‘পুশ ইন’ নিয়ে অবস্থান তুলে ধরেছে বাংলাদেশ ও ভারত
· Prothom Alo
বাংলাদেশ বলেছে, একতরফাভাবে সীমান্ত দিয়ে লোকজনকে ঠেলে পাঠানো অবৈধ, মানবাধিকারবিরোধী ও আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী।
ভারতের দাবি, নিজস্ব আইন ও বিদ্যমান প্রক্রিয়া মেনে অবৈধ বিদেশিদের ফেরত পাঠানো হচ্ছে।
Visit chickenroadslot.lat for more information.
পুশ ইনের পাশাপাশি সীমান্ত হত্যা, চোরাচালান ও অননুমোদিত অবকাঠামোর বিষয়ও আলোচনায় এসেছে।
ভারত থেকে বাংলাদেশের ভেতরে লোকজনকে ঠেলে পাঠানোর (পুশ ইন) চেষ্টার মধ্যে বিজিবি ও বিএসএফের মহাপরিচালক পর্যায়ের বৈঠকে দুই পক্ষের ভিন্ন অবস্থান আবারও সামনে এসেছে। বাংলাদেশ একে অবৈধ, মানবাধিকারবিরোধী ও আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী বলেছে। অন্যদিকে ভারত বলেছে, নিজস্ব আইন ও বিদ্যমান প্রক্রিয়া মেনে অবৈধ বিদেশিদের ফেরত পাঠানো হচ্ছে।
দিল্লিতে অনুষ্ঠিত দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবি-বিএসএফের মহাপরিচালক পর্যায়ের ৫৭তম সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনে গতকাল মঙ্গলবার মূল আলোচনা হয়। বৈঠকে পুশ ইনের পাশাপাশি সীমান্তে নিরস্ত্র বাংলাদেশি নাগরিক হত্যা, আহত ও নির্যাতন বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়টিও গুরুত্ব পায়। সীমান্তসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ইস্যুতে দুই পক্ষ নিজেদের অবস্থান তুলে ধরে।
চার দিনের এই সম্মেলনে বিজিবির মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী লিখিত বক্তব্যে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরেন। বিএসএফের মহাপরিচালক প্রবীণ কুমার তাঁর বক্তব্যে ভারতের অবস্থান ব্যাখ্যা করেন। সূচি অনুযায়ী আজ বুধবার দুই পক্ষ সম্মত কার্যবিবরণী চূড়ান্ত করার বিষয়ে আলোচনা করবে। আগামীকাল বৃহস্পতিবার যৌথ সংবাদ সম্মেলনের মধ্য দিয়ে সম্মেলন শেষ হওয়ার কথা।
এটার একটা সমাধান দ্রুত হবে: পুশ ইন প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টাবিজিবি সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৭ মে থেকে চলতি বছরের ২৬ জানুয়ারি পর্যন্ত আট মাসে বিএসএফ ২ হাজার ৪৭৯ জনকে বাংলাদেশে পুশ ইন করেছিল। তাঁদের মধ্যে ১২০ জন ছিলেন ভারতীয় নাগরিক। তবে গত মে মাস থেকে আবার সীমান্তে পুশ ইনের চেষ্টা বাড়তে থাকে।
পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকার গঠনের পর দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর প্রধানদের নেতৃত্বে এটিই প্রথম বৈঠক। মে মাসে রাজ্যে ক্ষমতার পালাবদলের পর মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বে বিজেপি সরকার ‘ডিটেক্ট, ডিলিট অ্যান্ড ডিপোর্ট’ বা ‘থ্রি-ডি’ অভিযান শুরু করে। নথিপত্র ছাড়া থাকা ‘তথাকথিত বাংলাদেশি’দের লক্ষ্য করেই এ অভিযান চলছে বলে বলা হচ্ছে। শুভেন্দু অধিকারী এরই মধ্যে গণমাধ্যমে দাবি করেছেন, অন্তত ৪ হাজার ৮৮০ জন অনুপ্রবেশকারীকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে।
পুশ ইন নিয়ে কী বলছে দুই পক্ষ
গতকালের বৈঠকে বিজিবি ও বিএসএফের প্রধানেরা তাঁদের বক্তৃতায় পুশ ইন নিয়ে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরেন বলে দিল্লির কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে। সূত্র জানায়, বৈঠকে পুশ ইনের বিষয়ে গত এক বছরে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যা বলে আসছে, বিএসএফের মহাপরিচালক তাঁর বক্তৃতায় সেটাই পুনর্ব্যক্ত করেছেন। ভারতের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের নাগরিকসহ অবৈধ বিদেশিদের বিষয়ে দেশের আইন ও প্রক্রিয়া অনুসরণ করে পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। আর ভারতের নিজস্ব আইনের পাশাপাশি বাংলাদেশের সঙ্গে বিদ্যমান যে প্রক্রিয়া আছে, সেটা অনুসরণ করে বাংলাদেশ থেকে আসা অবৈধ লোকজনকে ফেরত পাঠানো হচ্ছে।
