বার্লিনের স্মৃতি: যেখানে দেয়াল ভেঙে ইতিহাস বদলেছিল-শেষ পর্ব
· Prothom Alo

ডিটারের ছোট্ট ফ্ল্যাটে তিন দিন—
ডিটারের ফ্ল্যাট ছিল হুমবোল্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের খুব কাছেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক ভবনগুলোর পাশে তার ছোট্ট বাসাটি ছিল সাধারণ, কিন্তু আন্তরিকতায় ভরা। সেই তিন দিন আমি পর্যটক নয়, বরং বন্ধুর ঘরের অতিথি হয়ে পূর্ব বার্লিনকে দেখেছিলাম। সকালে আমরা বেরিয়ে পড়তাম শহর ঘুরতে। মেট্রোরেল-উ-বান (U-Bahn), ট্রাম এবং হাঁটতে হাঁটতে দেখেছি বার্লিনের নানা ঐতিহাসিক স্থান।
Visit h-doctor.club for more information.
আলেকজান্ডার প্লাৎসের ব্যস্ততা, বার্লিন টেলিভিশন টাওয়ারের আকাশছোঁয়া অবয়ব, বার্লিন ক্যাথেড্রালের মহিমা—সবকিছুই আমাকে মুগ্ধ করেছিল। ডিটার শুধু স্থান দেখাত না, তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা গল্পও বলত। একটি শহরকে সত্যিকার অর্থে জানতে হলে তার রাস্তা দেখা যথেষ্ট নয়; জানতে হয় তার মানুষের স্মৃতিও। মিউজিয়াম আইল্যান্ড ছিল আমাদের অন্যতম গন্তব্য। সেখানে প্রবেশ করে মনে হয়েছিল, পৃথিবীর হাজার বছরের সভ্যতা যেন একই ছাদের নিচে এসে মিলিত হয়েছে। পেরগামন জাদুঘরের গ্রিক স্থাপত্য, প্রাচীন মিসরের নিদর্শন, ইসলামী শিল্পকলার সংগ্রহ—সবকিছু আমাকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছিল।
আমি প্রাণিবিদ্যার ছাত্র ছিলাম, তাই শুধু মানুষের ইতিহাস নয়, জীবনের বৈচিত্র্যও আমাকে সব সময় আকর্ষণ করত। জাদুঘরের প্রতিটি নিদর্শন দেখে মনে হচ্ছিল, মানুষও এক দীর্ঘ বিবর্তনের গল্পের অংশ, যে গল্পে সভ্যতা, সংস্কৃতি ও জ্ঞানের ধারাবাহিকতা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে প্রবাহিত হয়ে এসেছে। ডিটার না থাকলে হয়তো এ শহরকে এত গভীরভাবে দেখা সম্ভব হতো না। সে ছিল আমার গাইড, বন্ধু এবং এক অর্থে ইতিহাসের জীবন্ত ব্যাখ্যাকার। কিন্তু পূর্ব বার্লিনের শান্ত দিনগুলোতেও আমার মনে একটি প্রশ্ন বারবার ঘুরছিল—একই শহর, একই মানুষ, একই ইতিহাস; তবু কেন একটি অদৃশ্য দেয়াল তাদের আলাদা করে রেখেছে? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই কয়েক দিন পর আমি একা পাড়ি দিলাম পশ্চিম বার্লিনের পথে।
চেকপয়েন্ট চার্লি পেরিয়ে অন্য এক পৃথিবীতে
পূর্ব বার্লিনে কয়েক দিন কাটানোর পর একদিন সিদ্ধান্ত নিলাম পশ্চিম বার্লিনে যাব। এই যাত্রা আমার জন্য শুধু একটি শহর থেকে আরেকটি শহরে যাওয়া ছিল না; এটি ছিল একই নগরীর দুই ভিন্ন বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়া। কিন্তু ডিটার আমার সঙ্গে যেতে পারল না। পূর্ব জার্মানির নাগরিক হিসেবে তার জন্য পশ্চিম বার্লিনে প্রবেশ করা ছিল প্রায় অসম্ভব। যে শহর তার নিজের দেশেই অবস্থিত, সেই শহরের একটি অংশে যাওয়ার অধিকারও তার ছিল না। এ অদ্ভুত বাস্তবতা তখন আমার কাছে যতটা বিস্ময়কর মনে হয়েছিল, আজ এত বছর পর ভাবলেও ততটাই বেদনাদায়ক মনে হয়। বিদায় নেওয়ার সময় ডিটার শুধু মৃদু হেসে বলেছিল, ‘তুমি দেখে এসো। ফিরে এসে আমাকে সব বলবে।’ তার সেই হাসির মধ্যে ছিল বন্ধুত্ব, কৌতূহল এবং কোথাও যেন এক অদৃশ্য সীমাবদ্ধতার বেদনা।
