ইসরায়েলের যে হামলা ভবিষ্যৎ যুদ্ধের জ্যামিতি বদলে দিল
· Prothom Alo

ইতিহাসে বহুবার দেখা গেছে, বড় যুদ্ধ শুধু মানচিত্র বদলায় না, যুদ্ধের ধরনও পাল্টে দেয়। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো দেখিয়ে দিচ্ছে, আমরা হয়তো এমন এক নতুন যুগে ঢুকে পড়েছি, যেখানে যুদ্ধের পুরোনো নিয়ম আর খাটছে না। এখন আর শত্রুর আকাশসীমায় ঢুকে লড়াই করা জরুরি নয়—দূরে বসেই আঘাত হানা যাচ্ছে, আর সেটাই সবচেয়ে বড় পরিবর্তন।
Visit tr-sport.click for more information.
২০২৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বর ইসরায়েল কাতারে হামলা চালায়। সেখানে কোনো যুদ্ধক্ষেত্র ছিল না, কোনো সরাসরি সংঘর্ষও চলছিল না। লক্ষ্য ছিল দোহার একটি বৈঠক, যেখানে হামাসের নেতারা যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা করতে বসেছিলেন।
সেই প্রস্তাব আবার এসেছিল ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে, আর তাতে ইসরায়েল নিজেও সম্পৃক্ত ছিল। অর্থাৎ যে আলোচনায় নিজেরাও অংশ নিচ্ছিল, সেই বৈঠককেই লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছিল। দোহায় ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানার সঙ্গে সঙ্গেই বোঝা যায়, এটা শুধু একটি হামলা নয়—এটি একটি নতুন নজির।
কাতারে ইসরায়েলি হামলা মার্কিন বিশ্বাসযোগ্যতা শেষ করে দিলএই একই ধরনের কৌশল আবার দেখা যায় ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি। আমেরিকা ও ইসরায়েলের ইরান যুদ্ধের শুরুতেই তেহরানে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির কম্পাউন্ডকে লক্ষ্য করে আঘাত হানা হয়। দুটি ঘটনার মধ্যে সময়ের ব্যবধান থাকলেও কৌশল একেবারে একই।
দুটি ক্ষেত্রেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—ইসরায়েলের যুদ্ধবিমান টার্গেট করা দেশের আকাশসীমায় ঢোকেনি। তারা দূর থেকেই ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে। সেই ক্ষেপণাস্ত্র নিজে নিজেই গিয়ে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করেছে। এর ফলে বিমানযুদ্ধের সবচেয়ে বড় বাধা—শত্রুর আকাশ প্রতিরক্ষা ভেদ করা—প্রায় অপ্রাসঙ্গিক হয়ে গেল।
দোহায় হামলাটি কৌশলগতভাবে ভুল ছিল বলেই ধরা হচ্ছে। কারণ, এতে ইসরায়েলের এই নতুন সামরিক ক্ষমতা অপ্রয়োজনীয়ভাবে সবার সামনে চলে আসে। লক্ষ্যটিও ছিল মূলত রাজনৈতিক, সামরিক নয়। পরে ইসরায়েল এই হামলার জন্য ক্ষমা চাইলেও, একবার যে প্রযুক্তি প্রকাশ্যে চলে এসেছে, তা আর লুকিয়ে রাখা যায়নি।
সৌদি আরব বিশ্বের সবচেয়ে বড় মার্কিন অস্ত্র ক্রেতা এবং তাদের কাছে বিপুলসংখ্যক এফ-১৫ বিমান রয়েছে। তবু তাদের বিমান এই ধরনের স্বাধীন নিয়ন্ত্রণ পায় না। কাতারের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। তাহলে এক দেশের ক্ষেত্রে এই সুযোগ দেওয়া হলো, অন্যদের ক্ষেত্রে নয় কেন?
