কারারক্ষী থেকে কারা গবেষক

· Prothom Alo

১৯৮৪-৮৫ সালের কথা। ছাদ নষ্ট হয়ে বৃষ্টির পানিতে রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারের পাঠাগারের সব বই নষ্ট হয়ে গেল। চোখের সামনে বই নষ্ট হয়ে যেতে দেখে ভীষণ কষ্ট পেলেন পড়াশোনায় আগ্রহী কারারক্ষী খোসবর আলী। ব্রিটিশ আমলের আইনে বন্দীদের ‘অমানবিক’ শাস্তি দেখে কারাগারের আইনকানুন সম্পর্কে জানার জন্য আগ্রহ তৈরি হয় এই কারারক্ষীর। গবেষণার জন্য দুই বছর আগেই চাকরি ছেড়ে দেন।

Visit michezonews.co.za for more information.

দেশ-বিদেশ থেকে বহু বই সংগ্রহ করে সারা দুনিয়ার কারাগার নিয়ে গবেষণা করেন খোসবর আলী। এ নিয়ে লিখে ফেলেছেন ৬০০ পৃষ্ঠার একটি গবেষণাগ্রন্থ। সম্প্রতি তাঁর প্রকাশিত কারাগারে অনুসন্ধান নামের এই বইয়ের প্রকাশনা উৎসবের আয়োজন করা হয়েছে ঢাকার বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে। আজ বৃহস্পতিবার হবে এই প্রকাশনা উৎসব।

অবসরের পর লেখালেখি

১৯৯৯ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পর লেখালেখি শুরু করেন খোসবর আলী। ২০০১ সালে রাজশাহী থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক দুনিয়ায় কারাগারের অনিয়ম নিয়ে ধারাবাহিকভাবে লিখতে থাকেন। খোসবর আলীর ভাষ্য, বিভিন্ন অনিয়ম নিয়ে লেখায় কারা কর্তৃপক্ষ ও সংক্ষুব্ধ ঠিকাদারের লোকজন তাঁকে খুঁজে বেড়াতে থাকেন। এ সময় তাঁকে ছয় মাস আত্মগোপনেও থাকতে হয়। তারপর পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলো নিয়ে বাংলাদেশের কারাব্যবস্থা শিরোনামে একটি বই প্রকাশিত হয়।

ব্রিটিশ আমলের আইনে কারাবন্দীদের ওপর ‘অমানবিক’ আচরণ খোসবর আলীকে পীড়া দিত। এরপর কারা আইন সম্পর্কে জানার আগ্রহ জাগে তাঁর।

২০১৫ সালে বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমিতে বিসিএস ৩৩ ব্যাচের সহকারী পুলিশ সুপারদের ‘পেনোলজি’ পড়িয়েছেন। একই বছর অতিথি শিক্ষক হিসেবে একই বিষয়ে মওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়িয়েছেন খোসবর আলী।

কারাগারবিষয়ক গ্রন্থ ছাড়াও নওগাঁ জেলার ইতিহাস ও ভাষা আন্দোলন নিয়ে খোসবর আলীর তিনটি গবেষণাগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। রয়েছে একটি কাব্যগ্রন্থও। তিনি এক ছেলে ও এক মেয়ের জনক। ছেলে–মেয়ে ও ছেলের স্ত্রী—তিনজনই চিকিৎসক।

কারারক্ষী হওয়ার গোড়ার কথা

খোসবর আলীর জন্ম ১৯৬০ সালে নওগাঁ জেলার গুজিশহর গ্রামে। তাঁর বাবা ছিলেন কৃষক। ১৬ বিঘা জমি ছিল তাঁর। ধান উঠলে উঠান ভরে যেত; কিন্তু মহাজনের ঋণ শোধ করার পর হাতে তেমন কিছুই থাকত না। কোনোরকমে সংসার চালাতেন তিনি। বাবার এই কষ্ট সহ্য হতো না খোসবর আলীর।

খোসবর আলী ভারত ও ইংল্যান্ড থেকে দুর্লভ বই সংগ্রহ করেছেন। ভাতিজা লন্ডন থেকে বই পাঠান। এখন অনলাইনে যেগুলো পাওয়া যায়, ডাউনলোড করে নেন।

