ডাইনোসর দেখতে কেমন ছিল, বিজ্ঞানীরা কীভাবে জানলেন
· Prothom Alo

২০১৫ সালের অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্রের সাউথ ডাকোটা রাজ্যে ৬৬ মিলিয়ন বছর পুরোনো একটি ডাইনোসরের জীবাশ্ম পাওয়া যায়। দুই পায়ে হাঁটা এই শিকারি প্রাণীর পুরো গা পালকে ঢাকা ছিল এবং চোয়ালে ছিল ধারালো দাঁত। খুব দ্রুত দৌড়াতে পারা এই প্রাণীর রঙিন ছবি তখন সারা বিশ্বে আলোড়ন ফেলে দেয়।
Visit casino-promo.biz for more information.
বিজ্ঞানীরা এই ডাইনোসরের নাম দেন ডাকোটার্যাপটর। এদের পেছনের পায়ের দ্বিতীয় আঙুলে কাস্তের মতো বাঁকানো বড় নখ ছিল। এরা লম্বায় প্রায় পাঁচ মিটার ও একজন মানুষের চেয়ে কিছুটা উঁচু হতো। জনপ্রিয় ভেলোসির্যাপটর ডাইনোসরের মতো এরাও ছিল ভীষণ চটপটে ও শিকারি প্রজাতির।
আজকাল বিজ্ঞানীরা যেভাবে ডাইনোসরের হাড় দেখে পুরো শরীরের রূপ ফুটিয়ে তোলেন, তা দেখে মনে হয় কাজটা কতই–না সহজ। কিন্তু লাখ লাখ বছর আগে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া এই প্রাণীগুলো আসলে দেখতে কেমন ছিল, তা তাঁরা কীভাবে বের করলেন? আমরা যদি আগে থেকে না চিনে কেবল একটি জেব্রা কিংবা জলহস্তীর কঙ্কাল দেখে অনুমান করতে যেতাম, তবে সেই কল্পনার সঙ্গে আসল প্রাণীর চেহারা কখনোই মিলত না। জলহস্তীর গায়ের মোটা চর্বির স্তর কিংবা জেব্রার গায়ের সুন্দর ডোরাকাটা দাগ শুধু কঙ্কাল দেখে বোঝা সত্যিই অসম্ভব। তাহলে বিজ্ঞানীরা কীভাবে ডাইনোসর দেখতে কেমন ছিল বের করলেন?
আইনের ডিগ্রি ছাড়াই ২৬ মামলায় জয়, গ্রেপ্তার হলেন যেভাবেপ্রাগৈতিহাসিক কাল থেকেই মানুষ মাটির নিচে পাওয়া অদ্ভুত সব প্রাণীর হাড় দেখে এদের দেখতে কেমন ছিল তা কল্পনা করার চেষ্টা করত। পুরোনো দিনের অনেক রূপকথার পেছনেও হয়তো ছিল এই ডাইনোসরের হাড়। খ্রিষ্টপূর্ব ১১০০ অব্দে চীনের লেখায় যে ড্রাগনের কথা বলা হয়েছে, তা হয়তো কোনো ডাইনোসরের জীবাশ্ম দেখেই কল্পনা করা হয়েছিল। আবার প্রাচীন গ্রিসের গল্পে ঈগল ও সিংহের সংমিশ্রণে তৈরি গ্রিফিন নামের যে কাল্পনিক প্রাণীর কথা পাওয়া যায়, তা হয়তো ঠোঁটওয়ালা প্রোটোসেরাটপস ডাইনোসরের হাড় দেখে মানুষ বানিয়েছিল।
শিল্পীর তুলিতে ‘পাখির মতো’ ডাইনোসরআগেকার দিনে মাটির নিচে অদ্ভুত কোনো হাড় পেলে মানুষ তাদের জানা ধারণা থেকেই প্রাণীর শরীর কেমন ছিল তা অনুমান করত। ফলে মাঝেমধ্যে কিছু ভুল হিসাবও হতো। ১৭৬৩ সালে রিচার্ড ব্রুকস নামের এক ব্রিটিশ চিকিৎসক ডাইনোসরের পায়ের একটি ভাঙা হাড় খুঁজে পান। কিন্তু তিনি সেটাকে ভেবেছিলেন ধর্মীয় গ্রন্থের গল্পের কোনো দৈত্যের শরীরের হাড়।
আমরা এখন জানি ডাক্তার ব্রুকসের ভুল ধারণা করা সেই পায়ের হাড়টি আসলে ছিল মেগালোসরাস ডাইনোসরের। ১৮২৪ সালে বিজ্ঞানী উইলিয়াম বাকল্যান্ড এটিকে একটি বিলুপ্ত সরীসৃপ হিসেবে সঠিকভাবে শনাক্ত করেন। তবে ব্রুকসকে পুরোপুরি দোষ দেওয়া যায় না। কারণ, ১৮৪২ সালের আগে ডাইনোসর নামটিরই কোনো অস্তিত্ব ছিল না।
শুরুতে ডাইনোসরদের কুমির বা টিকটিকির মতো ভাবা হলেও ১৯৬০-এর দশকে বিজ্ঞানী জন অস্ট্রম জানান, এরা মূলত পাখিদের মতো চটপটে ও উষ্ণ রক্তবিশিষ্ট প্রাণী ছিল। ১৯৯৬ সালে চীনে পালকযুক্ত ডাইনোসরের জীবাশ্ম পেয়ে তাঁর এই দাবি সত্যি প্রমাণিত হয়।
