‘গামছার সঙ্গে হুক লাগিয়ে মেশিনের মাধ্যমে আমাকে ঝোলানো হয়’
· Prothom Alo
গুম করে রাখার সময় হ্যান্ডকাফ খুলে তাঁর হাতে গামছা বাঁধা হয় বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করেছেন চিকিৎসক আশিক উল আকবর। জবানবন্দিতে তিনি বলেন, সেই গামছার সঙ্গে একটি হুক লাগিয়ে মেশিনের মাধ্যমে তাঁকে ঝোলানো হয়। ওজন বেশি হওয়ায় ঝোলানোর ফলে তাঁর দুই হাতের বগলের নিচের চামড়া ছিঁড়ে যেতে থাকে।
Visit bettingx.bond for more information.
আওয়ামী লীগের শামনামলে র্যাবের টিএফআই সেলে (টাস্কফোর্স ফর ইন্টারোগেশন সেল) গুম করে রাখার ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার জবানবন্দিতে আশিক উল আকবর এসব কথা বলেন। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ আজ বৃহস্পতিবার এ মামলার ষষ্ঠ সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন তিনি। এই মামলার আসামি বর্তমান ও সাবেক ১২ সেনা কর্মকর্তাসহ ১৭ জন।
জবানবন্দিতে আশিক উল আকবর বলেন, ২০১৬ সালে তিনি রংপুর প্রাইম মেডিকেল কলেজের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। তিনি ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাথি ছিলেন। ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ফ্যাসিস্ট সরকারবিরোধী বিভিন্ন মিছিল-মিটিংয়ে নিয়মিত অংশ নিতেন তিনি। ২০১৩ সালে হেফাজতে ইসলামের ডাকে শাপলা চত্বরের সমাবেশে তিনি এসেছিলেন। শাপলা চত্বরের ওই ঘটনার পর বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হাসিনা ও তাঁর ফ্যাসিস্ট সরকার এবং ভারতবিরোধী বিভিন্ন পোস্ট করতেন।
এ অবস্থায় ২০১৬ সালের ২৩ মে রাতে তাঁর মামার বাড়ি গাজীপুরের টঙ্গী থেকে সাদাপোশাকধারীরা তাঁকে তুলে নেন বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন আশিক উল আকবর। তিনি বলেন, তুলে এনে তাঁকে যেখানে রাখা হয়, সেখানে খাবার খাওয়ার সময় এক হাতে হ্যান্ডকাফ খুলে দেওয়া হতো এবং চোখের বাঁধন কিছুটা ওপরে তুলে দিত। পেছনে একজন লাঠি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতেন। খেতে না চাইলে প্রচুর মারধর করত। তিন মিনিটের মধ্যে পায়খানা, প্রস্রাব ও গোসল শেষ করতে হতো। সময় বেশি লাগলে প্রচুর মারধর করত। সারা দিনে মাত্র দুবার টয়লেটে নিয়ে যাওয়া হতো। এর বেশি যেতে চাইলে মারধর করত। সেখানে থাকা অবস্থায় ট্রেন চলাচলের শব্দ শুনতে পেতেন।
জবানবন্দিতে আশিক উল আকবর বলেন, সেখানে থাকা অবস্থায় তাঁকে একদিন জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিয়ে যাওয়া হয়। জিজ্ঞাসাবাদে তাঁকে প্রচুর মারধর করে জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থাকার কথা স্বীকার করতে বলে। এতে রাজি না হওয়ায় তাঁকে ব্যাপক মারধর করা হয়। তখন তাঁর হাতের হ্যান্ডকাফ খুলে গামছা বাঁধা হয়। গামছার সঙ্গে একটি হুক লাগিয়ে মেশিনের মাধ্যমে ঝুলিয়ে রাখা হয়।
ওজন বেশি হওয়ায় ঝোলানোর ফলে তাঁর দুই হাতের বগলের নিচের চামড়া ছিঁড়ে যেতে থাকে উল্লেখ করে জবানবন্দিতে আশিক উল আকবর বলেন, তখন পাশ থেকে একজন বলেন, ‘স্যার, ও অনেক মোটা। মরে যাবে।’ তখন তাঁকে ঝোলানো অবস্থা থেকে নামানো হয়। নামিয়ে পুনরায় জঙ্গি সংগঠনের সদস্য হিসেবে স্বীকার করতে বলা হয় তাঁকে। তারপরও অস্বীকার করলে তাঁর দুই কানের লতিতে দেওয়া হয় ইলেকট্রিক শক। সে সময় তাঁর মনে হচ্ছিল, তিনি মরে যাচ্ছেন।