২ হাজার ৮০০ জনের বেশি বাংলাদেশিকে বিজিবির কাছে হস্তান্তরের যুক্তি দেখিয়ে বিএসএফ বলেছে, বিদ্যমান প্রক্রিয়া অনুসরণ করে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী কাজটি করছে।
যথারীতি গতকালের বৈঠকেও বাংলাদেশের কাছে অবৈধ লোকজনকে ফেরত নেওয়ার ব্যাপারে তালিকা দেওয়ার প্রসঙ্গটি বিএসএফ তুলেছে। বিএসএফ আবার বলেছে, বাংলাদেশকে তালিকা দেওয়া হলে তা দীর্ঘসূত্রতার জালে আটকে পড়ে। এ প্রসঙ্গে পাঁচ বছর ধরে তালিকা দেওয়ার বিষয়টি এসেছে।
পুশ ইন কেন অবৈধ, সে বিষয়ে বিজিবি বক্তব্য তুলে ধরেছে। মানবাধিকার এবং মানবিক প্রক্রিয়া লঙ্ঘনের পাশাপাশি বিদ্যমান আন্তর্জাতিক আইন অনুসরণ করা হয় না বলে বাংলাদেশ জোরালোভাবে বলেছে। বাংলাদেশ বলেছে, ভারতসহ যেকোনো দেশ থেকে লোকজনকে ফেরত আনতে হলে তাদের নাগরিকত্বের বিষয়টি নিশ্চিত হয়ে ফিরিয়ে আনতে বাংলাদেশ বদ্ধপরিকর। কাজেই যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে মানবাধিকার এবং মানবিক প্রক্রিয়ার আন্তর্জাতিক আইন মেনেই সেটা করতে হবে। তাই একতরফাভাবে লোকজনকে সীমান্তের ভেতরে জোর করে পাঠানোর কোনো সুযোগ নেই। এটা করা অবৈধ। এর পাশাপাশি বাংলাদেশ রাতের অন্ধকারে সীমান্তে লোকজনকে ঠেলে পাঠানোর অপপ্রয়াস নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে।
সীমান্তে ‘পুশ ইন’: কূটনৈতিক কাঠামোর সদ্ব্যবহার করা উচিতভারত তালিকা পাঠানোর পর বাংলাদেশ দীর্ঘসূত্রতা করে বলে যে অভিযোগ, সেটিরও জবাব দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশ গত বছরের মে মাস থেকে এ পর্যন্ত কী কী ব্যবস্থা নিয়েছে, সেটি তুলে ধরেছে।
ভারত থেকে বাংলাদেশে মাদকদ্রব্য, অস্ত্র ও অন্যান্য নিষিদ্ধ পণ্যের চোরাচালান রোধ, মানব পাচার প্রতিরোধ, সীমান্ত আইন লঙ্ঘন বন্ধ এবং আন্তর্জাতিক সীমান্তের ১৫০ গজের মধ্যে কাঁটাতারের বেড়ার মতো বিভিন্ন অননুমোদিত অবকাঠামো নির্মাণের বিষয়সহ আরও কিছু বিষয় বৈঠকের আলোচ্যসূচিতে ছিল।
দ্রুত সমাধানের আশা উপদেষ্টার
গতকাল সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে সীমান্তে পুশ ইন নিয়ে করা এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান বলেন, পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে ‘পুশ ইন’ একটা ইস্যু ছিল। এটা তাদের একটা অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ব্যাপার। তার খানিকটা চাপ বাংলাদেশের ওপরে আসছে উল্লেখ করে উপদেষ্টা বলেন, ‘আমি এভাবে মনে করি না যে বাংলাদেশের সঙ্গে কোনো একটা টেনশন (উত্তেজনা) তৈরির জন্য ভারতের সরকার এটা করছে। পশ্চিমবঙ্গে যে নতুন সরকার দায়িত্বে এসেছে নির্বাচিত হয়ে, তাদের নির্বাচনের একধরনের প্রতিশ্রুতি ছিল। তাদের একটা রাজনীতি আছে, সেটারই একধরনের বহিঃপ্রকাশ এটা।’
উপদেষ্টা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন, বাংলাদেশে নতুন যে সরকার এসেছে, তার সঙ্গে ভারতের সরকার, ...তাঁর নিজেরও কিছু কথাবার্তা হয়েছে, তাঁরা বাংলাদেশের সঙ্গে ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে ড. ইউনূস সরকারের সঙ্গে যে ধরনের পরিস্থিতি ছিল, সেটা থেকে তাঁরা বেরিয়ে আসতে চান। দুই দেশই সেটা চায়। সে জন্য তিনি মনে করেন প্রাথমিকভাবে যে সংকট দেখা যাচ্ছে, এটার একটা সমাধান দ্রুত হবে।