স্বাস্থ্য, খাদ্য নাকি যাপন? দীর্ঘায়ুর রহস্যে চমকে দিচ্ছে দক্ষিণ কোরিয়ার নারীরা
· Prothom Alo

দীর্ঘ ও সুস্থ জীবন শুধু জিনগত সৌভাগ্যের বিষয় নয়, সঠিক যাপন, পুষ্টি, স্বাস্থ্যসেবা ও রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনারও ফল। নতুন গবেষণা বলছে, ২০৩০ সালের মধ্যেই দক্ষিণ কোরিয়ার নারীরা গড় আয়ুতে ৯০ বছরের ঐতিহাসিক মাইলফলক স্পর্শ করতে পারেন।
Visit umafrika.club for more information.
একসময় বিজ্ঞানীরা মনে করতেন, মানুষের গড় আয়ু ৯০ বছর ছোঁয়া প্রায় অসম্ভব। কিন্তু সেই ধারণাই এখন বদলে যাচ্ছে। গবেষকদের পূর্বাভাস বলছে, ২০৩০ সালের মধ্যে দক্ষিণ কোরিয়ার নারীরা বিশ্বের প্রথম জনগোষ্ঠী হতে পারেন, যাদের জন্মকালের গড় আয়ু ৯০ বছর অতিক্রম করবে। যদি তা সত্যি হয়, তবে এটি শুধু একটি পরিসংখ্যানগত সাফল্য নয়, বরং জনস্বাস্থ্য, পুষ্টি, শিক্ষা এবং সামাজিক উন্নয়নের দীর্ঘ কয়েক দশকের যাত্রার ফল।
এই পূর্বাভাসের ভিত্তি ২০১৭ সালে বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী চিকিৎসাবিষয়ক সাময়িকী দ্য ল্যানসেটে প্রকাশিত হয় একটি গবেষণা। লন্ডনের ইম্পেরিয়াল কলেজের গবেষক ভাসিলিস কন্টিস ও মাজিদ এজাতির নেতৃত্বে পরিচালিত গবেষণাটি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহযোগিতায় সম্পন্ন হয়। এতে বলা হয়েছিল, ২০৩০ সালের মধ্যে দক্ষিণ কোরিয়ার নারীদের গড় আয়ু ৯০.৮ বছরে পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে। তবে গবেষকরা এটিও স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন, এটি নিশ্চিত কোনো ভবিষ্যদ্বাণী নয়। বরং তাদের মডেল অনুযায়ী এই মাইলফলক স্পর্শ করার সম্ভাবনা ছিল ৫৭ শতাংশ।
গবেষণাটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে আরেকটি কারণে। দীর্ঘদিন ধরে জনসংখ্যাবিদদের একটি বড় অংশ বিশ্বাস করতেন, জাতীয় পর্যায়ে গড় আয়ু ৯০ বছর ছোঁয়া মানুষের জৈবিক সীমার কাছাকাছি। চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতি হলেও সেই সীমা অতিক্রম করা কঠিন হবে। কিন্তু নতুন বিশ্লেষণ সেই ধারণাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়।
গবেষকেরা কোনো একটি পরিসংখ্যানগত মডেলের ওপর নির্ভর করেননি। বরং ২১টি ভিন্ন পূর্বাভাস মডেল একত্র করে একটি উন্নত বায়েসিয়ান মডেল এনসেম্বল ব্যবহার করেন। সহজ ভাষায় বলতে গেলে, আবহাওয়ার পূর্বাভাসে যেমন একাধিক মডেলের ফলাফল মিলিয়ে সম্ভাব্য চিত্র তৈরি করা হয়, এখানেও তেমন পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছে। ফলে একটি মডেলের সীমাবদ্ধতা অন্য মডেলের মাধ্যমে ভারসাম্য পেয়েছে।
দক্ষিণ কোরিয়া কেন অন্য দেশগুলোর চেয়ে এগিয়ে?
এর উত্তর লুকিয়ে আছে কয়েক দশকের ধারাবাহিক নীতিগত উন্নয়নে। ১৯৮০-এর দশকের শেষ দিক থেকেই দেশটি প্রায় পুরো জনগোষ্ঠীর জন্য জাতীয় স্বাস্থ্যবিমা চালু করে। ফলে চিকিৎসাসেবা শুধু শহর বা উচ্চবিত্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। একই সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ, হৃদ্রোগ প্রতিরোধ, শৈশবের উন্নত পুষ্টি এবং নারীদের মধ্যে অত্যন্ত কম ধূমপানের হার দীর্ঘমেয়াদে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। গবেষকদের মতে, দক্ষিণ কোরিয়ার সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল উন্নয়নের সুফল সমাজের বড় অংশের কাছে পৌঁছে দেওয়া। শুধু আধুনিক হাসপাতাল নির্মাণ নয়, বরং সাধারণ মানুষের জন্য মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করাই তাদের সাফল্যের মূল চাবিকাঠি।
এই গল্পের আরেকটি দিকও আছে,যে দেশটি বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘজীবী নারীদের আবাসস্থল হতে পারে, সেই দেশেই জন্মহার এখন বিশ্বের সর্বনিম্নগুলোর একটি। প্রতি নারীর গড়ে একটি সন্তানেরও কম জন্ম দিচ্ছে। অর্থাৎ মানুষ দীর্ঘদিন বেঁচে থাকলেও নতুন প্রজন্মের সংখ্যা দ্রুত কমে যাচ্ছে। ফলে ভবিষ্যতে স্বাস্থ্যসেবা, পেনশন, কর্মক্ষম জনসংখ্যা এবং প্রবীণদের সামাজিক সুরক্ষা নিয়ে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি হতে পারে। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানও দেখায়, দক্ষিণ কোরিয়ার নারীদের গড় আয়ু ইতোমধ্যে ৮৬ থেকে ৮৭ বছরের মধ্যে পৌঁছেছে। কোভিড-১৯ মহামারির সময় কিছুটা স্থবিরতা এলেও পরে আবার ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা গেছে। তবে ২০৩০ সালের মধ্যে ৯০ বছরে পৌঁছাতে হলে আগামী কয়েক বছরেও একই গতিতে উন্নতি ধরে রাখতে হবে।
সব মিলিয়ে দক্ষিণ কোরিয়ার এই সম্ভাব্য অর্জন শুধু দীর্ঘজীবনের গল্প নয়। এটি দেখিয়ে দেয়, একটি দেশের মানুষের আয়ু বাড়াতে শুধু উন্নত চিকিৎসা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন সমতাভিত্তিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা, পুষ্টিকর খাদ্য, শিক্ষার সুযোগ, সচেতন জীবনযাপন এবং দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা। ২০৩০ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার নারীরা সত্যিই ৯০ বছরের গড় আয়ু অতিক্রম করবেন কি না, তা সময়ই বলে দেবে। তবে ইতোমধ্যেই তারা বিশ্বকে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিয়ে ফেলেছেন। মানুষের দীর্ঘ ও সুস্থ জীবনের ভিত্তি গড়ে ওঠে প্রতিদিনের ছোট ছোট নীতিগত সিদ্ধান্ত, সামাজিক সমতা এবং সবার জন্য মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার মধ্য দিয়েই।
সূত্র: স্পেস ডেইলি
ছবি: পেকজেলসডটকম