ছবি: বার্লিন ক্যাথেড্রালআমার কাছে পূর্ব ও পশ্চিম জার্মানির উভয় অংশের ভিসা ছিল। নির্ধারিত দিনে আমি ট্রেনে উঠলাম পশ্চিম বার্লিনের উদ্দেশ্যে। মাত্র ২০ মিনিটের পথ। কিন্তু যতই সীমান্তের কাছাকাছি আসছিলাম, পরিবেশ ততই বদলে যাচ্ছিল। ট্রেন থামল। সশস্ত্র সীমান্তরক্ষীরা উঠে এল। তাদের সঙ্গে ছিল প্রশিক্ষিত কুকুর। প্রতিটি বগি, প্রতিটি যাত্রী, প্রতিটি লাগেজ সতর্কতার সঙ্গে পরীক্ষা করা হলো। বাতাসে ছিল একধরনের অস্বস্তিকর নীরবতা। মনে হচ্ছিল, একটি শহরের অভ্যন্তরে প্রবেশ করছি না; বরং দুটি ভিন্ন রাজনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যবর্তী এক অদৃশ্য প্রাচীর অতিক্রম করছি।
অবশেষে পৌঁছালাম চেকপয়েন্ট চার্লিতে। শীতল যুদ্ধের ইতিহাসে এই নাম যেন কিংবদন্তির মতো। পূর্ব ও পশ্চিম বার্লিনের সীমান্তে অবস্থিত এই চেকপয়েন্ট ছিল বিদেশি নাগরিক, কূটনীতিক ও বিশেষ অনুমতিপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের জন্য নির্ধারিত প্রবেশপথ। সীমান্ত কর্মকর্তার হাতে আমার পাসপোর্ট গেল। তিনি দীর্ঘক্ষণ সেটা পরীক্ষা করলেন। তারপর একটি ভারী ধাতব সিল দিয়ে পাসপোর্টে প্রবেশের অনুমতি চিহ্নিত করলেন। সেই ছোট্ট সিল তখন হয়তো কেবল একটি প্রশাসনিক চিহ্ন ছিল, কিন্তু আজও সেটি আমার কাছে ইতিহাসের একটি স্পর্শযোগ্য স্মৃতি। কারণ, সেই সিল আমাকে প্রবেশাধিকার দিয়েছিল এমন এক শহরের অংশে, যেখানে একই সময়ে স্বাধীনতা ও বিভাজন পাশাপাশি অবস্থান করছিল।
বার্লিনের স্মৃতি: যেখানে দেয়াল ভেঙে ইতিহাস বদলেছিল—পর্ব ১পশ্চিম বার্লিন: স্বাধীনতার দ্বীপ
বিভক্ত জার্মানির মানচিত্রে পশ্চিম বার্লিন ছিল এক অদ্ভুত বাস্তবতার শহর। চারদিকে পূর্ব জার্মানির ভূখণ্ডে ঘেরা, অথচ রাজনৈতিকভাবে পশ্চিমা বিশ্বের অংশ। যেন এক বিশাল প্রাচীরের ওপারে দাঁড়িয়ে থাকা স্বাধীনতার ছোট্ট এক দ্বীপ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ থেকে উঠে আসা এ শহর ধীরে ধীরে হয়ে উঠেছিল গণতন্ত্র, সংস্কৃতি ও আধুনিকতার প্রতীক।
চেকপয়েন্ট চার্লি পেরিয়ে পশ্চিম বার্লিনে প্রবেশ করতেই যেন এক ভিন্ন পরিবেশ অনুভব করলাম। রাস্তার দৃশ্য বদলে গেল। দোকানের জানালায় রঙিন বিজ্ঞাপন, ব্যস্ত পথচারী, আধুনিক গাড়ি, নিয়ন আলোর ঝলকানিসহ সবকিছুতেই ছিল একধরনের উন্মুক্ততা ও গতি। পূর্ব বার্লিনের নিয়ন্ত্রিত পরিবেশের সঙ্গে এর পার্থক্য ছিল স্পষ্ট। তখন বুঝলাম, রাজনৈতিক ব্যবস্থা মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে কত গভীরভাবে প্রভাবিত করতে পারে।
