সন্তানের কান্নাও যখন ‘কনটেন্ট’: ইসলাম যেভাবে দেখে
· Prothom Alo

ফেসবুকের ফিডে স্ক্রল করতে করতে এখন প্রায়ই চোখে পড়ে একটা নতুন ধরনের দৃশ্য— একটা অবুঝ শিশুর আধো বুলি, তার রাগ, তার কান্না, তার সবচেয়ে অসতর্ক মুহূর্তটাও ক্যামেরাবন্দী হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে ইন্টারনেটে। খোদ মা–বাবার হাতেই।
Visit sport-tr.bet for more information.
একে বলা হচ্ছে ‘শেয়ারেন্টিং’, মানে সন্তানের ব্যক্তিগত জীবনের প্রদর্শন।
ওপর থেকে দেখলে এটাকে মনে হতে পারে ভালোবাসার একটা প্রকাশ, স্মৃতি ধরে রাখার নিরীহ চেষ্টা। কিন্তু ভেতরে উঁকি দিলে দেখা যায় লাইক, ভিউ, ফলোয়ার আর স্পনসরশিপের বাণিজ্যিক টান, যেখানে শিশু আসলে হয়ে উঠেছে মা–বাবার কনটেন্ট বানানোর হাতিয়ার।
ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে এই একটা প্রবণতার ভেতরেই লুকিয়ে আছে চার স্তরের সমস্যা, যা একের পর এক গভীর হতে থাকে।
শৈশবে একটা শিশুর নিজের ভালো-মন্দ বা গোপনীয়তা বোঝার সামর্থ্য থাকে না। সেই সরলতার সুযোগ নিয়ে তার প্রতিটি মুহূর্তকে কোটি মানুষের সামনে উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়।
প্রথম স্তর: যে আমানত প্রথমেই নষ্ট হয়
ইসলামে সন্তান কোনো ব্যক্তিগত সম্পদ নয়, বরং আল্লাহর পক্ষ থেকে মা–বাবার কাছে দেওয়া মূল্যবান আমানত। কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনগণ, তোমরা জেনেশুনে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের সঙ্গে খেয়ানত কোরো না এবং তোমাদের পারস্পরিক আমানতসমূহেরও খেয়ানত কোরো না।’ (সুরা আনফাল, আয়াত: ২৭)
শৈশবে একটা শিশুর নিজের ভালো-মন্দ বা গোপনীয়তা বোঝার সামর্থ্য থাকে না। সেই সরলতার সুযোগ নিয়ে তার প্রতিটি মুহূর্তকে কোটি মানুষের সামনে উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। তাতে তার ‘সম্মতি’ থাকে না, কেননা, সম্মতি দেওয়ার মতো বয়সই তার হয়নি। এটা এক ধরনের খেয়ানত।
নবীজি (সা.) এই দায়িত্বকে জবাবদিহির অধীনে এনে বলেছেন, ‘তোমাদের প্রত্যেকেই একেকজন দায়িত্বশীল, আর তোমাদের প্রত্যেককেই তার অধীনদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৭১৩৮)
ভার্চুয়াল দুনিয়ায় বরকত লাভের ৫ উপায়দ্বিতীয় স্তর: বাস্তব ঝুঁকির মুখে ফেলা
শিশুর ছবি-ভিডিও প্রতিনিয়ত শেয়ার হওয়ার ফলে তার গোপনীয়তা হারায়। একই সঙ্গে সে বড় হয় এক কৃত্রিম জগতে—ক্যামেরার সামনে কীভাবে হাসতে হয়, কীভাবে আচরণ করতে হয়, এসব শিখতে শিখতে তার স্বাভাবিক শৈশব হারিয়ে যায়।
তা ছাড়া এই অতি-প্রদর্শন শিশুকে সাইবার বুলিং থেকে শুরু করে আরও ভয়ংকর নানা বিপদের সামনে ফেলতে পারে। ইসলামে কুদৃষ্টি বা ‘নজর লাগা’র বিষয়টাকে নেহাত কুসংস্কার হিসেবে দেখা হয় না। নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘নজর লাগা সত্য।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২১৮৮)
সহিহ বুখারি, হাদিস: ৭১৩৮তোমাদের প্রত্যেকেই একেকজন দায়িত্বশীল, আর তোমাদের প্রত্যেককেই তার অধীনদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।তিনি নিজে হাসান-হোসাইনকে অন্যের কুদৃষ্টি ও হিংসা থেকে রক্ষার জন্য বিশেষ দোয়া পড়তেন, আড়াল করে রাখতেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৩৭১)
বাবা-মায়েরা ভিউ আর প্রশংসার লোভে নিজের নিষ্পাপ শিশুকে যেভাবে সার্বক্ষণিক ক্যামেরার সামনে রাখছেন, তা অজান্তেই তাকে ঠেলে দিচ্ছে সেই কুদৃষ্টি আর মনস্তাত্ত্বিক ঝুঁকির মুখে।
তৃতীয় স্তর: নিয়তের ভেতরে গড়মিল
চাইল্ড শেয়ারিংয়ের একটি অন্ধকার দিক হলো, সন্তানকে ব্র্যান্ড বা স্পনসরশিপের মাধ্যমে অর্থ উপার্জনের যন্ত্র বানানো। কোনো কোনো পেজে শিশুর কান্নার ভিডিও লাইভ করে ভিউ বাড়ানো হয়, কাউকে দিয়ে পণ্যের বিজ্ঞাপন করানো হয়।
হালাল উপার্জনের নির্দেশ ইসলাম দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু নিজের সন্তানের শৈশব আর মর্যাদাকে পুঁজি করে টাকা আয়ের এই সংস্কৃতিকে সমর্থন করে না। লোকদেখানো নিয়তকে ইসলামে আধ্যাত্মিক পতন হিসেবে দেখা হয়।
নিষ্পাপ শৈশবে প্রবীণদের সান্নিধ্যনবীজি (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি মানুষকে শোনানোর জন্য কাজ করে, আল্লাহ তার গোপন উদ্দেশ্য মানুষের সামনে প্রকাশ করে দেবেন। আর যে ব্যক্তি লোকদেখানোর জন্য কাজ করে, আল্লাহ তার লোকদেখানোর প্রতিদান দুনিয়াতেই দিয়ে দেবেন—আখেরাতে তার কিছু থাকবে না।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৯৮৭)
চতুর্থ স্তর: পরবর্তী জীবনের লজ্জা
আজ যে শিশু অবুঝ অবস্থায় ক্যামেরার সামনে কাঁদছে, কয়েক বছর পর সে বড় হবে, নিজের একটা ব্যক্তিত্ব আর বন্ধুমহল তৈরি হবে। তখন ইন্টারনেটে থেকে যাওয়া সেই পুরোনো ভিডিওগুলোই তাকে ফেলতে পারে চরম সামাজিক লজ্জা আর হীনম্মন্যতার মুখে।
ইসলাম মানুষের বর্তমান আর ভবিষ্যৎ—দুই জীবনেরই সম্মান রক্ষার তাগিদ দেয়। কোরআনে বলা হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই আমি আদম সন্তানকে মর্যাদা দান করেছি।’ (সুরা ইসরা, আয়াত: ৭০)
সন্তানের মর্যাদা রক্ষা করা এবং নিজের সাময়িক বিনোদন বা আর্থিক লাভের জন্য তাকে উপহাসের পাত্র না বানানো মা-বাবার দায়িত্ব।
বড় হয়ে যেন সন্তান তার নিজের শৈশবের ভার্চ্যুয়াল ছাপের জন্য লজ্জিত না হয়। তার মর্যাদা রক্ষা করা এবং নিজের সাময়িক বিনোদন বা আর্থিক লাভের জন্য তাকে উপহাসের পাত্র না বানানো মা-বাবার দায়িত্ব।
সন্তান কোনো কনটেন্ট বা পণ্য নয়, সে একটা জীবন্ত মানুষ। তাকে ক্যামেরার কৃত্রিম আলো থেকে দূরে রেখে বাস্তব পৃথিবীর আলো-বাতাসে স্বাভাবিকভাবে বড় হতে দেওয়া, তার নৈতিক ও মানসিক বিকাশ নিশ্চিত করাই হোক একজন আদর্শ অভিভাবকের লক্ষ্য।
ভার্চুয়াল দুনিয়ায় বরকত লাভের ৫ উপায়