কবি গরিব ফকিরের ন্যারেটিভ

· Prothom Alo

বয়স হয়ে গেছে। মরে যাব। কম মানুষের মুখ দেখলাম। কম অমানুষের মুখ দেখলাম। আফসোস নাই। আমি নিজে কী? মানুষ না অমানুষ?—মানবজন্তু বলতে পারলে ভালো লাগবে আমার।

Visit sportbet.rodeo for more information.

ডাকাতের বংশ আমরা ফকির

কলিমউল্লাহ ফকির

সলিমউল্লাহ ফকির

নজিবউল্লাহ ফকির

কলিমউল্লাহ ফকির বংশের সম্মান সমুন্নত রেখে মরেছেন। ভাটির ত্রাস কলিমউল্লাহ ডাকাইতকে পুলিশও ধরে রাখতে পারে নাই। ব্রিটিশ আমলের বাঘা পুলিশ। কলিমউল্লাহ ফকিরের পুত্র সলিমউল্লাহ ফকির বংশের মুখে চুনকালি দিয়ে মরেছেন। ডাকাতি পেশা বজায় রাখেন নাই। দল ভেঙে দিয়েছিলেন। সলিমউল্লাহ ফকিরের পুত্র নজিবউল্লাহ ফকির আরও বড় নাফরমানি করে বেঘোরে মরেছেন। বিএ, বিএড করে হাইস্কুলের শিক্ষক হয়েছিলেন। ইতিপূর্বে ফকির বংশের কেউ শিক্ষক হয়েছেন, ইতিহাসে নাই।

আমি সেই নজিবউল্লাহ ফকিরের পুত্র। ছিটগ্রস্ত মস্তিষ্ক নিয়ে জন্মেছি। ডাকাত হই নাই, শিক্ষক হই নাই, কবি হয়েছি। আমার নাম গরিবউল্লাহ ফকির। আমি গরিব এবং আমি ফকির। গরিব ফকির নামে কবিগিরি করি। বই একটাই প্রকাশিত হয়েছে, ‘গরিব ফকিরের অর্ধেক কবিতা’। প্রকাশিতব্য বই ‘আরও অর্ধেক গরিব ফকির’। আমার বয়স এখন ৫৯। সামনের জানুয়ারিতে ৬০ হবে। আমি আর কত দিন বাঁচব? বয়স হয়ে গেছে মরে যাব—এটা আদৌ কাজের কথা তো না। কেউ ৮৭ বছর বয়সে মরে, কেউ ১০২ বছর বয়সে মরে, কেউ ১৯ বছর বয়সে মরে যায়, কেউ ১১ মাস বয়সে হাম হয়ে মরে যায়। ৫২ বছর বয়সে নজিবউল্লাহ ফকির হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছিলেন। সলিমউল্লাহ ফকির ও কলিমউল্লাহ ফকির অবশ্য দীর্ঘায়ু পেয়েছিলেন। নবতিপর হয়ে মরেছেন। তাতে এই গ্যারান্টি দেওয়া চলে না যে আমি নবতিপর হয়ে মরব।

দিলরুবা ছিল পরমা সুন্দরী। পুরান ঢাকার বনেদি পরিবারের মেয়ে। আমাকে প্রেম করে, বিয়ে করে, স্বপরিবার বিচ্যুত হয়েছিল।

—এতক্ষণে তারা চমকাল। ছেলেটা–মেয়েটা। দিলরুবার এন্ট্রি আশা করে নাই এখানে। ছেলেটা ভব ঠাকুর, মেয়েটা কারুবাকী হক। এরা একটা লিটল ম্যাগ করে ‘রোয়াক’। লিটল ম্যাগ মাত্রই অনিয়মিত। ‘রোয়াক’ ৬ সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছে, আরেক সংখ্যা প্রকাশের প্রস্তুতি চলছে। কোনো দশকের কবি হিসেবে চিহ্নিত হন নাই, অনুল্লিখিত থেকে গেছেন, এমন কবিদের নিয়ে সংখ্যা। সেই সংখ্যার জন্য আমার সাক্ষাৎকার নিচ্ছে কবি সিপিএল। ভিডিও সাক্ষাত্কার। অনুলিখন করে ছাপবে। কারুবাকী হক বলল, ‘দিলরুবার কথা আপনি কখনো বলেন নাই।’

