পুলিশের এসকর্ট কী, কারা পান, বাতিল হওয়ায় ১৮ মন্ত্রীর নিরাপত্তা এখন কীভাবে হবে
· Prothom Alo

সামনে পুলিশের গাড়ি, হুটারের শব্দ করছে সতর্ক—এ দৃশ্য বলে দেয় গুরুত্বপূর্ণ কেউ যাচ্ছেন। ঢাকার সড়কে পুলিশের বিশেষ পাহারা বা এসকর্টের এমন দৃশ্য খুবই চেনা। তবে সেটাই এখন আলোচনায়।
Visit extonnews.click for more information.
এর কারণ সরকারের একটি সিদ্ধান্ত। সেটা হলো ১৮ জন মন্ত্রীর ‘এসকর্ট’ সুবিধা বাতিল। রাজধানীতে চলাচলের সময় এখন থেকে তাঁদের সামনে পুলিশের গাড়ি থাকবে না। কেবল ছয়জন মন্ত্রী ও একজন মন্ত্রী পদমর্যাদার উপদেষ্টা কেবল এই সুবিধা পাবেন।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) সূত্রে জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নির্দেশে ডিএমপি এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। জ্বালানি সাশ্রয়, পুলিশের যানবাহনের স্বল্পতা এবং প্রটোকলের বহর ছোট করার সরকারি অবস্থান মিলিয়েই সিদ্ধান্তটি নেওয়া হয়েছে। এর আগে প্রধানমন্ত্রী নিজেই তাঁর প্রটোকল কমিয়ে ফেলার সিদ্ধান্ত নেন।
এখন রাজধানীতে মন্ত্রীদের মধ্যে এসকর্ট সুবিধা বহাল থাকা ছয়জন মন্ত্রী ও একজন উপদেষ্টা হলেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর; স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ; অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী; সমাজকল্যাণ এবং মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন; পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান; বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ এবং মন্ত্রী পদমর্যাদার পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে মন্ত্রিসভায় প্রধানমন্ত্রী ছাড়াও ২৪ জন পূর্ণমন্ত্রী, ২৩ জন প্রতিমন্ত্রী, ৫ জন মন্ত্রী পদমর্যাদার উপদেষ্টা রয়েছেন। এ ছাড়া পাঁচ জন উপদেষ্টা রয়েছেন প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদায়।
সরকারের এ সিদ্ধান্তের অনেকেরই কৌতূহল—পুলিশের এই এসকর্ট সুবিধা কী, এই সুবিধার আওতায় কী কী থাকে, এই সুবিধা বাতিল করার ফলে কি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সব ধরনের নিরাপত্তা শেষ হয়ে যায়, চলুন খুঁজি তার উত্তর।
এসকর্ট সুবিধা কী
রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের চলাচলের সময় তাঁদের গাড়ির সামনে বা পাশে থাকা পুলিশি সুরক্ষার গাড়িকে এসকর্ট বা প্রটেকশন গাড়ি বলা হয়। এটি পুলিশের বিশেষ নিরাপত্তা ও প্রটোকল ব্যবস্থা। এই সুবিধার আওতায় রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করা, যানজটে দ্রুত পার হতে সাহায্য করা এবং অনাকাঙ্ক্ষিত ঝুঁকি এড়ানো।
রাজধানীতে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের এসকর্ট সুবিধা দেয় ডিএমপির প্রটেকশন বিভাগ। বিভাগটির তথ্য অনুযায়ী, সাধারণত প্রতিটি এসকর্ট গাড়িতে পাঁচ সদস্যের একটি পুলিশ দল থাকে। তাদের মধ্যে একজন উপপরিদর্শক (এসআই) এবং চারজন কনস্টেবল থাকেন। তাঁদের চলাচলের জন্য বরাদ্দ থাকে পুলিশের একটি গাড়ি। রাজধানীতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা মন্ত্রীর প্রয়োজন ও চলাচলের সূচি অনুযায়ী দলটি তাঁর গাড়ির সঙ্গে থাকে। এই এসকর্ট দলের বেতন-ভাতা এবং গাড়ির জ্বালানি খরচ মেটানো হয় সরকারি কোষাগার থেকে।
এসকর্ট কারা পান
ডিএমপির তথ্য অনুযায়ী, পুলিশের এসকর্ট সুবিধা সবার জন্য নির্ধারিত নয়। এটি মূলত রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি এবং বিশেষ ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের নিরাপত্তা মূল্যায়নের ভিত্তিতে দেওয়া হয়। কারা এই সুবিধা পাবেন, তা সরকার, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করে।
রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী ও মন্ত্রী পর্যাদার উপদেষ্টারা এই সুবিধা পান। আর প্রতিমন্ত্রীরা এসকর্ট সুবিধা পান না, শুধু বাসার নিরাপত্তা পান। আবার সব মন্ত্রী এই সুবিধা নেন না।
ছয় মন্ত্রী ও মন্ত্রী পদমর্যাদার এক উপদেষ্টাসহ বর্তমানে ১৮ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি পুলিশের এসকর্ট সুবিধা পাচ্ছেন। মন্ত্রীদের বাইরে অন্যরা হলেন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, সদ্য সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন, সাবেক প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস, ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল, বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান, বিরোধীদলীয় উপনেতা সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের, চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি, বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম, প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী, প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন।
নিয়ম অনুযায়ী, স্পিকার ও দুদক চেয়ারম্যানও এই সুবিধা পান। তবে বর্তমানে এই দুই পদে কেউ দায়িত্বে নেই।
এসব ব্যক্তির বাইরেও বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধান, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, খেলোয়াড়েরা বাংলাদেশে এলে সাময়িক সময়ের জন্য ‘ভিআইপি’ পদমর্যাদা ঘোষণা করে এই এসকর্ট সুবিধা দেওয়া হয়। নিরাপত্তা পরিস্থিতি বিবেচনায় কখনো কখনো কোনো সরকারি কর্মকর্তা বা গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিকেও সরকারি সিদ্ধান্তে এই সুবিধা দেওয়া হয়।
প্রটেকশন বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, প্রধানমন্ত্রীর এসকর্ট সুবিধা আগের চেয়ে কমিয়ে আনা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর বহরে আগে পুলিশের দুটি প্রটোকল গাড়ি থাকত। তিনি এখন সেই দুটি গাড়ি নিচ্ছেন না। প্রধানমন্ত্রীর মূল নিরাপত্তায় বিশেষ নিরাপত্তা বাহিনী (এসএসএফ) থাকছে। পুলিশের পক্ষ থেকে শুধু মোটর শোভাযাত্রার পাইলট (মোটরসাইকেল নিয়ে বহরে থাকেন) রাখা হয়েছে। সামনে ও পেছনে মোটরসাইকেলে দুজন করে মোট চারজন পুলিশ সদস্য দায়িত্ব পালন করেন।
রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা বিধান কী
রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তার ক্ষেত্রে মূল আইন হচ্ছে বিশেষ নিরাপত্তা বাহিনী (এসএসএফ) আইন, ২০২১। আইনের ৮(১) ধারায় বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী যেখানেই অবস্থান করুক না কেন, তাঁদের দৈহিক নিরাপত্তা দেওয়া এসএসএফের প্রধান দায়িত্ব। অর্থাৎ তাঁদের নিরাপত্তা শুধু ঢাকা কিংবা সরকারি সফরের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাঁরা সার্বক্ষণিক তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবেন। গোয়েন্দা সংস্থা এবং সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় তাঁরা নিরাপত্তা নিশ্চিত করবেন। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো এই সহায়তা দিতে বাধ্য।
এসকর্ট কীভাবে দেওয়া হয়
ঢাকা মহানগরের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী এবং রাষ্ট্রের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির জন্য এসকর্ট সুবিধা অনুমোদিত থাকলে তাঁর চলাচলসূচি অনুযায়ী প্রটেকশন বিভাগের গাড়ি ও দলের সদস্যরা সঙ্গে থাকেন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পুলিশ সদর দপ্তর বা ডিএমপির ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী এই বরাদ্দ দেওয়া, কমানো বা প্রত্যাহার করা হয়।
এর বাইরে গুরুত্বপূর্ণ এসব ব্যক্তির বাসার নিরাপত্তা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যক্তিপর্যায়েও এসকর্ট দেওয়া হয়।
