১৬ বছর বয়সে টেবিল মুছতেন, ২৪–এ হয়েছেন বাড়ির মালিক
· Prothom Alo

আজ তিনি জাতীয় পুরস্কারজয়ী সিনেমার অভিনেতা, নির্মাতাদের আস্থার নাম এবং দর্শকের কাছে বাস্তবধর্মী অভিনয়ের প্রতীক। কিন্তু এই অবস্থানে পৌঁছানোর পথ মোটেও সহজ ছিল না। হচ্ছিল বলিউড তারকা বিক্রান্ত ম্যাসির কথা। সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে বিক্রান্ত তাঁর জীবনের এমন কিছু অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন, যা তাঁর সংগ্রামের দিনগুলোর একটি স্পষ্ট ছবি তুলে ধরে। তিনি জানান, মাত্র ১৬ বছর বয়সেই সংসারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিতে হয়েছিল তাঁকে। পড়াশোনার খরচ জোগাতে, পরিবারের পাশে দাঁড়াতে তিনি মুম্বাইয়ের একটি কফি শপে টেবিল পরিষ্কার করার কাজও করেছেন। আজ যখন তিনি নিজের ছেলের জন্য দেশের সেরা স্কুলগুলোর ব্রশিউর দেখেন, তখন তাঁর মনে পড়ে যায় সেই দিনগুলোর কথা—যখন কলেজের ফি জোগাড় করাই ছিল সবচেয়ে বড় চিন্তা।
Visit extonnews.click for more information.
মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলের বড় হয়ে ওঠা
মুম্বাইয়ের এক সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম বিক্রান্ত ম্যাসির। পরিবারে অর্থের প্রাচুর্য ছিল না, কিন্তু স্বপ্নের অভাবও ছিল না। ছোটবেলা থেকেই তিনি বুঝেছিলেন, জীবনে প্রতিষ্ঠিত হতে হলে নিজের ওপরই ভরসা করতে হবে।
কৈশোরে তাঁর সমবয়সীরা যখন খেলাধুলা, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা কিংবা সিনেমা নিয়ে ব্যস্ত, তখন বিক্রান্তের বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। সংসারের আর্থিক টানাপোড়েন তাঁকে খুব অল্প বয়সেই পরিণত করে তোলে।
১৬ বছরেই কর্মজীবনের শুরু
বিক্রান্ত জানিয়েছেন, ১৬ বছর বয়সেই তিনি কাজ শুরু করেন। উদ্দেশ্য ছিল একটাই—নিজের পড়াশোনার খরচ চালানো এবং পরিবারের আর্থিক দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়া। তিনি একটি কফি শপে টেবিল পরিষ্কার করতেন। অনেকের কাছে এটি হয়তো সাধারণ একটি কাজ, কিন্তু একজন কিশোরের কাছে এটি ছিল আত্মসম্মান, দায়িত্ববোধ এবং সংগ্রামের এক কঠিন পাঠ।
বিক্রান্ত বলেছেন, কোনো ১৬ বছরের ছেলে স্বেচ্ছায় এমন কাজ করতে চায় না। কিন্তু তাঁর কাছে এটি ছিল প্রয়োজনের তাগিদ। সেই প্রয়োজনই তাঁকে জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা দিয়েছে।
বন্ধুদের কাছে সত্য লুকিয়ে রাখতেন
এই সময়টা মানসিকভাবেও সহজ ছিল না। বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় বন্ধুরা তাঁকে খেলতে ডাকত। কেউ ক্রিকেট খেলতে চাইত, কেউ ফুটবল। কিন্তু বিক্রান্তের যেতে হতো কাজে।
বন্ধুরা জিজ্ঞেস করত, ‘কোথায় যাচ্ছ?’ তিনি স্পষ্ট করে বলতে পারতেন না। কারণ, এত কম বয়সে পরিবারের জন্য কাজ করতে হচ্ছে—এই বিষয়টি তাঁকে বিব্রত করত।
আজ তিনি স্বীকার করেন, তখন কষ্ট হতো। কিন্তু সেই অভিজ্ঞতাই তাঁকে মানসিকভাবে শক্ত করেছে।
প্রথম উপার্জনের গল্প
অভিনয় থেকে তাঁর প্রথম আয়ও হয়েছিল স্কুলজীবনেই।
নিউজিল্যান্ডের একটি স্বাস্থ্যবিষয়ক প্রতিষ্ঠানের ক্যাটালগের জন্য কয়েকজন শিক্ষার্থীকে বেছে নেওয়া হয়েছিল। বিক্রান্তও ছিলেন তাঁদের মধ্যে। সেই কাজের জন্য তিনি পান মাত্র ২০০ রুপি।
অর্থের পরিমাণ খুব বেশি না হলেও সেটিই ছিল তাঁর প্রথম উপার্জন। আর সেই ছোট্ট অভিজ্ঞতাই তাঁকে বুঝিয়ে দেয়, নিজের পরিশ্রমে অর্থ উপার্জনের অনুভূতি কতটা মূল্যবান।
