মেয়র ভবনে আধা বেলা

· Prothom Alo

সপ্তাহে চার দিন হোম অফিস। মোটে এক দিন বাস-ট্রেন ঠেঙিয়ে যাওয়া হয় মিউনিখের আরেক মাথায় আসল অফিসটায়। সেটুকু বাদ দিলে মোটের ওপর অলস এক ভালুক জীবন চলছে। বৈচিত্র্যের বড় অভাব। তাই সেদিন যখন ছেলের ইশকুল থেকে ই–মেইল এল, আগামী সোমবার কোনো বাবা-মার সময় হবে নাকি একটা ট্রিপে বাচ্চাদের সঙ্গী হওয়ার, তখন আগুপিছু না ভেবেই হ্যাঁ বলে ফেললাম। অফিসে বিস্তারিত জানিয়ে বলে দিলাম, ওই দিন কাজে বসতে সকাল গড়িয়ে দুপুর হবে। ফ্যামিলি ফ্রেন্ডলি জার্মান কোম্পানি বলে কথা। নির্দ্বিধায় ‘Viel Spa’ (ফিল স্পাস, হ্যাভ ফান) জানিয়ে সায় দিয়ে দিল।

সোমবার চলে এল সপ্তাহ ঘুরে। ঘড়িতে সকাল সাড়ে সাতটা। স্কুলের উঠানে দাঁড়িয়ে আছি। সামনেই এক দঙ্গল ছেলেপিলে জট পাকিয়ে গলা চড়িয়েছে ফুল ভলিউমে। কান দপদপ করছে রীতিমতো। এখানে ‘স্পাস’ বা ফান যে কোথায়, ঠিক খুঁজে পাচ্ছি না। একলা ঘরে নিরিবিলিতে কাজ করে নির্জনতায় বেশ অভ্যাস হয়ে গেছে। তা ছাড়া খুব যে বাচ্চাকাচ্চা পছন্দ করি, এমন দাবি করা ঠিক হবে না। একমাত্র ছেলে তাফসু মিয়াকে কোনোমতে তাইরেনাইরে করে পালছি আরকি। সেই আমাকে কি না অত্র এলাকার প্রাইমারি স্কুলের ক্লাস ফোর, এ-সেকশনের ছাব্বিশটা বাচ্চার সাথে জুড়ে দেওয়া হয়েছে।

Visit orlando-books.blog for more information.

ওই এলাকা মানে মিউনিখ থেকে একটু দূরের ‘রুহেনব্রুন’ নামের ছিমছাম এক শহরতলি। ওই এলাকা ছেড়ে এখন যত্রতত্র পালিয়ে যাব, তার আর উপায় নেই। কারণ, ফ্রাউ আনার নাকের ডগায় দাঁড়িয়ে আছি। ফ্রাউ আনা এ-সেকশনের ক্লাস টিচার। বয়স পঁচিশ-টচিশ হবে। কপাল বেয়ে বাদামি চুল নেমে এসেছে এলোমেলো। জিনসের সাথে লাল বেজবল জ্যাকেটে তাকে ক্লাস টিচারের বদলে ষোড়শী টিনএজারের মতো লাগছে। এই বুঝি কানে হেডফোন লাগিয়ে, চুইংগাম পুরে উদাস হাঁটা দেবে কোনো একদিকে। কিন্তু তার বদলে ফ্রাউ আনা বেজায় ব্যস্তসমস্ত হয়ে হাতের কাগজগুলো দেখে কী যেন মিলিয়ে নিচ্ছে। বাচ্চাদের দিকে আপাতত নজর দেওয়ার ফুরসত নেই।

মিউনিখ থেকে একটু দূরের ‘রুহেনব্রুন’ নামের ছিমছাম এক শহরতলি। ওই এলাকা ছেড়ে এখন যত্রতত্র পালিয়ে যাব, তার আর উপায় নেই। কারণ, ফ্রাউ আনার নাকের ডগায় দাঁড়িয়ে আছি। ফ্রাউ আনা এ-সেকশনের ক্লাস টিচার। বয়স পঁচিশ-টচিশ হবে। কপাল বেয়ে নেমে বাদামি চুল নেমে এসেছে এলোমেলো। জিনসের সাথে লাল বেজবল জ্যাকেটে তাকে ক্লাস টিচারের বদলে ষোড়শী টিনএজারের মতো লাগছে।