ট্রাইব্যুনালে এসব কথা বলে কান্না করেন সাক্ষী। আশিক উল আকবর বলেন, তখন তিনি মাথায় প্রচণ্ড ব্যথা অনুভব করেন এবং প্রচণ্ড ভয় পান। পরে তিনি বলেন, তারা (নির্যাতনকারীরা) যা বলবে, তিনি তাই স্বীকার করবেন। তখন নির্যাতনকারীরা তাঁকে একটি প্রিন্টেড কাগজ ও একটি সাদা কাগজ দেয়। আরও অত্যাচার হতে পারে, এই ভয়ে প্রিন্টেড কাগজে থাকা লেখা হুবহু খুব দ্রুত সাদা কাগজে লেখেন তিনি। সাদা কাগজে লেখা তাঁর জবানবন্দির ভিডিও স্বীকারোক্তিও নেওয়া হয়। সে সময় তাঁর ফেসবুক আইডি ও পাসওয়ার্ড নেওয়া হয়।
সেখানে সারাক্ষণ তাঁর চোখ বেঁধে ও দুই হাত পেছনের দিকে নিয়ে হ্যান্ডকাফ পরিয়ে রাখা হতো বলেও জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন এই চিকিৎসক। তিনি বলেন, একদিন চোখের বাঁধন ঢিলা হয়ে যায়। তখন একজন এসে খুব শক্ত করে তাঁর চোখে বাঁধন দেয়। এতে তাঁর ডান চোখে প্রচুর ব্যথা অনুভব করেন।
একদিন তাঁকে একটি বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট পরানো, চোখবাঁধা, জমটুপি পরানো হয় উল্লেখ করে আশিক উল আকবর বলেন, জমটুপির ওপর হেলমেট পরানো হয়। তারপর মাইক্রোবাসে করে অন্য জায়গায় নেওয়া হয়। একপর্যায়ে তাঁর হ্যান্ডকাফ ও চোখের বাঁধন খোলা হয়। গুম হওয়ার পর প্রথম সেদিন তিনি দিনের আলো দেখতে পান। তিনি দেখেন, অনেক ক্যামেরা তাঁর ছবি তুলছে। পরে ২০১৬ সালের ২১ জুলাই তিনিসহ মাহমুদুল হাসান, নাজমুস সাকিব ও শরিয়তুল্লাহ শুভর বিরুদ্ধে টঙ্গী থানায় একই ঘটনায় তিনটি মিথ্যা মামলা দেওয়া হয়।
দুই মাস গুম এবং ১৩ মাস জেলে থাকার পরে হাইকোর্টের আদেশে জামিনে মুক্ত হন উল্লেখ করেন আশিক উল আকবর। তিনি বলেন, ২০২৩ সালে তিনি এমবিবিএস ডিগ্রি অর্জন করেন। এই ঘৃণ্য নির্যাতনের জন্য শেখ হাসিনা, সাবেক প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিক, ফ্যাসিস্ট রেজিমের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং সে সময়ের র্যাব সদস্যদের সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করেন তিনি।
র্যাবের টিএফআই সেলে গুম করে রাখার ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের এ মামলার ১০ আসামি ঢাকা সেনানিবাসের সাবজেলে আছেন। তাঁরা হলেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. জাহাঙ্গীর আলম, তোফায়েল মোস্তফা সারোয়ার, মো. কামরুল হাসান, মো. মাহাবুব আলম এবং কে এম আজাদ, কর্নেল আবদুল্লাহ আল মোমেন ও আনোয়ার লতিফ খান (অবসর প্রস্তুতিমূলক ছুটিতে), লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. মশিউর রহমান, সাইফুল ইসলাম ও মো. সারওয়ার বিন কাশেম। আজ তাঁদের সাবজেল থেকে ট্রাইব্যুনালে এনে এজলাসে তোলা হয়।
এ মামলার আরও সাত আসামি পলাতক। তাঁরা হলেন শেখ হাসিনা, তাঁর সাবেক উপদেষ্টা তারিক আহমেদ সিদ্দিক, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান, র্যাবের সাবেক মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ (পরে আইজিপি হন), এম খুরশীদ হোসেন ও মো. হারুন অর রশিদ এবং লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) মুহাম্মাদ খায়রুল ইসলাম।