিক্ত নকশার বৈচিত্র্য না রেখে সামঞ্জস্যপূর্ণ রং রাখলে তা বেশ রুচিশীল হয়। টাইলস দীর্ঘদিনের বিনিয়োগ, তাই শুধু বর্তমান ট্রেন্ড নয়; স্থায়িত্ব, রক্ষণাবেক্ষণ ও কার্যকারিতা বিবেচনায় সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।
সিরামিক খাত নিয়ে আপনাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও সম্ভাবনাগুলো কী?
মোহাম্মদ আশরাফুল হক: আমরা সিরামিককে শুধু নির্মাণসামগ্রী নয়, আধুনিক স্থাপত্য ও জীবনযাত্রার অংশ হিসেবে দেখি। ভবিষ্যতে আমাদের পণ্য উন্নয়নের বড় ক্ষেত্র হবে বড় আকারের টাইলস, উন্নত সারফেস প্রযুক্তি ও জ্বালানিসাশ্রয়ী উৎপাদন। স্থপতি ও ইন্টেরিয়র ডিজাইনারদের কাজের পরিসর বাড়াতে আমরা ৯০০x১৮০০ মিলিমিটারের মতো বড় আকারের টাইলস নিয়ে কাজ করছি। পাশাপাশি উপাদানের যথাযথ ব্যবহারের মাধ্যমে কাঁচামাল ও পরিবহন ব্যয় কমানোর সম্ভাবনা দেখছি। বর্জ্য তাপ পুনরুদ্ধার ও সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়িয়ে উৎপাদনপ্রক্রিয়াকে আরও পরিবেশবান্ধব করাই আমাদের আগামী দিনের লক্ষ্য।
আন্তর্জাতিক বাজারে সক্ষমতা বাড়াতে এবং স্থানীয় ঐতিহ্যের সুনাম ধরে রাখতে বিশেষ কোনো পরিকল্পনা আছে কি?
মোহাম্মদ আশরাফুল হক: উদ্ভাবন শুধু নতুন রং বা আকার নয়, এটি মানুষের বাস্তব প্রয়োজনের সমাধান। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের জন্য তৈরি আকিজ সিরামিকসের ‘ব্রেইল টাইলস’–এর বড় উদাহরণ, যা ইনোভেশন অ্যাওয়ার্ড পেয়েছে। আমাদের স্থাপত্য, প্রকৃতি, আবহাওয়া ও হস্তশিল্প থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে নিজস্ব নকশার ভাষা তৈরির বড় সুযোগ রয়েছে, যার উপস্থাপনা হবে আন্তর্জাতিক মানের। ভবিষ্যতে গবেষণা, ডিজিটাল নকশা এবং স্থপতিদের সঙ্গে সমন্বয়ে আমরা আরও জোর দেব। আমাদের লক্ষ্য এমন এক অবস্থানে পৌঁছানো, যেখানে বিশ্ববাজার বাংলাদেশের সিরামিককে শুধু দামের জন্য নয়; বরং মান, নকশা, উদ্ভাবন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক টেকসই উন্নয়নের জন্য চিনবে।