এই সুযোগে ছেলেপিলেরা কেউ টিফিন বক্স খুলে রুটি-স্যান্ডউইচ চিবোচ্ছে। যাদের গালে রুটি নেই, তাদের হাতে গাজর-আপেল আছে। এক-আধ কামড় বসানো আপেল মাঝে মাঝেই টেনিস বল হয়ে বিপজ্জনক গতিতে ছুটে যাচ্ছে কান ঘেঁষে। ভালো বিপদে পড়া গেল দেখছি। কে বলে জার্মানরা চুপচাপ। অবশ্য সবাই যে জার্মান তা না। আফগানি আমিন, তুর্কি কারিম, বাংলাদেশি তাফসু মিয়া, চায়নিজ মেই-লিং, ফ্রেঞ্চ রাফায়েল, সব পিলপিল করছে। একটা গোলগাল রাশান ভ্লাদিমিরও ঘুরছে চারপাশে গোল হয়ে। এ যেন দারুণ রঙিন পাঁচমিশালি এক মিনি গ্লোব।

যাহোক, এক দিনের অভিভাবক হিসেবে চাকরিটা শুরু হয়ে গেল বুঝে ওঠার আগেই। এইমাত্র কোঁকড়া চুলের গ্রেগো নামের ছেলেটা আমাকে দিয়ে কলা ছিলিয়ে নিয়ে গেল। মাথিয়াস করে আরেকজন আবার দৌড়ে এসে পানির ফ্লাস্ক ধরিয়ে দিয়েছে। টাইট মাথা খুলে দিতে হবে। এর মাঝে তৃতীয় ব্যক্তি আমিন সাহেব পা বাড়িয়ে দিয়েছে। জুতার ফিতা খুলে গেছে। নার্ভাস হাতে এমন বিষ-গেরো কষলাম যে পা থেকে আর কোনোকালে জুতা খোলা যাবে কি না সন্দেহ। সব মিলিয়ে অনুরোধে-উপরোধে তথৈবচ অবস্থা।

অনুরোধের ঢেঁকি গেলা শেষ না হতেই বেনি দুলিয়ে মিষ্টি মেয়ে ভ্যালেন্টিনা হাজির। তার দুষ্টু প্রশ্ন, ‘তুমি কি বিলিকে দেখতে চাও?’ বিলি কে বা কারা সেটা জানতে চাওয়ার আগেই হাতে মুঠোয় সন্দেহজনক কিছু একটা পুরে দেওয়া হলো। মুঠ খুলতেই তিড়িং করে লাফিয়ে উঠল আট চোখের লোমশ কালো ইয়া বড় মাকড়সা। চমকে ভিমরি খেয়ে হার্ট অ্যাটাকের জোগাড় এবার। অবস্থা দেখে বিলির মা ভ্যালেন্টিনা সুধাল, ‘ওমা, তুমি ভয় পেলে নাকি? বিলি তো প্লাস্টিকের।’ গলায় আটকানো কলিজাটা ঢোঁক গিলে নামিয়ে দিতে দিতে জবাব দিলাম, ‘অ্যাঁ, কী যে বলো। বিলিও আমাদের সঙ্গে যাচ্ছে নাকি?, বাহ্ বাহ্...।’ ভয় পেয়েছি টের পেলে এই পাজি মেয়ে আজ সারা দিন জ্বালিয়ে মারবে। তা ছাড়া তার পকেটে বিলির আরও ভাই-ব্রাদার আছে কি না, কে জানে। সাপ-ব্যাঙ থাকার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না একেবারে। ছেলের ক্লাস-ট্রিপের সঙ্গী হওয়ার দুর্বুদ্ধিটা যে কী করে মাথায় এসেছিল, ভেবে পেলাম না।

ছেলের নাম নিতেই তাফসু মিয়া উদয় হলো। মায়ের ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা দেখে তার গভীর আনন্দ হচ্ছে। সে উত্তেজিত স্বরে বলল, ‘কি মা, কেমন লাগছে তোমার? খুব মজা হচ্ছে, তা–ই না? মা, তুমি আসায় আমি যে কী খুশিইই...!’ জবাবে হালকা চিঁ চিঁ ছাড়া আর স্বর বেরোল না আপাতত।

স্টেফানকে দেখলাম তিনটা আর্ল গ্রে টি-ব্যাগ একসাথে ডুবিয়ে তাতে দেদার দুধ-চিনি ঢালছে। সরু চোখে অবাক তাকাতেই বলল, ‘একবার ইন্ডিয়াতে খেয়েছিলাম, তারপর থেকে তোমাদের এই মিল্ক-টির প্রেম আর ছাড়তে পারছি না।’ তাকে শুধরে দিয়ে বললাম, ‘আমি কিন্তু বাংলাদেশি, তবে মিল্ক-টির ব্যাপারে আমরাও দুর্বল।’

ওদিকে দূর থেকে ফ্রাউ আনা হাত নেড়ে কী যেন বলতে চাইছে। যদিও তাতে কারও হুঁশ হচ্ছে না। অগত্যা হার্ড লাইন ধরতে হলো তাকে। দুই আঙুলে আচমকাই সে এমন জোরসে শিস বাজাল যে মুহূর্তেই আমি সমেত বাচ্চারা সব সটান অ্যাটেনশন ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে গেলাম। আর টিফিন বক্সগুলোও খটাশ খটাশ বন্ধ হয়ে ব্যাকপ্যাকে সেঁধিয়ে গেল আপনা থেকেই। এই না হলে আর ক্লাস টিচার। মিষ্টি হাসির নরম স্বভাবের ফ্রাউ আনার এই কমান্ডারমার্কা গরম চেহারাটা দেখে ভরসা পেলাম। নইলে ফোর্থ ডিভিশনের ছাব্বিশ সৈন্যের দুরন্ত প্লাটুন সামলানো এই স্বল্পপ্রাণ, দুর্বল, হোম-অফিসজীবীর কর্ম না। যাহোক, কমান্ডারের হুকুম মোতাবেক আমরা মার্চ করতে করতে ট্রেন স্টেশনের পথ ধরলাম অবশেষে।

স্টেশনটা কাছেই। মিনিট পাঁচেকে প্ল্যাটফর্মে পৌঁছে গেলাম সদলবলে। ছেলেপিলের দল ফ্রাউ আনার দাবড়ানি খেয়ে সেই যে লাইনে এসেছে, এখনো তেমন আছে। ট্রেন চলে আসতে ভালো মানুষের মতো একে একে বগিতে উঠে পড়ল কোনোরকম ট্যাঁ-ফোঁ ছাড়াই।

রুহেনব্রুন-এর আকাশে জুন মাসের ঝকঝকে রোদ (এআই দিয়ে সামান্য রাঙিয়ে নেওয়া)

খোলা মাঠের মাঝে আমাদের টুকটুকে লাল ট্রেন ছুটে চলছে। দুই পাশে রাই শর্ষের সোনালি খেত। আকাশে জুন মাসের ঝকঝকে রোদ। আর ওই যে দূরে আল্পসের সারি। পাহাড়চূড়ায় সাদা মেঘের মুকুট ঠিক যেন ভ্যানিলা আইসক্রিম। মনের কথাটা পড়তে পেরেই যেন ফ্রাউ আনা বলে উঠল, ‘বাচ্চারা, ফেরার পথে আইসক্রিম হবে নাকি এক দফা?’ প্রস্তাব শেষ না হতেই ভালো মানুষি ভুলে হুক্কাহুয়া ডেকে উঠল একপাল শিয়ালশাবক। ট্রেনে বসা দাদু-টাইপ বুড়োবুড়ি তাদের খবরের কাগজ সরিয়ে ভ্রু কুঁচকে তাকাল এক চোট। আমাদের হাতে আইসক্রিম থাকলে দাদু-বাহিনীর ভ্রুর তাপে আইসক্রিম গলে দই হয়ে যেত নির্ঘাত।

দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]

আজকে এই ট্রেনযাত্রার উদ্দেশ্য হলো রুহেনব্রুন এলাকার মেয়র ভবনে হানা দেওয়া। তার আগে ট্রেনের চাকায় দুই মিনিটের একটা ল্যাঙ্গুয়েজ ক্লাস হয়ে যাক। তাহলে গন্তব্যে পৌঁছে কিছু সুবিধা হবে। মেয়র ভবনের জার্মান নাম হলো, ‘রাটহাউস’। ‘রাট’ বা ‘পরামর্শ’ দেওয়া হয় যে ভবনে, সেটাই রাটহাউস। আর মেয়র সাহেবের জার্মান হলো ‘বুর্গারমাইস্টার’। ‘বুর্গার’ মানে ‘নাগরিক’ আর বুর্গারমাইস্টার হলো তাদের বস। আজকে তারই শুষ্কং-কাষ্ঠং সরকারি দপ্তর ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখানো হবে ছেলেপুলেদের। তারপর বোধ হয় রাটহাউস-বুর্গারমাইস্টার-লেটুসপাতা দিয়ে বার্গার বানিয়ে বাচ্চাগুলোকে খাইয়ে দেওয়া হবে ঘোৎ করে। শিক্ষাসফর বলে কথা!