শিয়ামক দাভারের নাচের দলে
পরে তিনি যোগ দেন শিয়ামক দাভারের নৃত্যদলে। সমসাময়িক নৃত্যশিল্পী হিসেবে নিয়মিত পারিশ্রমিক পেতে শুরু করেন। নাচের পাশাপাশি অভিনয়ের প্রতিও তাঁর আগ্রহ বাড়তে থাকে। একই সময়ে তিনি কফি শপেও কাজ করতেন। দিনভর কাজ, মহড়া, পড়াশোনা—সব মিলিয়ে জীবন ছিল ভীষণ ব্যস্ত।
কফি শপে কাজ করার পেছনের আরেকটি স্বপ্ন
যে কফি শপে তিনি কাজ করতেন, সেখানে নিয়মিত আসতেন চলচ্চিত্র জগতের নানা মানুষ। বিক্রান্তের মনে হতো, হয়তো একদিন তাঁদের কারও নজরে পড়বেন। হয়তো কোনো অভিনয়ের সুযোগ মিলবে। সেই স্বপ্নই তাঁকে আরও অনুপ্রাণিত করত।
বিক্রান্তের ভাষায়, তখন নিজের জন্য এক কাপ কফি কেনার মতো টাকাও ছিল না। অথচ অন্যদের জন্য কফি পরিবেশন করতেন তিনি।
বয়স লুকিয়ে চাকরি
সে সময় তিনি নাবালক ছিলেন। তাই কফি শপের মালিক তাঁকে সতর্ক করে দিয়েছিলেন—বয়সের বিষয়টি যেন কেউ না জানতে পারে। বিক্রান্ত ও তাঁর নিয়োগকর্তা দুজনেই বয়স তিন বছর বেশি বলে পরিচয় দিতেন। আজ এই গল্প শুনে অবাক লাগলেও, তখন সেটিই ছিল তাঁর বাস্তবতা।
বিমানসেবক হওয়ার সুযোগও এসেছিল
অভিনয়ের আগে তিনি বিমানসেবক হওয়ার জন্যও আবেদন করেছিলেন।
প্রাথমিক ধাপও পেরিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু ঠিক তখনই টেলিভিশনে অভিনয়ের সুযোগ আসে। জীবনের মোড় ঘুরে যায় সেখান থেকেই।
টেলিভিশনের পরিচিত মুখ
ছোট পর্দাতেই বিক্রান্তের অভিনয়জীবনের আসল সূচনা। ধারাবাহিকের মাধ্যমে ধীরে ধীরে দর্শকদের কাছে পরিচিত হয়ে ওঠেন। দীর্ঘ সময় ধরে টেলিভিশনে কাজ করে অভিনয়ের ভিত্তি আরও মজবুত করেন।
এই সময়টাই তাঁকে ক্যামেরা, সংলাপ, চরিত্র নির্মাণ—সবকিছুর বাস্তব শিক্ষা দেয়।
সিনেমায় ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠা
বলিউডে তাঁর যাত্রা শুরু হয় ছোট ছোট চরিত্র দিয়ে। কিন্তু কখনো শর্টকাট খোঁজেননি। প্রতিটি চরিত্রকে গুরুত্ব দিয়ে অভিনয় করেছেন। ‘লুটেরা’, ‘আ ডেথ ইন দ্য গঞ্জ’, ‘ছপাক’, ‘হাসিন দিলরুবা’, ‘সেক্টর ৩৬’ —একটির পর একটি ছবিতে নিজের অভিনয়দক্ষতার প্রমাণ দিয়েছেন।
‘টুয়েলভথ ফেল’ বদলে দিল সবকিছু
অবশেষে আসে সেই চলচ্চিত্র, যা তাঁর ক্যারিয়ারের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। ‘টুয়েলভথ ফেল’
শুধু বাণিজ্যিকভাবেই সফল হয়নি, সমালোচকদের কাছেও ব্যাপক প্রশংসা পায়। একজন সাধারণ যুবকের স্বপ্নপূরণের গল্পে বিক্রান্তের অভিনয় দর্শকদের আবেগাপ্লুত করে।
এই ছবির মাধ্যমে তিনি জাতীয় পর্যায়ে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে যান।
২৪ বছরেই নিজের বাড়ি
বিক্রান্তের জীবনের অন্যতম আবেগঘন অধ্যায় তাঁর প্রথম বাড়ি কেনা। মাত্র ২৪ বছর বয়সে তিনি নিজের উপার্জনের টাকায় একটি ছোট্ট বাড়ি কিনেছিলেন।
এটি ছিল তাঁর মায়ের বহুদিনের স্বপ্ন। বিক্রান্ত বলেছেন, জীবনে যা-ই ঘটুক না কেন, অন্তত মাথা গোঁজার একটি জায়গা থাকবে—এই নিশ্চয়তাই তিনি তাঁর মাকে দিতে চেয়েছিলেন।
ছেলের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন স্বপ্ন
আজ সময় বদলেছে। যে ছেলে একসময় কলেজের ফি জোগাড় করতে সংগ্রাম করেছেন, তিনিই এখন স্ত্রীকে নিয়ে সন্তানের জন্য দেশের সেরা স্কুল বেছে নেওয়ার কথা ভাবছেন। তিনি বলেছেন, জীবনের এই পরিবর্তন এখনো তাঁর কাছে অবিশ্বাস্য লাগে।
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস অবলম্বনে