ভরণপোষণের মামলায় অসুস্থ শিশুর চিকিৎসার খরচ দিতে বাবাকে আদালতের আদেশ
· Prothom Alo

সাত বছরের শিশুটি মায়ের সঙ্গে এসেছিল আদালতে। এজলাস থেকে বিচারক দেখলেন শিশুটির ডান হাতের তুলনায় বাঁ হাত অনেক বড় ও কালচে। মূলত বাদীপক্ষ তাদের আরজির পক্ষে প্রমাণ তুলে ধরতেই শিশুটিকে হাজির করেছিল। বিচারক শিশুটিকে দেখলেন, কিন্তু কোনো মন্তব্য করলেন না। তবে বিচারক সেদিনের পর্যবেক্ষণের প্রতিফলন ঘটালেন রায়ের মধ্য দিয়ে।
গত ১২ এপ্রিল রায়ে বিচারক শিশুটির বাবাকে আদেশ দিয়েছেন, চিকিৎসাসহ শিশুটিকে ভরণপোষণ দিতে হবে। হাতে অস্ত্রোপচারের পুরো খরচ বাবাকেই বহন করতে হবে।
Visit playerbros.org for more information.
ঘটনাটি সাতক্ষীরা জেলার পারিবারিক আদালত-২–এর। এই আদালতের বিচারক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) জ্যেষ্ঠ সহকারী জজ মো. হাসানুল বান্না এ রায় দেন।
ছেলেশিশুটির বাবা-মায়ের বিবাহবিচ্ছেদ হয়েছে এক বছর আগে। সে মায়ের সঙ্গে সাতক্ষীরার দেবহাটা উপজেলায় থাকে। বাবার বাড়ি সাতক্ষীরার কালীগঞ্জ উপজেলায়। তবে একটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের ঢাকা কার্যালয়ে তিনি কর্মরত।
চিকিৎসার কাগজপত্র অনুসারে, শিশুটি ‘ভাস্কুলার ম্যালফরমেশন’ নামে রোগে ভুগছে। এটি রক্তনালির একটি গঠনগত ত্রুটি। শিশুটির বাঁ হাতে স্বাভাবিক রক্ত চলাচল হয় না। ফলে শিশুটির বাঁ হাত তার ডান হাতের তুলনায় অস্বাভাবিক ফোলা ও কালচে বর্ণের।
শিশুটির বাবা-মায়ের বিয়ে হয়েছিল ২০১৬ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি। বিবাহবিচ্ছেদ হয় ২০২৪ সালের ১৬ অক্টোবর। অসুস্থ শিশুটি বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান। গত বছরের মার্চে সাবেক স্বামীর কাছ থেকে দেনমোহর, ভরণপোষণ ও ছেলের চিকিৎসার খরচ চেয়ে আদালতের কাছে আরজি করেছিলেন শিশুটির মা। মামলার ১৩ মাস পর বিচারক রায়ে দেনমোহর ও ভরণপোষণের পাশাপাশি শিশুটির চিকিৎসার খরচ দিতে শিশুর বাবার প্রতি আদেশ দেন।
গত বছরের মার্চে সাবেক স্বামীর কাছ থেকে দেনমোহর, ভরণপোষণ ও ছেলের চিকিৎসার খরচ চেয়ে আদালতের কাছে আরজি করেছিলেন শিশুটির মা। মামলার ১৩ মাস পর বিচারক রায়ে দেনমোহর ও ভরণপোষণের পাশাপাশি শিশুটির চিকিৎসার খরচ দিতে তার বাবার প্রতি আদেশ দেন। এই মামলায় শিশুটির মা ১ নম্বর ও শিশুটি ২ নম্বর বাদী। ওই নারী স্থানীয় একটি মাদ্রাসার শিক্ষক।
শিশুটির মায়ের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, পারিবারিক আদালতে তিনি অভিযোগ করেছিলেন। সেই রায় হয়েছে। তবে তিনি রায়ের কপি এখনো হাতে পাননি।
