টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিক: আতঙ্ক নয়, দরকার সচেতনতা

· Prothom Alo

দেশি ও আমদানি করা বেশ কয়েকটি টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতির তথ্য প্রকাশের পর অনেকেই উদ্বিগ্ন। তবে ভয় নয়, প্রয়োজন বৈজ্ঞানিক তথ্য জানা এবং সচেতন সিদ্ধান্ত নেওয়া।

Visit truewildgame.com for more information.

সম্প্রতি দেশে টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিক নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (ইএসডিও)-এর এক গবেষণায় দেশি ও আমদানিকৃত কয়েকটি টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতির তথ্য উঠে এসেছে। গবেষণায় প্রতি ১০০ গ্রাম টুথপেস্টে ২০ থেকে ৩২০টি পর্যন্ত মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা শনাক্ত হয়েছে। প্রতিবেদনটি প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। অনেকের মনে প্রশ্ন—তাহলে কি বাজারে পাওয়া টুথপেস্ট নিরাপদ?

এই উদ্বেগ একেবারে অমূলক নয়। কারণ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্বের বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, খাদ্য, পানীয়, বাতাস, ধুলাবালি এমনকি কিছু প্রসাধনী সামগ্রীর মাধ্যমে মাইক্রোপ্লাস্টিক মানবদেহে প্রবেশ করতে পারে। রক্ত, ফুসফুস, লিভার, কিডনি, প্ল্যাসেন্টা, শুক্রাণু, মাতৃদুগ্ধ, এমনকি মস্তিষ্কের টিস্যুতেও মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতির তথ্য গবেষণায় উঠে এসেছে। যদিও এসব কণার দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যপ্রভাব নিয়ে এখনো গবেষণা চলছে, তবু বিষয়টি বিজ্ঞানীদের উদ্বেগের অন্যতম কারণ হয়ে উঠেছে।

কেন উদ্বেগ বাড়ছে?

মাইক্রোপ্লাস্টিক স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হতে পারে

মাইক্রোপ্লাস্টিক অত্যন্ত ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা, যা পরিবেশে দীর্ঘদিন টিকে থাকে এবং খাদ্যশৃঙ্খলের বিভিন্ন স্তরে প্রবেশ করতে পারে। গবেষণায় এসব কণার সঙ্গে কয়েকটি সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকির সম্পর্ক পাওয়া গেছে। যেমন—
• ধমনীর প্ল্যাকে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি থাকলে হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক ও মৃত্যুঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যেতে পারে।
• পুরুষের শুক্রাণুর গুণগত মান কমে যাওয়া এবং নারীর প্রজননস্বাস্থ্যে বিরূপ প্রভাবের সম্ভাবনার কথা বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে।
• ফুসফুসে প্রদাহ ও শ্বাসতন্ত্রের সমস্যার সঙ্গে এর সম্ভাব্য সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা চলছে।
• অন্ত্রের মাইক্রোবায়োমের পরিবর্তন, প্রদাহ এবং কোলন ক্যানসারের সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়েও বিজ্ঞানীরা কাজ করছেন।
• কিছু গবেষণায় ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের মস্তিষ্কে তুলনামূলক বেশি মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে, যদিও এর কারণ-সম্পর্ক এখনো নিশ্চিত নয়।
• অক্সিডেটিভ স্ট্রেস ও দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহের মাধ্যমে কিছু রোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে বলেও ধারণা করা হচ্ছে।
তবে মনে রাখতে হবে, এসব গবেষণার অনেকগুলোই এখনো চলমান। তাই মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি মানেই নির্দিষ্ট কোনো রোগ হবে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সময় এখনো আসেনি।

সমাধান কী?

মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ কোনো ব্যক্তি একা দূর করতে পারবেন না। এর জন্য প্রয়োজন কার্যকর সরকারি নীতি, উৎপাদক প্রতিষ্ঠানের দায়বদ্ধতা এবং পরিবেশবান্ধব উৎপাদনব্যবস্থা। একই সঙ্গে ভোক্তা হিসেবেও আমাদের সচেতন হতে হবে। অপ্রয়োজনীয় প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানো, পরিবেশবান্ধব পণ্য বেছে নেওয়া এবং প্রয়োজন হলে বিকল্প ব্যবহারের কথা ভাবা যেতে পারে।
অনেকে টুথপেস্টের পরিবর্তে ঘরে তৈরি টুথ পাউডার ব্যবহারের কথা ভাবছেন। প্রাকৃতিক কিছু উপাদান দিয়ে তৈরি এই মিশ্রণ মুখের পরিচর্যায় সহায়ক হতে পারে। তবে এটি ফ্লোরাইডযুক্ত টুথপেস্টের পূর্ণাঙ্গ বিকল্প নয়। দাঁতের ক্ষয় প্রতিরোধে ফ্লোরাইডের কার্যকারিতা এখনো সবচেয়ে বেশি বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত।
ঘরে তৈরি টুথ পাউডার কি বিকল্প হতে পারে?
যাঁরা প্রাকৃতিক উপাদান ব্যবহার করতে আগ্রহী, তাঁরা ঘরে তৈরি টুথ পাউডার ব্যবহার করতে পারেন। তবে এটি ফ্লোরাইডযুক্ত টুথপেস্টের বিকল্প নয়। বরং মুখের পরিচর্যায় একটি সহায়ক উপায় হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। দাঁতের ক্ষয় প্রতিরোধে ফ্লোরাইডের কার্যকারিতা এখনো সবচেয়ে শক্তিশালী বৈজ্ঞানিক প্রমাণ দ্বারা সমর্থিত।