যাহোক, ট্রেন গন্তব্যে থামতেই ঝটপট নেমে পড়লাম আমরা। ফ্রাউ আনা এলোমেলো হাত নেড়ে ঘাড়-মাথা ঝাঁকাচ্ছে। এই ইশারার মানে বোঝা বড় দায়। একবার মনে হচ্ছে, সে বলছে, ‘আজকে কার ঘাড়ে কটা মাথা আছে, দেখে নেবো’। আবার মনে হচ্ছে, ‘মাথা গুনে দেখুন তো সব কটা ছেলেমেয়ে নামল নাকি ট্রেন থেকে’। দ্বিতীয়টাই হবে হয়তো ধরে নিয়ে ছেলেপেলের মাথা গোনা শুরু করলাম। বায়োলজির লোক আমি অঙ্কে বড্ড নড়বড়ে। গুনেটুনে একবার হলো চব্বিশ, আরেকবার ছাব্বিশ। তবে আশার কথা, পাশ থেকে বিলি-মাকড়সার মা ভ্যালেন্টিনাও বলে উঠল, ‘ছাব্বিশ, ছাব্বিশ’। গোনাগুনি বাদ দিয়ে এবার কবজি উঁচিয়ে ফ্রাউ আনাকে সবুজসংকেত পাঠিয়ে দিলাম। যাহা চব্বিশ, তাহাই ছাব্বিশ।

দুই কদম হেঁটে দলবলসহ রুহেনব্রুন মেয়র ভবনের সামনে এসে দাঁড়াতেই ধন্দে পড়লাম। কোথায় দলিল-দস্তাবেজে ঠাসা ইট-কাঠের অন্ধকার ঘুমন্ত দপ্তর। তিনতলা সাবেকি দালানের সব কটা জানালা খুলে লাল-হলুদ-গোলাপি-বেগুনি ফুলের কেয়ারি ঝাঁপিয়ে পড়ছে আমাদের দেখে। এমন ফুলেল অভ্যর্থনায় খানিকটা ভড়কে গেলাম যেন। স্বাগত জানাতে আরও একজনকে দেখা গেল বড় ফটকের কাছে। ফ্রাউ আনার বয়সী এক তরুণী। নাম এমিলি। তার চেহারায় মোটেও ম্যাজমেজে সরকারি কর্মচারী ভাব নেই। বরং মনে হচ্ছে সে যেন এক শখের কফিশপের শৌখিন বারিস্তা। এই বুঝি এক কাপ ধোঁয়া ওঠা কফি নিয়ে এগিয়ে আসবে। এমিলি নামের মেয়েটা আসলেই এগিয়ে এল উষ্ণ হাসি ছড়িয়ে, ‘হের্জলিশ উইলকমেন, কিন্ডার! সুস্বাগতম, বাচ্চারা’।

ছেলেপিলেরা ওই সব স্বাগতম-টমের ধার না ধেরে হুড়মুড়িয়ে মেয়র ভবনে সেঁধিয়ে গেল। দলটা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বিশাল অন্দরমহলে হারিয়ে যাওয়ার আগেই সবাইকে একরকম আগলে ধরে নিয়ে যাওয়া হলো বড় হল রুমটায়। পথ দেখিয়ে নিয়ে আসা এমিলির সাথে এবার এক তরুণ এসে যোগ দিয়েছে। জানা গেল তার নাম স্টেফান। হলরুমে সবাই তাকে ঘিরে দাঁড়াতেই স্টেফান কোত্থেকে ঝাড়া দিয়ে বিরাট এক ফর্দ বের করল। তারপর ঘোষণা দেওয়ার ভঙ্গিতে বলল, ‘এই হলো আজকের প্রোটোকল।’ চার পাতার ফর্দ দেখে মনে মনে দমে গেলাম। জার্মানদের সবকিছুতেই প্রোটোকল আর নিয়মকানুনের ইচিং-বিচিং। প্রোটোকল ছাড়া বোধ হয় হাঁচিও দেওয়া যাবে না এ দেশে। ভাবতে না ভাবতেই নাক সুরসুরিয়ে হালুম টাইপের বিকট একটা হাঁচি এসেই আবার পালিয়ে গেল।

স্টেফান ছেলেটা তুমুল ‘বাইরিশ’ উচ্চারণে তার ফর্দ পড়ে শোনাল। সিলেট-নোয়াখালীর ভাষা যেমন বাংলা হয়েও বাংলা নয়, তেমনি বাভারিয়া অঞ্চলের এই বাইরিশ ডায়ালেক্ট বুঝতে গেলে খোদ জার্মানদেরও দাঁত নড়ে যায়। আর এই দুই দিনের প্রবাসী বাঙ্গাল তো কোন ছাড়। শুধু এটুকু বুঝলাম যে দশটার সময়ে একটা ব্রেক থাকবে। তখন বাচ্চাদের জন্য হালকা স্ন্যাক্স আর বড়দের কফির ব্যবস্থা আছে। বাকি প্রোটোকলটা অ্যারোপ্লেন হয়ে সাঁই সাঁই করে মাথার ওপর দিয়ে উড়ে গেল।

