স্থানীয় ডাল-ছোলা থেকে বিশ্বস্বীকৃত
· Prothom Alo

দেশীয় উপাদান দিয়ে শিশু অপুষ্টির চিকিৎসায় যুগান্তকারী পথ দেখিয়েছেন আইসিডিডিআরবি-র নির্বাহী পরিচালক ড. তাহমিদ আহমেদ। চার দশকের গবেষণায় তিনি প্রমাণ করেছেন—অপুষ্টির সমাধান শুধু খাবারে নয়, লুকিয়ে আছে অন্ত্রের স্বাস্থ্যেও। সম্প্রতি এশিয়ান সায়েন্টিস্ট-এর সেরা ১০০ বিজ্ঞানীর তালিকায় উঠে এসেছে তাঁর নাম। বিশ্বমঞ্চে প্রশংসিত এই বাংলাদেশি বিজ্ঞানীর অনন্য বিজ্ঞানযাত্রার গল্প...
Visit bettingx.bond for more information.
চার দশক আগে চিকিৎসক হিসেবে কাজ শুরু করেছিলেন। তখনই তাহমিদ আহমেদ দেখেছিলেন, অপুষ্টি দেশের একটা বড় সমস্যা। শুধু শিশুদের নয়, নারীদেরও। বিশেষ করে যাঁরা সন্তানসম্ভবা। তীব্র অপুষ্টির জন্য অনেক শিশুকে চোখের সামনে মরে যেতে দেখেছেন। তখন নিজেকে অসহায় মনে হতো। ঠিক করলেন, কিছু একটা করা দরকার। যে চিকিৎসা আছে এর চেয়ে নতুন কিছু করা দরকার। আর চিকিৎসাটা সহজ করা দরকার।
দারিদ্র্য এবং তার অনিবার্য ফসল অপুষ্টি বাংলাদেশে অনেক আগে থেকে আছে। এটা শুধু বাংলাদেশের নয়, বিশ্বের অনেক দেশের সমস্যা। আজও। শুধু অপুষ্টি নয়, তাহমিদ আহমেদ দেখছেন, পুষ্টিকর খাবার খাওয়ানোর পরও অনেক শিশু স্বাভাবিকভাবে বেড়ে ওঠে না। তীব্র অপুষ্টিতে আক্রান্ত শিশুরা চিকিৎসা পায়, বিশেষ পুষ্টিকর খাবারও খায়। তবু অনেকের বৃদ্ধি কাঙ্ক্ষিত হয় না। তাহলে কি সমস্যা শুধু খাবারের অভাব নয়? শরীরের ভেতরে এমন কোনো প্রক্রিয়া আছে, যা ঠিকমতো কাজ না করলে পুষ্টিকর খাবারও পুরোপুরি কাজে লাগে না?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে তিনি ও তাঁর সহযোগীরা শুধু একটি নতুন খাদ্য তৈরি করেননি, সেই সঙ্গে শিশু অপুষ্টির চিকিৎসার ধারণাকেই নতুনভাবে ভাবার পথ দেখিয়েছেন।
বাংলাদেশের ডাল, ছোলা, সয়াবিন, চিনাবাদাম ও কাঁচা কলার মতো সহজলভ্য উপাদান ব্যবহার করে বাংলাদেশে তাঁর নেতৃত্বে তৈরি হয়েছে এমন একটি উদ্ভাবন, যা এখন আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান অঙ্গনে আলোচিত। এই গবেষণার স্বীকৃতিস্বরূপ সম্প্রতি আইসিডিডিআরবির নির্বাহী পরিচালক তাহমিদ আহমেদ স্থান পেয়েছেন এশিয়ান সায়েন্টিস্ট প্রকাশিত এশিয়ার সেরা ১০০ বিজ্ঞানীর তালিকায়। এটি শুধু একজন গবেষকের ব্যক্তিগত অর্জন নয়; বাংলাদেশের গবেষণাগারে জন্ম নেওয়া একটি বৈজ্ঞানিক ধারণার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও। তাহমিদ আহমেদের এমন স্বীকৃতি নতুন নয়। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক খ্যাতনামা সাময়িকী টাইম তাদের ২০২৫ সালের ‘বিশ্ব স্বাস্থ্য খাতে প্রভাবশালী ১০০ ব্যক্তি’র তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে তাঁকে।
