যে বোলতার নাম হলো শতবর্ষী ডেভিড অ্যাটেনবরোর নামে

· Prothom Alo

শতবর্ষের জন্মদিনে কেউ ফুল পায়, কেউ কেক। কিন্তু পৃথিবীর সবচেয়ে বিখ্যাত প্রকৃতিবিদদের একজন ডেভিড অ্যাটেনবরো পেলেন এক অদ্ভুত উপহার—একটি ক্ষুদ্র পরজীবী বোলতা!

Visit sportbet.rodeo for more information.

মাত্র সাড়ে তিন মিলিমিটার লম্বা বাদামি রঙের এই বোলতার নাম রাখা হয়েছে অ্যাটেনবরোঙ্কুলাস টাউ (Attenboroughnculus tau)। নাম শুনতে জটিল লাগলেও এর পেছনের গল্পটা দারুণ। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, প্রকৃতি ও প্রাণবৈচিত্র্যকে মানুষ যেভাবে নতুন চোখে দেখতে শিখেছে, তার বড় কৃতিত্ব অ্যাটেনবরোর। তাই তাঁর ১০০তম জন্মদিনে নতুন প্রজাতির এই বোলতা তাঁকে উৎসর্গ করা হয়েছে।

বোলতাটি খুঁজে পেয়েছেন ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামের গবেষকেরা। মজার ব্যাপার হলো, এটি কোনো জঙ্গলে নতুন করে ধরা পড়েনি, বরং বহু বছর ধরে জাদুঘরের সংগ্রহেই ছিল। ১৯৮৩ সালে দক্ষিণ আমেরিকার দেশ চিলির ভালদিভিয়া অঞ্চল থেকে এটি সংগ্রহ করা হয়েছিল। তারপর প্রায় চার দশক ধরে অসংখ্য নমুনার ভিড়ে এটি পড়ে ছিল নীরবে।

অ্যাটেনবরোঙ্কুলাস টাউ বোলতা

একদিন গবেষকেরা পুরোনো সংগ্রহ ঘাঁটতে গিয়ে খেয়াল করেন, ছোট্ট এই বোলতাটি অন্যদের মতো নয়। এর শরীরে এমন কিছু বৈশিষ্ট্য আছে, যা আগে দেখা যায়নি। এরপর শুরু হয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা। শেষ পর্যন্ত নিশ্চিত হওয়া যায়, এটি সম্পূর্ণ নতুন একটি প্রজাতি। শুধু তা-ই নয়, এটি এতটাই আলাদা যে এর জন্য নতুন গণ বা জেনাস পর্যন্ত তৈরি করতে হয়েছে।

ডেভিড অ্যাটেনবরো সম্পর্কে এই ১০ তথ্য জানেন কি
১৯৮৩ সালে দক্ষিণ আমেরিকার দেশ চিলির ভালদিভিয়া অঞ্চল থেকে অ্যাটেনবরোঙ্কুলাস টাউ বোলতাটি সংগ্রহ করা হয়েছিল।

বিজ্ঞানীরা এর নামের শেষে ‘tau’ যোগ করেছেন গ্রিক বর্ণ ‘টাউ’ থেকে। কারণ, বোলতার পেটের ওপর ইংরেজি ‘T’ অক্ষরের মতো দুটি চিহ্ন দেখা যায়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এত ছোট্ট একটি পোকা নিয়ে এত উত্তেজনার কারণ কী?

কারণ, এটি সাধারণ বোলতা নয়। এটি একধরনের পরজীবী বোলতা বা প্যারাসাইটিক ওয়াস্প। শুনতে ভয়ংকর লাগলেও প্রকৃতির জগতে এরা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই বোলতারা সাধারণত অন্য কোনো প্রাণীর শরীর বা ডিমের ভেতরে নিজেদের ডিম পাড়ে। পরে বাচ্চারা ফুটে বের হলে সেই প্রাণীকেই ধীরে ধীরে খেতে থাকে। প্রকৃতির ভাষায় এটি নিষ্ঠুর মনে হলেও বাস্তুতন্ত্রে এর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। এরা অনেক ক্ষতিকর পোকামাকড়ের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করে।

বোলতার পেটের ওপর ইংরেজি ‘T’ অক্ষরের মতো দুটি চিহ্ন দেখা যায়

গবেষকেরা এখনো নিশ্চিত নন, নতুন এই বোলতাটি ঠিক কোন প্রাণীকে শিকার বানায়। তবে ধারণা করা হচ্ছে, এটি হয়তো মাকড়সার ডিমের থলির ভেতরে ডিম পাড়ে। পরে বাচ্চারা সেই ডিম খেয়ে বড় হয়।

প্রকৃতির এই অদ্ভুত আচরণ বহু বছর ধরেই মানুষকে বিস্মিত করেছে। অ্যাটেনবরো নিজেও তাঁর বিখ্যাত তথ্যচিত্রগুলোতে বহুবার এমন পরজীবী বোলতার জীবন দেখিয়েছেন। তাঁর ধারাভাষ্যে ভয়ংকর দৃশ্যও রহস্যময় সৌন্দর্যে ভরে উঠত। ছোটবেলায় টেলিভিশনের পর্দায় এসব দেখে অসংখ্য শিশু প্রথমবারের মতো প্রকৃতিকে ভালোবাসতে শিখেছে।

ডেভিড অ্যাটেনবরো সঙ্গে সাগর অভিযান
এই অ্যাটেনবরোঙ্কুলাস টাউ বোলতারা সাধারণত অন্য কোনো প্রাণীর শরীর বা ডিমের ভেতরে নিজেদের ডিম পাড়ে। পরে বাচ্চারা ফুটে বের হলে সেই প্রাণীকেই ধীরে ধীরে খেতে থাকে।

এই নতুন প্রজাতির গবেষণায় যুক্ত বিজ্ঞানী গ্যাভিন ব্রড বলেছেন, তিনি ছোটবেলায় অ্যাটেনবরোর অনুষ্ঠান দেখে ট্যাক্সোনমিস্ট হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন। ট্যাক্সোনমিস্ট হলেন সেই বিজ্ঞানী, যিনি নতুন প্রাণী ও উদ্ভিদের পরিচয় নির্ধারণ করেন এবং নাম দেন।

পৃথিবীতে লাখ লাখ প্রাণী এখনো অচেনা। বিজ্ঞানীদের ধারণা, পৃথিবীর বিপুলসংখ্যক পোকামাকড়ের নামই এখনো দেওয়া হয়নি। শুধু ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামের সংগ্রহেই কোটি কোটি নমুনা আছে, যার বড় অংশ এখনো পুরোপুরি শনাক্ত হয়নি।

এ কারণেই জাদুঘরের সংগ্রহ এত গুরুত্বপূর্ণ। আমরা সাধারণত মনে করি, নতুন প্রাণী খুঁজতে হলে গভীর জঙ্গলে যেতে হবে। কিন্তু অনেক সময় নতুন আবিষ্কার লুকিয়ে থাকে পুরোনো বাক্সের ভেতরেও। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো, এই গবেষণায় একজন স্বেচ্ছাসেবকও ভূমিকা রেখেছেন। তিনি প্রথম সন্দেহ করেছিলেন, বোলতাটি আলাদা কিছু হতে পারে। বিজ্ঞান শুধু বড় বড় গবেষণাগারেই সীমাবদ্ধ নয়, কৌতূহলী সাধারণ মানুষও এতে অবদান রাখতে পারে।

বিশ্বজুড়ে এখন অনেক তরুণ-তরুণী মোবাইল ফোন দিয়ে পোকামাকড়, পাখি বা গাছের ছবি তুলে বিভিন্ন ওয়েবসাইটে আপলোড করছেন। সেখান থেকেই অনেক সময় নতুন তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, আপনার আশপাশের পার্ক, বাগান বা বাড়ির দেয়ালেও এমন প্রাণী থাকতে পারে, যাদের সম্পর্কে বিজ্ঞান এখনো খুব কম জানে।

মৌমাছি হুল ফোটালে এত ব্যথা লাগে কেন
বিজ্ঞানীদের ধারণা, পৃথিবীর বিপুলসংখ্যক পোকামাকড়ের নামই এখনো দেওয়া হয়নি। শুধু ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামের সংগ্রহেই কোটি কোটি নমুনা আছে, যার বড় অংশ এখনো পুরোপুরি শনাক্ত হয়নি।

এ কারণেই অ্যাটেনবরোর গল্প এখনো এত অনুপ্রেরণাদায়ক। এক শ বছর বয়সেও তিনি মানুষকে প্রকৃতির দিকে তাকাতে শেখাচ্ছেন। তাঁর কণ্ঠ শুনে আজও নতুন প্রজন্ম বিস্ময়ে আবিষ্কার করছে পিঁপড়া, মাকড়সা, ব্যাঙ কিংবা বোলতার গোপন জীবন।

এক শ বছর বয়সেও ডেভিড অ্যাটেনবরো মানুষকে প্রকৃতির দিকে তাকাতে শেখাচ্ছেন

হয়তো পৃথিবীর কোথাও, কোনো পাতার নিচে এখনো লুকিয়ে আছে আরেকটি অচেনা প্রাণী। কেউ তাকে এখনো নাম দেয়নি। কেউ জানে না তার গল্প। কিন্তু কোনো এক কৌতূহলী চোখ একদিন সেটিকে খুঁজে পাবে। তারপর সেই ছোট্ট প্রাণীটিও হয়ে উঠবে পৃথিবীর বড় এক বিস্ময়।

লেখক: সাবেক শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সূত্র: আরএনজেডমৌমাছি নিয়ে ১০টি মজার তথ্য

Read full story at source