দোতলার লম্বা করিডর পেরিয়ে বড়সড় একটা ওয়েটিং রুমে আমাদের নিয়ে এল স্টেফান। তার হাতের লিস্টি মোতাবেক এখন এক–একজন অফিসার এসে বাচ্চাদের জ্ঞান দিয়ে যাবে একেক বিষয়ে। কেউ বলবে পানি নিয়ে, কারও বিষয় বিদ্যুৎ, কারওবা ট্যাক্স, ইত্যাদি ইত্যাদি। মেয়র অফিসের নিত্যদিনের কাজের ফিরিস্তি আরকি। শুনেই কুমিরের মতো একটা হাই তুলে ফেললাম। ওদিকে ছেলেপেলের চোখে দেখলাম চকচকে আগ্রহ।

শুরুতেই এলেন সিরিয়াস চেহারার হের রিখটার। তার কারবার পানি নিয়ে। হাতে তার ছোট্ট একটা বিকার। সেখানে লেখা ‘এইচটুও’, পানির রসায়নিক সংকেত। ‘এই পানি কোত্থেকে আসে বল তো বাচ্চারা?’ সমস্বরে জবাব এল, ‘পাইপ দিয়ে!’

শোরগোলে একটুও বিরক্ত না হয়ে হের রিখটার মাথা নেড়ে বললেন, ‘একদম ঠিক। ওই যে দূরে জানালার বাইরে আল্পস দেখছ, প্রতিদিন ছয় মিলিয়ন লিটার পানি সেইখান থেকে গড়িয়ে এসে রুহেনব্রুনের বড় বড় ট্যাংকে জমা হয়। তারপর আমাদের ল্যাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর মাটির নিচ দিয়ে পাইপ বেয়ে সেই পানি তোমাদের বাড়িতে ঢোকে। তারপর গ্লাসে নিয়ে গিলে ফেললেই হলো। পৃথিবীর সব দেশে পাইপ বেয়ে এমন খাবার পানি আসে না। ফুটিয়ে, ছেঁকে নানা রকমভাবে বিশুদ্ধ করে পানি খেতে হয় তাদের। সেদিক দিয়ে তোমরা অনেক লাকি যে কল ঘোরালেই এক গ্লাস পরিষ্কার পানি, আহ্। বলেই হের রিখটার হাতের বিকার ঢকঢক গলায় ঢেলে ফেললেন।

লেকচার চলতে লাগল, ‘আবার বেহিসাবি খরচ করলে কিন্তু পানি শেষ হয়ে যাবে একসময়ে। তাহলে কী করতে হবে বল তো দেখি?’ জবাবে বিচিত্র সব সমাধান এল। চায়নিজ মেই-লিং বলল, ‘পানি কম কম খেতে হবে আর বেশি করে জুস খেতে হবে।’ ফ্রেঞ্চ রাফায়েল বলল, ‘বেশি বেশি গোসল করা যাবে না, এই যে দেখো না, আমি সপ্তাহে এক দিন গোসল করি সে জন্য।’ জার্মান লিও বলল, ‘কলের পানি খাওয়া বন্ধ, শুধু বৃষ্টির পানি খেতে হবে।’

‘সাবাশ, সাবাশ”, সব কটা সমাধানই বোধ হয় হের রিখটারের মনে ধরল। তিনি খুশি খুশি গলায় এবার হাঁক দিলেন, ‘হের হেলমুট, এবার আপনার পালা’। কখন যে বিরাট টাকওয়ালা হেলমুট সাহেব চুপ করে ভিড়ে মিশে দাঁড়িয়েছেন, বুঝতেই পারিনি কেউ। যাহোক, ইনি বলবেন ট্যাক্স নিয়ে। কিন্তু কিসের কী। উনি পড়লেন কুকুর-বিড়াল নিয়ে। তোমাদের যাদের বিড়াল আছে তার ডান হাত তোলো। আর যারা কুকুর পালো, তারা তোলো বাঁ হাত। হাত গুনে বিড়ালের মালিক পাওয়া গেল ৯ জন। আর কুকুরের মনিব ১৩ জন। হের হেলমুট এবার সুধালেন, ‘বলো তো, তোমাদের বাবা-মাকে কার জন্য ট্যাক্স গুনতে হয়, টমির জন্যে নাকি মিমির জন্যে?’ বাচ্চাদের কিছু্টা ইতস্তত করতে দেখা গেল। এই ফাঁকে যার টমি-মিমি কিছুই নেই, সেই তাফসু মিয়া হাত উঁচিয়ে বলল, ‘টমি টমি!’ হের হেলমুট চওড়া হাসিতে সহমত দিলেন। ‘হ্যাঁ, কুকুর একটা থাকলেও খাজনা দিতে হবে, কিন্তু বিড়াল দশটা থাকলেও খাজনা নেই, কী মজা, তাই না?’