এশিয়ার সেরা ১০০ বিজ্ঞানীর তালিকায় বাংলাদেশের ৩ নক্ষত্রতাহমীদ আহমেদ বলেন, ‘তীব্র অপুষ্টির শিকার শিশুরা অনেক তাড়াতাড়ি মারা যায়। আপনি যদি একজন ভালো শিশুর তুলনা করেন, তবে এই তীব্র অপুষ্টির শিকার শিশুর মারা যাওয়ার ঝুঁকি ১২ গুণ বেশি।’
স্থানীয় উপাদানে প্রথম সাফল্য
ড. তাহমিদ আহমেদের গবেষণাজীবনের কেন্দ্রবিন্দু শিশু অপুষ্টি। দক্ষিণ এশিয়াসহ বিশ্বের বহু দেশে তীব্র অপুষ্টিতে আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসায় দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহার করা হচ্ছে রেডি টু ইউজ থোরাপিউটিক ফুড (আরইউটিএফ)। রান্না ছাড়াই খাওয়া যায়, দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করা যায় এবং দ্রুত অপুষ্টি কাটিয়ে উঠতে সহায়তা করে, এমন বিশেষ খাদ্য। কিন্তু এই খাদ্যের বড় অংশই বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। ফলে ব্যয় যেমন বেশি, তেমনি সরবরাহেও থাকে অনিশ্চয়তা।
এই বাস্তবতা থেকেই শুরু হয় স্থানীয় বিকল্প তৈরির চেষ্টা। এই চেষ্টা অস্বাভাবিক ছিল না। কেননা ড. তাহমিদ আহমেদ সেই দেশের গবেষক, যে দেশের অন্তত দেড় কোটি শিশু এখনো খর্বকায় কিংবা কৃশকায়। তা এই অপুষ্টির কারণেই। আর দেশের অন্তত চার লাখ শিশু এখনো তীব্র অপুষ্টিতে ভোগে। এই তীব্র অপুষ্টিতে ভুগলে কী হয়?
তাহমীদ আহমেদ বলেন, ‘তীব্র অপুষ্টির শিকার শিশুরা অনেক তাড়াতাড়ি মারা যায়। আপনি যদি একজন ভালো শিশুর তুলনা করেন, তবে এই তীব্র অপুষ্টির শিকার শিশুর মারা যাওয়ার ঝুঁকি ১২ গুণ বেশি।’
বাংলাদেশের আনাচকানাচে অপুষ্টির শিকার শিশু ছড়িয়ে আছে। এদের প্রত্যেককেই হাসপাতালে এনে চিকিৎসা করানো জটিল। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এর কোনো প্রয়োজন নেই। তাদের চিকিৎসাটা করতে হবে বাসার মধ্যে।
দেশের প্যাকেটজাত খাবার অস্বাস্থ্যকর, পুষ্টি উপাদানে গড়মিল: গবেষণাড. তাহমিদ আহমেদ সেই দেশের গবেষক, যে দেশের অন্তত দেড় কোটি শিশু এখনো খর্বকায় কিংবা কৃশকায়। তা এই অপুষ্টির কারণেই। আর দেশের অন্তত চার লাখ শিশু এখনো তীব্র অপুষ্টিতে ভোগে।
এ জন্য তাঁরা দুই ধরনের কাজ করেন। অপুষ্টির শিকার শিশুর জন্য খাবার তৈরিতে প্রথম বিবেচ্য বিষয় ছিল, এসব শিশুকে এমন একটা খাবার দিতে হবে, যে খাবারটা অল্প পরিমাণ দিলেই হবে। আর এতে আমিষ, শর্করা, চর্বি এবং সেই সঙ্গে অনুপুষ্টির উপাদান যেন থাকে, তা নিশ্চিত করা। আর খাবারটা এমন যেন হয়, যাতে সে তীব্র অপুষ্টি থেকে সে বেরিয়ে আসে।
