মার্তিনেজ–পিকফোর্ড: লড়াইটা হবে দুই গোলকিপারেরও
· Prothom Alo
আটালান্টায় আজ আলোর অনেকটুকু থাকবে লিওনেল মেসি, হ্যারি কেইন বা জুড বেলিংহামদের ওপর। কিন্তু খেলাটা যদি টাইব্রেকারে গড়ায়, তাহলে সেই আলো এসে পড়বে দুজনের ওপর। এমিলিয়ানো মার্তিনেজ ও জর্ডান পিকফোর্ড—লড়াইটা আজ দুই দলের দুই গোলকিপারেরও। একজন নামবেন ২০২২ কাতার বিশ্বকাপের পর আরেকবার দলের ত্রাতা হতে আর আরেকজনের ওপর একটা দেশের ৬০ বছরের অপেক্ষা সাঙ্গ করার চাপ।
Visit mchezo.life for more information.
ফুটবলে গোলকিপারের কাজটা এমন—পুরো ম্যাচে একটা মাত্র ভুল এলোমেলো করে দিতে পারে সবকিছু। আবার একটা মাত্র সেভও এনে দিতে পারে অমরত্ব। এমিলিয়ানো মার্তিনেজের সেই মুহূর্ত এসেছিল ২০২২ সালে কাতারের লুসাইল স্টেডিয়ামে। ফ্রান্সের বিপক্ষে ফাইনালের অতিরিক্ত সময়ে রান্দাল কোলো মুয়ানির শটে মার্তিনেজের সেই সেভ আর্জেন্টিনার ফুটবল পুরাণে চিরকালীন জায়গা পেয়ে গেছে। সেই ফাইনালেই পরে মার্তিনেজ টাইব্রেকারে রুখে দিয়েছিলেন কিংসলে কোমানের শট। সেবার পুরো টুর্নামেন্টে সাত ম্যাচের প্রতিটি মিনিট খেলে তিনটি ক্লিন শিট আর গোল্ডেন গ্লাভ—মার্তিনেজ মানে আর্জেন্টিনার জন্য ‘মুশকিল আসান’।
জর্ডান পিকফোর্ডের গল্পটা এত ঝলমলে নয়। ২০১৮ বিশ্বকাপে তরুণ পিকফোর্ড কলম্বিয়ার বিপক্ষে শেষ ষোলোর পেনাল্টি শুটআউটে বাঁচিয়েছিলেন কার্লোস বাক্কার শট, ইংল্যান্ডকে এনে দিয়েছিলেন প্রথম বিশ্বকাপ শুটআউট জয়। এরপর ২০২১ ইউরোর ফাইনাল, ২০২৪ ইউরোর ফাইনাল—কোনোবারই পারেননি দলকে জেতাতে। তবে ইংল্যান্ডের প্রথম পছন্দের গোলকিপারের জায়গাটা অনেক দিন ধরেই নিজের করে নিয়েছেন।
তবে ২০২৬ বিশ্বকাপে দুই দলকে সেমিতে তুললেও ঠিক সেরাটা দেখা যায়নি দুজনের। মার্তিনেজকে গ্রুপ পর্বে খুব বড় কোনো পরীক্ষা দিতে হয়নি, কিন্তু নকআউট পর্বে দলের পোস্ট অক্ষত রাখতে পারেননি। কেপ ভার্দে ও মিসরের বিপক্ষে দুটি করে গোল হজম করতে হয়েছে। গোল খেয়েছেন শেষ ষোলোতে সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষেও। মিসরের বিপক্ষে ম্যাচের পর যেমন নিজেই আত্মসমালোচনা করেছিলেন, ‘আমার মনে হচ্ছে, আমি কাউকে সাহায্য করতে পারছি না। এই অনুভূতির সঙ্গে আমি একদমই পরিচিত নই।’
মার্তিনেজ অবশ্য সংগ্রাম করেই এ পর্যন্ত এসেছেন। ইন্দিপেন্দিয়েন্তের যুব একাডেমি থেকে আর্সেনালে পাড়ি জমানো এই মার্তিনেজকে একটা সময় বছরের পর বছর কাটাতে হয়েছে বেঞ্চে বসে। ধারে যেতে হয়েছে অক্সফোর্ড, শেফিল্ড ওয়েনসডে, হেতাফের মতো ক্লাবে—পরিচয়হীনতার সেই দীর্ঘ সময় তাঁকে শিখিয়েছে ধৈর্য। দীর্ঘ অপেক্ষার পর ২০২১ সালে ২৮ বছর বয়সে আর্জেন্টিনা জাতীয় দলে সুযোগ হয়েছে তাঁর। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। ওই বছরেই কোপা জিতিয়ে রাতারাতি বনে যান জাতীয় নায়ক। পরের বছরে তো কাতারের সেই বিশ্বকাপ, যেখানে মার্তিনেজ নিজেকে নিয়ে যান নতুন উচ্চতায়। ক্লাব দল অ্যাস্টন ভিলার হয়েও এর মধ্যে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন প্রথম পছন্দের গোলকিপার হিসেবে।
জর্ডান পিকফোর্ডপিকফোর্ডের গল্পটা অনেকটা মার্তিনেজের মতোই। ক্যারিয়ারের শুরুতে তাঁকেও খেতে হয়েছে হোঁচট। সান্ডারল্যান্ডের একাডেমি থেকে শুরু, তারপর ডার্লিংটন, অ্যালফ্রেটন টাউন, বার্টন অ্যালবিয়ন, ব্র্যাডফোর্ড সিটি, প্রেস্টন নর্থ এন্ড—ইংলিশ ফুটবলের নিচু স্তরের একের পর এক ক্লাবে ধারে গিয়ে পুড়ে পুড়ে হয়েছেন সোনা। ২০১৭ সালে এভারটনে যোগ দেওয়ার পর থেকেই তিনি সেই ক্লাবের অবিচ্ছেদ্য অংশ আর ২০১৮ বিশ্বকাপ থেকে ইংল্যান্ডের পোস্টের নিচে প্রথম পছন্দ। এই বিশ্বকাপে নরওয়ে ম্যাচেই তিনি পিটার শিল্টনকে ছাড়িয়ে ইংল্যান্ডের হয়ে বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি ১৮টি ম্যাচ খেলার রেকর্ড গড়েছেন। যেটি আরও বাড়িয়ে নেওয়ার সুযোগ তাঁর সামনে।
এই বিশ্বকাপে পিকফোর্ড দলের ত্রাতা হয়ে উঠেছিলেন মেক্সিকোর ম্যাচে। ১০ জন নিয়ে ইংল্যান্ড দ্বিতীয়ার্ধের অনেকটা সময়জুড়ে মেক্সিকোর আক্রমণ ঠেকিয়ে গেছে, যাতে বড় ভূমিকা ছিল পিকফোর্ডের। রাউল হিমেনেজকে দুবার গোলবঞ্চিত করেছেন দারুণ দক্ষতায়। তবে নরওয়ের বিপক্ষে প্রথম গোলটা হজমে তাঁর দায়ও দেখেছেন অনেকে। সবকিছুর পরও পিকফোর্ড এখনো পোস্টের নিচে বিশ্বস্ত। ইংল্যান্ডের সাবেক গোলকিপার পল রবিনসন যেমন মনে করিয়ে দিয়েছেন, পিকফোর্ডের যে স্বীকৃতি প্রাপ্য, সেটি অনেক সময়ই তিনি পান না।
এই বিশ্বকাপে গোল্ডেন গ্লাভের দৌড়ে দুজন অনেকটাই পিছিয়ে আছেন। তবে দুজনের সামনে অন্য রকম একটা চ্যালেঞ্জও আছে। ক্যারিয়ারে প্রথমবারের মতো লিওনেল মেসির মুখোমুখি হবেন পিকফোর্ড। ম্যাচের আগে সেটি নিয়ে আপ্লুতও এই গোলকিপার। তবে মনে করিয়ে দিয়েছেন, ইংল্যান্ড শুধু মেসিকে নিয়েই ভাবছে না। অন্যদিকে পেশাদার ক্যারিয়ারের লম্বা সময় ইংল্যান্ডে কাটিয়ে দেওয়ার পর এই প্রথম দেশটির মুখোমুখি হচ্ছেন মার্তিনেজ।
শেষ পর্যন্ত এই ম্যাচ শেষে নায়ক কে হবেন, তা জানা যাবে আজ।
অথচ এই হ্যারি কেইনই সুযোগ পাননি আর্সেনাল একাডেমিতে