বাচ্চারা কতটুক মজা পেয়েছে ঠিক বোঝা গেল না। তাদের কেউ কেউ উশখুশ করছে। পাশ ত্থেকে বিলির মা ভ্যালেন্টিনা অনুযোগের সুরে বলছে, ‘খিদে পেয়েছে, কখন খেতে দেবে জানো তুমি?’ তাকে আশ্বস্ত করতে ঘড়ি দেখালাম। দশটা বাজতে বেশি দেরি নেই। স্ন্যাক্স-ব্রেক আসন্ন।

ব্রেকের আগের শেষ পর্বে এবার এলেন হের মার্কুস। তার লেকচারের বিষয় পানি, বিদ্যুৎ এসব কিছু না। বরং ইনি বলবেন, ছুটির দিন রোববারের ওপর। জার্মানিতে রোববার একটা প্যারাময় দিন। কারণ, এক রোববারে যত নিয়ম মানতে হয়, তা কোনো লিস্টিতে কুলাবে না। এ যেন সব বারণের দিন। সুতরাং মনে মনে প্রমাদ গুনলাম।

হের মার্কুস গলা খাকারি দিয়ে শুরু করলেন, ‘রোববার মানে কি জানো তো তোমরা? রোববার হলো ‘রুহেটাগ’ (মানে বিশ্রামের দিন)। এই দিনে কী কী করা বারণ বলো তো এক এক করে?’ আফগান ছেলে আমিন পটাং করে হাত তুলল, ‘ভ্যাক্যুম করা যাবে না। আমার মা গত রোববারে ভ্যাক্যুম চালাল আর অমনি নিচের বাসার দাদু এসে মাকে শাসিয়ে গেল।’ এখানে বলে রাখা ভালো, জার্মান দাদুদের মেজাজ একটু খঁচেই থাকে। তাই রোববারে খেলনা গাড়িটা ঠকাশ করে পরলেও তারা পুলিশসমেত বাসায় হানা দিতে পারে। একটুও বাড়িয়ে বলছি না।

আজকে সব ভাল করে শিখে নিয়ে মাকে শেখাবে, কেমন? তাহলে আর রাগী দাদু বকা দেওয়ার চান্স পাবে না। হের মার্কুস বলে চললেন, ‘রোববারে দেয়ালে হাতুড়ি চালানো কিংবা ড্রিল করা নিষেধ, জোরে গান শোনাও বারণ, জন্মদিনের পার্টিও বাদ রোববারে, আসবাবপত্র সরানো বা জোড়া দেওয়া একদম মানা, ওয়াশিং মেশিনও চালানো যাবে না ভ্রুম ভ্রুম। এমনকি বাগানের ঘাস কাটার মেশিনও চলবে না। কি বোঝা গেল, কিন্ডার (মানে, বাচ্চারা)?। সব কিন্ডার এবার গন্ডারের মতো ঘোশ করে উঠল। তাদের ঘোশঘাশে আর না পেরে দেয়ালে ঝোলানো বিরাট গ্র্যান্ডফাদার ক্লকটা এবার ঢং ঢং ঘর কাঁপিয়ে দশটা বাজিয়ে দিল।

স্টেফান কিছুটা আমচু মুখে তার হাতে ধরা প্রোটোকলে চোখ বোলাচ্ছে। সেখানে আরও কতক লেকচার-মেকচার ছিল বোধ হয়। সেগুলো শিকেয় তুলে রাখতে হবে আরকি। অগত্যা কাগজটা পকেটে চালান দিয়ে বেচারা হাঁক দিল, ‘সবাই আমার পিছু পিছু চলো, চারতলার কিচেনে স্ন্যাক্স খাবো এখন...।’ কথাটা মাটিতে না পড়তেই ছাব্বিশ জোড়া পা ধুপধাপ সিড়ি মাড়িয়ে রওনা দিয়ে দিল।

অতিকায় দুই কাঠের টেবিল ঘিরে ভারী বেঞ্চ বসানো। অনায়াসে তাতে জনা চল্লিশেক লোক এঁটে যায়। স্টেফান ছেলেপিলেদের বসিয়ে দিয়ে ব্যস্তসমস্ত হয়ে এগিয়ে এল, ‘ফ্রাউ আনা, আর ফ্রাউ সাবরিনা, আপনারা কি কফি খাবেন? আমাদের কফি মেশিনটা নতুন কেনা হয়েছে, এই গত মাসেই। দারুণ কফি হয়। কী দিই আপনাদের বলুন তো?’ মিনিট দুয়েকের পর ফ্রাউ আনার হাতে কালো তিতিকুটে এস্প্রেসো আর আমার হাতে সফেদ ফেনিল কাপাচিনো চলে এল। ওদিকে স্টেফানকে দেখলাম তিনটা আর্ল গ্রে টি-ব্যাগ একসাথে ডুবিয়ে তাতে দেদার দুধ-চিনি ঢালছে। সরু চোখে অবাক তাকাতেই সে বলল, ‘একবার ইন্ডিয়াতে খেয়েছিলাম, তারপর থেকে তোমাদের এই মিল্ক-টির প্রেম আর ছাড়তে পারছি না।’ তাকে শুধরে দিয়ে বললাম, ‘আমি কিন্ত বাংলাদেশি, তবে মিল্ক-টির ব্যাপারে আমরাও দুর্বল।’

আলাপে ছেদ পড়ল। ছেলেপেলেরা স্টেফানকে রীতিমতো হাঁক দিয়ে ডাকছে, ‘ব্রেৎজেল কি এই কয়টাই, আর নেই?’ ব্রেৎজেল হলো এক রকমের রুটি। প্রচণ্ড শক্ত খেতে। সাধারণ বাঙালির দাঁত ওতে গেঁথে যাবে অনায়াসে। আবার বড় বড় লবণের দানা লাগানো রুটির চারপাশে। এক কামড়ে প্রেশার বেড়ে টঙ্গে উঠবে, এমন। কিন্তু এ দেশে ছেলেবুড়ো সবার কাছে ব্রেৎজেল মানে জাতীয় খাবার। যাহোক, বাচ্চাদের অমন লোভী প্রশ্নে ফ্রাউ আনা আর আমি লজ্জায় মুখ চাওয়াচাওয়ি করছি। কিন্তু স্টেফান একটুও ঘাবড়ে না গিয়ে বলল, ‘প্রোটোকলে আছে, এগারোটার সময়ে ফ্রাউ আনা তোমাদের আইইসক্রিম খাওয়াবে। সে জন্য পেটে জায়গা রাখতে হবে না?’ তারপর সে বেশ নাটকীয় ভঙ্গিতে তাড়া দিল, ‘চলো, চলো, এবার আজকের আসল আকর্ষন। স্বয়ং বুর্গারমাইস্টার (জনাব মেয়র সাহেব) অপেক্ষা করছে তোমাদের জন্যে।’

বাচ্চারা এবার শুধু উঠলোই না, বরং দল বেঁধে নিচে নামার আগে যার যার প্লেট-গ্লাসগুলো কিচেনের ডিশ ওয়াশারে ঢুকিয়ে দিল চটপট। তিন-চারজন মিলে রুটির গুঁড়ো টিস্যু দিয়ে চমৎকার মুড়িয়ে ময়লার বিনে ফেলে দিল। আরেক দল ঝুঁকে পড়ে মেঝে থেকে খাবারের টুকরা উদ্ধার করল। আর বেঞ্চগুলো টেবিলের নিচে ঠেলে রাখল কয়েকজন মিলে টিপটপ। মনে মনে জার্মান ডিসিপ্লিনের তারিফ না করে পারলাম না। ছাব্বিশ সৈনিকের প্লাটুন কমান্ডার ফ্রাউ আনার মুখে গর্বের মুচকি হাসি খেলে গেল।

বুর্গারমাইস্টারের অফিসটা বেজায় ছোট। কোনমতে টেবিল-চেয়ার বসে এমন। রাটহাউসে আমাদের ওয়েলকাম জানানো এমিলি মেয়েটাকে দেখলাম আবার। এতক্ষণ তাকে দেখিনি কেন বুঝলাম। এমিলি হলো মেয়র সাহেবের সেক্রেটারি। হাতে একতাড়া ফাইল নিয়ে আরেক অফিসে ছোটার আগে আমাদের আরেকবার হ্যালো বলতে ভুলল না মেয়েটা। সাথে মন ভালো করা একটা হাসি।

চেয়ারে গা ডুবিয়ে বসে আছেন আমাদের বুর্গারমাইস্টার, হের ফাইশটেনবাইনার। মেয়র সাহেবের নাম শুনে দাঁত নড়ে গেল। তিন দিন-তিন রাত এই নাম জপলেও মুখস্থ হওয়ার না। সুতরাং সে আশা ছেড়ে দিয়ে তাকে বরং মেয়র সাহেব বলেই চালিয়ে দেই। আমাদের দলটাকে তার দপ্তরে হাজিরা দিতে এসেছি দেখে চেয়ার ছেড়ে হন্তদন্ত হয়ে উঠে এলেন। যেন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী-মিনিস্টার এসেছি আমরা।

‘তোমরা কি জানো আমার দুই ছেলেমেয়েও তোমাদের রুহেনব্রুন ইশকুলে পড়ে? তোমাদের এক ক্লাস ওপরে আর নিচে। ইভান আর সোফি। চেনো নাকি ওদের? দেখা গেল, বাচ্চাদের অনেকেই তাদের চেনে কিন্তু তারা যে মেয়রপুত্র-কন্যা, এই তথ্য একেবারে নতুন। তবে তাতে খুব একটা বিচলিত হতে দেখা গেল না কাউকে।

