ফেলন ছেড়ে তরমুজ চাষে কেন ঝুঁকছেন চট্টগ্রামের কৃষকেরা
· Prothom Alo

চট্টগ্রাম জেলার চন্দনাইশ উপজেলার কৃষক মো. হান্নান একসময় শীত এলেই ফেলন ডালের বীজ হাতে নিতেন। ধান কাটার পর জমিতে হালকা চাষ দিয়ে দ্রুত বীজ বপন করতেন। কিন্তু চার বছর ধরে তিনি আর ফেলন চাষ করছেন না। শেষবার যে ফলন পেয়েছিলেন, তা বিক্রি করে খরচই ওঠেনি।
হান্নান সম্প্রতি প্রথম আলোকে বলেন, ‘আগে স্থানীয় বীজ দিয়েই ভালো ফলন হতো। এখন পাতায় মরিচা ধরে, ফুল কম আসে। শেষে দেখি, খরচই উঠছে না। তাই অন্য ফসল ধরেছি।’
Visit asg-reflektory.pl for more information.
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, চট্টগ্রামে ফেলন ডালের উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে কমছে। ২০২১-২২ অর্থবছরে যেখানে উৎপাদন ছিল ১৬ হাজার ৮৪৯ টন, সেখানে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা নেমে এসেছে ১২ হাজার ৬৪২ টনে।
চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলায় ঘুরলে এখন ফেলন ডালের চাষ নিয়ে কৃষকের মুখে এমন হতাশার গল্পই বেশি শোনা যায়। কেউ পুরোপুরি চাষ ছেড়েছেন, কেউ জমি কমিয়ে দিয়েছেন। তাই এর প্রভাব পড়েছে উৎপাদনে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, চট্টগ্রামে ফেলন ডালের উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে কমছে। ২০২১–২২ অর্থবছরে যেখানে উৎপাদন ছিল ১৬ হাজার ৮৪৯ টন, সেখানে ২০২৫–২৬ অর্থবছরে তা নেমে এসেছে ১২ হাজার ৬৪২ টনে। মাঝখানের সময়েও পতনের ধারা থামেনি; ২০২৪–২৫ অর্থবছরে উৎপাদন ছিল প্রায় ১৩ হাজার টন। সব মিলিয়ে পাঁচ বছরের ব্যবধানে উৎপাদন কমেছে প্রায় ৪ হাজার ২০৭ টন, যা শতাংশের হিসাবে প্রায় ২৫। একই সময়ে জেলার মোট ডাল উৎপাদনও কমেছে প্রায় ৬ হাজার টন। খেসারি, মসুর, মুগ, মাষকলাই ও মটরের উৎপাদনও কমেছে।
ফেলন চট্টগ্রামের প্রধান ডাল ফসল। ফটিকছড়ি, পটিয়া, মিরসরাই ও সন্দ্বীপে এখনো কিছুটা উৎপাদন হচ্ছে। কিন্তু আনোয়ারা, কর্ণফুলী, বাঁশখালী ও চন্দনাইশে আবাদ ও ফলন—দুটিই ধারাবাহিকভাবে কমেছে। চার বছরে শতাধিক কৃষক চাষ কমিয়েছেন।
আনোয়ারার কৃষক মোহাম্মদ আবু সায়েম চার-পাঁচ বছর আগেও ফেলন চাষ করতেন। এখন আর করেন না। তিনি বলেন, ‘শুরুতে ভালোই লাভ ছিল। উৎপাদনও বেশি হতো। পরে দেখি, ফলন কমতে শুরু করেছে। তখন আর ধরে রাখতে পারিনি।’
তবে সন্দ্বীপের মাইটভাঙ্গা ইউনিয়নের কৃষক মাইন উদ্দীন এখনো ফেলন চাষ করছেন। এবারের মৌসুমে ৪০ শতক জমিতে চাষ করেছেন। তাঁর হিসাবে, খরচ হয়েছে পাঁচ থেকে সাত হাজার টাকা। তিনি আশা করছেন, প্রায় দুই মণ ডাল পাবেন। মাইন উদ্দীন বলেন, ‘বাজার ভালো থাকলে লাভ আছে। এখন কেজি প্রায় ১০০ টাকা। কিন্তু ফলন ঠিক থাকবে কি না, এই নিশ্চয়তা নেই। কখনো ভালো হয়, কখনো একেবারে কমে যায়।’
— আপ্রু মারমা, উপপরিচালক, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, চট্টগ্রামকৃষকেরা এখন উচ্চমূল্যের ফসলের দিকে ঝুঁকছেন। তরমুজ ও কিছু সবজির চাষ বেড়েছে। সীতাকুণ্ড ও মিরসরাইয়ে আগে যেসব জমিতে ফেলন হতো, এখন সেখানে তরমুজ হচ্ছে। কারণ, ফেলনের চেয়ে তরমুজে লাভ বেশি। এতে ফেলনের উৎপাদনে টান পড়ছে।জমিও কমছে
পরিসংখ্যান বলছে, ২০২১-২২ সালে ফেলনের আবাদ ছিল প্রায় ১২ হাজার ৯৬১ হেক্টরে। ২০২৫-২৬ সালে সেই আবাদ কিছুটা কমেছে। এবার ১২ হাজার ৬৪২ হেক্টর জমিতে ফেলনের চাষ হয়েছে। ফলে উৎপাদন ও জমির পরিমাণ কমায় কৃষি কর্মকর্তারা দুশ্চিন্তায় পড়েছেন।
কৃষি কর্মকর্তা ও কৃষকেরা বলছেন, আবহাওয়ার অনিশ্চয়তা এখন বড় ঝুঁকি। শীতের শেষে হঠাৎ বৃষ্টি বা তাপমাত্রা বেড়ে গেলে গাছের ফুল ঝরে যায়। এতে গাছ বেঁচে থাকলেও দানা ঠিকমতো হয় না। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে রোগবালাই। বছরের পর বছর একই বীজ ব্যবহার করায় পাতায় মরিচা রোগ বাড়ছে। এতে গাছ দুর্বল হয়ে পড়ে, ফুলও কম ধরে।
গবেষণাতেও এই প্রবণতার প্রতিফলন আছে। ২০২৪ সালে ‘এশিয়া-প্যাসিফিক জার্নাল অব রিজওনাল সায়েন্স’-এ প্রকাশিত এক গবেষণায় ১৯৭২ থেকে ২০২০ সালের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বৃষ্টিপাত ডাল উৎপাদনে সহায়ক হলেও তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার ঊর্ধ্বগতি নেতিবাচক প্রভাব তৈরি করে। গবেষণাটি বলছে, জলবায়ুগত পরিবর্তন ডাল উৎপাদনের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতাকে প্রভাবিত করছে।
আবার ২০১৮ সালে অ্যাগ্রিকালচার সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশে ডাল উৎপাদন বাড়াতে উন্নত জাত ও উপযুক্ত প্রযুক্তি গ্রহণ জরুরি হলেও ভালো মানের বীজের অভাব, পোকা-রোগের আক্রমণ এবং কৃষকের প্রযুক্তি গ্রহণে সীমাবদ্ধতা বড় বাধা হয়ে আছে। গবেষণাটি আরও বলছে, শস্য আবাদে প্রতিযোগিতার কারণে ডালের জমিও চাপে পড়ে।
জানতে চাইলে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর চট্টগ্রামের উপপরিচালক আপ্রু মারমা প্রথম আলোকে বলেন, কৃষকেরা এখন উচ্চমূল্যের ফসলের দিকে ঝুঁকছেন। তরমুজ ও কিছু সবজির চাষ বেড়েছে। সীতাকুণ্ড ও মিরসরাইয়ে আগে যেসব জমিতে ফেলন হতো, এখন সেখানে তরমুজ হচ্ছে। কারণ, ফেলনের চেয়ে তরমুজে লাভ বেশি। এতে ফেলনের উৎপাদনে টান পড়ছে। তিনি বলেন, অনেক কৃষক একই বীজ বহু বছর ধরে ব্যবহার করছেন। এতে রোগের প্রকোপ বাড়ছে, ফলনও কমছে।
পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ ফেলন
ফেলন গ্রামীণ খাদ্যতালিকারও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সরকারি কৃষি তথ্যভান্ডার বাংলাদেশ অ্যাগ্রো-মেটিওরোলজিক্যাল ইনফরমেশন সার্ভিস (বামিস) বলছে, ফেলনে খাদ্যশক্তি ও প্রোটিন—দুটিই রয়েছে। সেখানে বারি ফেলন-১ ও বারি ফেলন-২কে উন্নত জাত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ফেলন বেলে দোআঁশ থেকে এঁটেল দোআঁশ, ভালো নিকাশযুক্ত জমিতে ভালো হয়। সাধারণত নভেম্বরের শেষ সপ্তাহ থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে বীজ বপন করা হয়। মার্চ থেকে এপ্রিলের মধ্যে ফসল তোলা যায়।
কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, এই ফসলের বড় সুবিধা হলো, কম সেচে চাষ সম্ভব। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, মাঠপর্যায়ে মৌলিক ব্যবস্থাপনাই অনেক সময় মানা হয় না। ধান কাটার পর অনেক জমিতে তাড়াহুড়ো করে ফেলনের বীজ ছিটিয়ে দেওয়া হয়। জমি ঠিকমতো প্রস্তুত করা হয় না। সুষম সার প্রয়োগ, নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে বপন, সময়মতো আগাছা দমন; এসব ধাপও অনেক ক্ষেত্রে উপেক্ষিত থাকে। ফলে আবাদ থাকলেও ফলন নেমে যায়।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য উন্নত ও রোগপ্রতিরোধী বীজ সরবরাহ, মাঠপর্যায়ে প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং কৃষকদের প্রশিক্ষণ বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন আঞ্চলিক কৃষি গবেষণা কেন্দ্র চট্টগ্রামের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এস এম ফয়সল। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ফেলনের উৎপাদন বাড়াতে কৃষকদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে। উচ্চফলনশীল বীজ সরবরাহ করতে হবে। এর মধ্যে বারি ফেলন-১ ও বারি ফেলন-২ ব্যবহার বাড়ানো যেতে পারে। আবার বিরতি দিয়ে স্থানীয় জাতও ব্যবহার করা যেতে পারে।