অল্প আগে গোসল করেছি বলে আমি এখনো চুল ঝুঁটি করি নাই, মুদ্রাদোষ বশত দাড়ির বেণি বানাচ্ছি, কথা বলছি। বললাম, ‘কথা উঠে নাই। এ ছাড়া আমি আর কখনো সাক্ষাত্কার দিই নাই।’

‘কখনোই তার কথা শোনা যায় নাই।’

‘আমি কখনোই মাইকিং করি নাই।’

তারা হাসল। ভব ঠাকুর বলল, ‘দিলরুবা কি কবিতা পড়ে আপনার প্রেমে পড়েছিলেন?’

‘না। আমি তার প্রেমে পড়েছিলাম। আমি তখন গেন্ডারিয়ার রজনী চৌধুরী রোডে থাকি। জাহাজের বাড়ির গলিতে। তাকে একদিন রাস্তায় দেখলাম। গেন্ডারিয়ার বড়ইতলা মাজারের কাছে তারা থাকে। প্রেম হলো, বিয়ে করব, আমার এক মামাশ্বশুর ছিলেন উকিল, আমাদের এলাকার কোবাদ উকিলের বেয়াই। কোবাদ উকিল যথাস্থানে আমার বংশপরিচয় সাপ্লাই দিয়ে থাকবেন, নিশ্চিত না, আমার সাক্ষাৎ শ্বশুর সাহেব ঘোষণা দিলেন, ডাকাতের বংশে মেয়ে বিয়ে দেবেন না। শত ভাগ সঠিক সিদ্ধান্ত ছিল।’

‘তবুও আপনারা বিয়ে তো করলেন।’

‘করলাম।’

‘ছেলে–মেয়ে?’

‘হয় নাই, তার আগেই দিলরুবা গন। উইথ দ্য উইন্ড।’ ভব ঠাকুর, কারুবাকী হক কিছু বুঝল? কারুবাকী হক বলল, ‘সরি, সেপারেশনের কথা বলছেন? উনি চলে গেছেন?’

বিরাট ক্ষতি! ‘চলে যায় নাই। সেপারেশন—তা একরকম।’

‘ও-ও-ও।’

‘সেপারেশন মানে আমি মেরে ফেলেছি দিলরুবাকে। আমাদের এই বিল্ডিংটা তখন দুইতলা। হত্যা করে দিলরুবার ডেডবডি আমি পিস পিস করে কেটেছিলাম। দুই চোখের মণি উপড়ে একটা অ্যাবসলিউট ভদকার বোতলে রেখে দিয়েছিলাম। ফরমালিনে চুবিয়ে। দিলরুবা মরে গেছে, তার চোখের মণি এই জগৎ–সংসার দেখুক।’

‘কী বলছেন আপনি এসব?’ কারুবাকী হক বলল। ভব ঠাকুর বলল, ‘দিলরুবার ডেডবডি টুকরা টুকরা করে কেটে কী করলেন? হাড়মাস আলাদা করেছিলেন?’

এটা দারুণ! ভব ঠাকুরের অ্যাটিটিউড বা স্মার্টনেস। ‘হাড়মাস আলাদা করতে হয় নাই। আমার এক বন্ধু ছিল কুকুর প্রজনন কেন্দ্রের ম্যানেজার। করোনার সময় মরে গেছে। করোনা হয় নাই, ব্রেন স্ট্রোক হয়ে। এগারোটা পলিথিনের প্যাকেট কুকুর প্রজনন কেন্দ্রের গাড়ি নিয়ে গিয়েছিল।’ ‘দিলরুবার অনুপস্থিতি তখন প্রশ্নের উদ্রেক করে নাই?’