এসএসসি পাসের পর ১৯৭৬ সালে রাজশাহীতে এসে খোসবর শুনলেন কারাক্ষী পদে লোক নিয়োগ হবে। তিনি গিয়ে লাইনে দাঁড়ালেন। ১০ জনের মধ্যে ৯ জনকেই নিয়ে নিল। খোসবরের ভাষ্য, ‘নকশাল এলাকায়’ বাড়ি বলে তাঁকে নেওয়া হলো না। তখন একজন কর্মকর্তা বললেন, ‘ছেলেটা ছোট। তার বাবার নাম ও আমার নাম একই।’ এ কথা শুনে ডিআইজি প্রিজন তাঁকে চাকরিতে নিয়ে নিলেন। এরপর ওই বছরের ৭ জুলাই মাসিক ১৪৫ টাকা বেতনে চাকরিতে যোগদান করেন তিনি।

কারাগারের অভিজ্ঞতা থেকে গবেষণায় আগ্রহ

খোসবর বলেন, ব্রিটিশ আমলের আইনে কারাবন্দীদের ওপর ‘অমানবিক’ আচরণ তাঁকে পীড়া দিত। এরপর কারা আইন সম্পর্কে জানার আগ্রহ জাগে তাঁর। এ জন্য কাজ শেষে নগরের শাহ্ মখমুদ লাইব্রেরি ও নগরের মনিবাজার পাবলিক লাইব্রেরিতে (এখন নেই) গিয়ে পড়তেন। কারাগার থেকে বই নেওয়ার সুযোগ পেতেন না।

মহসিনুল হক, কুমিল্লার জেলা ও দায়রা জজকারাগারে প্রবেশমাত্রই কীভাবে একজন মানুষ তার মর্যাদা হারিয়ে ফেলত, কীভাবে তার শরীরের প্রতিটি অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নথিভুক্ত হয়ে যেত রাষ্ট্রীয় নজরদারির অধীনে—এই বর্ণনাগুলো পাঠককে ইতিহাসের পাতা থেকে সরাসরি সেই বন্দিশালার ভেতরে নিয়ে যায়।

১৯৮২ সালে তৎকালীন আইজি প্রিজন কর্নেল মকসুল হোসেন চৌধুরী খোসবর আলীর কাজে সন্তুষ্ট হয়ে তাঁকে দাপ্তরিক কাজ দেওয়ার জন্য ডিআইজিকে বলে দেন। তার পর থেকেই খোসবর আলীর পড়াশোনার দরজা খুলে যায়। এর কিছুদিন পর তৎকালীন ডিআইজি প্রিজন এ এইচ এম ছিদ্দিকুর রহমান রাজশাহীতে যোগ দেন। তিনি তাঁকে বই পড়ার সুযোগ করে দেন। এমনকি ঢাকা আর্কাইভস থেকে বই বা গবেষণা তথ্য নেওয়ার জন্য বলে দিতেন। এ ছাড়া ভারত ও ইংল্যান্ড থেকে তিনি দুর্লভ বই সংগ্রহ করেছেন। ভাতিজা লন্ডন থেকে বই পাঠান। এখন অনলাইনে যেগুলো পাওয়া যায়, ডাউনলোড করে নেন।

‘এটি নীরব যন্ত্রণার দলিল’

কারাগারে অনুসন্ধান বইটি ইতিমধ্যেই পড়েছেন কুমিল্লার সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ মহসিনুল হক। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘এটি শুধু একটি ইতিহাসের বই নয়, এটি এক দীর্ঘ নীরব যন্ত্রণার দলিল।’ তিনি আরও বলেন, ‘গ্রন্থটির কেন্দ্রীয় যুক্তি খুবই সুস্পষ্ট। কারাগার কেবল অপরাধীকে সংশোধনের জায়গা ছিল না; বরং এটি ছিল ঔপনিবেশিক অর্থনৈতিক শোষণ ও রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার একটি সুপরিকল্পিত কৌশল। কারাগারে প্রবেশমাত্রই কীভাবে একজন মানুষ তার মর্যাদা হারিয়ে ফেলত, কীভাবে তার শরীরের প্রতিটি অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নথিভুক্ত হয়ে যেত রাষ্ট্রীয় নজরদারির অধীনে—এই বর্ণনাগুলো পাঠককে ইতিহাসের পাতা থেকে সরাসরি সেই বন্দিশালার ভেতরে নিয়ে যায়।’

Read full story at source