ঘরে তৈরি টুথ পাউডারে সাধারণত চারটি উপাদান ব্যবহার করা যেতে পারে—হলুদ গুঁড়া, লবঙ্গ গুঁড়া, সোডিয়াম বাইকার্বোনেট (বেকিং সোডা) এবং পিংক সল্ট। প্রতিটি উপাদানেরই কিছু পরিচিত গুণ রয়েছে।

হলুদ গুঁড়া
হলুদের প্রধান সক্রিয় উপাদান কারকিউমিন (Curcumin) অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি ও অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল বৈশিষ্ট্যের জন্য পরিচিত। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, এটি মাড়ির প্রদাহ (জিঞ্জিভাইটিস) কমাতে এবং ডেন্টাল প্লাক নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে।

লবঙ্গ গুঁড়া
লবঙ্গের প্রধান উপাদান ইউজেনল (Eugenol) প্রাকৃতিক ব্যথানাশক, অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল ও প্রদাহনাশক হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহৃত হচ্ছে। এটি দাঁতের ব্যথা উপশমে সাহায্য করতে পারে এবং দাঁতের ক্ষয় সৃষ্টিকারী কিছু ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে কার্যকর বলে গবেষণায় উল্লেখ রয়েছে। ডেন্টিস্ট্রিতেও ইউজেনল দীর্ঘদিন ধরে অস্থায়ী ফিলিং ও ব্যথা উপশমের উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

সোডিয়াম বাইকার্বোনেট
বেকিং সোডা দাঁতের ওপর জমে থাকা চা, কফি বা তামাকের দাগ দূর করতে সাহায্য করে। এটি মুখের অম্লতা কমিয়ে ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধির অনুকূল পরিবেশ হ্রাস করতে পারে। কিছু গবেষণায় প্লাক অপসারণ এবং মাড়ির প্রদাহ কমাতেও এর ইতিবাচক ভূমিকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

পিংক সল্ট
পিংক সল্ট মূলত সোডিয়াম ক্লোরাইড। এতে অল্প পরিমাণে বিভিন্ন খনিজ উপাদান থাকে। এটি মৃদু পরিষ্কারক ও অ্যান্টিসেপটিক হিসেবে কাজ করতে পারে, যদিও এ বিষয়ে শক্তিশালী বৈজ্ঞানিক প্রমাণ সীমিত।

যেভাবে তৈরি করবেন

• এক চা-চামচ হলুদ গুঁড়া
• এক চা-চামচ লবঙ্গ গুঁড়া
• এক চা-চামচ সোডিয়াম বাইকার্বোনেট
• এক চা-চামচ পিংক সল্ট
চারটি উপাদান ভালোভাবে মিশিয়ে একটি পরিষ্কার ও শুকনো কাচের বয়ামে সংরক্ষণ করুন।

কীভাবে ব্যবহার করবেন

সকালে ও রাতে অল্প পরিমাণ পাউডার টুথব্রাশে নিয়ে দাঁত পরিষ্কার করতে পারেন। যাঁদের মাড়ির সমস্যা রয়েছে, তাঁরা আঙুলের সাহায্যে হালকাভাবে মাড়িতে ম্যাসাজ করতে পারেন। তবে জোরে ঘষা উচিত নয়।

কিছু সতর্কতা

• পাউডারের দানা অবশ্যই মিহি হতে হবে। অতিরিক্ত ঘষা দাঁতের এনামেল ক্ষয় করতে পারে।
• মাড়ি থেকে নিয়মিত রক্তপাত, দাঁতে তীব্র ব্যথা, ফোলা বা ক্যাভিটি থাকলে অবশ্যই দন্তচিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
• শিশুদের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এ ধরনের টুথ পাউডার ব্যবহার না করাই ভালো।
• যাঁরা ফ্লোরাইডযুক্ত টুথপেস্ট ব্যবহার করেন, তাঁরা এটি বিকল্প হিসেবে নয়, প্রয়োজনে পরিপূরক পরিচর্যার অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে পারেন।

শেষ কথা

মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ শুধু টুথপেস্টের সমস্যা নয়; এটি আমাদের সামগ্রিক জীবনযাত্রার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি বৈশ্বিক পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ। তাই প্রয়োজন আতঙ্ক নয়, সচেতনতা। প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানো, পরিবেশবান্ধব পণ্য বেছে নেওয়া এবং বৈজ্ঞানিকভাবে সমর্থিত স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করাই সবচেয়ে কার্যকর পথ।
মুখ ও দাঁতের সুস্বাস্থ্য রক্ষায় নিয়মিত ব্রাশ করা, সঠিক খাদ্যাভ্যাস এবং প্রয়োজন অনুযায়ী দন্তচিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার কোনো বিকল্প নেই। প্রাকৃতিক উপাদান সহায়ক হতে পারে, কিন্তু বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত চিকিৎসা ও পরিচর্যার স্থান তারা পুরোপুরি নিতে পারে না।

লেখক: খাদ্য ও পথ্য বিশেষজ্ঞ; প্রধান নির্বাহী, প্রাকৃতিক নিরাময় কেন্দ্র
ছবি: পেকেজেলসডটকম

Read full story at source