মেট গালা বর্জন করে যে গল্প বললেন মামদানি
· Prothom Alo

মেট গালার ঝলমলে আলো নিভে গেলেও আলোচনা থামেনি। বরং বিশ্বজুড়ে সবাই ব্যস্ত তারকাদের পোশাক বিশ্লেষণে। অথচ একই দিনে লাল গালিচার বাইরে দাঁড়িয়ে জোহরান মামদানি মনে করিয়ে দিয়েছেন—ফ্যাশনের সবচেয়ে উজ্জ্বল গল্পগুলো লেখা হয় অদৃশ্য শ্রমিকের অনবদ্য সৃজননৈপুণ্যে।
Visit h-doctor.club for more information.
নিউইয়র্কের মেয়র হিসেবে চার মাস পার করেছেন জোহরান মামদানি। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির অনেক কিছুই এখনো বাস্তবায়ন করতে না পারায় কিছুটা আড়ালেই ছিলেন তিনি। তবে হঠাৎ করেই আবার আলোচনায় ফিরেছেন মেট গালা বর্জনের সিদ্ধান্ত এবং তার বিপরীতে গড়ে তোলা এক ব্যতিক্রমী প্রচারণার কারণে।
নিউহয়র্ক মেয়র জোহরান মামদানিনিউইয়র্কের মেট্রোপলিটান মিউজিয়ামের লাল গালিচা তখন তারায় তারায় খচিত। মেট গালার ঝলমলে আসরজুড়ে আলো, ক্যামেরা, হীরের ঝিলিক আর বিলাসিতার বিজ্ঞাপন। টেলিভিশনের সামনে তখন চোখ গোটা বিশ্বের। ঠিক সে রাতেই শহরের আরেক প্রান্তে দাঁড়িয়ে নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানি লিখলেন ফ্যাশনের এক অন্যরকম গল্প। পোশাক নয়, তাঁর কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠলেন পোশাকশ্রমিকরা।
মেট গালায় মামদানির না যাওয়ার সিদ্ধান্ত ছিল প্রতীকী। কারণ এ বছরের আয়োজন ঘিরে ছিল তীব্র বিতর্ক। বিশেষ করে জেফ বেজোসের সম্পৃক্ততা নিয়ে নিউইয়র্কজুড় উত্তাল ছিল বিক্ষোভে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও সবর ছিল ‘অ্যামাজন প্রাইম গালা’র মতো ব্যঙ্গাত্মক শব্দবন্ধ ব্যবহারে।
দর্জি সোনিয়া কাস্ত্রেখোন ও হাফিজ রাজাক্রিস্টোফার অ্যান্ডারসন ও আর্নেস্টিন গেতবে বুদ্ধিমান মামদানি এই আসর কেবল বয়কট করেননি; বরং তিনি তৈরি করেন পাল্টা এক ভিজ্যুয়াল বিবৃতি। মেট গালার রাতেই তিনি প্রকাশ করেন একটি ফটোশুটের ছবি; যেখানে স্পটলাইটে ছিলেন নিউইয়র্কের গার্মেন্টশ্রমিকরা— দর্জি, প্যাটার্ন কাটার, সূচিশিল্পী আর অভিবাসীকর্মীরা। এই প্রচারণায় মামদানি সামনে নিয়ে আসেন কয়েকজন শ্রমিক ও সংগঠকের গল্প; এঁরা হলেন– দর্জি হাফিজ রাজা; দর্জি ও শ্রমিক ইউনিয়ন সংগঠক ক্রিস্টোফার অ্যান্ডারসন; অ্যামাজনের সাবেক ডেলিভারি কর্মী ও শ্রমিক অধিকারকর্মী ল্যাট্রিস জনসন এবং ল্যামন্ট হোপওয়েল; দর্জি সোনিয়া কাস্ত্রেখোন; এবং মেসির কর্মী ও শ্রমিক ইউনিয়ন সংগঠক আর্নেস্টিন গে।
