চৌর্যবৃত্তির অভিযোগে পদত্যাগ করা কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপককে মৃত অবস্থায় উদ্ধার
· Prothom Alo

বড় ধরনের মেধাস্বত্ব চুরি বা চৌর্যবৃত্তির কেলেঙ্কারির জেরে গত সপ্তাহে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদত্যাগ করেছিলেন কৃষ্ণাঙ্গ অধ্যাপক জেসন আরডে। বর্ণবাদের অভিযোগ ওঠা সে ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতে এবার তাঁর লাশ উদ্ধার করা হলো।
Visit freshyourfeel.com for more information.
গতকাল শুক্রবার জেসন আরডের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছে বিশ্বের মর্যাদাপূর্ণ এ বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষ।
৪১ বছর বয়সী জেসন আরডেকে গতকাল বিকেলে দক্ষিণ লন্ডনের একটি ঠিকানায় অচেতন অবস্থায় পাওয়া যায়। লন্ডন মেট্রোপলিটন পুলিশ সার্ভিস এ তথ্য জানিয়েছে। তবে উদ্ধারের সময় মৃত ব্যক্তির পরিচয় নিশ্চিত করেনি পুলিশ।
কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর ডেবোরা প্রেন্টিস এক সংক্ষিপ্ত বিবৃতিতে বলেন, ‘এ মর্মান্তিক খবর শুনে আমরা গভীরভাবে শোকাহত।’
আরডের পরিবার তাঁর একাডেমিক কাজ ও ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে ওঠা অভিযোগের পর যে ‘হয়রানির প্রচারণা’ চালানো হয়েছে, তার সমালোচনা করেছে।
২০২৩ সালে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে সবচেয়ে কম বয়সী কৃষ্ণাঙ্গ অধ্যাপক হওয়ার গৌরব অর্জন করেন আরডে। তবে কিছু শিক্ষাবিদ ও সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে তাঁর পিএইচডি বা ডক্টরেট গবেষণাপত্রের একাংশ চুরির অভিযোগ উঠলে তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি হয়।
সাইমন অ্যান্ড শুস্টার প্রকাশনীর মাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে পরিবারটি বলেছে, ‘এ মিথ্যা প্রচারণা জেসনের জন্য অসহনীয় হয়ে উঠেছিল। তিনি ছিলেন একজন কোমল স্বভাবের মানুষ, যিনি সব সময় সবার মধ্যে ভালো কিছু দেখতে চাইতেন।’
২০২৩ সালে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে সবচেয়ে কম বয়সী কৃষ্ণাঙ্গ অধ্যাপক হওয়ার গৌরব অর্জন করেন আরডে। তবে কিছু শিক্ষাবিদ ও সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে তাঁর পিএইচডি বা ডক্টরেট গবেষণাপত্রের একাংশ চুরির অভিযোগ উঠলে তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি হয়।
পরবর্তী সময়ে যুক্তরাজ্যের কিছু সংবাদপত্র ও কলামিস্ট বিষয়টিকে লুফে নেন। তাঁদের দাবি, ‘বৈচিত্র্য, সমতা ও অন্তর্ভুক্তি (ডিইআই)’ সংক্রান্ত নীতিমালার সুযোগ নিয়ে জেসন আরডে অন্যায়ভাবে ওই সুবিধা পেয়েছিলেন।
আপাতত এ মৃত্যুকে আকস্মিক বা অপ্রত্যাশিত হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে এর পেছনে কোনো রহস্য বা সন্দেহজনক কিছু আছে বলে মনে হচ্ছে না।বিভিন্ন অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তদন্ত শুরুর ঘোষণা দেয়। এর পরপরই ৫ আগস্ট জেসন আরডে অধ্যাপক পদ এবং জেসাস কলেজের ফেলোশিপ—উভয় জায়গা থেকেই পদত্যাগের ঘোষণা দেন।
ইন্টারনেটে পোস্ট করা এক চিঠিতে আরডে জানিয়েছিলেন, এ কঠিন সময় পার করার একমাত্র উপায় ছিল পদত্যাগ করা। তবে এ সিদ্ধান্তকে যেন কোনোভাবেই তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের স্বীকৃতি হিসেবে ধরে নেওয়া না হয়, সে বিষয়েও জোর দেন তিনি।
পত্রিকার দাবি ও পুলিশের বক্তব্য
লন্ডন অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিসের তথ্যের ভিত্তিতে শহরের ব্যাটারসি এলাকার এক বাড়ি থেকে একজনকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করার খবর পায় পুলিশ। এক বিবৃতিতে লন্ডন পুলিশ জানায়, দুর্ভাগ্যবশত ৪১ বছর বয়সী ওই ব্যক্তিকে ঘটনাস্থলেই মৃত ঘোষণা করা হয়।