তাহমিদ আহমেদ বলেন, ‘এ ধরনের খাবার বিশ্বের অন্যান্য দেশে আছে। কিন্তু আমরা চিন্তা করলাম আমাদের খাবারটা তৈরি করতে হবে দেশীয় উপাদান দিয়ে। কাঁচা কলা, ছোলার ব্যবহার হলো। আমরা তৈরি করলাম স্বর্ণালি নামে খাবার।’
স্বর্ণালিতে দুই ধরনের জিনিস আছে। একটা হচ্ছে চাল এবং ডাল, আরেক ধরনের স্বর্ণালি আমরা তৈরি করি ছোলা দিয়ে। এটা প্রায় হালুয়ার মতো।
এই খাবার অল্প পরিমাণ শিশুদের দিলেই এক থেকে দেড় মাসে শিশু তীব্র অপুষ্টি থেকে বের হয়ে ভালো শিশু হয়ে যায়। এটার নাম তাঁরা দিয়েছেন স্বর্ণালি। কেননা যে শিশু তীব্র অপুষ্টিতে ভুগছে, সে তার স্বর্ণালি দিনগুলো হারিয়ে ফেলছে। কারণ তীব্র অপুষ্টি। ড. তাহমিদরা এভাবে লাখো শিশুর স্বর্ণালি দিন ফিরিয়ে দিতে চান।
কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরে এই স্থানীয়ভাবে তৈরি খাবারের কার্যকারিতা নিয়ে বড় পরিসরের গবেষণা সম্প্রতি শেষ হয়েছে। গবেষণার ফলাফল বলছে স্বর্ণালি শিশুদের তীব্র অপুষ্টি নিরাময়ে সফল।
দেশের ৭৫ শতাংশ মাটিতে পুষ্টি উপাদানের ঘাটতিস্বর্ণালিতে দুই ধরনের জিনিস আছে। একটা হচ্ছে চাল এবং ডাল, আরেক ধরনের স্বর্ণালি আমরা তৈরি করি ছোলা দিয়ে। এটা প্রায় হালুয়ার মতো।
শুধু খাবার নয়, দরকার সুস্থ মাইক্রোবায়োম
তবে ড. তাহমিদ আহমেদের সবচেয়ে আলোচিত গবেষণার শুরু আরেকটি প্রশ্ন থেকে। তিনি লক্ষ করছিলেন, একই ধরনের পুষ্টিকর খাবার পেলেও সব শিশুর সমান উন্নতি হচ্ছে না। সেই প্রশ্ন নিয়েই তাঁর আলোচনা হয় যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি ইন সেন্ট লুইসের অধ্যাপক ড. জেফ্রি গর্ডনের সঙ্গে। গর্ডন তখন মানুষের অন্ত্রে থাকা অণুজীব বা গাট মাইক্রোবায়োম নিয়ে গবেষণা করছিলেন। তাহমিদ আহমেদের মনে হলো, যদি অন্ত্রের জীবাণু স্থূলতার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে, তাহলে অপুষ্টির ক্ষেত্রেও নিশ্চয়ই এর ভূমিকা আছে।
সেই আলোচনা থেকেই শুরু হয় বহু বছরের যৌথ গবেষণা।
মানুষের অন্ত্রে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন অণুজীব বাস করে। এদের সম্মিলিতভাবে বলা হয় গাট মাইক্রোবায়োম। একসময় ধারণা ছিল, এরা শুধু খাবার হজমে সাহায্য করে। কিন্তু আধুনিক গবেষণা দেখিয়েছে, মানুষের বিপাকক্রিয়া, মস্তিষ্কের বিকাশ এবং শিশুর স্বাভাবিক বৃদ্ধির সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত।
তাহমিদ আহমেদ এবং তাঁর সহযোগীদের গবেষণার দুটি বড় এলাকা ঢাকার মিরপুরের বস্তি এবং উত্তরবঙ্গের কুড়িগ্রামের কিছু অঞ্চল। এই দুই এলাকার তাঁরা দেখেছেন, শিশু ও তাদের পরিবারের মধ্যে নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধির বড় ঘাটতি রয়েছে। আট–নয় মাস বয়সে শিশুরা হামাগুড়ি দিতে শুরু করলে মাটি ও বিভিন্ন জিনিস স্পর্শ করে হাতে জীবাণু লাগে। পরে সেই হাত মুখে দেওয়ার মাধ্যমে জীবাণু অন্ত্রে প্রবেশ করে। পাকস্থলীর অম্লীয় পরিবেশে বেশির ভাগ জীবাণু টিকে থাকতে না পারলেও নিচের অন্ত্রে পৌঁছে সেগুলো বাসা বাঁধতে পারে এবং ক্ষতি করতে পারে।
