বজ্রনিরোধক দণ্ডে কি কাজ হচ্ছে, না জেনেই কেন আরও স্থাপনের আলোচনা

· Prothom Alo

বজ্রপাতের মৃত্যু কমাতে ‘হটস্পটগুলো’ চিহ্নিত করে বজ্রনিরোধক দণ্ড বসানোর কর্মসূচি নেওয়া হয়েছিল কয়েক বছর আগে। ১৫ জেলার ১৩৫ উপজেলায় মোট ৩৩৫টি বজ্রপাত নিরোধক দণ্ড এবং বজ্রপাত নিরোধক যন্ত্র স্থাপনে বরাদ্দ রাখা হয়েছিল সাড়ে ১৯ কোটি টাকা। কিন্তু এই কর্মসূচির কোনো মূল্যায়ন হয়নি, এই প্রযুক্তির কার্যকারিতা নিয়েও সন্দিহান বিশেষজ্ঞরা। তবে এখন আবার নতুন করে বজ্রপাত নিরোধক দণ্ড কেনার আলোচনা চলছে। ২৮ জুন রোববার আন্তর্জাতিক বজ্রপাত নিরাপত্তা দিবস উপলক্ষে বিশেষ প্রতিবেদন।

Visit sweetbonanza-app.com for more information.

চলতি মাসের ৩ তারিখ চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার ভবানীপুর গ্রামের একটি আমবাগানে বজ্রপাতে মৃত্যু হয় মিরাজ নামের এক কিশোরের। ওই দিনই মারা যান পৌর এলাকার মনিরুল ইসলাম। ২২ মে থেকে ১৫ জুন—এই ২৫ দিনে এই বজ্রপাতে অন্তত ১১ জনের মৃত্যু হয়। অথচ জেলার বিভিন্ন স্থানে কয়েক বছর আগেই বসানো হয় বজ্রনিরোধক যন্ত্র বা লাইটনিং অ্যারেস্টার।

স্থানীয়দের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যানুযায়ী, রক্ষণাবেক্ষণ না হওয়ায় অনেক জায়গায় অ্যারেস্টারগুলো অকেজো হয়ে আছে।

তবে চাঁপাইনবাবগঞ্জের জেলা প্রশাসক আবু ছালেহ মো. মুসা জঙ্গী দাবি করছেন, জেলার অ্যারেস্টারগুলো ঠিক আছে। মৃত্যুগুলো যেসব স্থানে ঘটেছে, সেখানে অ্যারেস্টার নেই।

বজ্রনিরোধক যন্ত্রগুলোতে বজ্রপাতের ঘটনার তথ্য থাকার কথা। সেগুলো আছে কি না—প্রশ্নের জবাবে জেলা প্রশাসক বলেন, ‘এ তথ্য আমার কাছে নেই। খোঁজ নিতে হবে।’

অধ্যাপক মো. রাফি উদ্দিন, পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগ, বুয়েটবাংলাদেশে বজ্রনিরোধক অ্যারেস্টার দিয়ে বজ্রপাত নিরোধ অবাস্তব ধারণা, কোথাও এটা হয়নিঢাকায় সম্প্রতি কাল বৈশাখীর সময় এমন বজ্রপাত দেখা দিয়েছিল

বজ্রপাতের ঝুঁকি কমাতে এই দণ্ডগুলোর কার্যকারিতা নিয়ে বিশেষজ্ঞ মহল থেকে প্রশ্ন ওঠার পর অন্তর্বর্তী সরকার আমলে এগুলো আর নতুন করে স্থাপন না করার সিদ্ধান্ত হয়েছিল। এগুলো আসলেই কার্যকর কি না, তার কোনো মূল্যায়ন না হলেও বর্তমান সরকার আবার বজ্রনিরোধক দণ্ড স্থাপনের দিকে এগোচ্ছে।

ফলে প্রশ্ন উঠেছে, যে প্রযুক্তির কার্যকারিতা নিয়েই দেশ-বিদেশে বিতর্ক রয়েছে, যার বাস্তব ফলাফল নিয়ে মাঠপর্যায়ে স্পষ্ট মূল্যায়ন নেই, সেই প্রযুক্তিতেই আবার নতুন বিনিয়োগ কেন?