অধ্যাপক আরডের ব্যক্তিগত জীবনসংশ্লিষ্ট কিছু দাবি নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। যেমন তিনি ৩৫ দিনে ৩০টি ম্যারাথনে অংশ নিয়েছিলেন এবং দাতব্য কাজের জন্য লাখ লাখ টাকা তহবিল সংগ্রহ করেছিলেন, যা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন অনেকে।
ইতিমধ্যে জেসন আরডের পরিবারকে বিষয়টি জানানো হয়েছে। মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে পুলিশ বলছে, আপাতত এ মৃত্যুকে আকস্মিক বা অপ্রত্যাশিত হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে এর পেছনে কোনো রহস্য বা সন্দেহজনক কিছু আছে বলে মনে হচ্ছে না।
ঘটনাটি খতিয়ে দেখছেন লন্ডন মেট্রোপলিটন পুলিশের সেন্ট্রাল সাউথ কমান্ড ইউনিটের কর্মকর্তারা।
যুক্তরাজ্যের শিক্ষামন্ত্রী লুসি পাওয়েল জেসন আরডের মৃত্যুর খবরে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। এ কঠিন সময়ে পরিবারটির ব্যক্তিগত গোপনীয়তার প্রতি শ্রদ্ধা দেখানোর আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা অন্যান্য ক্ষেত্রে মন্তব্য করার সময় এর পেছনে যে একটি পরিবার ও তাদের ভালোবাসার মানুষেরা জড়িয়ে আছেন, তা মনে রাখার অনুরোধ শিক্ষামন্ত্রীর।
যুক্তরাষ্ট্রের শিক্ষাবিদ এবং নিজেকে ‘রেস রিয়েলিস্ট’ বা জাতিগত বাস্তববাদী হিসেবে দাবি করা নাথান কফনাসের একটি লেখা গত জুলাইয়ে প্রকাশিত হওয়ার পর আরডেকে নিয়ে বিতর্ক আরও বাড়ে। কফনাসের বিরুদ্ধে বর্ণবাদের অভিযোগ ওঠায় ২০২৪ সালে কেমব্রিজের সঙ্গে তাঁর গবেষণার চুক্তি বাতিল হয়েছিল।
আরডের ডক্টরেট গবেষণাপত্রের একাধিক অংশ অন্য উৎস থেকে হুবহু নকল করা হয়েছে বলে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ তোলেন কফনাস। পরে ব্রিটিশ দৈনিক ‘দ্য টাইমস’ ও ‘টেলিগ্রাফ’ আরডের একাডেমিক কাজ ও ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে বেশ কয়েকটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করে।
অধ্যাপক আরডের ব্যক্তিগত জীবনসংশ্লিষ্ট কিছু দাবি নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। যেমন তিনি ৩৫ দিনে ৩০টি ম্যারাথনে অংশ নিয়েছিলেন এবং দাতব্য কাজের জন্য লাখ লাখ টাকা তহবিল সংগ্রহ করেছিলেন, যা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন অনেকে।
মৃত্যুর আগে যে বলে গেছেন এ অধ্যাপক
শিক্ষাবিদ জেসন আরডে তাঁর গবেষণাকর্মে ভুল হওয়ার কথা স্বীকার করেছিলেন। তবে তিনি কোনোভাবেই ‘মিথ্যাবাদী’ নন বলেও জোরালো দাবি করেন।
সম্প্রতি ব্রিটেনের জনস্বার্থমুখী আইনি সংগঠন ‘গুড ল প্রজেক্ট’-এর প্রকাশিত এক বিবৃতিতে অধ্যাপক আরডে বলেন, কেমব্রিজে অধ্যাপক হিসেবে নিয়োগ পাওয়াটা নিঃসন্দেহে তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় পেশাদার গৌরব ছিল। তবে এ নিয়োগের পর থেকে তিনি জনসমক্ষে ক্রমাগত কঠোর সমালোচনা ও ব্যক্তিগত আক্রমণের শিকার হচ্ছিলেন। এমন পরিস্থিতিতে তাঁর ব্যক্তিগত ক্ষতি ও মানসিক চাপ সামলানোর সীমা ছাড়িয়ে গেছে।
নিজের শিক্ষার্থী ও সহকর্মীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে জেসন আরডে বলেন, ‘আমার নিজের সুস্থতা, আমার পরিবার এবং এ কঠিন সময়ে যাঁরা আমার পাশে ছিলেন, তাঁদের কথা ভেবেই আমি এ সিদ্ধান্তে পৌঁছেছি যে এই অধ্যায়ের ইতি টানার একমাত্র উপায় হলো সরে দাঁড়ানো।’
আরডে আরও বলেন, ‘এটি আমার কাজের সমাপ্তি নয়।’ তিনি জানান, তাঁর এখন ‘সুস্থ হয়ে ওঠার জন্য কিছু সময়’ প্রয়োজন। সেই সময় এলে তিনি আবার ফিরবেন।
চৌর্যবৃত্তির বিতর্কে পদত্যাগ করলেন কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক