পর্তুগালের গ্রামীণ উৎসব: ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মেলবন্ধন

· Prothom Alo

মে মাসের শেষ সপ্তাহের এক সন্ধ্যায় শাহাদাত ভাই হঠাৎ জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি কখনো বুল ফাইটিং দেখছ?’

প্রশ্নটা শুনে ছোটবেলার একটা স্মৃতি মনে পড়ল। ছোটোবেলায় পত্রিকা পড়া যখন নেশা ছিল, একদিন পত্রিকায় গ্রামবাংলার ষাঁড়ের লড়াইয়ের একটা ছবিসহ রিপোর্ট পড়ে বাবার কাছে জেদ করেছিলাম আমাকে যেন নিয়ে যায় ষাঁড়ের লড়াই দেখতে। কিন্তু যাওয়া আর হয়ে ওঠেনি। ভাইকে বললাম সেই ঘটনা। শাহাদাত ভাই বললেন, ‘চলো, আজকে দেখাই তোমাদের। আজকে একটা ফেস্টিভ্যালে হচ্ছে।’

Visit sportnewz.click for more information.

গুগল ম্যাপে জায়গাটা সার্চ দিয়ে দেখি লিসবন থেকে বেশ দূরে। রাত হয়ে যাবে ভেবে একটু ইতস্তত করছিলাম। সেটা বুঝতে পেরে ভাই বললেন, ‘আরে চলো, সবাই একসাথে যাই। যত রাতই হোক আমি তোমাকে বাসায় নামিয়ে দিয়ে আসব।’ এরপর আরিফ ভাই, রাজন ভাইসহ আমরা চারজন রওনা দিলাম। প্রায় ৪০ মিনিট পর পৌঁছালাম মোইতা শহরের ফেইরা দে মাইয়োতে।

মেলার আশপাশে পুরোনো ধাঁচের ঘরবাড়ি। পর্তুগালের গ্রামের এই পরিবেশে অদ্ভুত এক অনুভূতি আছে। মনে হচ্ছিল, যেন ৫০ বছর আগের কোনো ইউরোপিয়ান আর্টহাউস সিনেমার লোকেশনে এসে পড়েছি। ধীর আলো, পুরোনো দেয়াল, সরু রাস্তা—সবকিছুতেই সময় একটু ধীরে চলে।

দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]

মেলার ভেতরে ঢুকতেই পুরো দৃশ্য বদলে গেল। হঠাৎ মনে হলো যেন ফ্যান্টাসি কিংডম আর থাইল্যান্ডের কোনো নাইট মার্কেট একসঙ্গে মিশে গেছে। বিশাল এলাকাজুড়ে অসংখ্য দোকান, রাইড, গেম, খাবারের স্টল, খোলা আকাশের নিচে স্টেজ, গান, নাচ—সব মিলিয়ে এক উৎসবমুখর জনসমুদ্র।

পর্তুগালে আসার পর এত মানুষ একসঙ্গে আমি আগে কখনো দেখিনি। কেউ বন্ধুদের সঙ্গে এসেছে, কেউ পরিবার নিয়ে, কেউবা একা বিয়ার হাতে শুধু উৎসবের পরিবেশটা অনুভব করতে। দূর থেকে ভেসে আসছিল মিউজিক। সেই শব্দ অনুসরণ করে এগিয়ে গিয়ে দেখি, বিশাল এক স্টেজে নাচ চলছে। স্প্যানিশ ফ্ল্যামেঙ্কো ধাঁচের সেই নাচ দেখে হঠাৎ ‘জিনদাগি না মিলেগি দোবারা’ সিনেমার কথা মনে পড়ে গেল। পুরো পরিবেশটাই যেন ‘সে অরিতা’ গানের কোনো দৃশ্য।

আমি কিছুক্ষণ পরপর নতুন কিছু আবিষ্কার করছিলাম স্টলগুলোতে, এ জন্য মাঝেমধ্যে অন্যদের থেকে ভিড়ের মধ্যেই হারিয়ে যাচ্ছিলাম। যেন ছোটবেলায় মেলায় হারিয়ে যাওয়ার মতো। কিন্তু এখন মোবাইল আছে, তাই অন্যদের খুঁজে পেতে কষ্ট হলো না। আমার কাছে প্রতিটি মুহূর্তই ছিল নতুন অভিজ্ঞতা। মনে হচ্ছিল, হয়তো এ কারণেই এত দূরে ইউরোপে পড়তে আসা সার্থক। শুধু ডিগ্রির জন্য নয়; পৃথিবীর নানা সংস্কৃতি, মানুষ আর জীবনকে কাছ থেকে দেখার জন্য।

হঠাৎ চোখে পড়ল একটা খাবারের দোকান। দূর থেকে দেখে মনে হলো জিলাপি বানানো হচ্ছে। কৌতূহল নিয়ে কাছে গিয়ে দেখি, দেখতে প্রায় একই রকমভাবে বানানো হলেও এটি আসলে পর্তুগিজ খাবার ‘Farturas Churros Recheados’। শাহাদাত ভাই জানালেন, এটি পর্তুগিজদের ঐতিহ্যবাহী মেলার খাবার। আমরা কয়েকজন মিলে সেটা খেলাম। আশ্চর্যভাবে স্বাদের কোথাও যেন গ্রামবাংলার পিঠার সঙ্গে মিল খুঁজে পেলাম। তখন মনে হলো, পৃথিবীর সংস্কৃতিগুলো বাইরে থেকে যত আলাদা মনে হোক, ভেতরে ভেতরে তাদের মধ্যে অদ্ভুত কিছু মিল থেকেই যায়।