কোটি টাকার প্রকল্প, কিন্তু মূল্যায়ন নেই

বাংলাদেশে বজ্রপাতকে ২০১৬ সালে ‘জাতীয় দুর্যোগ’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এরপর বজ্রপাতের ‘হটস্পটগুলো’ চিহ্নিত করে বজ্রনিরোধক দণ্ড বসানোর কর্মসূচি নেওয়া হয়েছিল। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় ২০২১-২২ অর্থবছরে এ জন্য সাড়ে ১৯ কোটি টাকা বরাদ্দও রাখে।

এ কর্মসূচির আওতায় দেশের ১৫ জেলার ১৩৫ উপজেলায় মোট ৩৩৫টি বজ্রনিরোধক দণ্ড ও বজ্রপাত নিরোধক যন্ত্র স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। বিশেষ করে হাওরাঞ্চল, উন্মুক্ত মাঠ, কৃষি এলাকা এবং বজ্রপাতপ্রবণ জেলাগুলোতে এসব দণ্ড স্থাপন করা হয়।

তবে এই দণ্ডগুলোর অধিকাংশই কয়েক বছরের মধ্যেই অকার্যকর হয়ে যায় বলে স্থানীয় পর্যায় থেকে অভিযোগ আসে। প্রকল্প বাস্তবায়নের কয়েক বছর পরও কোনো জাতীয় মূল্যায়ন প্রকাশ করা হয়নি। ফলে কতগুলো যন্ত্র সচল আছে, কতগুলো বিকল, কতটি বজ্রপাত এগুলো গ্রহণ করেছে, কিংবা এগুলো বসানোর ফলে মৃত্যুহার কতটা কমেছে, তার কোনো তথ্যই জানা হয়নি।

প্রচলিত বজ্রনিরোধক দণ্ড ২০ মিটার উচ্চতায় স্থাপন করলে এর কার্যকর সুরক্ষা ব্যাসার্ধ প্রায় ২৯ মিটার পর্যন্ত হতে পারে। অন্যদিকে আধুনিক আর্লি স্ট্রিমার ইমিশন (ইএসই) প্রযুক্তির বজ্রনিরোধক ৬০ মিটার উচ্চতায় স্থাপন করা হলে সর্বোচ্চ প্রায় ১২০ মিটার ব্যাসার্ধ পর্যন্ত সুরক্ষা দেওয়ার দাবি করা হয়। অর্থাৎ যন্ত্রটি পুরো ইউনিয়ন, পুরো গ্রাম, এমনকি একটি পুরো আমবাগানও নিরাপদ করে না।

হবিগঞ্জের অভিজ্ঞতা: প্রমাণ নেই

হবিগঞ্জের তিন উপজেলায় চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহে বজ্রপাতে তিনজনের মৃত্যু হয়। গত ছয় বছরে জেলায় বজ্রপাতে মারা যান অন্তত ৯০ জন, যার মধ্যে ৬৫ জনই কৃষক। বজ্রপাতের ঝুঁকি কমাতে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় ২০২১-২২ অর্থবছরে প্রায় ২ কোটি টাকা ব্যয়ে এ জেলার বিভিন্ন স্থানে ৩৩টি অ্যারেস্টার স্থাপন করে।

জেলার ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা আলমগীর হোসেন গতকাল শনিবার প্রথম আলোকে বলেন, অ্যারেস্টারগুলো কার্যকর বলে উপজেলা পর্যায় থেকে তাঁকে জানানো হয়েছে।

উপজেলা পর্যায়ের কোনো কর্মকর্তা এই প্রযুক্তিগত দিক বুঝতে কি সক্ষম—এই প্রশ্নে আলমগীর হোসেন বলেন, ‘আসলে এটা ঠিক এটা বুঝতে পারাটা জটিল। আমার তো এসব তথ্যের ওপর নির্ভর করতে হবে। তবে আমি আরও খোঁজ নিয়ে জানার চেষ্টা করব।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে জেলা প্রশাসনের এক কর্মকর্তা বলেছেন, কোথাও এমন কোনো তথ্য বা রেকর্ড নেই, যা থেকে বোঝা যায়—যন্ত্রগুলো বজ্রপাত নিরোধ করেছে। অনেক স্থানে যন্ত্রের রক্ষণাবেক্ষণও নেই।

ভুল ধারণা বাড়ায় ঝুঁকি

বিশেষজ্ঞদের মতে, বজ্রনিরোধক দণ্ডের সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি হলো মানুষের প্রত্যাশা।

অনেকে মনে করেন, একটি বজ্রনিরোধক যন্ত্র বসানো মানেই পুরো গ্রাম বা আশপাশের কয়েক কিলোমিটার এলাকা নিরাপদ হয়ে গেছে। বাস্তবে বিষয়টি মোটেও এমন নয়।