মেয়র সাহেব এবার আসল কথা পাড়লেন, ‘কেউ কি বলতে পারো, সারা দিন এই ছোট্ট অফিসে বসে বসে আমি কী করি? চাকরিটা খুব বোরিং মনে হচ্ছে, তাই না?।’ কারও মুখে কথা ফুটল না।

নীরবতা মৌন সম্মতি মেনে নিয়ে মেয়র সাহেব বলা শুরু করলেন, ‘এই যে তোমরা একা একা স্কুলে যাও-আসো, কিন্তু কোথাও কোনো ছেলেধরার ভয় নেই—এটা নিশ্চিত করা আমার একটা বড় দায়িত্ব। বিকেলে যে মাঠে আর পার্কে খেলতে যাও, সেগুলোর যত্ন করাও আমার কাজ। তারপর যেমন, রাস্তার দুধারে যে গাছের সারি, ওগুলো ছেঁটেছুটে সুন্দর করে রাখাও জরুরি। আবার ধরো, রুহেনব্রুনের পাবলিক লাইব্রেরি, সুইমিংপুল, স্পোর্টস ক্লাবের দেখভালের পেছনে খরচাপাতি আছে। সে জন্য আমার অফিসে বিরাট একটা টাকার সিন্দুক আছে। চলো দেখাই তোমাদের। দেখি কেউ আমার টাঁকশাল খুলতে পারো কি না। পারলে সব টাকা আজকে তোমার!’

এমন মজার প্রস্তাবে ছেলেপুলে হল্লা করে মেয়রের পিছু পিছু চলল। পাশের অফিসে দেয়ালের এক পাশে ভারী পর্দা সরাতেই জং ধরা, অতি প্রাচীন চার ফুট বাই তিন ফুটি লোহার সিন্দুকের দেখা মিলল। সিন্দুকের হাতল গাড়ির স্টিয়ারিংয়ের মতো, ঘুরিয়ে খুলতে হয়। অভয় পেয়ে বাচ্চারা কেউ হাতল ধরে ঝুলে পড়ল, কেউ বা বোতাম টিপে সিক্রেট কোডটা ডি-কোড করতে ব্যস্ত হয়ে গেল। মেয়র সাহেবকে এই বানরীয় কর্মকাণ্ডে বেজায় খুশি মনে হলো। ওদের আরও কিছুক্ষণ ঝোলাঝুলি করতে দিয়ে সেক্রেটারি এমিলির হাত থেকে মান্ধাতা আমলের এক ছড়া চাবি নিয়ে দেখালেন, ‘এই হলো সিন্দুকের চাবি।’ চাবির চেহারা দেখে সবার চোয়াল ঝুলে গেল। সত্যি বলতে কি, জার্মান সরকারি অফিসগুলো এখনো ই-মেইলের বদলে বাড়ির ঠিকানা বরাবর চিঠি পাঠায় বাদামি খামে। তাদের সিন্দুকে যে দুই কিলো ওজনের চাবি ঝুলবে, এটাই স্বাভাবিক।

দেখতে দেখতে মেয়রভবনে আমাদের মজার সময়টা ফুরিয়ে এল। মেয়র হের ফাইশটেনবাইনার দোরগোড়া অবধি এগিয়ে দিলেন আমাদের দলটাকে। হাত নেড়ে বিদায় জানিয়েই চলে গেলেন না। ঠায় দাঁড়িয়ে রইলেন। আমাদের আজকের গাইড, স্টেফান উপসংহার টানল, ‘মেয়র ভবনে আধা বেলা সময় দেওয়ার জন্য তোমাদের ধন্যবাদ, কিন্ডার। ঠিক এগারোটা বাজে। এখন টাইম ফর আইসক্রিম!’

বাইরে ফ্রাউ আনা বিরাট এক বাক্স হাতে দাঁড়িয়ে। সে যে কখন চুপিসারে বেরিয়ে গিয়ে এসব কিনে এনেছে, জানতেও পারিনি কেউ। ছেলেপিলের দল এবার বুনো শিয়ালের মতো হুক্কা হুয়া তুলে ছুটে এল, ‘হুররাআআ...!’ অত সাধের জার্মান ডিসিপ্লিনটা যে এই মুহূর্তে কই হারাল, ঠিক বুঝলাম না।

বি.দ্র. স্থান-কাল-পাত্রের বেলায় কখনো বা ছদ্মনামের আশ্রয় নেওয়া হয়েছে।

  • লেখক: ড. রিম সাবরিনা জাহান সরকার, মিউনিখ, জার্মানি

Read full story at source