তবে পশ্চিম বার্লিনেও যুদ্ধের স্মৃতি মুছে যায়নি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল কাইজার ভিলহেল্ম মেমোরিয়াল চার্চ। যুদ্ধের বোমায় ক্ষতিগ্রস্ত এ গির্জাকে ইচ্ছাকৃতভাবে সম্পূর্ণ পুনর্নির্মাণ করা হয়নি। ধ্বংসপ্রাপ্ত মিনারটি রাখা হয়েছিল স্মৃতির প্রতীক হিসেবে যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যুদ্ধের ভয়াবহতা ভুলে না যায়। ধ্বংসস্তূপের মধ্যেও যে শান্তির আহ্বান থাকতে পারে, এ গির্জা তারই অসাধারণ উদাহরণ। পশ্চিম বার্লিনের একটি বিখ্যাত ডিপার্টমেন্ট স্টোর (KaDeWe) থেকে কিছু স্যুভেনির কিনে নিলাম এবং দুটি টি-শার্ট, একটি আমার জন্য ও আরেকটি ডিটারের জন্য। ডিপার্টমেন্ট স্টোরটি ছিল চোখে পড়ার মতো।
আজকের ঐক্যবদ্ধ বার্লিনের প্রাণচাঞ্চল্যের পেছনে সেই পশ্চিম বার্লিনের সংগ্রামের ইতিহাস লুকিয়ে আছে। ব্রান্ডেনবুর্গ গেট, রাইখস্টাগ কিংবা বার্লিন প্রাচীরের অবশিষ্টাংশের সামনে দাঁড়ালে তাই শুধু স্থাপত্য দেখা হয় না, অনুভব করা যায় একটি শহরের দীর্ঘশ্বাস, সাহস ও পুনর্জন্মের গল্প।
রাইখস্টাগ: ইতিহাসের ছাই থেকে উঠে দাঁড়ানো ভবন
বার্লিনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রাইখস্টাগ ভবন। জার্মানির সংসদ ভবন হিসেবে এটি শুধু রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান নয়; এটি জার্মান ইতিহাসের উত্থান-পতনের এক নীরব সাক্ষী। ১৯৩৩ সালে অ্যাডলফ হিটলার জার্মানির চ্যান্সেলর হওয়ার মাত্র এক মাসের মধ্যে রাইখস্টাগ ভবনে রহস্যজনক অগ্নিকাণ্ড ঘটে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে হিটলার বিরোধীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা সীমিত করা হয়, রাজনৈতিক বিরোধীদের দমন করা হয় এবং ধীরে ধীরে গণতান্ত্রিক কাঠামো ধ্বংস করে নাৎসি একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়।
রাইখস্টাগের সেই আগুন শুধু একটি ভবনের আগুন ছিল না; সেটি ছিল গণতন্ত্রের ওপর আঘাতের সূচনা। পরবর্তী ইতিহাস দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, হলোকস্ট এবং কোটি মানুষের দুর্ভোগ সেই অন্ধকার অধ্যায়ের সাক্ষ্য বহন করে। যুদ্ধের পর ক্ষতিগ্রস্ত রাইখস্টাগ দীর্ঘদিন পরিত্যক্ত ছিল। পরে পুনর্নির্মাণের মাধ্যমে এটি আবার জার্মান গণতন্ত্রের প্রতীক হিসেবে ফিরে আসে। বিশেষ করে এর আধুনিক কাচের গম্বুজটি আমাকে মুগ্ধ করেছিল। গম্বুজের ভেতর দাঁড়িয়ে নিচের সংসদ ভবনের দিকে তাকালে মনে হয়, গণতন্ত্র যেন জনগণের ওপর নজর রাখছে, ক্ষমতা যেন আর কখনো অন্ধকারের পথে না যায়।
বাল্টিকের নীল জলরেখায় ফিরে দেখা এক তরুণ গবেষকের দিনগুলোলাইপজিগ: সুর, সংস্কৃতি ও নিঃশব্দ জাগরণের শহর
বার্লিনে অবস্থানের সময় ডিটারের সঙ্গে এক দিনের জন্য লাইপজিগে যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল। এটি একটি ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ শহর। বার্লিন থেকে ট্রেনে প্রায় দেড় ঘণ্টার পথ। দূরত্ব খুব বেশি নয়, কিন্তু ইতিহাসের দিক থেকে লাইপজিগ যেন এক সম্পূর্ণ ভিন্ন জগতের দরজা খুলে দেয়। জার্মানির অনেক শহরের মতো লাইপজিগের সৌন্দর্য শুধু তার স্থাপত্যে নয়; বরং তার আত্মায়। এ শহরের রাস্তায় হাঁটলে মনে হয়, এখানে পাথরের ভবনগুলোর মধ্যেও যেন সংগীতের সুর, বইয়ের গন্ধ আর ইতিহাসের দীর্ঘশ্বাস মিশে আছে। লাইপজিগকে বলা হয় জার্মানির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক শহর। কয়েক শতাব্দী ধরে এটি ছিল ইউরোপের বাণিজ্য, শিক্ষা ও জ্ঞানচর্চার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। বিশেষ করে বই প্রকাশনা ও মুদ্রণশিল্পে এ শহরের অবদান অসাধারণ। বহু বিখ্যাত লেখক, দার্শনিক ও চিন্তাবিদ এ শহরের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