‘দুই দিন পর আমি লোকাল থানায় একটা সাধারণ ডায়েরি করেছিলাম। জগৎ–সংসার, সমাজ–সভ্যতা তখনো সোশ্যাল মিডিয়ায় ঢুকে পড়ে নাই। উড়ো খবর পাওয়া গিয়েছিল আলী আক্কাসের সাথে চলে গেছে দিলরুবা। মালয়েশিয়া বা ইন্দোনেশিয়ায়। মানুষজন অল্প দিনেই বিস্মৃত হয়েছিল দিলরুবাকে। আলী আক্কাসকে সেটাও খোঁজ নিতে যায় নাই।’ কারুবাকী হক বলল, ‘দিলরুবা কী করেছিলেন?’

‘না বলি?’

‘পুলিশ আপনাকে ধরতে পারে নাই। কিন্তু আপনার রিপেনট্যান্স হয় না?’ ‘রিপেনট্যান্স কেন হবে? আমি গরিব, আমি ফকির। আমার কোনো রিপেনট্যান্স নাই। নো রিমোর্স, নো রিগ্রেট, নো রিপেনট্যান্স। দিলরুবার চোখের মণি দুইটা আমি আজও সংরক্ষণ করে রেখেছি। সেই অ্যাবসলিউট ভদকার বোতলে। দেখবেন?’

এই ডোজে ভালো কাজ দিল। কারুবাকী হকের চোখ বিস্ফারিত হলো, সুতীক্ষ্ণ � কণ্ঠে মেয়েটা বলল, ‘না! না! কী বলেন!’

‘আপনি কি ড্রাগ করেন বা করতেন?’ ভব ঠাকুর বলল।

‘কখনোই না। চায়ের নেশা আছে, চা খাই। বিড়ি, সিগারেট কখনো টেনে দেখি নাই।’

‘আপনাদের বিয়ের ছবি আছে?’

‘ছিল। দুই অ্যালবামভর্তি ছবি ছিল। পুড়ে গেছে। দিলরুবার মৃত্যুর পরের বছর এই বাসায় অগ্নিকাণ্ড হয়েছিল। আমি শুধু অ্যাবসলিউট ভদকার বোতলটা সরিয়ে নিতে পেরেছিলাম। দিলরুবার এই একটা স্মৃতিই শুধু এখন আমার কাছে আছে। আমি দিলরুবাকে ভালোবাসতাম।’

‘তবে তাকে খুন করলেন কেন?’

আমি আবার বললাম, ‘না বলি?’ কারুবাকী হক বলল, ‘আপনি কিন্তু ভিডিওতে কথা বলছেন।’

‘যাহা বলিয়াছি সত্য বলিয়াছি।’

‘এই সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হলে পুলিশ আপনাকে ধরে নিয়ে যেতে পারে।’ ভব ঠাকুর বলল। কারুবাকী হক বলল, ‘ধরে নিয়ে যাবে।’

আমি অল্প হাসলাম। বললাম, ‘পারবে না।’ সাক্ষাত্কার আর দীর্ঘ করল না তারা। তাড়াহুড়ো করে উঠে চলে গেল।

কী মনে করে গেল?

আমি উন্মাদ? হাফ উন্মাদ? বদ্ধ উন্মাদ?

হা হা।

থানা এখান থেকে হাঁটা দূরত্ব। ভব ঠাকুর অ্যাটিটিউড–সম্পন্ন। কারুবাকী হক আমার প্রতি অবিমিশ্র ঘৃণা নিয়ে গেছে। আমি তাদের চা অফার করেছিলাম। বানিয়ে খাওয়াব। চিনি ছাড়া রং–চা। তারা অফার প্রত্যাখ্যান করেছে।

মিনিট চল্লিশেক পর কল বেল বাজল।

‘কে?’

উত্তম কুমারের সিনেমার নাম বলল, ‘থানা থেকে আসছি।’

দরজা খুলে কয়েকজন পুলিশ, ভব ঠাকুর ও কারুবাকী হককে দেখলাম। শেষোক্ত দুজনের চেহারা দেখার মতো হলো।

‘জি, বলেন?’

পুলিশ ভাইদের পক্ষ থেকে একজন বললেন, ‘আপনি কবি গরিব ফকির?’ ভব ঠাকুর বলল, ‘উনি—!’

