ঢাকার বাইরের ফ্রিল্যান্সারদের সংকট ও উত্তরণের পথ

· Prothom Alo

বিগত এক দশকে বাংলাদেশের অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানে সবচেয়ে বড় নীরব বিপ্লবটি ঘটিয়েছে তথ্যপ্রযুক্তি খাত। বিশেষ করে ফ্রিল্যান্সিং বা মুক্ত পেশা তরুণদের কাছে হয়ে উঠেছে আত্মকর্মসংস্থানের এক স্বাধীন আকাশ। ঘরে বসেই বৈশ্বিক বাজারের ডলার আয়ের এই হাতছানিতে সাড়া দিয়েছেন দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের তরুণেরাও। তবে এই সম্ভাবনার পেছনের গল্পটি সবার জন্য সমান নয়। রাজধানী ঢাকাকেন্দ্রিক ফ্রিল্যান্সাররা যেখানে নানা নাগরিক সুবিধা ও অবকাঠামোর সুবিধা পাচ্ছেন, ঠিক তার বিপরীতে দাঁড়িয়ে একবুক হতাশা আর সীমাহীন সংকট পার করছেন ঢাকার বাইরের জেলা, উপজেলা কিংবা গ্রামের ফ্রিল্যান্সাররা। মেধা ও ইচ্ছাশক্তি থাকা সত্ত্বেও কেবল ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে তাঁরা পিছিয়ে পড়ছেন প্রতিনিয়ত।

সমস্যার বৃত্তে প্রান্তিক ফ্রিল্যান্সাররা—

ঢাকার বাইরের একজন তথ্যপ্রযুক্তি-নির্ভর ফ্রিল্যান্সারের দিনলিপি আর ঢাকার ভেতরের ফ্রিল্যান্সারের দিনলিপিতে আকাশ-পাতাল তফাত। একজন প্রান্তিক ফ্রিল্যান্সারকে প্রতিদিন যেসব মৌলিক ও কাঠামোগত সংকটের মুখোমুখি হতে হচ্ছে।

Visit rouesnews.click for more information.

১. ইন্টারনেটের উচ্চমূল্য ও কচ্ছপগতি

ফ্রিল্যান্সিংয়ের মূল চালিকা শক্তি হলো উচ্চগতির ইন্টারনেট। ঢাকার বাইরে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সেবা এখনো অত্যন্ত সীমিত এবং শহর অঞ্চলের তুলনায় অনেক ব্যয়বহুল। জেলা বা উপজেলা পর্যায়ে যে ব্রডব্যান্ড পাওয়া যায়, তার সংযোগ প্রায়ই বিচ্ছিন্ন থাকে (ঘন ঘন লাইন ড্রপ)। বাধ্য হয়ে অনেককে মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহার করতে হয়, যার গতি যেমন কম, তেমনি খরচও আকাশচুম্বী। ক্লায়েন্টের সঙ্গে সরাসরি ভিডিও মিটিং করা কিংবা বড় কোনো ফাইল আপলোড–ডাউনলোড করার সময় ইন্টারনেটের এই লুকোচুরি ফ্রিল্যান্সারদের পেশাদারত্বকে মারাত্মকভাবে প্রশ্নের মুখে ফেলে।

নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]

২. মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা: লোডশেডিং

ঢাকার বাইরে বিদ্যুৎ–বিভ্রাট বা লোডশেডিং একটি নিত্যদিনের সঙ্গী। একজন ফ্রিল্যান্সার যখন ল্যাপটপ বা ডেস্কটপে গ্রাফিক ডিজাইন, সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট বা ডেটা অ্যানালাইসিসের মতো ভারী কাজ করেন, তখন হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে যাওয়া মানেই কাজের ছন্দপতন। জেনারেটর বা উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন আইপিএস (IPS) কেনার মতো আর্থিক সামর্থ্য শুরুর দিকে সবার থাকে না। ফলে সময়মতো (ডেডলাইন) কাজ জমা দিতে না পেরে অনেক ফ্রিল্যান্সার তাঁদের রেটিং হারান এবং বৈশ্বিক মার্কেটপ্লেস থেকে ছিটকে পড়েন।

৩. মেন্টরশিপ ও দক্ষ প্রশিক্ষণের অভাব

ইউটিউব বা গুগল দেখে প্রাথমিক কাজ শেখা গেলেও প্রফেশনাল লেভেলে কাজ করার জন্য দক্ষ মেন্টরশিপের প্রয়োজন হয়। ঢাকার বাইরে মানসম্মত আইটি ট্রেনিং ইনস্টিটিউট নেই বললেই চলে। যেসব প্রতিষ্ঠান আছে, সেগুলোর বেশির ভাগেরই পাঠ্যক্রম প্রাচীন এবং ট্রেইনারদের নিজেদেরই আন্তর্জাতিক বাজারে কাজের অভিজ্ঞতা নেই। ফলে প্রান্তিক তরুণেরা ভুল নির্দেশনার শিকার হয়ে ভুল পথে অর্থ ও সময় অপচয় করছেন।

৪. পেমেন্ট গেটওয়ের জটিলতা

আন্তর্জাতিক মার্কেটপ্লেস থেকে টাকা দেশে আনার ক্ষেত্রে এখনো ঢাকার বাইরের ফ্রিল্যান্সারদের ব্যাংকিং জটিলতায় পড়তে হয়। পেপাল (PayPal) এর মতো আন্তর্জাতিক পেমেন্ট গেটওয়ে সরাসরি না থাকায় থার্ড পার্টি অ্যাপের ওপর নির্ভর করতে হয়। এ ছাড়া স্থানীয় ব্যাংকগুলোর রেমিট্যান্স শাখাগুলো ঢাকার বাইরে ফ্রিল্যান্সিং আয়ের ওপর কর মওকুফ বা প্রণোদনা দেওয়ার সরকারি নিয়মগুলো সঠিকভাবে বুঝতে না পারায় ফ্রিল্যান্সারদের হয়রানির শিকার হতে হয়।

