স্মৃতির উঠান

· Prothom Alo

আশরাফ আলী চোখ বুজলেন। মনে পড়ে গেল চল্লিশ বছর আগের কথা। জীবনটা তো খুব বড় ছিল না; অথচ কত হাজারো কথা, কত হিসাব-নিকাশ! একটা ছোট মুদিদোকান চালিয়ে তিনটি সন্তানকে বড় করেছিলেন।

গাছের পাতাগুলো আজকাল ঝরে পড়ার আগেই শুকিয়ে কালচে হয়ে যায়। বুড়ো আশরাফ আলী উঠানের আমগাছটার নিচে একটা পুরোনো কাঠের চেয়ারে হেলান দিয়ে ভাবছিলেন।
রাত এখন কটা হবে? হাতঘড়ির সেকেন্ডের কাঁটাটা থেমে গেছে অন্তত বছর দশেক আগে। তবু অভ্যাসবশত তিনি বারবার হাতের কবজির দিকে তাকান। চারপাশের বাতাসে আজ কোনো কড়া কেমিক্যালের গন্ধ নেই, নেই কোনো অচেনা শহরের কোলাহল। শুধু আছে ভিজে মাটির সোঁদা গন্ধ আর বছরের পর বছর জমে থাকা এক নিদারুণ একাকিত্ব।

রান্নাঘর থেকে হুট করেই এক গ্লাস পানি হাতে বেরিয়ে এল মেজ মেয়ে শিউলি।
‘বাবা, এত রাতে বাইরে কেন বসে আছ? গায়ে তো আবার ঠান্ডা লেগে যাবে।’
আশরাফ আলী একটু হাসার চেষ্টা করলেন। তার গলায় একটা খসখসে শব্দ হলো—‘আজকের রাতটা কেমন যেন শান্ত রে, শিউলি। মনে হচ্ছে আকাশটা অনেক নিচে নেমে এসেছে।’
শিউলি বাবার পাশে ঘাসের ওপর হাঁটু মুড়ে বসল। বাবার হাতের ওপর নিজের হাতটা রাখল সে। সে হাত বড্ড শীতল, একদম খসখসে—‘তুমি তো সব সময়ই শেষ রাতের আকাশ ভালোবাসতে, বাবা। মা বলত, তুমি নাকি তরুণ বয়সে রাতের পর রাত জেগে নদীর পাড়ে বসে থাকতে।’

Visit playerbros.org for more information.

আশরাফ আলী চোখ বুজলেন। মনে পড়ে গেল চল্লিশ বছর আগের কথা। জীবনটা তো খুব বড় ছিল না; অথচ কত হাজারো কথা, কত হিসাব-নিকাশ! একটা ছোট মুদিদোকান চালিয়ে তিনটি সন্তানকে বড় করেছিলেন। বড় ছেলেটা এখন বিদেশে, ছোটটা শহরের বড় ডাক্তার। আর মেজ মেয়ে শিউলি—যে জন্ম থেকেই কিছুটা শারীরিক প্রতিবন্ধকতার শিকার, সে সারা জীবন এই গাঁয়ের ভিটেতেই রয়ে গেল।
লোকেরা বলত, আশরাফ আলী নিজের সন্তানদের জন্য অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছেন। কিন্তু তিনি নিজে জানেন, ত্যাগের ভেতরেও একটা ভীষণ সূক্ষ্ম স্বার্থপরতা লুকিয়ে থাকে।
‘শিউলি?’
‘বলো বাবা।’
‘বড় ছেলের কলেজের ফি জোগাড় করতে গিয়ে তোদের মায়ের একমাত্র সোনার বালাটা বিক্রি করে দিয়েছিলাম, মনে আছে? তোদের মা সেদিন কিচ্ছু বলেনি। শুধু বলেছিল, “ছেলে বড় মানুষ হোক।” কিন্তু আমি জানতাম, ওই বালাটা ওর মায়ের স্মৃতি ছিল। আমি কোনো দিন তাকে ওই বালাটা বানিয়ে ফেরত দিতে পারিনি।’

শিউলি মৃদু হেসে বাবার চাদরটা গায়ে ভালো করে জড়িয়ে দিল—‘মা তো কোনো দিন ও নিয়ে অনুযোগ করেনি, বাবা। মা জানত তুমি কতটা কষ্ট করতে।’
‘অনুতাপ অন্য জায়গায় রে মা’, আশরাফ আলীর কণ্ঠ এবার কেঁপে উঠল। ‘মানুষ যখন চলে যায়, তখন বোঝা যায় তার বেঁচে থাকার সময়টায় আমরা কতখানি অনুপস্থিত ছিলাম। আমরা ভাবি টাকা দিয়ে, সংসার চালিয়ে দায়িত্ব শেষ হলো। কিন্তু আসল যে পাওনা—একটু সময়, একটু পাশে বসা—সেটাই দেওয়া হয় না।’

কাছেই কোথাও একটা রাতজাগা পাখি ডেকে উঠল। বাতাসে আমগাছের পাতাগুলো খসখস শব্দ করে ঝরে পড়ল কয়েকটা।
আশরাফ আলী শিউলির দিকে তাকালেন। তার চোখের কোণে এক ফোঁটা জল জমেছে, যা রাতের আবছা আলোতেও চকচক করছে।
‘তোদের মা চলে যাওয়ার পর আমি খুব একলা হয়ে গিয়েছিলাম। আজ মনে হচ্ছে, আমারও তো সময় হয়ে এল।’
‘ওসব কথা বলো না তো, বাবা। একটু ভেতরে চলো, বিশ্রাম নেবে।’ শিউলি বলল।
‘না রে মা, এই বেশ আছি। তুই বরং গিয়ে একটু ঘুমা। আমি আর কিছুক্ষণ আলোটা দেখি।’
শিউলি কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইল। তারপর নিঃশব্দে উঠে ঘরের দিকে হেঁটে গেল।

শ্রাবণের ধনুভাঙা পণ

আশরাফ আলী নিশ্বাস ফেললেন। তার বুকের ভেতরটা আজ ভারী হালকা লাগছে। জীবনের সব দেনা–পাওনা, সব ব্যস্ততা আর অপরাধবোধ যেন এই রাতের নিঃশব্দতায় ধুয়েমুছে যাচ্ছে। প্রকৃতির একটাই নিয়ম—যে আলো একসময় জ্বলেছিল, তাকে এক দিন নিভে যেতেই হয়। শুধু রেখে যায় কিছু না-বলা কথা, আর সম্পর্কের সুতোর টান।

পরদিন সকালে যখন ভোরের প্রথম আলো আমগাছের ওপর এসে পড়ল, গ্রামের পথ ধরে হেঁটে আসা চাদর গায়ে এক বৃদ্ধ প্রতিবেশী ডাক দিলেন, ‘আশরাফ ভাই, জাগলেন নাকি?’
চেয়ারে আশরাফ আলী তেমনই হেলান দিয়ে বসে ছিলেন। হাত দুটি কোলে রাখা, চোখ দুটো শান্তভাবে বোজা। মুখে এক অদ্ভুত প্রশান্তি।
বাড়ি থেকে কোনো শিউলি বের হয়ে এল না। কারণ, সেই পলিথিন মোড়ানো ছোট ঘরটিতে শিউলি তো গত বছরই শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেছিল ব্যাধি সহ্য করতে না পেরে।
আশরাফ আলী সারা রাত কোনো অলৌকিক কায়দায় নয়, নিজের জমে থাকা ভালোবাসার স্মৃতির সঙ্গেই কথা বলছিলেন। প্রবীণ বয়সের নিদারুণ একাকিত্বে মানুষ যখন পুরো পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, তখন কেবল মনের ভেতরের মানুষগুলোই তার শেষ কথা শোনার জন্য বেঁচে থাকে।

দূর থেকে ফজরের আজানের সুর ভেসে এল। বাতাসে আর কোনো কথা রইল না, রয়ে গেল কেবল এক নীরব অশ্রুজল আর নিখাদ অনুভূতির সুর।

বন্ধু, রায়গঞ্জ বন্ধুসভা

Read full story at source