পৃথিবীর বিরলতম গুহামাছের খোঁজ মিলেছেআজকাল বিজ্ঞানীরা ডাইনোসরের কোনো হাড় পেলে পাখি, কুমির বা মানুষের কঙ্কালের সঙ্গে তুলনা করে সেগুলো সঠিক ক্রমে সাজান। কোনো হাড় নিখোঁজ থাকলে সমগোত্রীয় অন্যান্য ডাইনোসরের হাড়ের সঙ্গে মিলিয়ে সেই শূন্যস্থান পূরণ করা হয়। হাড় ও দাঁতের সূক্ষ্ম গঠন দেখে বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারেন প্রাণীটি কীভাবে হাঁটত বা শিকার করত। এভাবেই কঙ্কালের হাড়গুলোকে নিখুঁতভাবে বিশ্লেষণ করে বিলুপ্ত ডাইনোসরদের মূল চেহারা ফুটিয়ে তোলা সম্ভব হয়।
শিল্পীর কল্পনায় সরোপড ডাইনোসরডাইনোসরের কেবল হাড় খুঁজে পেলেই এর পুরো চেহারা জানা যায় না। একটি ডাইনোসর সত্যি দেখতে কেমন ছিল, তা বুঝতে হলে এর হাড়ের সঙ্গে পেশি, চর্বি ও চামড়ার হিসাব মেলাতে হয়।
সে জন্য এখনকার বেঁচে থাকা প্রাণীদের মাংসপেশি কীভাবে হাড়ের সঙ্গে যুক্ত থাকে, তা দেখে বিজ্ঞানীরা ডাইনোসরের শরীরের পেশি আঁকেন। ডাইনোসরের কঙ্কালের হাড়ে পেশি আটকে থাকার বিশেষ কিছু দাগ থাকে। সেই দাগ দেখে বোঝা যায় পেশিটি কতটা শক্ত ও বড় ছিল। ডিপ্লোডোকাসের মতো বিশাল ডাইনোসরের মেরুদণ্ডের পেশি এদের শরীরকে দীর্ঘ করতে সাহায্য করত। আজকাল থ্রিডি মডেলের মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারেন এই বিশাল ডাইনোসরগুলো কীভাবে হাঁটত বা খাবার চিবাত।
এরপর হাড়ের ওপর চামড়া, আঁশ কিংবা খোলস কল্পনা করে এদের চেহারা দেওয়া হয়। এডমন্টোসরাসের মতো গাছপালা খাওয়া ডাইনোসরের জীবাশ্মে কুমির বা টিকটিকির মতো আঁশযুক্ত চামড়ার ছাপ পাওয়া গেছে। আবার অ্যাঙ্কাইলোসরের মতো কিছু ডাইনোসরের গায়ে হাড়ের তৈরি শক্ত বর্ম ও কাঁটা থাকত, যা এদের অন্যান্য শিকারি প্রাণীর আক্রমণ থেকে বাঁচাত।
এভারেস্টে চড়া এত বিপজ্জনক কেনগাছপালা খাওয়া কিছু ডাইনোসরের চিবানোর দাঁতের চারপাশে হয়তো গাল ছিল। এই গাল খাবার চিবানোর সময় মুখ থেকে পড়ে যাওয়া আটকাত। আবার ট্রাইসেরাটপসের মতো কিছু ডাইনোসরের মুখে ছিল পাখির মতো শক্ত ঠোঁট।
বিজ্ঞানীদের মতে, ডাইনোসরের হাড়গোড় ছাড়া আর কিছুই কোটি কোটি বছর ধরে টিকে থাকতে পারে নাতৃণভোজী ডাইনোসরের গায়ে আঁশ থাকলেও মাংসাশী ডাইনোসরদের শরীর প্রায় নরম পালকে ঢাকা থাকত। চীনের লিয়াওনিং এলাকায় পাওয়া ৫০ প্রজাতি ডাইনোসরের জীবাশ্ম থেকে জানা গেছে, এদের শরীরে ছোট ছোট তুলতুলে পালক থেকে শুরু করে ওড়ার বড় পালকও ছিল। ভেলোসিরাপটর ও ডাকোটার্যাপটরের হাতের হাড়ে ডানার পালক আটকে থাকার দাগ পাওয়া গেছে, যা প্রমাণ করে এদের হাতে ছোট ডানা ও পালক ছিল।
বিজ্ঞানীদের দেওয়া তথ্যের ওপর ভিত্তি করেই শিল্পীরা ডাইনোসরের ছবি আঁকেন। বর্তমানে ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপ ব্যবহার করে ডাইনোসরের চামড়া ও পালকের আসল রং বের করার চেষ্টা চলছে। জীবাশ্মের ভেতরের রঙের কণা পরীক্ষা করে ইতিমধ্যে জানা গেছে কিছু প্রাগৈতিহাসিক সামুদ্রিক প্রাণীর পিঠ ছিল কালো আর পেট ছিল সাদা বা ফ্যাকাশে।
বিজ্ঞানীদের বহু বছরের গবেষণার তথ্য আর আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে বিজ্ঞানীরা ডাইনোসরেরা আসলে দেখতে কেমন ছিল আগের চেয়ে অনেক বেশি সঠিকভাবে জানতে পারছেন।
সূত্র: সায়েন্স ফোকাস, ডিসকভার ম্যাগাজিনপূর্ণিমায় কেন মন আবেগপ্রবণ হয়