বিকিনির দৃশ্য নিয়ে আপত্তি, সত্তর দশকের হিন্দি সিনেমার শুটিংয়ে কী হতো

· Prothom Alo

একটি বিকিনির দৃশ্য। সেটে উপস্থিত পুরো ইউনিট। ক্যামেরা প্রস্তুত, আলো জ্বলছে, সামনে নায়ক দেব আনন্দ। ঠিক সেই মুহূর্তেই শুটিং থামিয়ে দিলেন অভিনেত্রী বিন্দু। কারণ, তাঁকে আগে জানানোই হয়নি যে ওই দৃশ্যে বিকিনি পরতে হবে।

আবার কয়েক বছর পর আরেক ছবির সেটে ঘটল উল্টো এক ঘটনা। সকালে যে অভিনেত্রীকে রোমান্টিক গানে প্রেম নিবেদন করছিলেন সঞ্জীব কুমার, বিকেলে অন্য ছবির সেটে সেই একই অভিনেত্রীকে ‘মা’ বলে ডাকতে গিয়ে আটকে গেলেন তিনি। পরিচালক পর্যন্ত অবাক।

Visit orlando-books.blog for more information.

ভারতীয় চলচ্চিত্রের সোনালি যুগের এই দুই ঘটনাই সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে স্মৃতিচারণা করেছেন বলিউডের কিংবদন্তি অভিনেত্রী বিন্দু। তাঁর স্মৃতির ঝাঁপি খুলতেই উঠে এসেছে এমন এক সময়ের বলিউড, যেখানে তারকাদের পারস্পরিক সম্মান, পেশাদারত্ব ও মানবিকতার গল্প আজও বিস্ময় জাগায়।

হিন্দি সিনেমার অভিনেত্রী বিন্দু। আইএমডিবি

হঠাৎ বিকিনির কথা শুনে আপত্তি
১৯৭৩ সালের ছবি ‘জোশিলা’। পরিচালক যশ চোপড়া। ছবিতে দেব আনন্দ, হেমা মালিনী, রাখী এবং বিন্দু অভিনয় করেছিলেন। বিন্দুর ভাষ্য অনুযায়ী, শুটিংয়ের দিন সেটে পৌঁছেই তিনি জানতে পারেন তাঁকে একটি বিকিনি পরে দৃশ্য ধারণ করতে হবে। বিষয়টি আগে থেকে তাঁকে জানানো হয়নি। স্বাভাবিকভাবেই তিনি আপত্তি জানান।
অভিনেত্রীর কথায়, বিকিনি মানেই বিকিনি। এমন পোশাক পরার সিদ্ধান্ত আগে থেকে জানানো উচিত ছিল। হঠাৎ সেটে এসে বিষয়টি জানতে পেরে তিনি পরিচালক যশ চোপড়াকে স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে তিনি প্রস্তুত নন। ফলে পুরো ইউনিটের কাজ প্রায় দুই ঘণ্টার জন্য বন্ধ হয়ে যায়।

যশ চোপড়ার সমাধান
আজকের সময়ে এমন পরিস্থিতিতে হয়তো পরিচালকের সঙ্গে শিল্পীর তর্ক বাড়তে পারত। কিন্তু যশ চোপড়া অন্য পথ বেছে নেন।
তিনি বিন্দুকে আশ্বস্ত করেন যে দৃশ্যটি এমনভাবে ধারণ করা হবে যাতে অভিনেত্রী স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। সিদ্ধান্ত হয়, বেশির ভাগ সময় তাঁকে পানির ভেতর রাখা হবে। ক্যামেরায় মূলত পাশ ও পেছনের দিকের শট নেওয়া হবে। অপ্রয়োজনীয় কোনো ক্লোজআপ বা অস্বস্তিকর ফ্রেম রাখা হবে না।

বিন্দুর মতে, দেব আনন্দ পুরো সময় নীরব ছিলেন। তিনি কোনো চাপ সৃষ্টি করেননি, আবার বিরক্তিও প্রকাশ করেননি; বরং পুরো ইউনিট ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করেছে।

