কাজ করছেন, কিন্তু কেউ দেখছে না—সমস্যা কোথায়

· Prothom Alo

অনেকেই মনে করেন, অফিসে মনোযোগ দিয়ে কাজ করে গেলে একসময় তার পুরস্কার মিলবেই—পদোন্নতি হবে, নয়তো বেতন বৃদ্ধি তো হবেই। কিন্তু বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কিছু। প্রজন্মের পরিবর্তন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ব্যবহারের কারণে কর্মক্ষেত্রের নিয়মও বদলে গেছে। এখন শুধু সবচেয়ে পরিশ্রমী মানুষই এগিয়ে যান না; বরং যাঁরা নিজেদের কাজ ও দক্ষতাকে সবার সামনে তুলে ধরতে পারেন, তাঁরাই এগিয়ে থাকেন।

লিংকডইনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের তুলনায় অনলাইনে চাকরির আবেদন এখন দ্বিগুণ হয়েছে। একই সময়ে এআই–সম্পর্কিত চাকরির সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৩ লাখে। অন্যদিকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে আগ্রহীদের জন্য ‘ক্রিয়েটর’ পেশার সংখ্যা ৯০ শতাংশ এবং উদ্যোক্তা পরিচয়ের ব্যবহার ৭০ শতাংশ বেড়েছে।

Visit freshyourfeel.org for more information.

অথচ অনেক দক্ষ কর্মীই পিছিয়ে পড়ছেন। কারণ, তাঁদের যোগ্যতার অভাব নেই, উচ্চাকাঙ্ক্ষারও অভাব নেই। সমস্যা একটাই—তাঁদের কাজ কেউ দেখছে না। তাঁদের দক্ষতাই যেন তাঁদের আড়াল করে রেখেছে।

বর্তমানে এআইয়ের ব্যবহার জানা একটি মৌলিক দক্ষতা
লিংকডইনের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রে এআই–সম্পর্কিত দক্ষতা চাওয়া চাকরির সংখ্যা এক বছরে ৭০ শতাংশ বেড়েছে। একই সঙ্গে আগের দেড় বছরের তুলনায় এখন কর্মীরা দ্বিগুণ হারে প্রতিদিন বা প্রতি সপ্তাহে এআই ব্যবহার করছেন।

অন্যদিকে চাকরির বাজারও আগের চেয়ে অনেক বেশি প্রতিযোগিতাপূর্ণ। চাকরির আবেদন দ্বিগুণ হয়েছে, আর নিয়োগপ্রক্রিয়া আগের তুলনায় প্রায় ২০ শতাংশ ধীর হয়েছে। দুই-তৃতীয়াংশ নিয়োগদাতা এখন প্রাথমিকভাবে আবেদন যাচাই করতে এআই ব্যবহার করার পরিকল্পনা করছেন।

তাই এখন শুধু ভালো কাজ করলেই হবে না, মানুষকে জানাতেও হবে আপনি কী কাজ করছেন এবং কীভাবে করছেন।

প্রশংসা পাচ্ছেন, কিন্তু পদোন্নতি পাচ্ছেন না কেন

কেন অনেক দক্ষ লোকেরা নিজেকে তুলে ধরতে পারেন না
অনেকের কাছেই নিজের কাজের প্রচার করা অস্বস্তিকর মনে হয়। বিশেষ করে যাঁরা সত্যিই দক্ষ, তাঁদের মধ্যে এই প্রবণতা বেশি দেখা যায়।

মনোবিজ্ঞানে ডানিং-ক্রুগার প্রভাব নামে একটি ধারণা আছে। এতে বলা হয়, যাঁরা সত্যিই দক্ষ, তাঁরা জানেন যে শেখার এখনো অনেক কিছু বাকি। তাই তাঁরা নিজেদের যোগ্যতাকে কম করে দেখেন। বিপরীতে কম দক্ষ মানুষ অনেক সময় নিজেদের সক্ষমতাকে অতিরঞ্জিত করে দেখেন।

অনেকেই আবার আত্মপ্রচারে বিশ্বাস করেন না। তাঁদের ধারণা, ভালো কাজ করলে মানুষ এমনিতেই তা বুঝে যাবে। কিন্তু যখন চাকরির আবেদন দ্বিগুণ হচ্ছে, সবাই অনলাইনে নিজের কাজ তুলে ধরছে, তখন শুধু ভালো কাজ করলেই হবে না। দৃশ্যমান না হলে সেই দক্ষতা অনেক সময় অদৃশ্যই থেকে যায়।

দৃশ্যমান হওয়া মানে আত্মপ্রচার নয়
অনেকেই মনে করেন, দৃশ্যমান হতে হলে সব সময় নিজেকে প্রচার করতে হবে, আসলে বিষয়টি তা নয়। দৃশ্যমান হওয়ার অর্থ হলো, আপনি কীভাবে চিন্তা করেন, কীভাবে সমস্যার সমাধান করেন—সেটা অন্যদের জানানো।

অনেক প্রতিষ্ঠানে চাকরির সাক্ষাৎকারে প্রার্থীদের কোনো একটি কাজ করতে দেওয়া হয়। সেখানে শুধু ফলাফল নয়; বরং কীভাবে সমস্যার সমাধানে এগিয়েছেন, সেটিই বেশি গুরুত্ব পায়। নিয়োগদাতারা দেখতে চান আপনার কৌতূহল, বিশ্লেষণ ক্ষমতা, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা এবং ব্যর্থতা থেকে শেখার মানসিকতা।

এসব গুণ অনেক দক্ষ মানুষের মধ্যেই থাকে, কিন্তু তাঁরা তা প্রকাশ করতে পারেন না।

কীভাবে দৃশ্যমান হবেন
• নিজের দক্ষতাকে দৃশ্যমান করে তুলুন: আপনি যদি কাজে এআই ব্যবহার করেন, সেটি জীবনবৃত্তান্ত (সিভি) ও লিংকডইন প্রোফাইলে উল্লেখ করুন। কারণ, এখন অনেক প্রতিষ্ঠানই এ ধরনের দক্ষতা খুঁজছে। একই সঙ্গে আপনি কী ধরনের চাকরি চান, সেটিও নির্দিষ্ট করে লিখুন। যেমন শুধু ‘মার্কেটিং’ না লিখে ‘স্বাস্থ্য খাতে মার্কেটিং’ লিখলে নিয়োগদাতার কাছে আপনার লক্ষ্য আরও পরিষ্কার হবে। এ ধরনের ছোট ছোট পরিবর্তনই আপনাকে অদৃশ্য অবস্থা থেকে দৃশ্যমান করে তুলতে পারে।
• বিশ্বাসযোগ্যতার প্রমাণ তৈরি করুন: লিংকডইনের তথ্য অনুযায়ী, যাঁদের প্রোফাইল যাচাইকৃত, তাঁরা গড়ে ১৯ শতাংশ বেশি বার্তা পান এবং তাঁদের প্রোফাইল ৬০ শতাংশ বেশি দেখা হয়। এ ছাড়া বিভিন্ন এআই টুল ব্যবহারের দক্ষতার স্বীকৃতি এখন সরাসরি লিংকডইন প্রোফাইলে যুক্ত করা যায়। এতে নিয়োগদাতার কাছে আপনার বিশ্বাসযোগ্যতা আরও বাড়ে।
• একজন ক্রিয়েটরের মতো ভাবুন: দৃশ্যমান হতে চাইলে সবাইকে ইনফ্লুয়েন্সার হতে হবে, এমন নয়; বরং নিজের কাজ থেকে শেখা বিষয়, শিল্প খাতের অভিজ্ঞতা কিংবা পর্দার আড়ালের গল্প নিয়মিত শেয়ার করাই যথেষ্ট। ছোট পোস্ট, দীর্ঘ লেখা, নিউজলেটার কিংবা ভিডিও—যে মাধ্যমেই হোক, নিজের অভিজ্ঞতা অন্যদের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলুন।

শুধু দক্ষতা নয়, প্রয়োজন দৃশ্যমানতাও
মানুষ যদি না-ই জানে আপনি কী করেন, তাহলে আপনার দক্ষতা দিয়ে তাদের উপকার করাও সম্ভব নয়। আর কর্মক্ষেত্রে মানুষ যদি আপনার অবদান সম্পর্কে না জানে, তাহলে পদোন্নতির সম্ভাবনাও কমে যায়।

আত্মপ্রচার আর দৃশ্যমানতা এক বিষয় নয়। আত্মপ্রচারের লক্ষ্য নজর কাড়া আর দৃশ্যমানতার লক্ষ্য হলো নিজের চিন্তা, দক্ষতা ও কাজের মূল্য অন্যদের কাছে পরিষ্কার করে তোলা।

আজকের দ্রুত বদলে যাওয়া চাকরির বাজারে টিকে থাকতে শুধু যোগ্য হলেই হবে না; আপনাকে এমনভাবে নিজেকে উপস্থাপন করতে হবে, যাতে মানুষ আপনার কাজ দেখতে পায়, বুঝতে পারে এবং মূল্য দিতে পারে।

সূত্র: সাইকোলজি টুডে

Read full story at source