কেবল মেট গালা নয়, বরং যেকোন বড় আসরের জন্য তারকাদের পোশাক তৈরি করে থাকেন পোশাককর্মীরা। কখনো কখনো একটা পোশাক বানাতে সময় লাগে কয়েক শ ঘন্টাও। অথচ এঁরাই থেকে যান পাদপ্রদীপের আলোর বাইরে।
অ্যামাজনের সাবেক ডেলিভারি কর্মী ও শ্রমিক অধিকারকর্মী ল্যাট্রিস জনসন এবং ল্যামন্ট হোপওয়েলএদের সৃজননৈপুণ্যেই তারকা উৎসবদিনে ঝলমলিয়ে ওঠেন। অথচ অনুচ্চারিত থেকে যান তাঁরা। অনেকটা সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কবিতার এই লাইনগুলোর মতো করে বলতে হয়: অবিরল রঙের ধারার মধ্যে হীরকখচিত রমণীরা কত রকম আমোদে হাসলেও ওদের কথা কেউ মনে রাখেনি। তাই তো তারা থেকে যায় ফ্যাশনের সবচেয়ে বড় উৎসবের বাইরে।
যাদের হাতের নিখুঁত কারুকাজে ডিজাইনারের করা নকশা প্রাণ পায়, অনবদ্য সেলাইয়ের কারণে পোশাক হয়ে ওঠে নজরকাড়া তাদেরকে সামনে নিয়ে আসাই ছিল মামদানির এই প্রয়াসের উদ্দেশ্য।
মেট গালায় অ্যানা হ্যাথাওয়ে– কোথাও লেখা নেই কে বানিয়েছে এই অনিন্দ্যসুন্দর গাউনজেন–জি প্রজন্মের কাছে এখানেই গল্পটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কারণ তারা এমন এক পৃথিবীতে বড় হচ্ছে, যেখানে নান্দনিকতা শুধু ফিল্টার নয়; বরং রাজনৈতিক ভাষাও। তারা জানে, একটি ভাইরাল আউটফিটের পেছনে হয়তো রাত জেগে কাজ করা কোনো অভিবাসী নারী আছেন। তাঁরা বুঝতে শুরু করেছেন, ‘ফ্যাশন’ আর ‘ফাস্ট ফ্যাশন’ এক জিনিস নয়।
মামদানির এই অবস্থান তাই নিছক রাজনৈতিক স্টান্ট হয়ে থাকেনি। বরং এটি ছিল সংস্কৃতি পুনর্দখলের চেষ্টা। তিনি যেন বলতে চেয়েছেন—ফ্যাশন কেবল রেড কার্পেটের বিষয় নয়; এটি শ্রম, ঘাম, অভিবাসন, অসমতা আর মানুষের গল্প।
সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, এই বার্তা এসেছে খুবই ‘জেন–জি’ ভাষায়। প্রচলিত বক্তৃতা নয়, বরং সিনেম্যাটিক ফটোশুট, নরম আলো, মিনিমাল স্টাইলিং আর ইনস্টাগ্রাম-সুলভ ভিজ্যুয়াল ন্যারেটিভে। যেন প্রতিবাদও এখন নান্দনিক হতে শিখেছে।
আজকের পৃথিবীতে ফ্যাশন আর রাজনীতি আলাদা কিছু নয়। একটি টি-শার্টও অবস্থান জানাতে পারে, একটি অনুপস্থিতিও হয়ে উঠতে পারে উচ্চারণ। সবচেয়ে দামি টিকিটের আসর মেট গালার রাতেও তাই সবচেয়ে আলোচিত হয়ে ওঠেন সেই মানুষটি, যিনি সেখানে যাননি।
কারণ কখনো কখনো লাল গালিচায় হাঁটার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে তাঁদের গল্প সবাইকে জানানো, যাঁদের নিপুণতায় তৈরি হয়েছে লাল গালিচা আলো করা তাবড় তারকাদের পোশাক।
ছবি: ইন্সটাগ্রাম