প্রচলিত বজ্রনিরোধক দণ্ড ২০ মিটার উচ্চতায় স্থাপন করলে এর কার্যকর সুরক্ষা ব্যাসার্ধ প্রায় ২৯ মিটার পর্যন্ত হতে পারে। অন্যদিকে আধুনিক আর্লি স্ট্রিমার ইমিশন (ইএসই) প্রযুক্তির বজ্রনিরোধক ৬০ মিটার উচ্চতায় স্থাপন করা হলে সর্বোচ্চ প্রায় ১২০ মিটার ব্যাসার্ধ পর্যন্ত সুরক্ষা দেওয়ার দাবি করা হয়।

অর্থাৎ যন্ত্রটি পুরো ইউনিয়ন, পুরো গ্রাম, এমনকি একটি পুরো আমবাগানও নিরাপদ করে না। এটি কেবল নির্দিষ্ট একটি সীমিত এলাকার জন্য পরিকল্পিত।

কিন্তু বাস্তবে অনেক মানুষ মনে করেন, অ্যারেস্টার বসানো হয়েছে মানেই আশপাশে আর বজ্রপাত হবে না—এই ভুল ধারণা মানুষকে উল্টো ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।

বজ্রনিরোধক নিয়ে ভুল ধারণার ক্ষেত্রে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ‘সাইড ফ্ল্যাশ’।

আসাদুল হাবিব, মন্ত্রী, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়অ্যারেস্টার তো লাগবে। তবে সেটাই একমাত্র উপায় নয়। আমরা বিশেষ করে হাওরাঞ্চলসহ বজ্রপাতপ্রবণ অঞ্চলে আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা করছি

ধরা যাক, একটি উঁচু গাছের পাশে খোলা মাঠে একটি বজ্রনিরোধক দণ্ড বসানো হয়েছে। মানুষ যদি ধরে নেয় যে যন্ত্রটির কাছাকাছি দাঁড়ানোই নিরাপদ, তাহলে সেটি বিপজ্জনক ভুল হতে পারে। কারণ, বজ্রপাত কোনো উঁচু বস্তুকে আঘাত করার পর উচ্চ ভোল্টেজের বিদ্যুৎ পাশের গাছ, ধাতব বস্তু কিংবা মানুষের শরীরে লাফিয়ে যেতে পারে। একে বলা হয় সাইড ফ্ল্যাশ।

আন্তর্জাতিক বজ্র সুরক্ষা নির্দেশিকাগুলো তাই শুধু বজ্রনিরোধক বসানোর কথা বলে না, বরং নিরাপদ দূরত্ব, আর্থিং, সমবিভব ও মানুষের অবস্থান—সবকিছুকেই সমান গুরুত্ব দেয়।

সমবিভব হলো কোনো কারণে বজ্রপাত বা বৈদ্যুতিক ত্রুটির সময় যদি একটি ধাতব অংশে বিদ্যুৎ চলে আসে, তাহলে সমবিভব সংযোগের কারণে আশপাশের অন্যান্য ধাতব অংশও একই বিভবে চলে আসে। ফলে একজন মানুষ একসঙ্গে দুটি ধাতব অংশ স্পর্শ করলে তার শরীরের মধ্য দিয়ে বিদ্যুৎপ্রবাহ প্রবাহিত হওয়ার আশঙ্কা অনেক কমে যায়।

বিতর্কিত ইএসই প্রযুক্তি

বাংলাদেশে যেসব আধুনিক বজ্রনিরোধক দণ্ড ব্যবহারের কথা বলা হচ্ছে, তার বড় অংশই ইএসই (আর্লি স্ট্রিমার ইমিশন) প্রযুক্তিনির্ভর। এই প্রযুক্তিতে বজ্রনিরোধক দণ্ড বজ্রপাতের ঠিক আগমুহূর্তে আয়নিত ক্ষেত্র তৈরি করে নিজের দিকে আকর্ষণ করে এবং তা নিরাপদে মাটির নিচে প্রবাহিত করে।

এই প্রযুক্তির নির্মাতারা দাবি করেন, এটি প্রচলিত ফ্র্যাঙ্কলিন রডের তুলনায় অনেক বড় এলাকা সুরক্ষা দিতে পারে। কিন্তু এই দাবিই আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্কের বিষয়।

যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ফায়ার প্রটেকশন অ্যাসোসিয়েশন (এনএফপিএ) এবং প্রযুক্তিবিদদের সংগঠন আইট্রিপলই বহু বছর ধরেই প্রচলিত ফ্র্যাঙ্কলিন পদ্ধতিকেই মূল মানদণ্ড হিসেবে অনুসরণ করে আসছে। প্রচলিত এ পদ্ধতিতে উঁচু ভবনের ওপর স্থাপিত দণ্ড বজ্রপাতের পর বিদ্যুৎকে এর সঙ্গে সংযুক্ত তারের মাধ্যমে মাটিতে পরিবাহিত করে। এই প্রযুক্তিতে বজ্রকে আগে থেকে আকর্ষণ করা হয় না।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় ২০২১-২২ অর্থবছরে সাড়ে ১৯ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখে বজ্রনিরোধক দণ্ড স্থাপনে। ১৫ জেলার ১৩৫ উপজেলায় মোট ৩৩৫টি বজ্রনিরোধক দণ্ড স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। বিশেষ করে হাওরাঞ্চল, উন্মুক্ত মাঠ, কৃষি এলাকা ও বজ্রপাতপ্রবণ জেলাগুলোতে এসব যন্ত্র স্থাপন করা হয়।

এএসই প্রযুক্তির কার্যকারিতা নিয়ে বিশ্বজুড়ে ভিন্নমত রয়েছে। ২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রে ইএসই প্রযুক্তি বিক্রির সঙ্গে যুক্ত একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা হয়। তাতে অভিযোগ ছিল, প্রযুক্তিটির কার্যকারিতা সম্পর্কে অতিরঞ্জিত ও বিভ্রান্তিকর দাবি করা হয়েছে। আদালতের নির্দেশে প্রতিষ্ঠানটিকে জরিমানা দিতে হয় এবং তাদের বিপণন কার্যক্রম বন্ধ করতে হয়।

নতুন গবেষণাও তুলছে প্রশ্ন

সম্প্রতি আইট্রিপলইতে প্রকাশিত ‘আ লংটার্ম স্টাডি অন দ্য পারফরম্যান্স অব আর্লি স্ট্রিমার ইমিশন এয়ার টার্মিনালস ইন আ হাই কেরাউনিক রিজিয়ন’ শীর্ষক গবেষণায়ও ইএসই প্রযুক্তির দীর্ঘমেয়াদি কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।

গবেষকেরা দীর্ঘ সময়ের বাস্তব তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখেছেন, নির্মাতাদের দাবি অনুযায়ী অতিরিক্ত সুরক্ষার পক্ষে পর্যাপ্ত প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

অবশ্য গবেষণাটি ইএসই প্রযুক্তিকে সম্পূর্ণ অকার্যকর বলেও ঘোষণা করেনি। বরং বলেছে, এর কার্যকারিতা নিয়ে আরও স্বাধীন, দীর্ঘমেয়াদি ও বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন প্রয়োজন।

বাংলাদেশে প্রতিবছর ৬০ লাখ বজ্রপাত হয় বলে একাধিক গবেষণায় উঠে এসেছে। এর মধ্যে ৫১ শতাংশই হয় ভূমিতে, বাকিটা মেঘের মধ্যে। তবে বিশ্বের বেশির ভাগ দেশে ৭০ ভাগ হয় মেঘে, বাকিটা ভূমিতে। অর্থাৎ দেশে ৩০ লাখের বেশি বজ্রপাত হয় ভূমিতে।

সেখানে অ্যারেস্টারের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক মো. রাফি উদ্দিন। তিনি দীর্ঘ দুই দশকের বেশি সময় ধরে বজ্রপাত নিয়ে গবেষণা করছেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, বাংলাদেশে বজ্রনিরোধক অ্যারেস্টার দিয়ে বজ্রপাত নিরোধ অবাস্তব ধারণা, কোথাও এটা হয়নি।

৮ জুন মন্ত্রণালয়ের এক বৈঠকে অ্যারেস্টার সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের দেওয়া তথ্য উল্লেখ করে মো. রাফি উদ্দিন বলেন, কোম্পানিটি জানিয়েছে, পুরো বছরে তাদের অ্যারেস্টারে মাত্র একটি বজ্রপাত ধারণের ঘটনা পাওয়া গেছে। বিষয়টি যে কতটা অকার্যকর, তা বোঝাই যাচ্ছে।

তাহলে সরকার আবার কেন

অ্যারেস্টার নতুন করে স্থাপন বন্ধ রাখা হয়েছে বলে গত ২০২৫ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর বাসসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন অন্তর্বর্তী সরকারের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফারুক ই আজম।