কিন্তু আমার কাছে লাইপজিগের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ছিল সংগীতের ইতিহাস। এ শহরের নাম উচ্চারণ করলেই প্রথমে মনে পড়ে যায় জোহান সেবাস্টিয়ান বাখের কথা। অষ্টাদশ শতাব্দীর এই মহান সংগীতজ্ঞ তাঁর জীবনের দীর্ঘ সময় লাইপজিগে কাটিয়েছেন। তিনি এখানে সেন্ট থমাস চার্চের সংগীত পরিচালক হিসেবে কাজ করেছিলেন এবং এখানেই তাঁর বহু অমর সৃষ্টি রচিত হয়েছিল। সেন্ট থমাস চার্চে দাঁড়িয়ে আমার মনে হয়েছিল, সময় যেন থেমে গেছে। কয়েক শত বছর আগে যে স্থানে বাখ দাঁড়িয়ে সংগীত সৃষ্টি করেছিলেন, আজও সে স্থান মানুষকে মুগ্ধ করে। তাঁর সুরের ধ্বনি যেন আজও শহরের পুরোনো দেয়াল ও গির্জার ঘণ্টাধ্বনির সঙ্গে মিশে আছে। সংগীতের মাধ্যমে একজন মানুষের চিন্তা, অনুভূতি ও আত্মার প্রকাশ কীভাবে শতাব্দী অতিক্রম করে মানুষের হৃদয়ে পৌঁছাতে পারে, বাখ তার এক অসাধারণ উদাহরণ। লাইপজিগের সঙ্গে আরেক মহান সংগীত প্রতিভার নাম জড়িয়ে আছে; ফেলিক্স মেন্ডেলসন। বাখের সংগীতকে নতুন করে বিশ্বের সামনে পরিচিত করার ক্ষেত্রেও তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। এ শহর যেন শুধু সংগীত সৃষ্টি করেনি; বরং সংগীতের ঐতিহ্যকে সংরক্ষণও করেছে।
ছবি: ব্রান্ডেনবুর্গ গেট- জার্মানির ঐক্য ও শান্তির অন্যতম জাতীয় প্রতীকতবে লাইপজিগের ইতিহাস শুধু শিল্প ও সংস্কৃতির নয়; এটি রাজনৈতিক পরিবর্তনেরও এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। ১৯৮৯ সালে পূর্ব জার্মানির সমাজতান্ত্রিক শাসনের বিরুদ্ধে যে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন শুরু হয়েছিল, তার অন্যতম কেন্দ্র ছিল লাইপজিগের সেন্ট নিকোলাস চার্চ। প্রতি সোমবার সেখানে প্রার্থনা সভার মাধ্যমে মানুষ স্বাধীনতা, মানবাধিকার ও গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের দাবি জানাতে শুরু করে। ধীরে ধীরে সেই আন্দোলন বিশাল গণ–আন্দোলনে পরিণত হয়, যা শেষ পর্যন্ত বার্লিন প্রাচীর পতনের পথ তৈরি করে। অর্থাৎ যে পূর্ব জার্মানিকে আমি ১৯৮২ সালে দেখেছিলাম, তার ভেতরেই কয়েক বছর পর পরিবর্তনের বীজ অঙ্কুরিত হয়েছিল। ইতিহাসের পরিবর্তন কখনো হঠাৎ ঘটে না; মানুষের দীর্ঘদিনের আকাঙ্ক্ষা ও সাহসের মধ্য দিয়েই তার জন্ম হয়। ডিটারের সঙ্গে লাইপজিগের সেই ছোট্ট ভ্রমণের সময় অবশ্য আমরা ভবিষ্যতের এ পরিবর্তনের কথা জানতাম না। আমরা শুধু দেখেছিলাম একটি সুন্দর শহর, তার সংগীত, স্থাপত্য এবং মানুষের জীবন।
