একাত্তরে সৈয়দপুরের গোলাহাটে গণহত্যার স্বীকৃতি দাবি
· Prothom Alo

নীলফামারীর সৈয়দপুরের গোলাহাটে একটি স্মৃতিস্তম্ভ রয়েছে। এটি নির্মিত হয়েছে ১৯৭১ সালে গোলাহাটিতে বিহারি ও পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে নিহত ৪৫০ হিন্দু ও মাড়োয়ারির স্মরণে; কিন্তু স্মৃতিস্তম্ভটি এখনো অসমাপ্ত। এর মতোই অসমাপ্ত এই গণহত্যার স্বীকৃতি। সেই স্বীকৃতির দাবি আবার উঠেছে বেসরকারিভাবে পালিত গোলাহাট গণহত্যার দিবসে।
Visit somethingsdifferent.biz for more information.
আজ শনিবার ‘১৯৭১ জেনোসাইড বাংলাদেশ: গোলাহাট, সৈয়দপুর ৫৫ বছর স্মরণ আয়োজন’ অনুষ্ঠানে এই দাবি ওঠে আলোচকদের মধ্য থেকে। রাজধানীর এশিয়াটিক সোসাইটি মিলনায়তনে এই অনুষ্ঠান আয়োজন করে জেনোসাইড জাস্টিস অ্যান্ড রিসার্চ ফোরাম ও বাংলা ভুবন ঐকতান।
১৯৭১ সালের ১৩ জুন গোলাহাট গণহত্যার বর্ণনা তুলে ধরে জেনোসাইড জাস্টিস অ্যান্ড রিসার্চ ফোরামের নির্বাহী পরিচালক খালিদা আক্তার বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় নিরাপদে ভারতে পৌঁছে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে হিন্দু ও মাড়োয়ারি সম্প্রদায়ের শত শত মানুষকে একটি ট্রেনে তোলা হয়েছিল। গোলাহাট এলাকায় ট্রেন থামিয়ে তাদের ওপর পরিকল্পিত হামলা চালানো হয়, যাতে অন্তত ৪৫০ জন নিহত হন; নারী, পুরুষ ও শিশু—কেউই এ হত্যাযজ্ঞ থেকে রক্ষা পাননি।
খালিদা আক্তার বলেন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে নীলফামারীর সৈয়দপুরের গোলাহাটে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড ছিল মানবসভ্যতার ইতিহাসের এক নির্মম অধ্যায়। এই গণহত্যার বিচার ও যথাযথ স্বীকৃতি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
একাত্তর গোলাহাট হত্যাকাণ্ড নিয়ে জেনোসাইড জাস্টিস অ্যান্ড রিসার্চ ফোরাম ও বাংলা ভুবন ঐকতানের আলোচনা অনুষ্ঠানে নিহত স্বজনের স্মৃতি তুলে ধরে বক্তব্য দেন সাইদুর রহমান। আজ শনিবার বিকেলে ঢাকায় এশিয়াটিক সোসাইটি মিলনায়তনেআদিত্যপুর, কালীগঞ্জ ও ছাতনী গণহত্যা
অনুষ্ঠানে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে সিলেটের আদিত্যপুর, নীলফামারীর কালীগঞ্জ ও নাটোরের ছাতনী গণহত্যার বিস্তারিত তুলে ধরেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গবেষক ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক জেবউননেছা।
জেবউননেছা বলেন, এসব হত্যাকাণ্ডে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর পাশাপাশি স্থানীয় রাজাকার ও স্বাধীনতাবিরোধী সহযোগীরাও অংশ নেয়। আদিত্যপুরে শান্তি কমিটির পরিচয়পত্র দেওয়ার কথা বলে ৬৫ জন হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষকে ডেকে নিয়ে রশি দিয়ে বেঁধে গুলি করে হত্যা করা হয় এবং পরে বহু নারী নির্যাতনের শিকার হন।
কালীগঞ্জ ও ছাতনী গণহত্যার প্রসঙ্গে অধ্যাপক জেবউননেছা বলেন, কালীগঞ্জে শরণার্থীদের দুই ভাগে ভাগ করে একদলকে গুলি এবং অন্যদলকে পাশের খালপাড়ে নিয়ে হত্যা করা হয় বলে প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায় উঠে এসেছে। অন্যদিকে নাটোরের ছাতনীতে রাতে গ্রাম ঘেরাও করে ঘুমন্ত মানুষদের হত্যার পর মরদেহ শনাক্ত কঠিন করে তুলতে নৃশংসতা চালানো হয়।
এসব গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি, বধ্যভূমি সংরক্ষণ এবং শহীদদের স্মৃতি রক্ষায় রাষ্ট্রের কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
একাত্তর গোলাহাট হত্যাকাণ্ড নিয়ে জেনোসাইড জাস্টিস অ্যান্ড রিসার্চ ফোরাম ও বাংলা ভুবন ঐকতানের আলোচনা অনুষ্ঠানে ফোরামের গবেষক, অবসরপ্রাপ্ত বিচারক ফাউজুল আজিম। আজ শনিবার বিকেলে ঢাকায় এশিয়াটিক সোসাইটি মিলনায়তনেবিচার দাবি
অনুষ্ঠানে সভাপ্রধান জেনোসাইড জাস্টিস অ্যান্ড রিসার্চ ফোরামের গবেষক ও অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ ফউজুল আজিম ১৯৭১ সালের প্রতিটি গণহত্যার ঘটনা আলাদাভাবে তদন্ত করে সংশ্লিষ্ট সব অপরাধীকে বিচারের আওতায় আনার দাবি জানান। তিনি বলেন, ইতিহাসের সত্যকে অস্বীকার না করে যথাযথ স্বীকৃতি ও বিচার নিশ্চিত করাই জাতির প্রতি প্রকৃত দায়বদ্ধতা।
অনুষ্ঠানের সূচনা বক্তব্যে বাংলা ভুবন ঐকতানের প্রধান সমন্বয়কারী রুশো রকিব বলেন, যে জাতি তার ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, সে জাতি কখনো টিকে থাকতে পারে না; তাই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও গণহত্যার ইতিহাস ধারণ করে ভবিষ্যৎ নির্মাণে তরুণদের এগিয়ে আসতে হবে।
একাত্তর গোলাহাট হত্যাকাণ্ড নিয়ে জেনোসাইড জাস্টিস অ্যান্ড রিসার্চ ফোরাম ও বাংলা ভুবন ঐকতানের আলোচনা অনুষ্ঠানে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক জেবউননেছা। আজ শনিবার বিকেলে ঢাকায় এশিয়াটিক সোসাইটি মিলনায়তনেঅনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধকালে গোলাহাটে মা-বাবা ও ভাইসহ পাঁচ স্বজন হারানো পরিবারের সদস্য সাইদুর রহমান ও স্থানীয় সাংবাদিক এম আর আলম ঝন্টু। তাঁরা গোলাহাট গণহত্যাসহ সব গণহত্যার বিচার দাবি করেন।
রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর ‘আজো আমি বাতাসে লাশের গন্ধ পাই’ কবিতা আবৃত্তির মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের সূচনা করেন সঞ্চালক কানিজ গোফরানী কোরেশী। এরপর গোলাহাটে এবং স্বাধীনতাযুদ্ধে শহিদদের স্মরণে দাঁড়িয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।
অনুষ্ঠানে বক্তব্যের ফাঁকে ফাঁকে গোলাহাট গণহত্যার ওপর নির্মিত ভিডিও চিত্র, সাক্ষাৎকার ও অ্যানিমেশন দেখানো হয়।