এরপর আমরা গেলাম বুল ফাইট দেখতে। মেলার একপাশে তখন মানুষের ঢল ধীরে ধীরে আরেক দিকে সরছে। দূর থেকে ভেসে আসছিল ঘোষণা আর হুইসেলের শব্দ। বিশাল এক এরিনার সামনে এসে দেখি হাজার হাজার মানুষ। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো এত মানুষ, এত ভিড়, তবু কোথাও বিশৃঙ্খলা নেই। সবাই যেন জানে তারা একটা ঐতিহ্যের অংশ হতে এসেছে।

এরিনার ভেতরে ঢুকে প্রথম যে জিনিসটা আমাকে অবাক করল, সেটা হলো পরিবেশের নাটকীয়তা। লাইট, ঘোড়ার শব্দ, ট্রাম্পেটের সুর—সবকিছু মিলিয়ে মনে হচ্ছিল আমি কোনো লাইভ থিয়েটার দেখতে এসেছি। পর্তুগালের বুল ফাইট ভিন্ন অন্য অনেক দেশের চেয়ে। এখানে ষাঁড়কে দর্শকদের সামনে হত্যা করা হয় না। বরং পুরো ব্যাপারটা অনেকটা সাহস, কৌশল আর ঐতিহ্যের প্রদর্শনের মতো। প্রথমে ঘোড়ার ওপর থাকা ‘cavaleiro’ ষাঁড়কে নিয়ন্ত্রণ করে। এরপর আসে ‘forcados’—একদল মানুষ, যারা কোনো অস্ত্র ছাড়া সরাসরি ষাঁড়ের সামনে দাঁড়ায়।

আমি অবাক হয়ে দেখছিলাম, কয়েকজন মানুষ কীভাবে শুধু সাহস আর দলগত সমন্বয় দিয়ে বিশাল এক ষাঁড়কে থামানোর চেষ্টা করছে। মুহূর্তগুলো এত দ্রুত ঘটছিল যে চোখ সরানোর সুযোগ ছিল না। পুরো স্টেডিয়াম একসঙ্গে চিৎকার করছে, হাততালি দিচ্ছে, আবার হঠাৎ নিস্তব্ধ হয়ে যাচ্ছে।

বুঝতে পারলাম, এটা শুধু খেলা নয়—এটা এ অঞ্চলের মানুষের আবেগ, ইতিহাস আর পরিচয়ের অংশ।

মোইতা শহর রিবাতেজো অঞ্চলের সংস্কৃতির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। বহু শতাব্দী ধরে এই অঞ্চল কৃষি, ঘোড়া আর ষাঁড় পালনের জন্য পরিচিত। ফেইরা দে মেরিয়ো শুধু একটি মেলা নয়; এটি গ্রামীণ পর্তুগালের সামাজিক স্মৃতি। আগে কৃষক, ব্যবসায়ী আর পশুপালকেরা এখানে জড়ো হতো। সময়ের সঙ্গে সেটি আজ বিশাল সাংস্কৃতিক উৎসবে রূপ নিয়েছে। এখনো স্থানীয় মানুষ ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরে ঘোড়ায় চড়ে মেলায় আসে। তরুণদের মধ্যেও এই ঐতিহ্য নিয়ে গর্ব চোখে পড়ে।

চারপাশের মানুষদের দেখছিলাম। বৃদ্ধ মানুষ, তরুণ তরুণী, পরিবার—সবাই কত আবেগ নিয়ে এই অনুষ্ঠান দেখছে। তখন মনে হচ্ছিল, আমরা বাইরে থেকে ইউরোপকে যত আধুনিক আর মেকানিক্যাল ভাবি, বাস্তবে এখানকার মানুষেরাও নিজেদের লোকজ সংস্কৃতি আঁকড়ে ধরে বেঁচে আছে।

মজার বিষয় হলো, এই পুরো অভিজ্ঞতার মধ্যে কোথাও একটা গ্রামের গন্ধ আছে। আমাদের দেশের বৈশাখী মেলা, ষাঁড়ের হাট, কিংবা ঈদের আগের রাতের জমজমাট পরিবেশ—কিছু অনুভূতি যেন অদ্ভুতভাবে মিল খুঁজে পায়।

সংস্কৃতি হয়তো ভাষা বা দেশের সীমান্ত দিয়ে আলাদা হয়, কিন্তু মানুষের আনন্দ, উৎসব আর একসঙ্গে বাঁচার অনুভূতিগুলো পৃথিবীর সব জায়গাতেই প্রায় একই।

রাত তখন আরও গভীর হচ্ছিল। কিন্তু আমার মনে হচ্ছিল, আমি যেন ধীরে ধীরে পর্তুগালকে নতুনভাবে চিনতে শুরু করেছি। শুধু একজন প্রবাসী ছাত্র হিসেবে নয়, বরং এই সমাজের গল্প, মানুষ আর ঐতিহ্যকে কাছ থেকে দেখা একজন মানুষ হিসেবে।

লেখক: হুমায়ূন আহমেদ শ্রাবণ, পর্তুগালের নোভা স্কুল অব বিজনেস অ্যান্ড ইকোনমিকসের (নোভা এসবিই) ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড পাবলিক পলিসি বিষয়ের একজন মাস্টার্স শিক্ষার্থী।

Read full story at source