হত্যা মামলার আসামি আওয়ামী লীগ নেতা, ‘রাজনৈতিক’ দেখিয়ে প্রত্যাহারের সুপারিশ বিএনপি নেতার

· Prothom Alo

ফরিদপুরের ভাঙ্গায় ইতালিপ্রবাসী মাসুদ রানা হত্যা মামলাটিকে ‘রাজনৈতিক’ হিসেবে উল্লেখ করে মামলা প্রত্যাহারের আবেদন করেছেন জেলা বিএনপির আহ্বায়ক সৈয়দ মোদাররেছ আলী। মামলার প্রধান আসামি ইমদাদুল হক ওরফে বাচ্চু। তিনি ভাঙ্গা পৌর আওয়ামী লীগের সহসভাপতি।

Visit esporist.org for more information.

গত ২৩ এপ্রিল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ‘মামলা প্রত্যাহার–সম্পর্কিত প্রতিবেদনে’ মাসুদ হত্যা মামলাটিকে রাজনৈতিক মামলা বিবেচনায় প্রত্যাহারের সুপারিশ করা হয়। এতে আবেদনকারী হিসেবে বিএনপি নেতা সৈয়দ মোদাররেছ আলীর নাম রয়েছে। আবেদনে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ কামরুল হাসান মোল্লা, পুলিশ সুপার মো. নজরুল ইসলাম, অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এ ডি এম) মিন্টু বিশ্বাস এবং জেলা ও দায়রা জজ আদালতের সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) আশরাফ আলী সুপারিশ করেছেন।

তবে বিএনপি নেতা সৈয়দ মোদাররেছ আলী মামলা প্রত্যাহারের এমন কোনো আবেদনের বিষয়টি অস্বীকার করেছেন। যদিও এ ডি এম মিন্টু বিশ্বাস নিশ্চিত করেছেন, জেলা বিএনপির আহ্বায়ক আবেদনকারী হিসেবে স্বাক্ষর করেছেন, তিনি এখন হয়তো ভুলে গেছেন।

এ ঘটনার প্রতিবাদে আজ মঙ্গলবার দুপুরে ফরিদপুর প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করেছেন নিহত মাসুদ রানার (৪৫) পরিবার। এতে নিহত মাসুদের মা হালিমা বেগমের লিখিত বক্তব্য পড়ে শোনান মাসুদের ছোট ভাই মো. আসাদুজ্জামান। সংবাদ সম্মেলনে মাসুদের স্ত্রী শাহীন আফরোজ ও ছোট মেয়ে মাসুদা মেহেরামা উপস্থিত ছিলেন।

সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, ২০২১ সালের ১৩ এপ্রিল ভাঙ্গা পৌরসভার নওপাড়া পৌর আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ইমদাদুল হক, তাঁর ভাই মঞ্জু মিয়া, দুই ছেলে রিজু মিয়া, মিজু মিয়াসহ ৩০–৩৫ জন ব্যক্তি বাসস্ট্যান্ডে ইতালিপ্রবাসী মাসুদ রানাকে কুপিয়ে হত্যা করেন। ঘটনার দুদিন পর ১৫ এপ্রিল নিহত মাসুদের মা হালিমা বেগম বাদী হয়ে ভাঙ্গা থানায় একটি হত্যা মামলা করেন। ওই বছরের ২৭ সেপ্টেম্বর মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা উল্লিখিত আসামিসহ ৩৪ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন। বর্তমানে মামলাটি ফরিদপুরের দ্বিতীয় জজ আদালতে বিচারাধীন। সম্প্রতি আসামিরা প্রভাব খাটিয়ে মামলাটিকে ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা’ হিসেবে দেখিয়ে প্রত্যাহারের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করিয়েছেন।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ২০১২ সালে ভাঙ্গা পৌর আওয়ামী লীগের সর্বশেষ সম্মেলনে ইমদাদুল হক সহসভাপতি নির্বাচিত হন। ওই কমিটি এখনো বহাল আছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই আওয়ামী লীগ নেতাকে ফরিদপুর-৪ আসনের বিএনপির প্রার্থী শহিদুল ইসলামের পক্ষে প্রচারণা চালাতে দেখা যায়।

ভাঙ্গা পৌর এলাকার দুজন বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, ২০২১ সালের ২০ সেপ্টেম্বর ভাঙ্গা পৌর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে ইমদাদুল হক ২ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর প্রার্থী হওয়ার উদ্যোগ নেন। একই ওয়ার্ডে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন জহুরুল হক। ইতালিপ্রবাসী মাসুদ রানা জহুরুলের সমর্থক ছিলেন। তিনি (মাসুদ) জহুরুলের পক্ষে প্রচারণা ও এলাকার মানুষকে সহযোগিতা করে আসছিলেন। এই ক্ষোভ থেকে হত্যাকাণ্ডটি ঘটে।

বাদীপক্ষের আইনজীবী আবদুর রশিদ বলেন, মামলাটির সাক্ষ্য গ্রহণ চলছে। ২৪ জন সাক্ষীর মধ্যে এখন পর্যন্ত ৯ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ হয়েছে। তিনি বলেন, এটি কোনো রাজনৈতিক মামলা নয়। মামলার কোথাও বিএনপি, আওয়ামী লীগ, জামায়াত লেখা নেই। এটি স্থানীয় বিরোধের জেরে একটি হত্যাকাণ্ড। কিন্তু আসামিপক্ষ প্রভাবশালী হওয়ায় তাঁরা রাজনৈতিক বিবেচনার তকমা দিয়ে মামলাটি প্রত্যাহারের চেষ্টা করছেন, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য ও সমর্থনযোগ্য নয়।

জেলা বিএনপির আহ্বায়ক সৈয়দ মোদাররেছ আলী প্রথম আলোকে বলেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের স্পষ্ট নির্দেশনা আছে, কোনো হত্যা কিংবা নারী নির্যাতনের মামলা রাজনৈতিক বিবেচনার আওতায় আসবে না। সেখানে তাঁর এমন কোনো আবেদনের প্রশ্নই ওঠে না। তিনি জানেন না, আবেদনকারী হিসেবে কেন তাঁর নাম জুড়ে দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, ‘যারা সুপারিশ করে পাঠিয়েছে, তারা বলতে পারবে—আমি আবেদনকারী হিসেবে কোনো স্বাক্ষর করেছি নাকি মৌখিকভাবে জানিয়েছি। এ কাগজ তারা দেখাতে পারবে না। কেননা আমি এ–জাতীয় কোনো কাজ করিনি।’

তবে এ ডি এম মিন্টু বিশ্বাস প্রথম আলোকে বলেন, ‘যদিও এসব ক্ষেত্রে আবেদনকারী হয় ভুক্তভোগী। কিন্তু জেলা বিএনপির আহ্বায়ক ভুল করে আবেদনকারীর ঘরে স্বাক্ষর করে ফেলেছিলেন।’ তিনি বলেন, হত্যা মামলা রাজনৈতিক বিবেচনায় প্রত্যাহার করা যাবে না—এ–জাতীয় কোনো নীতিমালা নেই। তা ছাড়া তিন দফা যাচাই-বাছাই করে জেলা কমিটি এ সুপারিশ পাঠিয়েছে। যদি এমন হয় সুপারিশ যথাযথ হয়নি, তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষ তাদের কাছে আবেদন করতে পারে, কিংবা সরাসরি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়েও আবেদন করতে পারে। এটি এখনো কার্যকর হয়নি। মামলাটি চলমান রাখার সুযোগ এখনো আছে।

Read full story at source