বাংলাদেশের স্টুডিও থেকে যুক্তরাজ্যের মঞ্চে আরাফাত কীর্তি
· Prothom Alo

মঞ্চে আলো জ্বলে ওঠে, শিল্পী গান শুরু করেন। দর্শকের মনোযোগ তখন মঞ্চের দিকেই। কিন্তু সেই কণ্ঠ, বাদ্যযন্ত্র আর পুরো পরিবেশনার শব্দ শ্রোতার কাছে ঠিক কীভাবে পৌঁছাবে? তার বড় একটি অংশ নির্ধারিত হয় মঞ্চের বাইরে বসে থাকা আরেকজনের হাতে। আরাফাত কীর্তি সেই নেপথ্যেরই একজন। মিউজিক প্রডাকশন, মিক্সিং-মাস্টারিং থেকে শুরু করে লাইভ সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং, সংগীতের শব্দ নির্মাণের বিভিন্ন ক্ষেত্রেই কাজ করছেন তিনি। বাংলাদেশে শুরু হওয়া সেই পেশাগত যাত্রা এখন বিস্তৃত হয়েছে যুক্তরাজ্যের মঞ্চেও।
স্টুডিওতে থেকেই শুরু
আরাফাত কীর্তির সংগীত নিয়ে কাজের শুরু মূলত স্টুডিওতে। মিউজিক প্রডিউসার এবং মিক্সিং ও মাস্টারিং ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কাজ করতে গিয়ে গানের শব্দকে শুধু কারিগরি দিক থেকে নয়, সংগীতের অংশ হিসেবেই দেখতে শুরু করেন তিনি। বিভিন্ন গান, অ্যালবাম ও অরিজিনাল সাউন্ডট্র্যাকের সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা তাঁকে শিখিয়েছে, একটি রেকর্ডিংকে বেশি চকচকে করে তোলাই সব নয়। কণ্ঠের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য, বাদ্যযন্ত্রের স্বাভাবিক ধ্বনি এবং সংগীতের আবেগ অক্ষুণ্ন রেখেও সমকালীন প্রডাকশনের উপযোগী একটি সাউন্ড তৈরি করা যায়। এই ভাবনাই পরে তাঁর লাইভ সাউন্ডের কাজেও প্রভাব ফেলেছে।
Visit extract-html.com for more information.
গন্তব্য মঞ্চ
স্টুডিওতে একটি গান নিয়ে বারবার কাজ করার সুযোগ থাকে। কিন্তু কনসার্টে তা সম্পূর্ণ আলাদা। সেখানে সিদ্ধান্ত ও তার প্রতিক্রিয়া তাৎক্ষণিক। একই মঞ্চে কণ্ঠ, তবলা, হারমোনিয়াম, গিটার, ড্রামস কিংবা অন্য কোনো অ্যাকুস্টিক ও ইলেকট্রনিক বাদ্যযন্ত্র যখন একসঙ্গে বাজছে, তখন প্রতিটির আলাদা চরিত্র বজায় রেখে একটি সামগ্রিক শব্দ তৈরি করতে হয়। আরাফাতের কাছে এ জায়গাটিই লাইভ সাউন্ডের সবচেয়ে সৃজনশীল অংশ। তাঁর ভাষায়, ভালো লাইভ সাউন্ড শুধু কতটা জোরে বা কতটা পরিষ্কার শোনা যাচ্ছে, তা নয়, বরং শিল্পী মঞ্চে যে অনুভূতি তৈরি করছেন, সেটি শ্রোতার কাছে কতটা অনুভূত হচ্ছে, সেটাই গুরুত্বপূর্ণ।
দক্ষিণ এশিয়ার সংগীত এবং তার চ্যালেঞ্জ
দক্ষিণ এশিয়ার সংগীত নিয়ে কাজের ক্ষেত্রে আরও কিছু আলাদা বাস্তবতা রয়েছে। কণ্ঠনির্ভর পরিবেশনা, সূক্ষ্ম ডায়নামিকাল অ্যাকুস্টিক বাদ্যযন্ত্রের স্বাভাবিক টোন অনেক সময় বড় ভেন্যুর আধুনিক সাউন্ড সিস্টেমে ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। এই জায়গাতেই নিজের স্টুডিও অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করেন আরাফাত কীর্তি। আধুনিক ডিজিটাল অডিও প্রযুক্তি ব্যবহার করেও সংগীতের স্বাভাবিক উষ্ণতা ও বৈশিষ্ট্য ধরে রাখা অন্যতম লক্ষ্য।