এই হামলাগুলোতে প্রচলিত বোমাবর্ষণ পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়নি। বরং এক জটিল সমন্বিত প্রযুক্তিব্যবস্থার মাধ্যমে পুরো অপারেশন পরিচালিত হয়েছে। এখানে গোয়েন্দা তথ্য, নজরদারি, সাইবারব্যবস্থা, যোগাযোগ, কমান্ড—সবকিছুকে একসঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। এর ফলে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া, বাস্তব সময়ের পরিস্থিতি বোঝা এবং নিখুঁতভাবে আঘাত করা সম্ভব হয়েছে। ফলে বোঝা যায়, এখানে বিমান নয়, আসল শক্তি এই সমন্বিত ব্যবস্থাটাই।
কাতারের ক্ষেত্রে একটি ইসরায়েলি এফ-১৫ আই যুদ্ধবিমান লোহিত সাগরের আন্তর্জাতিক জলসীমার ওপর দিয়ে উড়ে সৌদি আরবের ইয়ানবু বন্দরের কাছাকাছি অবস্থান নেয়। কিন্তু তারা সৌদি আকাশসীমায় ঢোকেনি। কারণ, সৌদি আরবের বহুস্তরীয় শক্তিশালী আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা এড়িয়ে যাওয়াই ছিল লক্ষ্য।
এই অবস্থান থেকেই বিমানটি একটি আকাশ থেকে নিক্ষেপযোগ্য ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে, যা স্প্যারো পরিবারের অন্তর্ভুক্ত। সেটি সম্ভবত সিলভার স্প্যারো ধরনের। এটি এমন একধরনের ক্ষেপণাস্ত্র, যা প্রথমে বিমানের সঙ্গে থাকে, কিন্তু একবার ছেড়ে দিলে তা নিজের মতো করে এগোয়, অনেকটা মাঝারি পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের মতো।
মার্কিন ঘাঁটির নিরাপত্তাচাদর ফালাফালা, বাদশাহ-আমিরদের কী হবেক্ষেপণাস্ত্রটি প্রথমে রকেট বুস্টারের সাহায্যে ওপরে উঠে যায়। এটি ওঠে প্রায় বায়ুমণ্ডলের বাইরের স্তর পর্যন্ত। তারপর সেটি একটি বাঁকানো পথে এগিয়ে চলে, যেখানে সাধারণ আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা পৌঁছাতে পারে না। শেষ পর্যায়ে এটি অত্যন্ত দ্রুত গতিতে প্রায় সোজা নিচে নেমে আসে।
এই সময় ক্ষেপণাস্ত্রের গতি থাকে হাইপারসনিক বা অতিস্বনক মাত্রায়, অর্থাৎ শব্দের গতির চেয়ে পাঁচ গুণ বেশি। বায়ুমণ্ডলে ঢোকার সময় ঘর্ষণে প্রচণ্ড তাপ তৈরি হয় এবং তার চারপাশে প্লাজমার স্তর তৈরি হয়। এতে রাডারের পক্ষে সঠিকভাবে তাকে ধরা কঠিন হয়। ফলে প্রতিরক্ষাব্যবস্থার হাতে সময় থাকে খুবই কম—মাত্র কয়েক সেকেন্ড। এই অল্প সময়ে লক্ষ্য শনাক্ত করা, তার গতিপথ বোঝা এবং প্রতিরোধ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
এমনকি অত্যাধুনিক প্রতিরক্ষাব্যবস্থাও এই সমস্যার পুরো সমাধান করতে পারে না। তারা কিছুটা সাহায্য করতে পারে, কিন্তু সময় বাড়াতে পারে না। আর এই সময়ের সীমাবদ্ধতাই সবচেয়ে বড় বাধা, যা প্রযুক্তি দিয়ে পুরো কাটানো যায় না।
ইরানে হামলার মাস্টারমাইন্ড: মোসাদকে নীরবে পাল্টে দিলেন যিনিতেহরানের হামলাতেও সম্ভবত ব্লু স্প্যারো ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে একই কৌশল ব্যবহার করা হয়। এবার বিমানটি সিরিয়া বা ইরাকের দিক থেকে উড়ে এসে ইরানের দিকে উত্তর দিক থেকে আঘাত হানে। ভৌগোলিক অবস্থান বদলালেও কৌশল একটাই ছিল—দূর থেকে আঘাত, দ্রুতগতি এবং প্রতিরক্ষা এড়িয়ে যাওয়া।
এই প্রযুক্তির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—এটি ব্যবহার করতে গেলে বিমানের ভেতরের সফটওয়্যার ও মিশন সিস্টেমের ওপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকতে হয়। অর্থাৎ শুধু বিমান থাকলেই হবে না, তার ভেতরের কোড ও ডেটার ওপরও নিজের কর্তৃত্ব থাকতে হবে। ইসরায়েল সেই নিয়ন্ত্রণ পেয়েছে বলেই তারা এই ধরনের অপারেশন চালাতে পারছে।
এখানেই বড় প্রশ্ন ওঠে। সৌদি আরব বিশ্বের সবচেয়ে বড় মার্কিন অস্ত্র ক্রেতা এবং তাদের কাছে বিপুলসংখ্যক এফ-১৫ বিমান রয়েছে। তবু তাদের বিমান এই ধরনের স্বাধীন নিয়ন্ত্রণ পায় না। কাতারের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। তাহলে এক দেশের ক্ষেত্রে এই সুযোগ দেওয়া হলো, অন্যদের ক্ষেত্রে নয় কেন?