পুষ্টিমানুষের অন্ত্রে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন অণুজীব বাস করে। এদের সম্মিলিতভাবে বলা হয় গাট মাইক্রোবায়োম। একসময় ধারণা ছিল, এরা শুধু খাবার হজমে সাহায্য করে।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, অপুষ্টিতে আক্রান্ত শিশুদের ক্ষুদ্রান্ত্রের জেজুনাম অংশে এমন জীবাণুর উপস্থিতি পাওয়া যায়, যেখানে স্বাভাবিক অবস্থায় সেগুলোর থাকার কথা নয়। এসব জীবাণু অন্ত্রে প্রদাহ সৃষ্টি করে। ফলে অন্ত্রের ভেতরের আঙুলের মতো সূক্ষ্ম গঠন (ভিলাই), যা খাবারের পুষ্টি শোষণের কাজ করে, ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে পুষ্টি উপাদান ঠিকমতো শোষিত হতে পারে না। ফলে পর্যাপ্ত ও পুষ্টিকর খাবার খাওয়ানো হলেও অনেক শিশু অপুষ্টিতে ভোগে।
এই গবেষণা থেকে গবেষকেরা উপসংহারে পৌঁছেছেন যে অপুষ্টি শুধু খাদ্যের অভাবের কারণে নয়; নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধির ঘাটতিও এর অন্যতম প্রধান কারণ। মিরপুরে পরিচালিত এই গবেষণার ফলাফল আন্তর্জাতিক স্বীকৃত বৈজ্ঞানিক সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে এবং বিষয়টি এখন বিশ্বজুড়ে গবেষকদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু। এই অন্ত্রজনিত সমস্যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ‘এন্টারোপ্যাথি' বলা হয়।
এই বাস্তবতা সামনে রেখে ড. তাহমিদ আহমেদ ও ড. জেফ্রি গর্ডনের গবেষক দল এমন একটি খাদ্য তৈরির সিদ্ধান্ত নেয়, যা অন্ত্রের উপকারী ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধি ঘটাতে পারে। তাঁরা সরাসরি ব্যাকটেরিয়া শরীরে প্রবেশ করানোর পথ বেছে নেননি। বরং স্থানীয়ভাবে সহজলভ্য ছোলার আটা, সয়াবিনের আটা, চিনাবাদামের পেস্ট, কাঁচা কলাসহ বিভিন্ন উপাদান দিয়ে তৈরি করেন মাইক্রোবায়োটা–ডিরেক্টেড কমপ্লেমেন্টরি ফুড–২ বা এমডিসিএফ–২। এর উদ্দেশ্য ছিল অন্ত্রে আগে থেকেই থাকা উপকারী অণুজীবের বৃদ্ধি ঘটিয়ে শিশুর শরীরকে পুষ্টি আরও কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে সহায়তা করা।
পুষ্টি পেলেই পুষ্টস্থানীয়ভাবে সহজলভ্য ছোলার আটা, সয়াবিনের আটা, চিনাবাদামের পেস্ট, কাঁচা কলাসহ বিভিন্ন উপাদান দিয়ে তৈরি করেন মাইক্রোবায়োটা–ডিরেক্টেড কমপ্লেমেন্টরি ফুড–২ বা এমডিসিএফ–২।
বিশ্ববিজ্ঞানের স্বীকৃতি