আমি বললাম, ‘গরিব ফকির? না ভাই। আমি গরিব, তবে ফকির না, ফখর। আমার নাম মোহাম্মদ ফখর-উজ-জামান মণ্ডল।’

‘ও, আপনি কী করেন?’ ‘বিমার দালালি, এই আমার কার্ড।’

এক পুলিশ ভাইকে কার্ড দিলাম, কার্ডে আমার নাম মো. ফকর-উজ-জামান মণ্ডল লেখা আছে। আমার স্ট্যাম্প সাইজ ছবি প্রিন্ট করা আছে। বিমার দালাল মো. ফকর-উজ-জামান মণ্ডল টাকলু, নাদুসনুদুস টাইপ, বাটারফ্লাই গোঁফওয়ালা ব্যক্তি। কারুবাকী হক বলল, ‘গরিব ফকির কি আপনার সাথে থাকেন?’

‘জি না ম্যাডাম। আমি থাকি আমার পরিবার নিয়া। পরিবার বাপের বাড়িতে গেছে। ধামরাইয়ের আড়ালিয়ায়। কুল্লা ইউনিয়ন।’

‘গরিব ফকির কি এই বিল্ডিংয়ে থাকেন?’

‘আট বচ্ছর ধরে আমরা আছি এই বিল্ডিংয়ে। এর আগে ভিতরবাড়ি লেনে থাকতাম। বাড়িওয়ালা দানেশ চাচাজি আমারে নিজের ছেলের মতো স্নেহ করতেন। দানেশ চাচাজির ইন্তেকাল হইল, তার ছেলেরা আমারে আর তাদের চাচেরা ভাই মনে করতে পারল না। তারা বিল্ডিং ভেঙে মার্কেট উঠাবে, নোটিশ দিল বাসা ছেড়ে দিতে হবে, ছেড়ে দিলাম। আট বচ্ছর আগের ঘটনা। সেই বিল্ডিং উঠে নাই এখনো। ডেভেলপারের লগে আমার চাচেরা ভাইগের বনিবনা হয় না...।’ কারুবাকী হক স্পষ্টত বিরক্ত হলো, ‘গরিব ফকির এই বিল্ডিংয়ে থাকেন?’

‘কেমনে থাকব? গরিব ফকির মাইনষের নাম হয় এইটাই কুনুদিন শুনি নাই, ম্যাডাম। আমার এক শ্বশুর ফুফা আছেন, বাতেনি চিকিত্সক মুনশি গরিবউল্লাহ সরকার, উনাশি বছর বয়স হইসে, হইলে কী অইব, দেখা যায় জোয়ান মানুষটার মতনই। রহস্য রোমাঞ্চ লেখক অলোক বারী আমার শ্বশুর ফুফার ক্লায়েন্ট আছলেন। এই বিল্ডিংয়ের বাড়িওয়ালা সাদেকুল চাচাজি দুইতলায় থাকেন। তার ম্যানেজার হবুল ভাইরে একতলায় হার্ডওয়্যারের দোকানে পাইবেন। তারারে জিগ্যাস করে দেখতে পারেন কুনো কালে এই বিল্ডিংয়ে কুনো গরিব ফকির ভাড়া থাকতেন কি না? আমি এনে আট বছর ধরে আছি, আমি বলতে পারি আমি কুনো গরিব ফকিরের কথা শুনি নাই।’

তারা কী করবে? কারুবাকী হক, ভব ঠাকুর? পুলিশ ভাইদের বুঝিয়েসুজিয়ে সঙ্গে করে নিচে নেমে গেল। সাদেকুল চাচাজি বা হবুল মামার সঙ্গে কি কথা বলে যাবে তারা? সাদেকুল চাচাজি বা হবুল মামা কি গরিব ফকিরের হদিস দিতে পারবেন তাদের?

হা হা।

হা হা হা।

দরজা বন্ধ করে আমি আবার গরিব ফকির অবতারে ফিরলাম। গরিব ফকির দ্য পোয়েট। দিলরুবার গল্পটা বানানো। কিন্তু গরিব ফকির দ্য পোয়েট সত্যি। আর সত্যি সেই চোখের মণি দুইটা, অ্যাবসলিউট ভদকার বোতলে আমি ফরমালিনে চুবিয়ে রেখেছি।

Read full story at source