ফারুক ই আজম বলেছিলেন, ‘বজ্রনিরোধক দণ্ড বা লাইটিং অ্যারেস্টার, এটা আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে তেমন কার্যকর নয়। এটা মাত্র ১০০ মিটার রেডিয়াসে কাজ করে। তাহলে পুরো দেশের জন্য কত দণ্ড প্রয়োজন! সে জন্য আমরা মনে করি, বজ্রপাত নিরোধক দণ্ড নয়, বরং মানুষকে সচেতন করাটাই শ্রেয়।’

উদাহরণ হিসেবে সুনামগঞ্জকে ধরা যেতে পারে। বজ্রপাতপ্রবণ এই জেলার আয়তন ৩ হাজার ৭৫০ বর্গকিলোমিটার। এটি অ্যারেস্টারের ১০০ মিটার সক্ষমতা ধরলে শুধু সুনামগঞ্জে ১ লাখ ৪২ হাজার অ্যারেস্টার বসাতে হবে ১১ হাজার কোটি টাকায়।

তবে ৮ জুন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের এক সভার নোটিশে দেখা যায়, সরকার নতুন করে বজ্রনিরোধক প্রযুক্তি নিয়ে আলোচনা করছে। সভায় বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের পাশাপাশি প্রযুক্তি সরবরাহকারী দুই প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদেরও ডাকা হয়।

বিশেষজ্ঞদের প্রশ্ন, আগে স্থাপিতগুলোর কার্যকারিতার মূল্যায়ন না করে নতুন করে বিনিয়োগ কতটা যৌক্তিক?

বিশেষজ্ঞদের মতে, বজ্রপাত থেকে প্রাণহানি কমাতে শুধু অ্যারেস্টার বসালেই হবে না। এর সঙ্গে প্রয়োজন আধুনিক বজ্রপাত পূর্বাভাস ব্যবস্থা, মোবাইলে তাৎক্ষণিক সতর্কবার্তা, কৃষকদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র, মাঠে কাজের সময়সূচি পরিবর্তন, বিদ্যালয়ভিত্তিক সচেতনতা, বজ্রপাতের সময় কী করতে হবে—এসব বিষয়ে গণপ্রচার।

তালগাছ, দণ্ড কিছুই কাজে এল নাবজ্রপাত নিয়ে সতর্কবার্তা

সরকার যদি আবার নতুন করে বজ্রনিরোধক দণ্ড স্থাপনের উদ্যোগ নেয়, তাহলে তার আগে আগের প্রকল্পের সাফল্য-ব্যর্থতার একটি স্বাধীন মূল্যায়ন প্রকাশ করা জরুরি।

আগে স্থাপন করা অ্যারেস্টারগুলোর কার্যকারিতা প্রমাণিত নয় বলে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিবও স্বীকার করেন। তবে বজ্রপাত নিরোধে সম্ভাব্য ব্যবস্থাগুলোর মধ্যে অ্যারেস্টার থাকছে বলে জানিয়েছেন তিনি।

আসাদুল হাবিব গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘অ্যারেস্টার তো লাগবে। তবে সেটাই একমাত্র উপায় নয়। আমরা বিশেষ করে হাওরাঞ্চলসহ বজ্রপাতপ্রবণ অঞ্চলে আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা করছি।’

এখন বজ্রপাতে মৃত্যু কমাতে বিশেষজ্ঞদের কাছে পরামর্শ চাওয়া হয়েছে বলে জানান আসাদুল হাবিব।

৮ জুনের সভায় অ্যারেস্টার সরবরাহকারী কোম্পানির প্রতিনিধিদের উপস্থিতি সম্পর্কে মন্ত্রী বলেন, ‘আমরা তাঁদের ডেকেছিলাম মতামত জানার জন্য।’

দুর্যোগবিশেষজ্ঞ গওহার নঈম ওয়ারা প্রথম আলোকে বলেন, অ্যারেস্টার বা আশ্রয়কেন্দ্র স্থাপনে খরচ বাড়বে, কিন্তু মানুষের জীবন বাঁচবে, তার নিশ্চয়তা নেই। মাঠে কাজ করা মানুষ তো বুঝতেই পারে না কখন বজ্রপাত হবে। সে সম্পর্কে তার সচেতনতা ও ধারণা থাকাটা দরকার। কিন্তু তা তো হচ্ছে না।

Read full story at source