ঢাকার বাইরে রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রী ঢাকার বাইরে গেলে এসএসএফের নেতৃত্বে সফরস্থলের পুলিশ, জেলা প্রশাসন, গোয়েন্দা সংস্থা ও অন্য সরকারি প্রতিষ্ঠান নিরাপত্তা পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে। মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী বা উপমন্ত্রীর ক্ষেত্রে অনুমোদিত সরকারি সফরসূচি সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসন ও পুলিশ কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়। সফরের গুরুত্ব, অনুষ্ঠানস্থল, রুট এবং সম্ভাব্য হুমকি বিবেচনায় স্থানীয় পুলিশ এসকর্ট ও অনুষ্ঠানস্থলের নিরাপত্তা দেয়।
সাধারণত প্রতিটি এসকর্ট গাড়িতে পাঁচ সদস্যের একটি পুলিশ দল থাকেএসকর্ট বাতিল হওয়া মন্ত্রীদের নিরাপত্তা এখন কীভাবে হবে
সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সম্প্রতি যে ১৮ জন মন্ত্রীর এসকর্ট প্রত্যাহার করা হয়েছে, তাঁদের মধ্যে রয়েছেন ধর্মমন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ; পরিবেশমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু; মুক্তিযুদ্ধবিষয়কমন্ত্রী আহমেদ আজম খান; সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী; ভূমিমন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনু; বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম রিতা; বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির; শ্রম ও প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী; তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন এবং কৃষি ও মৎস্যমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ।
এ ছাড়া পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনামন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু, আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান, গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের, শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন, স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন, তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলমের এসকর্টও প্রত্যাহার করা হয়েছে।
ডিএমপি বলছে, এসকর্ট সুবিধা বাতিল হলেও নিয়ম অনুযায়ী এসব মন্ত্রীর একজন গানম্যান ও হাউস গার্ড বহাল থাকবে। পাশাপাশি ঢাকার বাইরে সফরে গেলে প্রয়োজন অনুযায়ী সব মন্ত্রীর জন্য পুলিশের প্রহরা ও নিরাপত্তাব্যবস্থা বহাল থাকবে।
হঠাৎ কেন ১৮ মন্ত্রীর ‘এসকর্ট’ প্রত্যাহার, নেপথ্যে কীএসকর্ট দিতে গিয়ে পুলিশ কোন সংকটে
ডিএমপির প্রটেকশন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকায় ভিআইপি, কেপিআইভুক্ত বিভিন্ন স্থাপনার জন্য যে পরিমাণ পুলিশ সদস্য প্রয়োজন, তা নেই। সদস্যের ঘাটতির কারণে অতিরিক্ত ডিউটি করতে গিয়ে পুলিশ সদস্যদের শারীরিক ও মানসিক চাপ বাড়ছে। একই সঙ্গে যানবাহন সংকটও রয়েছে। ফলে কখনো কখনো একটি প্রটেকশন গাড়ি একজন মন্ত্রীকে পৌঁছে দিয়েই তড়িঘড়ি করে আরেকজনকে নিতে ছুটতে হয়।
এসকর্ট সুবিধা কমানোর ফলে মন্ত্রীদের নিরাপত্তায় নিয়োজিত প্রায় ৯০ পুলিশ সদস্যকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। আগে এ কাজে প্রায় ১২০ জন পুলিশ সদস্য যুক্ত থাকলেও এখন থাকছেন ৩০ থেকে ৩৫ জন। একই সঙ্গে এসকর্টের গাড়ির ব্যবহার ২৫টি থেকে কমে ৭টিতে নেমেছে। এ দায়িত্ব থেকে মুক্ত গাড়ি ও জনবল পুলিশের অন্য কাজে লাগানো হচ্ছে।
ডিএমপির প্রটেকশন বিভাগের উপকমিশনার মো. শাহরিয়ার আলম প্রথম আলোকে বলেন, ‘রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নিরাপত্তা দেওয়া পুলিশের নিয়মিত কাজের অংশ। তবে কিছু সংকটের কারণে এই দায়িত্ব পালনে পুলিশকে হিমশিম খেতে হচ্ছে। সংকট কেটে গেলে আরও নির্বিঘ্নে নিরাপত্তা সেবা দেওয়া সম্ভব হবে।’