বাড়ছিল মৃত্যু, জারি করা হয় কারফিউ
· Prothom Alo

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন দমন ও নিয়ন্ত্রণ করতে ২০২৪ সালের ১৭ জুলাই রাতে মুঠোফোন ইন্টারনেট বন্ধ করে দেয় তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার। পরদিন ১৮ জুলাই রাতে পুরোপুরি ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়া হয়। এ কারণে ১৯ জুলাই সকাল থেকেই মানুষ জানতে পারছিল না দেশের কোথায় কী হচ্ছে।
Visit newsbetting.club for more information.
এ অবস্থায় পরদিন প্রথম আলো ছাপা পত্রিকা থেকে জানা যায়, রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় ১৯ জুলাই (শুক্রবার) ব্যাপক বিক্ষোভ, সংঘর্ষ ও সহিংসতা হয়েছে। এতে অন্তত ৫৬ জন আন্দোলনকারী শহীদ হন। এর মধ্যে ঢাকায়ই ৪৪ জন শহীদ হন। সব মিলিয়ে তিন দিনে (১৬, ১৮ ও ১৯ জুলাই) মৃত্যু এক শ ছাড়িয়ে যায়।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে মৃত্যু বেশি ছিল ঢাকার পাঁচ এলাকায়১৯ জুলাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকে ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ (সর্বাত্মক অবরোধ) কর্মসূচির দ্বিতীয় দিন ছিল। এদিন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের পাশাপাশি পুলিশ, সাংবাদিক, পথচারীসহ বিপুলসংখ্যক মানুষ আহত হন। রাজধানীর রামপুরা-বাড্ডা, যাত্রাবাড়ী ও উত্তরায় ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। ঢাকার বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ দমাতে হেলিকপ্টার থেকে এদিন কাঁদানে গ্যাসের শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করা হয়।
শুরু থেকে এ আন্দোলনে ছিলেন শুধু শিক্ষার্থীরা। পরে এটি আর শুধু শিক্ষার্থীদের আন্দোলন থাকেনি, হয়ে যায় ছাত্র–জনতার। কোটা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সমর্থনে ১৯ জুলাই বিকেলে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে ‘জাতীয় ঐক্য সমাবেশ ও মিছিলের’ কর্মসূচি দিয়েছিল বিএনপি। এ সমাবেশকে কেন্দ্র করে দলটির নেতা-কর্মীদের সঙ্গে পুলিশের দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়।
সেদিন তোপখানা রোডে গণতন্ত্র মঞ্চের মিছিল লক্ষ্য করে পুলিশ ছররা গুলি, সাউন্ড গ্রেনেড ও কাঁদানে গ্যাসের শেল ছোড়ে এবং লাঠিপেটা করে। পল্টন এলাকায় ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে পুলিশের দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়।
১৯ জুলাই রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় স্থানীয় লোকজনকেও অংশ নিতে দেখা যায়। শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের সামনে ‘মৃত্যু এত সহজ কেন?: সন্তানের পাশে অভিভাবক’ শিরোনামে ‘সর্বস্তরের অভিভাবক সমাজ’-এর ব্যানারে সমাবেশের আয়োজন করা হয়। মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে মৌন প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করেন ছোট পর্দা ও মঞ্চের অভিনয়শিল্পী, আবৃত্তিশিল্পীসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতা-কর্মীরা। বিবৃতিতে দ্রুত ইন্টারনেট পরিষেবা চালুর দাবি জানায় সংবাদপত্রের সম্পাদকদের সংগঠন সম্পাদক পরিষদ।
সংঘাত–সংঘর্ষ গুলি, সারা দেশে পুলিশ সদস্যসহ নিহত ৯৮ঢাকায় সরকারি বিভিন্ন স্থাপনা ও অবকাঠামোতে এদিন আগুন দেওয়া হয়। ঢাকার বাইরে নারায়ণগঞ্জ, কিশোরগঞ্জের ভৈরব, ময়মনসিংহ, মাদারীপুর ও কুমিল্লায় সরকারি স্থাপনা, আওয়ামী লীগ ও বিএনপির কার্যালয় এবং দলীয় নেতাদের বাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। বিভিন্ন জায়গায় হেলিকপ্টার ব্যবহার করে সাউন্ড গ্রেনেড ও কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ এবং আগুন নেভাতে পানি ছিটাতে দেখা যায়।
এদিন রাতে গণভবনে আওয়ামী লীগের জোটসঙ্গী ১৪ দলের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেই বৈঠকের পর (১৯ জুলাই) রাত ১২টা থেকে সারা দেশে কারফিউ জারি এবং সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সম্মুখসারির সমন্বয়কদের ধরতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীরও তৎপরতা ছিল। ১৯ জুলাই ভিন্ন ভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন জায়গা থেকে সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম (বর্তমানে সংসদ সদস্য ও এনসিপির আহ্বায়ক), আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া (সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা) ও আবু বাকের মজুমদারকে (বর্তমানে জাতীয় ছাত্রশক্তির সাধারণ সম্পাদক) আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য পরিচয়ে তুলে নেওয়া হয়। সন্ধ্যার পর ধানমন্ডি থেকে বাকেরকে, রাত ১১টার দিকে হাতিরঝিলের মহানগর আবাসিক এলাকা থেকে আসিফকে ও মধ্যরাতে খিলগাঁওয়ের নন্দীপাড়া এলাকা থেকে নাহিদকে তুলে নেওয়া হয়।
১৯ জুলাই রাত সাড়ে নয়টার দিকে ৯ দফা দাবিতে আবারও কমপ্লিট শাটডাউন কর্মসূচি ঘোষণা করেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের তৎকালীন সমন্বয়ক আব্দুল কাদের। দাবির মধ্যে ছিল শেখ হাসিনার ক্ষমা চাওয়া, তৎকালীন সরকারের তিন মন্ত্রীর পদত্যাগ, সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও হল খুলে দেওয়া প্রভৃতি। আব্দুল কাদের ৯ দফা পূরণ না হওয়া পর্যন্ত কমপ্লিট শাটডাউন অব্যাহত রাখার ঘোষণা দেন।