শহরের আরেকটি আকর্ষণ ছিল লাইপজিগ চিড়িয়াখানা। প্রাণিবিদ্যার ছাত্র হিসেবে আমার কাছে এটি ছিল বিশেষ আনন্দের জায়গা। বই ও গবেষণাপত্রে দেখা বহু প্রাণীকে জীবন্ত অবস্থায় দেখার অভিজ্ঞতা ছিল একেবারেই ভিন্ন। পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের প্রাণীদের বৈচিত্র্য দেখে আবারও উপলব্ধি করেছিলাম, প্রকৃতি কত অসীম সৃজনশীল। বিজ্ঞান আমাকে জীবনের বিবর্তন বুঝতে শিখিয়েছে আর ভ্রমণ আমাকে সেই জীবনের বৈচিত্র্য অনুভব করতে শিখিয়েছে।
লাইপজিগ থেকে ফেরার সময় ট্রেনের জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে ভাবছিলাম, একটি শহরকে শুধু তার বর্তমান দিয়ে বিচার করা যায় না। প্রতিটি শহরের ভেতরে লুকিয়ে থাকে বহু শতাব্দীর গল্প। লাইপজিগও তেমনই, যেখানে বাখের সংগীত, মানুষের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা এবং ইতিহাসের পরিবর্তনের ধারা একই সুরে মিলিত হয়েছে।
৩০ বছর পরে: ফিরে দেখা বার্লিন
মনে হয়, এই তো সেদিনের কথা; অথচ সময়ের অদৃশ্য স্রোতে তত দিনে ত্রিশটি বছর নিঃশব্দে পেরিয়ে গেছে। ২০১২ সালে আবার যখন বার্লিনে ফিরে এলাম, তখন সেই শহর আর আগের মতো নেই। ১৯৮২ সালে ব্রান্ডেনবুর্গ গেটের আশপাশ ছিল এক নীরব, ভীতিকর এলাকা। সেখানে ছিল প্রহরী, কাঁটাতার ও বিভাজনের কঠোর বাস্তবতা। পশ্চিম পাশে ছিল বার্লিন প্রাচীর। দূরে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকত সোভিয়েত ও মার্কিন ট্যাংক; শীতল যুদ্ধের উত্তেজনার নীরব প্রতীক। আর ২০১২ সালে? সেই একই জায়গা মানুষের আনন্দে মুখর। পর্যটকদের ভিড়, ঘোড়ার গাড়ি, রাস্তার শিল্পী, স্যুভেনির বিক্রেতা, ক্যামেরার ঝলকানি—সব মিলিয়ে এক উৎসবমুখর পরিবেশ।
যেখানে একসময় ছিল বিভাজনের প্রতীক, সেখানে আজ দাঁড়িয়ে আছে ঐক্যের প্রতীক। চেকপয়েন্ট চার্লির কাছেও রাখা হয়েছে স্মৃতিচিহ্ন। বার্লিন প্রাচীরের কিছু অংশ সংরক্ষিত আছে, যেন ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ভুলে না যায় যে মানুষের তৈরি বিভাজন কত বেদনাদায়ক হতে পারে। কাইজার ভিলহেল্ম মেমোরিয়াল চার্চের ধ্বংসপ্রাপ্ত অংশের পাশে তৈরি হয়েছে আধুনিক স্থাপত্যের নতুন চার্চ। পুরোনো ক্ষত আর নতুন জীবনের পাশাপাশি অবস্থান যেন জার্মানির পুনর্জন্মের প্রতীক। ব্রান্ডেনবুর্গ গেটের সামনে দাঁড়িয়ে আমার মনে হলো, ইতিহাস কখনো পুরোপুরি হারিয়ে যায় না। সে থেকে যায় মানুষের স্মৃতিতে, স্থাপনার দেয়ালে, একটি পুরোনো পাসপোর্টের সিলে, কিংবা দুই বন্ধুর বহু বছর আগের এক ট্রেনযাত্রার গল্পে।
১৯৮২ সালের সেই তরুণ গবেষক আর ২০১২ সালের পরিণত বিজ্ঞানী—দুজন যেন একই স্থানে এসে মিলিত হলো। একজন দেখেছিল বিভক্ত পৃথিবীকে। আর অন্যজন দেখল পুনর্মিলিত মানবতার বিজয়কে। বার্লিন আমাদের শিখিয়েছে, দেয়াল যত শক্তই হোক, মানুষের আকাঙ্ক্ষা তার চেয়ে বেশি শক্তিশালী। ইতিহাস শেষ পর্যন্ত বিভাজনের নয়, মানুষের মিলনের গল্পই লেখে।
*লেখক: অধ্যাপক রাশিদুল হক: সাবেক সহ-উপাচার্য, বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী এবং সাবেক অধ্যাপক, এমোরি বিশ্ববিদ্যালয়, আটলান্টা, যুক্তরাষ্ট্র, ও প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]