৫. সামাজিক স্বীকৃতি ও মানসিক একাকিত্ব

ঢাকার বাইরে এখনো ফ্রিল্যান্সিংকে একটি ‘স্থায়ী বা মর্যাদাপূর্ণ চাকরি’ হিসেবে দেখা হয় না। ‘সারা দিন কম্পিউটারের সামনে বসে কী করে?’—এমন সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি ও পারিবারিক চাপ তরুণদের মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তোলে। ঢাকার মতো সেখানে কোনো ‘কো-ওয়ার্কিং স্পেস’ বা ফ্রিল্যান্সারদের কমিউনিটি নেই, যেখানে বসে একে অপরের সঙ্গে অভিজ্ঞতা বিনিময় বা নেটওয়ার্কিং করা যায়। এই একাকিত্ব তাঁদের সৃজনশীলতাকে কমিয়ে দেয়।

সংকট উত্তরণের পথ: সমাধান কী?

ঢাকার বাইরের এই বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠীকে যদি আমরা ফ্রিল্যান্সিং ইকোসিস্টেমে পূর্ণাঙ্গভাবে যুক্ত করতে না পারি, তবে ডিজিটাল বাংলাদেশের সুফল অধরাই থেকে যাবে। এই সংকট দূরীকরণে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরি:

স্মার্ট ইন্টারনেট ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ–সংযোগ: উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত সুলভ মূল্যে উচ্চগতির ফাইবার অপটিক ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট নিশ্চিত করতে হবে। প্রান্তিক ফ্রিল্যান্সারদের জন্য বিশেষ ‘স্টুডেন্ট বা ফ্রিল্যান্সার ইন্টারনেট প্যাকেজ’ চালু করা যেতে পারে। পাশাপাশি ফ্রিল্যান্সার-অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

হাই-টেক পার্ক ও কো-ওয়ার্কিং স্পেসের বিস্তার: সরকারের শেখ কামাল আইটি ট্রেনিং ও ইনকিউবেশন সেন্টারগুলোর পরিধি আরও বাড়াতে হবে। প্রতিটি জেলা ও বড় উপজেলায় সরকারি বা বেসরকারি উদ্যোগে স্বল্পমূল্যে ‘কো-ওয়ার্কিং স্পেস’ বা ফ্রিল্যান্সিং জোন তৈরি করা দরকার, যেখানে ২৪ ঘণ্টা বিদ্যুৎ, উচ্চগতির ইন্টারনেট এবং কাজের পরিবেশ থাকবে।

মানসম্মত অনলাইন ও অফলাইন মেন্টরশিপ: ঢাকার সফল ও অভিজ্ঞ ফ্রিল্যান্সারদের মাধ্যমে প্রান্তিক পর্যায়ে হাইব্রিড (অনলাইন+অফলাইন) বুটক্যাম্প ও মেন্টরশিপ প্রোগ্রামের আয়োজন করতে হবে। শুধু বেসিক কম্পিউটার শিক্ষা নয়, অ্যাডভান্সড কোডিং, এআই টুলসের ব্যবহার এবং ক্লায়েন্ট কমিউনিকেশনের ওপর জোর দিতে হবে।

সহজ ব্যাংকিং ও ঋণ–সুবিধা: ঢাকার বাইরের স্থানীয় ব্যাংক কর্মকর্তাদের ফ্রিল্যান্সিং খাত সম্পর্কে সচেতন করতে হবে, যেন ফ্রিল্যান্সাররা সহজেই কার্ড বা অ্যাকাউন্ট সুবিধা পান। এ ছাড়া নতুনদের জন্য জামানতবিহীন ‘স্মার্ট ফ্রিল্যান্সার লোন’ বা স্টার্টআপ ফান্ড দেওয়া উচিত, যাতে তাঁরা ভালো মানের ল্যাপটপ ও আইপিএস কিনতে পারেন।

সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি: গণমাধ্যম ও স্থানীয় প্রশাসনের উদ্যোগে ফ্রিল্যান্সিংকে একটি সম্মানজনক পেশা হিসেবে তুলে ধরে প্রচার-প্রচারণা চালাতে হবে। সফল প্রান্তিক ফ্রিল্যান্সারদের পুরস্কৃত করলে পরিবার ও সমাজের দৃষ্টিভঙ্গিতে ইতিবাচক বদল আসবে।

ঢাকার বাইরের ফ্রিল্যান্সাররা কেবল নিজেদের ভাগ্যবদল করছেন না; বরং রেমিট্যান্স পাঠিয়ে দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করছেন। সুদূর কুড়িগ্রাম, রাঙামাটি কিংবা বরগুনার কোনো এক তরুণ যখন ভাঙা ঘরে বসে আমেরিকার কোনো করপোরেট অফিসের সফটওয়্যার তৈরি করেন, তখন তা শুধু তাঁর একার সাফল্য নয়—তা পুরো দেশের গৌরব। অবকাঠামোগত সামান্য একটু সহযোগিতা আর সঠিক দিকনির্দেশনা পেলে এই প্রান্তিক তরুণেরাই হয়ে উঠতে পারেন বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তি। মেধার কোনো ভৌগোলিক সীমানা নেই, এবার শুধু সুযোগটাকে সীমানাহীন করার পালা।

Read full story at source