মামলার বিবরণ থেকে জানা গেছে, শিশুটির বাবা-মায়ের বিয়ে হয়েছিল ২০১৬ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি। বিবাহবিচ্ছেদ হয় ২০২৪ সালের ১৬ অক্টোবর। অসুস্থ শিশুটি বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান।
গত বছরের মার্চে যখন মামলাটি করা হয়েছিল, তখন পৃথক পারিবারিক আদালত প্রতিষ্ঠা করা হয়নি এবং দাম্পত্য অধিকার পুনরুদ্ধার, দেনমোহর, ভরণপোষণ ও শিশুসন্তানের অভিভাবকত্ব ও তত্ত্বাবধান বিষয়ে মামলা করার আগে আইনগত সহায়তা প্রদান (সংশোধন) আইন ২০২৬–এর আওতায় মধ্যস্থতার জন্য লিগ্যাল এইডে আবেদন করার বিধান কার্যকর হয়নি। ফলে পুরোনো প্রক্রিয়ায় (সহকারী জজ আদালত আগে পারিবারিক আদালত হিসেবে পরিচালিত হতো) মামলাটি পরিচালিত হচ্ছিল।
ফেরদৌস হোসেন, বাদীর আইনজীবী‘ছেলেটি ঢাকা থেকে ফিরে আসার পর বিচারককে আমরা অনুরোধ করেছিলাম যেন তিনি শিশুটিকে দেখেন। শিশুটিকে এক শুনানির দিন আদালতে নেওয়া হয়। তখন বিচারক শিশুটিকে ডায়াসে ডেকে নেন। তিনি দেখেন যে শিশুটির বাম হাত অস্বাভাবিক ফোলা ও কালচে বর্ণ ধারণ করেছে।পারিবারিক আদালত আইন ২০২৩–এর আওতায় গত বছরের সেপ্টেম্বরে পৃথক পারিবারিক আদালত প্রতিষ্ঠা করা হয়। সাতক্ষীরার পারিবারিক আদালত-২–এ সাতক্ষীরার চারটি উপজেলার দেবহাটা, আশাশুনি, কালীগঞ্জ ও শ্যামনগরের মামলাগুলো পরিচালিত হচ্ছে।
এর আগে ওই নারী যৌতুকের দাবিতে মারধরের অভিযোগে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা করেছিলেন স্বামীর বিরুদ্ধে। ওই মামলা এখনো বিচারাধীন।
অসুস্থ শিশুটিকে ডেকে নেন বিচারক
পারিবারিক আদালতে ওই নারীর পক্ষে মামলাটি পরিচালনা করেছেন সাতক্ষীরা জেলা ও দায়রা জজ আদালতের আইনজীবী মো. ফেরদৌস হোসেন।
আইনজীবী প্রথম আলোকে বলেন, ওই নারীর অভিযোগ ছিল শিশুর বাবা দেনমোহর, ভরণপোষণ কিছু দেন না। গত বছর মামলা করার পর ২৩ জুন শিশুটির বাবা আদালতে হাজির হয়ে জবাব দেন ও মামলায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। মামলা চলা অবস্থায় তিনি বাদীপক্ষের আইনজীবী হিসেবে আদালতে দরখাস্ত দিয়েছিলেন যে ছেলেটা মায়ের সঙ্গে আছে, মামলা চলাকালীন যেন কিছুটা ভরণপোষণ দেওয়া হয়। কারণ, মামলা শেষ হতে অনেকটাই দেরি হয়। ওই সময় বিচারক শিশুটির বাবাকে শিশুটির জন্য মাসে ৩ হাজার টাকা করে ভরণপোষণ দেওয়ার আদেশ দেন। মৌখিকভাবে বিচারক বাবাকে বলেন, পয়লা বৈশাখ, ঈদের মতো উৎসবে যেন তিনি ছেলেকে কিছুটা বেশি টাকা দেন।
রায়ে বিচারক শিশুটির অস্ত্রোপচার বাবদ ২ লাখ ৫১ হাজার টাকা দিতে বাবাকে আদেশ দিয়েছেন। শিশুটির মায়ের ১ লাখ ২৫ হাজার টাকা দেনমোহর পরিশোধ করতে বলা হয়েছে। রায়ের পর থেকে শিশুটির পড়াশোনা, চিকিৎসার নিয়মিত খরচবাবদ মাসে ৮ হাজার টাকা করে দেওয়ার আদেশও দেওয়া হয়েছে বাবাকে।
এরপর শিশুটির বাবা মাত্র তিন মাস সেই আদেশ মেনে চলেছিলেন। মোট সাড়ে ১০ হাজার টাকা ভরণপোষণ দিয়েছিলেন বলে জানান ফেরদৌস হোসেন।
ফেরদৌস হোসেন বলেন, এর আগের আদালতে বাদী ও সাক্ষীর জেরা শেষ হয়ে যায়। পারিবারিক আদালত-২ নম্বরে যখন মামলাটি পরিচালনা যখন শুরু হয়, তখন বিবাদীর সাক্ষী, জেরা ও যুক্তিতর্ক বাকি ছিল। শিশুটির বাবার পক্ষ থেকে আইনজীবী বারবার সময় পেছাচ্ছিলেন। অজুহাত দিতেন যে ‘অফিস থেকে ছুটি পাচ্ছেন না।’ বিচারক একদিন বলেন যে ‘আপনারা কবে সময় দিতে পারবেন বলেন, সে অনুযায়ী শুনানির ডেট দেব।’
মামলা চলার সময়ে শিশুটি মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়ে। শিশুটির মা তাকে নিয়ে ঢাকায় যান। দুটি হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। এর মধ্যে একটি হাসপাতালের চিকিৎসার ব্যবস্থাপত্র, অস্ত্রোপচারের জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ ও অস্ত্রোপচারের জন্য আড়াই লাখ টাকার প্রয়োজন জানিয়ে কাগজপত্র জমা দেওয়া হয়।
আইনজীবী ফেরদৌস হোসেন বলেন, ‘ছেলেটি ঢাকা থেকে ফিরে আসার পর বিচারককে আমরা অনুরোধ করেছিলাম যেন তিনি শিশুটিকে দেখেন। শিশুটিকে এক শুনানির দিন আদালতে নেওয়া হয়। তখন বিচারক শিশুটিকে ডায়াসে ডেকে নেন। তিনি দেখেন যে শিশুটির বাম হাত অস্বাভাবিক ফোলা ও কালচে বর্ণ ধারণ করেছে।’
মামলার রায় থেকে জানা গেছে, বিচারক শিশুটির অস্ত্রোপচার বাবদ ২ লাখ ৫১ হাজার টাকা বাবা বহন করবেন বলে আদেশ দেন। শিশুটির মায়ের ১ লাখ ২৫ হাজার টাকা দেনমোহর পরিশোধ করতে বলেন। শিশুটির ১৩ মাসের বকেয়া ভরণপোষণ বাবদ ৩৯ হাজার টাকা পরিশোধ ও রায়ের পর থেকে শিশুটির পড়াশোনা, চিকিৎসার নিয়মিত খরচবাবদ মাসে ৮ হাজার টাকা করে ভরণপোষণ দেওয়ার আদেশ দেন।
এদিকে আদালতের আদেশের বিষয়ে মন্তব্য জানতে শিশুটির বাবার মুঠোফোন নম্বরে একাধিকবার কল করা হয় ও বার্তা পাঠানো হয়। কিন্তু তিনি সাড়া দেননি। তবে তাঁর ছোট ভাই কথা বলেছেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ভরণপোষণের রায়ের কথা তিনি শুনেছেন। আদালত যখন রায় দিয়েছেন, তখন তাঁর ভাই ‘নিশ্চয়ই’ তা পালন করবেন।