‘পরিবারের আগে দায়িত্ব, এখানেই সব সুখ–দুঃখ’

· Prothom Alo

ঈদ মানেই পরিবার–পরিজনের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি, ঘুরে বেড়ানো আর উৎসবের আমেজে সময় কাটানো। কিন্তু এই উৎসবের সময়েও কিছু মানুষ দায়িত্বের জায়গা থেকে সরে দাঁড়াতে পারেন না। পরিবার থেকে দূরে থেকেও তাঁরা কাজ করে যান মানুষের স্বস্তি নিশ্চিত করতে। কারও দায়িত্ব সড়কে শৃঙ্খলা বজায় রাখা, কারও দায়িত্ব হাসপাতালে জরুরি সেবা দেওয়া। ঈদের আনন্দ তাঁদের কাছে অন্য রকম—মানুষের মুখে স্বস্তি দেখার মধ্যেই তাঁরা খুঁজে পান তৃপ্তি।

ঈদুল আজহার দিন গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর বাংলামোটর মোড়ে ট্রাফিকের দায়িত্ব পালন করছিলেন মাহবুবুর রহমান। চারপাশের কোলাহল আর যানবাহনের চাপের মধ্যেও তিনি ছিলেন পুরোপুরি কাজে মনোযোগী। দায়িত্ব পালনের ফাঁকে কথা হয় তাঁর সঙ্গে।

Visit newsbetting.cv for more information.

মাহবুবুর রহমান জানান, ছয় বছর ধরে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক বিভাগে কাজ করছেন তিনি। ঈদ কেমন কাটছে, জানতে চাইলে হালকা হাসি দিয়ে বলেন, ‘ছুটি ছাড়া ঈদ যেমন কাটে আরকি। বেলা দুইটা থেকে ডিউটি শুরু হয়েছে। তার পর থেকেই এখানে দায়িত্ব পালন করছি।’

মাহবুবুর রহমান জানান, স্ত্রী ও চার মেয়ে নিয়ে রাজধানীর হাজারীবাগে থাকেন। গ্রামের বাড়ি নড়াইলে। ছুটি পেলে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে গ্রামের বাড়িতে ঈদ করতে যান। সেখানে বাবা–মা ও দুই ভাই থাকেন।

পরিবারের সঙ্গে ঈদ করতে না পারার কষ্টের কথাও বলেন মাহবুবুর রহমান। তিনি বলেন, ‘গ্রামের বাড়িতে বাবা–মা, দুই ভাইসহ সবাই একসঙ্গে আনন্দ করছে। উৎসবমুখর পরিবেশ। কিন্তু আমি যেতে পারলাম না—এটা ভেবে খারাপ লাগে। তবুও কিছু করার নেই। এই দায়িত্ব তো আর ফেলে রাখা যাবে না। পুলিশের চাকরি মানে জনগণের সেবা। পরিবারের আগে দায়িত্ব। এখানেই সব সুখ–দুঃখ।’

মাহবুবুর রহমান, ট্রাফিক পুলিশ ‘ছুটি ছাড়া ঈদ যেমন কাটে আরকি। বেলা দুইটা থেকে ডিউটি শুরু হয়েছে। তার পর থেকেই এখানে দায়িত্ব পালন করছি

ঈদের ছুটিতে মেয়েরা ঘুরতে যেতে চাইলেও ডিউটির কারণে তাঁদের সময় দিতে পারেননি বলে জানান তিনি। মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘মেয়েরা আমি ছুটি পাইনি বলে গ্রামেও যায়নি। একটু ঘুরতে বের হতে চেয়েছিল, কিন্তু ডিউটির কারণে নিয়ে যেতে পারিনি। চাইলে তো যখন–তখন বের হওয়া যায় না। সবার ছুটি সম্ভবও নয়। কাউকে না কাউকে ত্যাগ স্বীকার করতেই হয়।’