হিন্দি সিনেমার অভিনেত্রী বিন্দু। আইএমডিবি

‘অশালীন লাগবে না’
দৃশ্য ধারণ শেষে বিন্দুর মনে সংশয় থেকেই গিয়েছিল। তিনি ছবির চিত্রগ্রাহক ফালি মিস্ত্রিকে জিজ্ঞেস করেন দৃশ্যটি কেমন হয়েছে। ফালি মিস্ত্রির উত্তর ছিল, তাঁকে ভালো লাগছে, অশালীন লাগছে না।

এই মন্তব্যের পরই বিন্দুর অস্বস্তি কেটে যায়। কারণ তাঁর মূল উদ্বেগ ছিল পোশাক নয়, বরং পর্দায় সেটি কীভাবে উপস্থাপিত হবে।

সত্তরের দশকে সাহসী চরিত্রের মুখ
বিন্দু এমন এক সময়ে বলিউডে কাজ করেছেন, যখন নারী চরিত্রের উপস্থাপনায় বড় পরিবর্তন আসছিল। তিনি একদিকে ভ্যাম্প, অন্যদিকে আধুনিক, আত্মবিশ্বাসী এবং গ্ল্যামারাস চরিত্রে অভিনয় করে দর্শকদের নজর কেড়েছিলেন।
তবে পর্দায় সাহসী চরিত্রে অভিনয় করলেও ব্যক্তিগত সীমারেখা নিয়ে তিনি ছিলেন স্পষ্ট। ‘জোশিলা’র ঘটনাটি সেই আত্মসম্মানবোধেরই একটি উদাহরণ।

অশালীন উপস্থাপনা থেকে বেফাঁস মন্তব্য, বারবার বিতর্কে জাহ্নবী

সকাল থেকে প্রেম, বিকেলে ‘মা’
বিন্দুর আরেকটি স্মৃতি আরও মজার। একদিন সকালে তিনি এবং সঞ্জীব কুমার একটি ছবির রোমান্টিক গানের শুটিং করছিলেন। সেখানে বিন্দুর চরিত্রটি সঞ্জীব কুমারকে আকৃষ্ট করার চেষ্টা করছিল।

দুপুরে সেই শুটিং শেষ করে দুজনই চলে যান আরেক ছবি ‘অর্জুন পণ্ডিত’-এর সেটে।
সেখানে সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিস্থিতি। বিন্দু অভিনয় করছেন অশোক কুমারের স্ত্রীর চরিত্রে; অর্থাৎ সঞ্জীব কুমারকে তাঁকে ‘মা’ বলে সম্বোধন করতে হবে।

মুখে আসছিল না ‘মা’
সাদা শাড়ি পরে মেকআপ ছাড়া দৃশ্যের জন্য প্রস্তুত ছিলেন বিন্দু। সঞ্জীব কুমার ক্যামেরার সামনে এসে সংলাপ বলতে গিয়ে হেসে ফেলেন। বারবার চেষ্টা করেও ‘মা’ শব্দটি মুখে আনতে পারছিলেন না।
পরিচালক হৃষিকেশ মুখার্জি কারণ জানতে চাইলে সঞ্জীব কুমার রসিকতা করে বলেন, ‘সকাল সাতটা থেকে বেলা দুইটা পর্যন্ত যাকে প্রেম নিবেদন করেছি, বিকেলে তাকেই কীভাবে “মা” বলি?’
পুরো ইউনিট হেসে ওঠে। পরে অবশ্য দৃশ্যটি ঠিকভাবেই ধারণ করা হয়।

পেশাদারত্বের এক সময়
বিন্দুর স্মৃতিচারণা শুধু নস্টালজিয়া নয়; এটি বলিউডের এক ভিন্ন কর্মসংস্কৃতির দলিল।
একদিকে পরিচালক যশ চোপড়ার সংবেদনশীলতা, অন্যদিকে দেব আনন্দের ধৈর্য, আবার হৃষিকেশ মুখার্জির সেটে হাস্যরস—সব মিলিয়ে তখনকার চলচ্চিত্র নির্মাণে মানবিক সম্পর্কের গুরুত্ব স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

আজকের দিনে চুক্তিপত্র, ইনটিমেসি কো-অর্ডিনেটর এবং আগাম সম্মতির বিষয়গুলো অনেক বেশি গুরুত্ব পায়। কিন্তু সেই সময়েও একজন শিল্পী নিজের সীমারেখা নিয়ে আপত্তি জানাতে পেরেছিলেন আর পরিচালকও সেটিকে সম্মান করেছিলেন।

ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস অবলম্বনে

Read full story at source