এমডিএফসিএফ–টু–এর কার্যকারিতা নিয়ে বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ বৈজ্ঞানিক সাময়িকীগুলোতে একের পর এক গবেষণা প্রকাশিত হয়েছে। ২০১৯ সালে সায়েন্স সাময়িকীতে প্রকাশিত গবেষণায় দেখা যায়, এটি অন্ত্রের প্রয়োজনীয় উপকারী ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যা বাড়াতে সক্ষম। ২০২১ সালে দ্য নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অব মেডিসিন–এ প্রকাশিত গবেষণায় দেখা যায়, মাঝারি মাত্রার তীব্র অপুষ্টিতে আক্রান্ত শিশুদের বৃদ্ধি, রোগ প্রতিরোধক্ষমতা এবং শরীরের গুরুত্বপূর্ণ জৈব সূচকে উল্লেখযোগ্য উন্নতি ঘটে। পরে নেচার–এ প্রকাশিত গবেষণায় বিজ্ঞানীরা ব্যাখ্যা করেন, এমডিএফসিএফ–টু–এর কোন উপাদান কীভাবে নির্দিষ্ট ব্যাকটেরিয়ার মাধ্যমে কাজ করে। পরবর্তী অনুসরণমূলক গবেষণায় আরও দেখা গেছে, চিকিৎসা শেষ হওয়ার দুই বছর পরও শিশুদের বৃদ্ধিতে এর ইতিবাচক প্রভাব বজায় থাকতে পারে।
বর্তমানে ভারত, পাকিস্তান, মালি ও তানজানিয়ায় এমডিএফসিএফ–টু-এর বড় পরিসরের আন্তর্জাতিক ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল চলছে। গবেষণাগুলো সফল হলে এটি বিভিন্ন দেশের সরকার ও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা সম্ভব হবে।
এমডিএফসিএফ–টু কে ঘিরে আন্তর্জাতিক আগ্রহের আরেকটি কারণ হলো, এটি প্রচলিত প্রোবায়োটিকের মতো নয়। বাজারে অন্ত্রের স্বাস্থ্য ভালো রাখার দাবি করা নানা পণ্য পাওয়া যায়, কিন্তু সেগুলোর অনেকগুলোর কার্যকারিতা নিয়ে শক্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। এমডিএফসিএফ–টু বাইরে থেকে ব্যাকটেরিয়া শরীরে প্রবেশ করায় না; বরং অন্ত্রে আগে থেকেই থাকা উপকারী ব্যাকটেরিয়ার জন্য উপযুক্ত খাদ্য সরবরাহ করে। ফলে সেই ব্যাকটেরিয়াগুলোই বৃদ্ধি পেয়ে শরীরের বৃদ্ধি, মস্তিষ্কের বিকাশ এবং রোগ প্রতিরোধব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে সহায়তা করে।
খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তার নতুন সম্ভাবনা রঙিন চালমা–বাবার তিন সন্তানের সর্বশেষ আসিয়া। মা আসমা শুয়ে আছেন তার পাশে। জানান, সন্তান যে অপুষ্টিতে ভুগছে, এখানে এসে তা বুঝেছেন। এখন তার পুষ্টির জন্য করণীয় কী, তাও জানতে পেরেছেন।
স্থানীয় সমাধান, বৈশ্বিক সম্ভাবনা
রাজধানীর মহাখালীতে আইসিডিডিআরবির বিশাল ক্যাম্পাস। ঝকঝকে, তকতকে ভবনগুলোতে নিরন্তর গবেষণারত শত শত বিজ্ঞানী। এ প্রতিষ্ঠান যে কতভাবে এ দেশের মানুষের, আসলে বিশ্বের মানুষের উপকারে কাজ করছে, তার ইয়ত্তা নেই। এ প্রতিষ্ঠানের উদ্ভাবন ওরস্যালাইনের বিশ্বের কয়েক কোটি মানুষের প্রাণ বাঁচিয়েছে। জীবন সুরক্ষাকারী বিভিন্ন টিকা নিয়ে গবেষণা করে প্রতিষ্ঠান। জনস্বাস্থ্যের নানা দিক নিয়ে চলে কাজ। কিন্তু সবখানেই দেশে, দেশীয় পদ্ধতি প্রাধান্য পায়। ওরস্যালাইনের কথাই ধরুন, গুড়, লবণ আর পানি মিলিয়ে এক অনবদ্য সৃষ্টি প্রাণ রক্ষা করে।
এ প্রতিষ্ঠান সরাসরি চিকিৎসাসেবা দেয়। এর কলেরা হাসপাতালে গিয়ে দেখা গেল নানা বয়সী কত মানুষের। হাসপাতালের কাছেই আছে পুষ্টি পুনর্বাসন ইউনিট। কলেরা হাসপাতালে আসা অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের বিশেষ যত্নের জন্য সেখানে নিয়ে আসা হয়েছে। এমন এক রোগী আসিয়ার বয়স দেড় বছর। মা–বাবার তিন সন্তানের সর্বশেষ সে। মা আসমা শুয়ে আছেন আসিয়ার পাশে। জানান, সন্তান যে অপুষ্টিতে ভুগছে, এখানে এসে তা বুঝেছেন। এখন তার পুষ্টির জন্য করণীয় কী, তা–ও জানতে পেরেছেন। আর এসব খাদ্য যে নিজেদের আয়ত্তের মধ্যেই আছে, তা–ও জেনেছেন।
যেভাবে বাংলাদেশি বিজ্ঞানী ওরস্যালাইন তৈরি করলেনআইসিডিডিআরবি প্রতিষ্ঠানের উদ্ভাবন ওরস্যালাইনের বিশ্বের কয়েক কোটি মানুষের প্রাণ বাঁচিয়েছে। জীবন সুরক্ষাকারী বিভিন্ন টিকা নিয়ে গবেষণা করে প্রতিষ্ঠান। জনস্বাস্থ্যের নানা দিক নিয়ে চলে কাজ।
প্রতিষ্ঠানটি এভাবে চিকিৎসা দিচ্ছে, দিচ্ছে শিক্ষাও
তাহমিদ আহমেদের গবেষণার সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত এখানেই—বিশ্বমানের বিজ্ঞান সব সময় উন্নত দেশের গবেষণাগারে জন্ম নেয় না। কখনো কখনো তার সূচনা হয় বাংলাদেশের মতো একটি দেশের বাস্তব সমস্যাকে সামনে রেখে, স্থানীয় উপাদান দিয়ে সমাধান খোঁজার মধ্য দিয়ে। তাহমিদ আহমেদের পরিচয় তুলে ধরে এশিয়ান সায়েন্টিস্ট লিখেছে, ‘খর্বাকৃতি (স্টান্টিং), অপুষ্টি এবং সংক্রামক রোগ মোকাবিলায় নীতি ও কর্মসূচি প্রণয়নে ড. আহমেদের গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছে। তাঁর গবেষণালব্ধ প্রমাণের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা পুষ্টি ও স্বাস্থ্যবিষয়ক কার্যকর উদ্যোগ বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন নিম্ন আয়ের দেশে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর কাছে বৃহত্তর পরিসরে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হয়েছে।
দীর্ঘ কয়েক দশকের গবেষণা ও নীতিগত প্রচারণার মাধ্যমে তিনি বিশ্বের শিশুদের জীবনের সুস্থ সূচনা নিশ্চিত করতে বৈশ্বিক প্রচেষ্টাকে আরও শক্তিশালী করেছেন এবং বিশ্বব্যাপী পুষ্টির মানোন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছেন।’
লেখক: সাংবাদিক*লেখাটি ২০২৬ সালে বিজ্ঞানচিন্তায় জুলাই সংখ্যায় প্রকাশিতবনের পাখির খাদ্য ও পুষ্টি