এই প্রশ্ন শুধু প্রযুক্তিগত নয়, সামরিক স্বাধীনতা এবং অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের মূল প্রশ্ন হয়ে আছে।
আরব দেশগুলো নিরাপত্তার নামে যেভাবে প্রতারিত হলোএর থেকেও বড় বিষয় হলো—এই কৌশল এখন আর গোপন নেই। কাতার ও ইরানে সফলভাবে ব্যবহার করে ইসরায়েল দেখিয়ে দিয়েছে, এটি কাজ করে। আর একবার কোনো পদ্ধতি কাজ করে দেখানো হলে, অন্য দেশগুলোও সেটি অনুসরণ করতে পারে।
এই প্রযুক্তির জন্য যেসব উপাদান দরকার, তা হলো—শক্তিশালী যুদ্ধবিমান, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, উন্নত নির্দেশনাব্যবস্থা। এর সবই অনেক দেশের কাছে রয়েছে। আমেরিকা, রাশিয়া, চীন, ফ্রান্স, পাকিস্তান—অনেক দেশই চাইলে এই ধরনের ব্যবস্থা তৈরি করতে পারবে।
এর ফলে যুদ্ধ এখন এমন এক জায়গায় পৌঁছাচ্ছে, যা পুরোপুরি আকাশ নয়, আবার পুরোপুরি মহাকাশও নয়—মাঝামাঝি এক স্তর। একবার এই সীমারেখা ভেঙে গেলে, তা আর আগের অবস্থায় ফিরবে না।
এর ফল খুবই গভীর। এখন আর কোনো দেশই পুরোপুরি নিরাপদ নয়। দূরত্ব বা ভৌগোলিক অবস্থান আর আগের মতো সুরক্ষা দেবে না। যে দূরত্ব একসময় নিরাপত্তার দেয়াল তৈরি করত, এখন তা আর তেমন কাজ করছে না।
ইসরায়েল এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে শুধু নিজের শক্তি বাড়ায়নি, অন্যদের জন্য পথও খুলে দিয়েছে। এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা—কবে অন্য দেশগুলোও একইভাবে এই কৌশল ব্যবহার করতে শুরু করবে।
এই পরিবর্তনের ফলে যুদ্ধ আরও অনিশ্চিত, দ্রুত এবং বিপজ্জনক হয়ে উঠবে। সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়ও কমে আসবে—দিন নয়, মিনিটের মধ্যে বড় সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এই অস্ত্র শুধু যুদ্ধের জন্য নয়, রাজনৈতিক চাপ তৈরি করা, আঞ্চলিক প্রতিযোগিতা বাড়ানো এবং কৌশলগত দ্বন্দ্ব মেটানোর ক্ষেত্রেও ব্যবহার হতে পারে।
সব মিলিয়ে, যুদ্ধের ধারণাই বদলে যাচ্ছে। আর সেই সঙ্গে বদলে যাচ্ছে নিরাপত্তা সম্পর্কে আমাদের পুরোনো ধারণাও।
নাওয়াফ ওবাইদ লন্ডনের কিংস কলেজের ওয়ার স্টাডিজ বিভাগের সিনিয়র ফেলো। তিনি আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও সামরিক কৌশল নিয়ে গবেষণা করেন।
আল–জাজিরা থেকে নেওয়া। অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ।