ভাঙনে মাটির নিচ থেকে বেরিয়ে আসছে সাবমেরিন কেব্‌ল, কী ধরনের ঝুঁকি রয়েছে

· Prothom Alo

প্রায় তিন মাস আগে কেব্‌ল দুটি উন্মুক্ত হয়েছিল। এরপর আর অবস্থার পরিবর্তন হয়নি। দুটি কেব্‌ল দিয়ে ২০১৮ সাল থেকে দ্বীপটিতে জাতীয় গ্রিড থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হয়। বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দুটি সাবমেরিন কেব্‌লের মাধ্যমে ৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করা যায়।

চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ চ্যানেলের তীরে ভাঙনে মাটির নিচ থেকে বেরিয়ে এসেছে জাতীয় গ্রিড থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহের দুটি সাবমেরিন কেব্‌ল। ভাটার সময় কেব্‌লটির প্রায় ৪০ ফুট দেখা যাচ্ছে। ভাঙনের কারণে কেব্‌লের আরও কত অংশ মাটি ও পানির নিচে ঝুঁকিতে রয়েছে, এর কোনো প্রকৌশলগত সমীক্ষা করেনি বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)।

Visit mchezo.life for more information.

প্রায় তিন মাস আগে কেব্‌ল দুটি উন্মুক্ত হয়েছিল। এরপর আর অবস্থার পরিবর্তন হয়নি। দুটি কেব্‌ল দিয়ে ২০১৮ সাল থেকে দ্বীপটিতে জাতীয় গ্রিড থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হয়। বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দুটি সাবমেরিন কেব্‌লের মাধ্যমে ৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করা যায়। তবে প্রাথমিকভাবে একটি কেব্‌লের মাধ্যমে ১০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে। দুটি কেব্‌লের স্থায়ীত্বকাল ৫০ বছর। কেব্‌ল দুটি বিকল হলে সন্দ্বীপে বসবাস করা প্রায় সাড়ে তিন লাখ মানুষ দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়বে।

পিডিবি জানায়, তাঁরা প্রকল্পের চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চিয়াংসু ঝোংথিয়েন টেকনোলজি কোম্পানি লিমিটেডের (জেডটিটি) বিশেষজ্ঞের পরিদর্শনের জন্য অপেক্ষা করছেন। কিন্তু ওই প্রতিষ্ঠান থেকে কেউ আসেননি। প্রতিষ্ঠানটি পরিদর্শনে আসার আগে আর্থিক, আবাসন ও যাতায়াত-সংক্রান্ত কিছু শর্ত দিয়েছে। সেগুলো পূরণের জন্য মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন চাওয়া হচ্ছে।

তিন মাসেও ঝুঁকি নিরূপণ হয়নি

সন্দ্বীপের যে স্থানে ভাঙন দেখা দিয়েছে, সেটি বাউরিয়া ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের ল্যান্ডিং স্টেশন থেকে দেড় কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত। গত ১ জুন প্রথম আলোয় ‘সন্দ্বীপে সাগরের ভাঙনে উন্মুক্ত দুটি সাবমেরিন কেব্‌ল, ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার শঙ্কা’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এরপর ল্যান্ডিং জোনে ভাঙন ঠেকাতে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) এক দফা জিও ব্যাগ ফেলেছিল। সেটি টেকেনি। পরে জুলাইয়ের মাঝামাঝি প্রবল জোয়ারে আবার তীর ভাঙলে কেব্‌ল দুটির আরও কিছু অংশ উন্মুক্ত হয়ে পড়ে।

পিডিবির কর্মকর্তারা বলছেন, জেডটিটি সরেজমিনে পরিদর্শন করবে বলে জানিয়েছে। তবে তিন মাসেও তারা আসেনি। তারা জানিয়েছে, আর্থিক ও লজিস্টিক সহায়তার শর্ত পূরণ হলে পরিদর্শনে আসবে।

পিডিবি চট্টগ্রামের (বিতরণ দক্ষিণ) প্রধান প্রকৌশলী কামাল উদ্দিন আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী তিনটি পক্ষের সমন্বয়ে কাজ করা হচ্ছে। স্থানীয় প্রশাসনকে বিষয়টি জানানো হয়েছে, পাউবোকে ভাঙন ঠেকানোর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। বিদেশি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকেও অবহিত করা হয়েছে। তারা সরেজমিনে পরিদর্শন করবে বলে জানালেও এখনো আসেনি।’

উন্মুক্ত কেব্‌ল কেন ঝুঁকিপূর্ণ

সমুদ্র বা নদীর তলদেশে সাধারণত মাটির নিচে সাবমেরিন পাওয়ার কেব্‌ল স্থাপন করা হয়। তলদেশের মাটি সরে গিয়ে কেব্‌লের কোনো অংশ মাটির সমর্থন হারিয়ে পানিতে ঝুলে পড়লে তাকে প্রকৌশলগতভাবে ‘ফ্রি স্প্যান’ বা মুক্ত-ঝুলন্ত অংশ বলা হয়। এ অবস্থায় স্রোত ও ঢেউয়ের কারণে কেব্‌ল বারবার নড়াচড়া করতে পারে। এতে কেব্‌লের ওপর যান্ত্রিক চাপ বাড়ে। এ কারণে দীর্ঘ মেয়াদে ক্ষতির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। ঘূর্ণিঝড় বা শক্তিশালী জলোচ্ছ্বাসের সময় এ ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।

চলতি বছরের ১২ জানুয়ারি ‘ফ্রন্টিয়ার্স ইন বিল্ট এনভায়রনমেন্ট’ জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় মুক্ত-ঝুলন্ত সাবমেরিন কেব্‌লের ওপর ঢেউ ও স্রোতের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, স্রোত ও ঢেউয়ের কারণে কেব্‌লে নড়াচড়া ও ঘূর্ণিজনিত কম্পন তৈরি হতে পারে। এতে কেব্‌লের বিভিন্ন উপাদানে ক্লান্তিজনিত ক্ষতির ঝুঁকি বাড়ে।

৩০ জুলাই ‘ওশান ইঞ্জিনিয়ারিং’ জার্নালে প্রকাশিত আরেকটি গবেষণায় সমুদ্রতলের মাটি সরে গিয়ে কেব্‌ল মুক্ত-ঝুলন্ত হলে এর বিকৃতি, বক্রতা ও পীড়নের পরিবর্তন বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এতে দেখা গেছে, সুরক্ষা ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হলে কেব্‌লের স্থানীয় বিকৃতি ও পীড়ন বেড়ে যেতে পারে।

সন্দ্বীপে সাবমেরিন কেবলের ল্যান্ডিংস্টেশন

সমীক্ষাকারী প্রতিষ্ঠানকেও জানানো হয়নি

২০১৭ সালে সন্দ্বীপ চ্যানেলের তলদেশ দিয়ে জাতীয় গ্রিড থেকে সন্দ্বীপে বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য দুটি সাবমেরিন পাওয়ার কেব্‌ল স্থাপন করা হয়। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পে ব্যয় হয় ১৪৪ কোটি টাকা। প্রকল্পের ঠিকাদার ছিল চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জেডটিটি। সমীক্ষা ও ভূতাত্ত্বিক তদারকির দায়িত্বে ছিল সরকারের স্বায়ত্তশাসিত বিশেষজ্ঞ পরামর্শক প্রতিষ্ঠান আইডব্লিউএম।

জেডটিটির ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পে দুটি ৩০ কিলোমিটার দীর্ঘ সাবমেরিন কেব্‌ল স্থাপন করা হয়। প্রতিটি কেব্‌ল তিন কোরের। কেব্‌ল স্থাপনের সর্বোচ্চ গভীরতা ছিল ৬ মিটার।

কেব্‌ল স্থাপনের আগে চ্যানেলের ভূমিরূপ ও তলদেশের পরিবর্তন নিয়ে সমীক্ষা করেছিল আইডব্লিউএম। ২০১৫ সালে প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে পিডিবির চুক্তি হয়। আইডব্লিউএমের ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, ৩৩ কেভি সাবমেরিন পাওয়ার কেব্‌লের পরিকল্পনা, স্থাপন ও কমিশনিং তদারকির জন্য পিডিবি তাদের সঙ্গে চুক্তি করেছিল। সমীক্ষায় সন্দ্বীপ চ্যানেলের সক্রিয় ভূমি রূপগত পরিবর্তন বিবেচনায় নেওয়া হয়েছিল।

জলপ্রবাহ, পলি পরিবহন, ঢেউ ও জলোচ্ছ্বাসের মডেল, স্যাটেলাইট চিত্র ও নদীতলের ক্রস-সেকশন তথ্য বিশ্লেষণ করে কেব্‌লের অবস্থান ও মাটির নিচে পোঁতার গভীরতা নির্ধারণে প্রকল্পে সহায়তা দিয়েছিল আইডব্লিউএম। তবে কেব্‌ল উন্মুক্ত হওয়ার পর এই চ্যানেলের ভূমিরূপ ও পানিপ্রবাহের পরিবর্তন নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে যোগাযোগই করেনি পিডিবি। দীর্ঘ সময় কেব্‌ল উন্মুক্ত থাকার পরও ঝুঁকি নিরূপণে তাদের পরামর্শ চাওয়া হয়নি।

আইডব্লিউএমের নির্বাহী পরিচালক আমীরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, সাবমেরিন কেব্‌লের অবস্থা মূল্যায়নে তাঁদের সঙ্গে পিডিবি যোগাযোগ করেনি। সমীক্ষাটি ৯ বছর আগে হয়েছিল। সময়ের সঙ্গে পারিপার্শ্বিক অবস্থার পরিবর্তন হতে পারে। তাই কেব্‌লের পুরো অংশ নিয়মিত মনিটরিং করা প্রয়োজন। পানির নিচের অংশ আরও গুরুত্বপূর্ণ।

Read full story at source