যুক্তরাজ্যের মঞ্চ
বাংলাদেশে কাজের অভিজ্ঞতার পর যুক্তরাজ্যে এসে আরাফাতের কীর্তির পেশাগত কাজ নতুন পরিসর পায়। বর্তমানে আনন্দধারা আর্টস, পিন্রো মিডিয়াসহ আরও বিভিন্ন আয়োজক এর ভিন্নধর্মী আয়োজনে লাইভ সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কাজ করছেন তিনি। লন্ডনে বাংলাদেশের ব্যান্ড সোলস এবং চিরকুট-এর কনসার্ট তিনি সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে যুক্ত ছিলেন আরাফাত।এ ছাড়া ভারতীয় বাংলা গানের শিল্পী শ্রীকান্ত আচার্য এবং ভজন ও গজলশিল্পী অনুপ জালোটাসহ দক্ষিণ এশিয়ার পরিচিত শিল্পীদের যুক্তরাজ্যের কনসার্টেও তিনি নিয়মিত কাজ করেছেন। ভিন্ন ধরনের শিল্পী, ভিন্ন ভেন্যু এবং ভিন্ন সংগীতধারার সঙ্গে কাজ করার এই অভিজ্ঞতা তাঁর লাইভ সাউন্ডের কাজকেও ধীরে ধীরে আরও বিস্তৃত করেছে।একটি ব্যান্ড কনসার্টের শব্দ পরিকল্পনা যেমন একরকম, তেমনি কণ্ঠ ও অ্যাকুস্টিক বাদ্যযন্ত্রনির্ভর অনুষ্ঠানের প্রয়োজন সম্পূর্ণ আলাদা। আরাফাত কীর্তি মনে করেন, সেই পার্থক্য বুঝে প্রতিটি পরিবেশনার জন্য আলাদাভাবে সাউন্ড তৈরি করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
প্রযুক্তি, না সংগীত?
সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের কাজে প্রযুক্তি অপরিহার্য। আধুনিক সাউন্ড সিস্টেম ছাড়া বড় মাপের প্রডাকশন এখন কল্পনা করা কঠিন। তবে আরাফাত কীর্তি প্রযুক্তি নির্ভরতায় বিশ্বাস করেন না। তাঁর কাছে প্রযুক্তি মূলত শিল্পীর ভাবনা ও শ্রোতার অভিজ্ঞতার মাঝখানের একটি মাধ্যম।এই দর্শনের পেছনে রয়েছে তাঁর দুই ধরনের অভিজ্ঞতা। একদিকে স্টুডিওতে দীর্ঘ সময় কাজের অভিজ্ঞতা, অন্যদিকে মঞ্চে তাৎক্ষণিক কাজের অভিজ্ঞতা। এই দুই অভিজ্ঞতার সমন্বয়েই নিজের কাজের একটি স্বতন্ত্র পদ্ধতি তৈরি করছেন তিনি।
দুই ভাই— আরাফাত কীর্তি এবং আরাফাত মহসীন। ছবি: প্রথম আলোসামনে আরও বড় পরিসর
যুক্তরাজ্যে দক্ষিণ এশিয়ার সংগীত ও সাংস্কৃতিক আয়োজনের সঙ্গে ধারাবাহিকভাবে যুক্ত হওয়ার ফলে আরাফাতে কীর্তির কাজ এখন বাংলাদেশের পরিচিত পরিসরের বাইরে নতুন শ্রোতা, শিল্পী ও আয়োজকদের কাছে পৌঁছাচ্ছে। তবে তাঁর কাছে আন্তর্জাতিক পরিসরে কাজ করার অর্থ শুধু বড় ভেন্যু বা পরিচিত শিল্পীর সঙ্গে কাজ করা নয়। বরং দক্ষিণ এশিয়ার সংগীতের নিজস্ব শব্দ ও আবেগকে অক্ষুণ্ন রেখে আন্তর্জাতিক মানের সমকালীন প্রডাকশনের সঙ্গে তার সৃষ্টিশীলতার সমন্বয় ঘটানোই তাঁর আগ্রহের জায়গা। বাংলাদেশের স্টুডিও থেকে যুক্তরাজ্যের মঞ্চে আরাফাত কীর্তির যাত্রা তাই শুধু একজন সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ারের নয়। এটি একই সঙ্গে নিজের একটি শব্দভাষা খুঁজে নেওয়ার চলমান প্রচেষ্টা।মঞ্চে হয়তো তাঁকে দেখা যায় না। কিন্তু শিল্পী ও শ্রোতার মধ্যে শব্দের যে সংযোগ, সেখানেই তিনি নিজের পরিচয় ও জায়গা তৈরি করে চলেছেন।