তবে দায়িত্ব পালনের মধ্যেই আলাদা একধরনের তৃপ্তি খুঁজে পান এই ট্রাফিক পুলিশ সদস্য। তাঁর ভাষায়, ‘শহরের রাস্তা যখন সুশৃঙ্খল থাকে, মানুষ নির্বিঘ্নে চলাচল করতে পারে, তখন খুব ভালো লাগে। আমাদের কাজ জনগণের সেবা করা। আমি দায়িত্ব পালন করার কারণে যখন মানুষ স্বস্তিতে চলাফেরা করতে পারে, সেটাই আমার কাছে সবচেয়ে বড় শান্তি।’

দায়িত্ব পালন করাটাই সবচেয়ে বড় পাওয়া

ঈদের দিন রাজধানীর শাহবাগে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থোপেডিকস বিভাগের জরুরি ইউনিটেও ছিল ব্যস্ততা। সেখানে দায়িত্ব পালন করছিলেন চিকিৎসক মানসী দত্ত। হাসপাতালের ব্যস্ততার মধ্যেই কথা হয় তাঁর সঙ্গে।

বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থোপেডিক বিভাগের চিকিৎসক মানসী দত্ত

মানসী দত্ত জানান, তিনি বর্তমানে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে এমএস কোর্সের ফেজ–এ রেসিডেন্ট হিসেবে কাজ করছেন। এর আগে একই প্রতিষ্ঠানে অর্থোপেডিকস বিভাগে মেডিক্যাল অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০ মার্চ থেকে নতুন দায়িত্বে কাজ শুরু করেন।

এই চিকিৎসক জানান, সকাল আটটা থেকে তাঁর ডিউটি শুরু হয়েছে। টানা ১২ ঘণ্টা কাজ করে রাতে বাসায় ফিরবেন। ঈদের দিনে অন্য সময়ের তুলনায় অর্থোপেডিকস বিভাগে রোগীর চাপ বেশি থাকে বলেও জানান তিনি।

ঈদের ছুটিতে ঘুরতে না পারা বা পরিবারকে সময় দিতে না পারার কষ্ট হয় কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে মানসী দত্ত বলেন, ‘আমরা চাই সবার ঈদটা সুন্দর হোক। মানুষের দোয়াটা এক অন্য রকম প্রশান্তি দেয়। এই প্রশান্তি বাসায় বিশ্রাম নিয়ে, ঘুরাঘুরি করে কিংবা শপিং করে পাওয়া যায় না। আমাদের চিকিৎসায় একজন মানুষ সুস্থ হলে, সেই মানুষটা সারা জীবন আমাদের মনে রাখেন।’

চিকিৎসকদের প্রতি মানুষের আচরণ নিয়েও আক্ষেপ প্রকাশ করেন মানসী দত্ত। তিনি বলেন, ‘আমরা ১২ ঘণ্টা কাজ করছি মানুষের জন্যই। কিন্তু কোনো সমস্যা হলেই সবাই ডাক্তারদের দোষ দেন। হাসপাতালে কোনো যন্ত্রাংশ না থাকলেও দায়টা চিকিৎসকদের ওপর পড়ে। এমনকি হামলার ঘটনাও ঘটে। অথচ কোনো কিছুর সংকট থাকলে সেটার সমাধান তো সরকারসহ সব সংশ্লিষ্ট পক্ষের সমন্বয়ে হওয়া উচিত।’

মানসী দত্ত, চিকিৎসকমানুষের দোয়াটা এক অন্য রকম প্রশান্তি দেয়। এই প্রশান্তি বাসায় বিশ্রাম নিয়ে, ঘুরাঘুরি করে কিংবা শপিং করে পাওয়া যায় না।

তবু মানুষের সেবার জায়গা থেকে সরে যেতে চান না বলে জানান এই চিকিৎসক। তাঁর ভাষায়, ‘কষ্ট আছে, চাপ আছে, তবু যখন দেখি একজন মানুষ চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরছেন, তখন মনে হয়—এই দায়িত্ব পালন করাটাই সবচেয়ে বড় পাওয়া।’

Read full story at source